somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নেগেটিভ মার্কেটিং

০১ লা জুন, ২০২৪ সকাল ১০:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার দ্যা সূর্যসেন হলের আবাসিক ছাত্র ছিলাম৷ হলের ৩০৮ নম্বর কক্ষে থাকতাম৷ ছোট সিঙ্গেল রুম৷ ডাবলিং করে দুইজন থাকতে হতো৷ যার যার রুমের সামনের বারান্দায় দড়ি দিয়ে কাপড় শুকানোর ব্যবস্থা ছিল৷ আমরা সেখানে কাপড় শুকাতে দিতাম৷ দড়ির সাথে কাপড় ক্লিপ দিয়ে আটকে দিতে হতো৷ এরপরেও জোরেশোরে বাতাস হলে কাপড় নিচে গিয়ে পড়তো৷ মাঝে মাঝে খুঁজেও পেতামনা৷ বিশেষ করে লুঙ্গি হারাতাম বেশি৷ বাতাসে কোথায় যে উড়িয়ে নিয়ে যেতো তার ঠিক ছিলনা৷ এ সমস্যাটা আমারই বেশি ছিল৷ তখন সাংবাদিকতা করতাম৷ সকালে গোসল করে লুঙ্গি শুকাতে দিয়ে বের হতাম৷ ফিরতে ফিরতে গভীর রাত৷ লুঙ্গি হারালে চুপচাপ আরেকটা কিনে নিতাম৷ কে লুঙ্গি খোঁজাখুজি করে!

একবার হলো কী! এক সপ্তাহে দুইটা লুঙ্গি নাই হয়ে গেলো৷ একটা হারানোর পর আরেকটা কিনেছিলাম৷ সেটাও খুঁজে পাচ্ছিলামনা৷ হলে চুরিও হয়৷ তখন লুঙ্গিও চুরি হতো৷ এবার ভাবলাম৷ একটা নোটিশ দেই৷ তখন কারো কিছু হারিয়ে গেলে হলের দুই লিফটের চারপাশের দেয়াল ছিল অঘোষিত নোটিশ বোর্ড৷ নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি থেকে শুরু করে কী নেই সেখানে! ভাবলাম, আমিও আমার লুঙ্গি হারানোর বিজ্ঞপ্তিটা দিয়ে দেই৷ লুঙ্গি হারানোর বিজ্ঞপ্তিতে নাম দিতে সংকোচ হলো৷ এজন্য এক দোকানের মামার নাম দিয়ে দিলাম৷ লুঙ্গি পেলে তাকে জানাতে বলে দিলাম৷ হাতে খুব সুন্দর করে বিজ্ঞপ্তি লিখে রাতে লাগিয়ে দিলাম৷ ওদিকে দোকানের মামাকে বলে রাখলাম৷ কেউ লুঙ্গির খোঁজ দিলে আমাকে জানাবেন৷

নোটিশ লাগানোর পর কয়েকদিন চলে গেলো৷ কারো কোন সাড়া নেই৷ লোকজন নোটিশটি পড়ছে কীনা তাও বোঝার উপায় নেই৷ দোকানদার মামাকে জিজ্ঞাসা করি, কেউ কোন খবর দিয়েছে কীনা! মামা জানান, একজনে নাকি জিজ্ঞাসা করেছেন, কার এমন লুঙ্গি? যে তা হারালেও বিজ্ঞপ্তি দিতে হয়! আমি তাকে বললাম, নাম বলবেন না৷

লুঙ্গি হারানোর বিজ্ঞপ্তিতে সাড়া পেলাম না৷ ভাবলাম লোকজন মনে হয় খেয়াল করেনি৷ তাহলে খেয়াল যাতে করে সে রকম একটা বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে৷ যেই ভাবনা; সেই কাজ৷ এবার একটা বড়সর কাগজে বিজ্ঞপ্তি লিখলাম৷ ইচ্ছা করে প্রতি লাইনে চার-পাঁচটা ভুল করলাম৷ জানি এ বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিক্রিয়া আসবেই৷ প্রতিক্রিয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তির চারপাশে বেশ খালি জায়গাও রেখে দিলাম৷

