somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলাদেশ আবার জিতেছে...

১২ ই মার্চ, ২০১৫ দুপুর ১২:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

৩১শে মে, ১৯৯৯...দিনটি অবিস্মরণীয় বাংলাদেশের জন্য। বিশবকাপে বাংলাদেশের খেলা হচ্ছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ করেছিল ২২৩/৯ (৫০ ওভার)। ৪৪ ওভারে পাকিস্তানের অবস্থা ১৬১/৯। আমি তখন জাম্বিয়ায়। টানটান হয়ে বসে আছি টেলিভিশনের সামনে পরিবারের সবাইকে নিয়ে। আমাদের জয়টা এই সময়ে প্রায় অবধারিত ছিল। তারপরও ক্রিকেট বলে কথা! এর মধ্যে লুসাকার সব বাংলাদেশীর মধ্যে ফোনাফুনি হয়ে গেছে, যদি বাংলাদেশ জিতে যায় তাহলে সবাই এক হয়ে যাবো কোনও এক রেস্তরাঁয়। ব্যাটিং ক্রিজে ছিল শোয়েব আখতার, বল হাতে ছিল নাইমুর রহমান দুর্জয়। দুই বল হয়ে গেছে। তৃতীয় বল হলো, শোয়েব অফ-এ ড্রাইভ করেই রান নিতে ছুটলো। ব্যস্‌, ফিল্ডার কে ছিল মনে নেই...তড়িৎ গতিতে বল তুলেই ছুড়ে দিল সোজা খালিদ মাসুদ পাইলটের হাতে। পাইলট তার চেয়েও দ্রুততায় স্ট্যাম্প ভেঙ্গে দিল। ওদিক থেকে সাকলাইন ক্রিজ ছুঁতে ব্যর্থ হলো। এই সময় অভূতপূর্ব এক দৃশ্যের অবতারনা হলো। গ্যালারী থেকে সব বাংলাদেশী দর্শক বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের মত মাঠে ঢুকে পড়লো। যদিও আম্পায়ার তার আঙ্গুল তুলেনি, তিনি পর্দায় দেখানোর জন্য সংকেত দিলেন। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত তৃতীয় আম্পায়ারের উপর ছেড়ে দিলেন। কিন্তু এটা যে আউট তা দর্শকদের বুঝতে অসুবিধা হয়নি। আমাদের খেলোয়ারদের শারীরিক ভাষাও তাঁরা ইতিমধ্যে পড়ে ফেলেছে। আর তাই এই বাধ-ভাঙ্গা জোয়ার! একটু পরই পর্দায় ঠিকই ভেসে উঠলো ‘আউট’। লাফিয়ে উঠলাম। আইসিসি’র পূর্ণাঙ্গ কোন সদস্যের বিরুদ্ধে প্রথম জয় সেও আবার পাকিস্তান! পাকিস্তান-বধ দিয়ে আমাদের বিজয়ের যাত্রা শুরু। আবার ফোনাফুনি করে আধা ঘণ্টার মধ্যে লুসাকার সব বাংলাদেশী Longacres-এ L. A. Ranch Restaurant-এ জড়ো হয়ে যাই। তখন রাত সাড়ে আটটার মত হবে। ওদের আগেই ফোন করে বলে দেয়া হয়েছিল প্রায় একশ জনের ব্যবস্থা রাখতে। আমি আমার camcorder নিয়ে হাজির হলাম (আজও আমার কাছে সেদিনের দৃশ্যগুলো সযত্নে রক্ষিত আছে)। আমি যেয়ে খোঁজ করলাম বাংলাদেশের একটা পতাকার ব্যবস্থা করা যায় কি না। কাকতালীয়ভাবে ঐ রেস্তরাঁর টেবিলম্যাট আর ন্যাপকিন ছিল সবুজ আর লাল। আমি ম্যাটের উপর লাল ন্যাপকিন পিন দিয়ে আটকিয়ে বাংলাদেশের পতাকার মত বানালাম। কিন্তু মাঝের লাল সূর্যটা চারকোণা হয়ে গেল। টানিয়ে দেবো কি না ভাবছি, আইনগতভাবে এটা গর্হিত কাজ হয়ে যাবে। সবাই বললো, এটা প্রতিকী পতাকা...কিছু হবে না, টানিয়ে দেন। আমি রেস্তরাঁর প্রবেশ পথে ঝুলিয়ে দিলাম। আফ্রিকান ম্যানেজার-ওয়েটাররা আমাদের কান্ড-কারখানা দেখে তাজ্জব হয়ে তাকিয়ে রইলো। একেতো জাম্বিয়ায় ক্রিকেট খেলা হয় না, তার উপর জিতলেও এমনটি হতে পারে ওরা ভাবতে পারেনি। পুরো রেস্তরাঁ সেদিন আমাদের উল্লাসে মুখর ছিল। বিদেশে বাংলাদেশীরা বসবাস করে একটা বিভাজনের ভেতর। এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু সেদিন সব বিভাজন ভুলে সবাই এক হয়ে গিয়েছিলাম বাংলাদেশের এমন এক ধ্রুপদী জয়ে।

