somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চেরাগ আলী ও তান্ত্রিক - ভৌতিক গল্প

৩১ শে মে, ২০২২ দুপুর ২:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



এক.

সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে চেরাগ আলী বললেন, বুঝেছো, নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি সকলের আগ্রহটা সবসময় একটু বেশিই থাকে । পশু, পাখিও নিষিদ্ধ জিনিষের প্রতি দুর্নিবার এক টান বা আকর্ষণ অনুভব করে । সকলেই নিয়ম ভাঙ্গতে চায় । এটাই সকলের সহজাত প্রবৃত্তি ।
চেরাগ আলীর কথা শেষ হতে না হতেই আমার পাশে বসা ঝন্টু ফট করে বলে উঠলো, পশু, পাখিদের এই টানাটানির খরটা আপনাকে কে দিলো, চেরাগ দা ?
ঝন্টুর বেফাঁস প্রশ্নে আমরা আঁতকে উঠলাম । এই বুঝি চেরাগ আলী বিরক্ত হয়ে ফুঁসে উঠেন । হঠাৎ করে ঘরে পিন পতন নীরবতা নেমে এলো। চোখে, মুখে কপট রাগ ফুটিয়ে তুলে সকলে তাকালাম ঝন্টুর দিকে । চোখের ইশারায় তিরস্কার করতে লাগলাম । কিন্তু কিসে কি! ঝুন্টু আমাদের পাত্তাই দিলো না। যেন কিছুই হয়নি এমন একটা ভাব নিয়ে ক্যাবলা কান্তির মতো মুখ হা করে বসে রইলো ।

বেশ কিছুক্ষণ চেরাগ আলী কিছুই বললেন না। ঘোলা দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ মেঝের দিকে তাকিয়ে থেকে । বার দুয়েক কাঁধের দু’পাশে থু থু করে থুতু ছিটাবার ভঙ্গি করে সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলতে শুরু করলেন, "তোমরা এ যুগের ছেলে, ছোকরারা কোন বিষয় নিয়ে খুব একটা চিন্তা ভাবনা করতে চাও না। বড্ড অলস তোমরা । কিন্তু কথা বলায় বেলায় তোমরা বড্ড পটু । স্থান,কাল,পাত্র বিবেচনা না করে, আগপাছ কিছু না ভেবে ফুটফাট মুখে যা আসে তাই বলে ফেলো । কিছু পুঁথিগত বিদ্যা মুখস্থ করে,কয়েক'টা ক্লাস পাশ দিয়ে,একটা চাকরি বাকরি ঝুটিয়ে নিয়ে জীবনটা পার করে দিতে দিতে ভাবো,বাহ ! এই বেশ ভাল আছি । এটাই বুঝি জীবন। এ জন্যই বুঝি জন্মেছি । জীবনের বুঝি আর কোন চাওয়া পাওয়ার নেই । তোমাদের ধৈর্য কম। তাই জীবনের আসল মানে বুঝতে চেষ্টা করো না ।"

বুঝলাম ঝন্টুর কথা চেরাগ আলী বেশ চটেছেন, কিন্তু রাগটা প্রকাশ না করে কথার করাতে সেই ঝাল মেটাতে চাইছেন ।

এ পর্যন্ত বলে চেরাগ আলী সকলের মুখের উপর একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে তারপর আধ পোড়া সিগারেটটা অ্যাশ ট্রে'র মধ্যে গুজে রাখতে রাখতে বললেন, প্রকৃতি; প্রকৃতি বা ন্যাচার ই হচ্ছে সব । মানুষ কিংবা পশু,পাখি যাই বলো না কেন, কেউই প্রকৃতির নিয়ম ভেঙ্গে নিস্তার পায় না । কিন্তু তবুও সকলে নিষিদ্ধ জিনিষের প্রতি আগ্রহী হয় । নিয়ম ভাঙ্গে । এটা সকলের জাত স্বভাব । এ থেকে মানুষ বা পশু, পাখি কেউই বের হয়ে আসতে পারে না ।

কিন্তু নিয়ম ভাঙলে তো শাস্তি পেতে হয় চেরাগ দা ।

কথাটা বলে ঝন্টু বিজ্ঞের মতো হেসে উঠলো। ঝন্টুর হাসির ধরণ দেখে আমরাও হেসে ফেললাম। মৃদু হেসে চেরাগ আলী বললেন, তা তো অবশ্যই । নিয়ম ভাঙ্গলে তো শাস্তি পেতে হবেই । এটাও নিয়ম । কিন্তু তবুও নিয়ম ভাঙ্গার মধ্যে যে আনন্দ, যে সুখ বা তৃপ্তি আছে সেটা কিন্তু অন্য কিছুতে খুঁজে পাবে না। তারপর একটু থেমে, অতীত জীবনের কিছু একটা ভেবে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে তিনি বললেন, হয়তো এ সুখের জন্যই বিশ্ব সংসারের সকলে নিয়ম ভাঙ্গে । শাস্তি পাবে জেনেও ভাঙ্গে।