মজার কথা হলো, লিফটের জন্য অপেক্ষা করতে হয়৷ এসময় অনেকেই বিজ্ঞপ্তির উপরে কলম চালায়৷ দেখলাম, পড়াতে চাই বিজ্ঞপ্তিতে কে যেন পড়ার আগে 'থা' যোগ করে থাপড়াতে চাই বানিয়ে দিয়েছে৷ আবার একজনে ক্লোজ আপ ওয়ানের প্রতিযোগী লোপার জন্য ভোট চেয়ে পোস্টার লাগিয়েছে- লোপাকে ভোট দিন৷ কে যেন ওই পোস্টারে ভোট কেটে কোপা শব্দটি বসিয়ে দিয়েছে৷ আমার টার্গেট এরা৷ আমি চাই আমার লুঙ্গী হারানোর বিজ্ঞপ্তিটা পোস্টমর্টেমের কবলে পড়ুক৷

ওই বিজ্ঞপ্তি লাগানোর দিনে খোঁজ নিতে পারি নি৷ ভুলে গেছিলাম৷ পরদিন মনে হলো দেখি তো লুঙ্গি হারানোর বিজ্ঞপ্তির কী হলো! গিয়ে দেখি সে এক ইতিহাস৷ কমপক্ষে পঞ্চাশ জন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন৷ একজনে লাল কালি দিয়ে বিজ্ঞপ্তির ভুলগুলো গোল চিহ্ন দিয়ে মার্ক করে দিয়েছেন৷ যার যা ইচ্ছা তা বিজ্ঞপ্তির চারপাশে লিখে দিয়েছে৷ একটা লেখা এখানো মনে আছে৷ পড়ে খুব হেসেছিলাম৷ সে লিখেছে, এই ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো কীভাবে!!! মোটামুটি লুঙ্গি হারানোর বিষয়টা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে৷ আমার উদ্দেশ্যই ছিল এটা৷ যা করেছি সেটাকে সোজা বাংলায় বলে নেগেটিভ মার্কেটিং৷ একই নোটিশ শুদ্ধভাবে ভালো হস্তাক্ষরে লিখলেও কারো নজরে পড়েনি৷ অথচ একই বিষয়বস্তুর অপর একটা নোটিশে কষ্ট করে কলমও চালিয়েছে অসংখ্য৷

২.০
নেগেটিভ মার্কেটিংয়ের বেশ কিছু বিষয় বিবেচনা করেছিলাম৷ সেগুলো হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে অহম বোধ৷ কোন ছাত্র একটা বিজ্ঞপ্তি লিখতে বিশ পঁচিশটা ভুল করেছে- এটা চোখে পড়বেই৷ এছাড়াও কিছু লোক বিজ্ঞপ্তিতে কলম চালিয়ে মজা নেয়৷ এ কারণে প্রতিক্রিয়া পাবো- এতে নিশ্চিত ছিলাম৷ এ ফাঁকে আমার লুঙ্গি হারানোর বিষয়টা সবাই জেনে যাবে৷ চুরি হতে পারে৷ এতে হলের অন্যরা সতর্ক হবে৷ আমার উদ্দেশ্য পুরাপুরি হাসিল৷ লুঙ্গী পাইনি ঠিকই৷ তবে জানাতে পেরেছিলাম আর কি৷

৩.০
ওই সময় ফেসবুক ছিলনা৷ এখন ফেসবুক হয়েছে৷ প্রতিনিয়ত নেগেটিভ মার্কেটিং দেখি৷ ভারতে এক মেয়ে বেসুরো গলায় গান গেয়ে তা সামাজিক মাধ্যমে আপলোড করে৷ এতে পুরা ভারতে তাকে নিয়ে হাসাহাসির বন্যা বয়ে যায়৷ আর ওই দিকে ওই মেয়ে পেয়ে যায় কোটি কোটি ভিউ আর শেয়ার৷ ভারতে কয়েকদিনের মধ্যে সে স্টার হয়ে যায়৷ পরে সে সালমান খানের বিগ ব্রাদার্সেও অংশ নেয়৷ ওই মেয়ের নাম বলছিলা৷ বললে আবার তাকে খুঁজবেন অনেকে৷ তার দেখাদেখি সারা বিশ্বে সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন জনে একই পন্থা অবলম্বন শুরু করেছে৷ আমাদের দেশেও কয়েকজন একই পথ ধরে৷ তাদের নামও একই কারণে বলছিনা৷ একজন তো অল্পের জন্য এমপি হতে পারলোনা৷ সামনে যে হবেনা তা কে বলতে পারে! আলজেরিয়ায় একজন বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তি ইদানিং ভাইরাল৷ পুরা আরব বিশ্বে তার জয়জয়কার৷ তার নামটা বলে দেই৷ তার নাম সোসো৷ সে একবার বাচ্চাদের সাথে ফুটবল খেলে গোল দিয়ে এমন উদযাপদ করেছে যে সেটা ভাইরাল হয়ে গেছে৷ এখন তার উদযাপন দেখতে হাজার হাজার মানুষ স্টেডিয়ামে হাজির হয়৷ ফুটবল খেলা হয়৷ সোসোকে দিয়ে গোল করানো হয়৷ সোসো গোল করে যে উদযাপন করে তা দেখে দর্শক উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে৷ সেই সোসো এখন কোটি কোটি টাকার মালিক৷ এই হলো চলতি বিশ্বে নেগেটিভ মার্কেটিংয়ের মতিগতি৷