আজ বিশ্বকাপে টাইগারদের ইংল্যান্ডকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠায় সারা দেশে যে আনন্দ বয়ে যাচ্ছে তা দেখে পনেরো বছর আগের কথা মনে পড়ে গেল। তখন বাংদেশের অবস্থা দেখতে পারিনি কিন্তু টেলিভিশনের খবরে দেখেছিলাম। সেই ছোঁয়া আজ বাংলাদেশে বসে পেলাম। পুরো বাংলাদেশ যেন এক হয়ে গেছে আজ। কিন্তু এই একাত্মবোধ কি থাকবে আমাদের মাঝে চিরকাল! মৌলিক বিষয়গুলোতে আমরা তো প্রায় মোটা দাগে বিভাজিত। এই বিভাজন যতদিন থাকবে ততদিন আমরা আমাদের সাফল্যের তরী তীরে ভিড়াতে পারব কিনা সন্দেহ। আর এই বিভাজনের কারনেই হয়তো যা কিছু অর্জন হবে সবই কেবল ক্ষনিকের জন্য, শুধুই বর্তমানের... আগামীকালের জন্য থাকবে না কিছুই। আমরা উৎসবপ্রিয় জাতি, উৎসবেই সীমিত হয়ে পড়বে সব। এমন বিভাজনে কখনও সেই প্রতিশ্রুতি তৈরি হতে পারে না, কোন উদ্দীপনা নিরন্তর ধারন করা যেতে পারে না যা আমাদের পূর্ণ সম্ভ্রম এনে দেবে। আর তাই সম্ভবতঃ আমরা সাফল্য পেয়েও ধরে রাখতে ব্যর্থ হই বারবার।

আর তাই বুঝি রমিজ রাজা-রা আজেবাজে মন্তব্য করতে পারে, নাসির জামশেদের মত অখ্যাত পাকিস্তানী ক্রিকেটারও টিজ মেরে টুইট করার সাহস পায়...যারা আজও আমাদের কাছে সবদিক থেকে লজ্জাবনত। যাদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ কোন দিনও বন্ধ হবে না।

এতো মৃত্যু, দগ্ধ মানুষের এতো হাহাকার আমাদের একটুও মানবিক করে তুলতে পারে না! এমন মধযুগীয় বর্বরতা আমাদের কারও হৃদয় নাড়াতে পারে না! এক কাতারে সবাই দাঁড়িয়ে বলতে পারে না...এমন আঁধার ঘেরা অচলায়তন চাই না। অথচ একটি মাত্র জয়, তাও সেই হাজার মাইল দূরে ছোট্ট এক খেলার মাঠে, আমাদের পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইলের সবাইকে কেমন এক কাতারে নামিয়ে নিয়ে এলো! একই আনন্দে লক্ষ প্রাণ দুলে ওঠে...দোদুল দোলে দোলনায়! এরকম এর আগেও অনেকবার হয়েছে এই ক্রিকেট শিল্পকে নিয়েই। কিন্তু আবার আমরা ফিরে গেছি সেই বিভক্তির অবস্থানে। আর তাই সম্ভবতঃ বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে, হারিয়ে গেছে আমাদের অর্জনগুলো। আমি ভাবি এই রকম বিজয় যদি আমাদের এক কাতারে নামিয়ে আনতে পারে, সকল জরা ভুলিয়ে দিতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ যদি কোনভাবে চ্যাম্পিয়ন হয়ে যেতে পারে তাহলে কি আমরা চিরদিনের জন্য সব ভুলে এক হয়ে যাবো? সব ভেদাভেদ ভুলে যাবো! সব বর্বরতা থেমে যাবে, বাংলার মাটি শীতল হবে! যদি তাই হয় তাহলে আমার দু’হাত সৃষ্টিকর্তার কাছে উত্থিত রইলো...ওদেরকে শক্তি দাও, এমন একটা বিজয় যেন ওরা ছিনিয়ে আনতে পারে যা আমাদের গ্লানিমুক্ত করবে; আলোর দুয়ার খুলে দেবে। আমরা আমাদের সম্ভ্রম, আমাদের গৌরব ফিরে পাবো। বিশ্ব মাঝারে রবে সদা “উন্নত মম শির”।
সেই মহেন্দ্রক্ষনের অপেক্ষায় রইলাম।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আত্মহনন ও পক্ষপাতিত্ব

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:২৮


রবীন্দ্রনাথ কি বাংলাদেশের নাগরিক ??!! শুধুমাত্র জাতীয় সংগীতের রচয়িতা এবং বাংলাদেশে কিছু সুশীলদের (ভালো নাপিত) তাকে নিয়ে নানা রকমের কলহ-বিবাদ-বিভক্তি তৈরী ব্যতিত; বাংলাদেশে তার আর অবদান কি... ...বাকিটুকু পড়ুন

তারা ভারতের এই সফট টুলস রবীন্দ্রনাথকে রক্ষা করবে।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৩


কয়েকদিন আগে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জাতীর পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলা হলো, সেখানে তো গ্রেপ্তার দেখলাম না! সেখানে কি পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবণতির শঙ্কা ছিলো না? পাকিস্তানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপি হল অথর্ব আর ইডিয়েটদের দল। বর্তমানে এদের দেশ পরিচালানার করার কোন যোগ্যতা ই নেই।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:২৩

রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি দেয়াটা নিন্দনীয় কিন্ত তার বিচার হবে কিসে? রাষ্ট্রদ্রোহিতা মামলায়?? রিমান্ডে নিয়ে?

চৈতালি চক্রবর্তী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, সে আইন বুঝে। প্রায় প্রতিদিন জুলাই, আবু সাইদ, বাংলাদেশ সব কিছু সম্পর্কে... ...বাকিটুকু পড়ুন

এআই মন্তব্যের পর ব্লগারগণের পোষ্ঠ ভালো বুঝে আসে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২০



চাঁদগাজী/সোনাগাজী বলতেন অনেক ব্লগার গরুর রচনা এবং অনেক ব্লগার গার্বেজ লেখেন। তাঁর এমন মন্তব্যের কারণে তাঁর বিরোধী ব্লগার সংখ্যা বেড়ে যায়। ফলে তিনি বার বার ব্যানের শিকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

=মনে রং নেই আর=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৫২


মন তো ছিল গোলাপী রঙ আভায় বন্দি, মন ছিল চন্দ্র মল্লিকা,
মন আর সেই মন নেই, মনের চারিপাশে এক সমুদ্দুর কুহেলিকা;
মন যেন পাথর হয়ে আছে, নেই অফুরন্ত ফুরসত
মন গোলাপী রঙ নয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×