আমাদের দেশে ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে নেগেটিভ মার্কেটিংয়ের জোয়ার চলছে৷ কারণ পরিবেশ অনুকূলে৷ বিশাল সংখ্যক মানুষ প্রতিক্রিয়াশীল৷ ফলে কোন জিনিস পেলে তার আর মার্কেটিংয়ের দরকার হয়না৷ লোকজন নিজেরাই করে দেয়৷ ধরুন, কেউ একটা হোটেল বানালো৷ সেটার প্রচার দরকার৷ রোজার মাসে সানি লিওনিকে এনে ওই হোটেল যদি কেউ উদ্বোধন করে তাহলে আর যায় কই৷ ঘরে ঘরে ওই হোটেলের নাম পৌঁছে যাবে৷ এই নেগেটিভ মার্কেটিংয়ের কারণে সালমান রুশদির লিখিত স্যাটানিক ভার্সাসের নাম এত সংখ্যক মানুষ জেনেছে যে, পৃথিবীর কোন বইয়ের এত মার্কেটিং পাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি৷

শেষ করছি লেখাটা৷ অফুরন্ত সময় আছে আপনার হাতে৷ সারাক্ষণ অনলাইনে থাকেন৷ ভালো কথা৷ তবে বোকার মতো নেগেটিভ মার্কেটিংয়ের শিকার হয়ে যাচ্ছেন না তো!

#All eyes on Rafa
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুন, ২০২৪ দুপুর ১২:৪৪
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিশ্ব পাঠ

লিখেছেন আবু সিদ, ২৮ শে মার্চ, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

I. পড়ার সাধারণ অর্থ
সাধারণভাবে, পড়া বা Reading হলো লিখিত বর্ণ বা চিহ্ন দেখে তার অর্থ উদ্ধার করার উপায়। পড়া কেবল শব্দ উচ্চারণ নয়, বরং লেখার বিষয়বস্তুর সাথে নিজের চিন্তার যোগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

এঁনারা কিসের আশায় দালালি করে যাচ্ছেন?

লিখেছেন বিচার মানি তালগাছ আমার, ২৮ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১২:০৫



১. ১৫ আগস্ট টাইপ কিছু বা ৭ নভেম্বর টাইপ কিছু না ঘটলে আওয়ামী লীগ সহসা আর ক্ষমতায় আসতে পারবে না। জুলাই-এর মত কিছুও বার বার হয় না। তাই ধরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বমিনং করোনং ইচ্ছং

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ২৮ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১২:১১


গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান
ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলী
১৫০।(১) এই সংবিধানের অন্য কোন বিধান সত্ত্বেও ১৯৭২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর তারিখে এই সংবিধান প্রবর্তনকালে সংবিধানের চতুর্থ তফসিলে বর্ণিত বিধানাবলী ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী... ...বাকিটুকু পড়ুন

মতভেদ নিরসন ছাড়া মুসলিম আল্লাহর সাহায্য পাবে না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৯ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৩:০৩



সূরাঃ ৩ আলে-ইমরান, ১০৫ নং আয়াতের অনুবাদ-
১০৫। তোমরা তাদের মত হবে না যারা তাদের নিকট সুস্পষ্ট প্রমাণ আসার পর বিচ্ছিন্ন হয়েছে ও নিজেদের মাঝে মতভেদ সৃষ্টি করেছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘স্বপ্নের শঙ্খচিল’ কে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভকামনা….

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৯ শে মার্চ, ২০২৬ সকাল ৭:৪৬



আজ সকালে ল্যাপটপ খুলেই উপরের চিত্রটা দেখলাম। দেখে মনটা প্রথমে একটু খারাপই হয়ে গেল! প্রায় একুশ বছর ধরে লক্ষাধিক ব্লগারের নানারকমের বৈচিত্রপূর্ণ লেখায় ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় সমৃদ্ধ আমাদের সবার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×