তবে কি সবাই শুধুমাত্র সুখ বা আনন্দ পাবার জন্যই নিয়ম ভাঙ্গে ? স্বভাবসুলভ প্রশ্ন করে সমর্থন পাবার আশায় ঝন্টু আমাদের মুখের দিকে তাকালো । আমরা তাকালাম চেরাগ আলীর মুখের দিকে ।

বেশির ভাগ মানুষ বা প্রাণী নিয়ম ভাঙ্গে লাভের আশায় । লোভ, লালসা, কাম, ক্রোধ সকলকে কাবু করে ফেলে। তবে বুঝলে, এর ও কিন্তু ব্যতিক্রম আছে। কেউ কেউ নিয়ম ভাঙ্গে স্রেফ অন্যের উপকারের জন্যে । নিজের ক্ষতি হবে জেনেও তারা পিছ পা হয় না। অবশ্য নতুনকে জানান জন্যেও কেউ কেউ নিয়ম ভাঙ্গে। সে নিয়ম ভেঙ্গার মাঝে যে তৃপ্তি বা সুখ পাওয়া যায় । তার সাথে পার্থিব কোন কিছুর তুলনা চলে না ।

সে রকম, নিয়ম-টিয়ম আপনি কি কখনো ভেঙ্গেছেন চেরাগ দা?

সুবল এতক্ষণ চুপচাপ একপাশে বসে সবার কথা শুনছিল, হুট করে প্রশ্নটা করে আড্ডার আবহটাই যেনো বদলে দিলো । দীর্ঘক্ষণ এলোমেলো ভাবে চলা আলোচনা এবার পূর্ণতা পেতে চললো। সুবল ঠিক ঠিক জানে কখন কিভাবে সঠিক প্রশ্নটা করে চেরাগ আলীর কাছ থেকে গল্প বের করে আনবে হবে।

চেরাগ আলী আবারো থম মেরে গেলেন,বেশ কিছুক্ষণ কিছু বললেন না । কয়েক মুহূর্ত সুবলের দিকে তাকিয়ে থেকে বার দুয়েক বা কাঁধের পাশে থু থু করে থুতু ছেটাবার ভঙ্গি করে প্যাকের থেকে বেনসন এন্ড হেজেস এর শেষ সিগারেটটা বের করে তাতে আগুন জ্বেলে ফুসসস করে ধোয়া ছেড়ে বললেন, হ্যাঁ ভেঙ্গেছি বৈকি । অনেক বার ভেঙ্গেছি । তোমাদের মতো আগপাছ কিছু না ভেবে ভেঙ্গেছি বলেই তো জীবনে কিছু করতে পারিনি । এখনো রয়ে গেছি বাপ দাদার এই ভাঙ্গা বাড়িতে। তবুও যে মাথার উপর একটা ছাদ আছে সেটাই অনেক কিছু। তা না হলে , আমি যে পথে গিয়েছিলাম,তাতে কবে, কোথায় মরে পরে থাকতাম তার কি কোন ঠিক ছিলো ।

আপনার সেই নিয়ম ভাঙ্গার গল্পটা শুরু করুণ না চেরাগ দা, ভূমিকা তো অনেক হলো । ঝন্টু অস্থির হয়ে বলে উঠলো।

বলছি, বলছি । এতো অস্থির হলে কি চলে । তারপর তিনি রঞ্জিত বাবু’র দিকে তাকিয়ে হাঁক দিলেন, ও হে রঞ্জিত, চা, টা কিছু একটা বলবে নাকি? এই ছেলে,ছোকরাদের সাথে কথা বলতে বলতে গলাটা যে একেবারে,শুকিয়ে কাঠ গেছে ।

সাদা রঙ্গের আধ ময়লা পাঞ্জাবি, পাজামা পরিহিত রোগা পাতলা, টাক মাথার রঞ্জিত বাবু ঘরের এক কোণে বসে এতক্ষণ আপন মনে কাচা চাল চিবচ্ছিলেন । কি অবাক হলেন বুঝি! অবাক হলেও সত্যি। রঞ্জিত বাবুর অভ্যাস হচ্ছে, পাঞ্জাবির পকেটে কাচা চাল নিয়ে ঘুরে বেড়ানো। যেখানেই যান পকেটে করে দু’মুঠো কাচা চাল নিয়ে যান। সেটাই একটু পরপর বের করে মুখে দেন আর চিবান ।

কোন এক অদ্ভুত কারণে চেরাগ আলী আর রঞ্জিত বাবুর মধ্যে সম্পর্কটা যে বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ তা তাদের পরস্পরের কথোপকথনে থেকে পরিষ্কার টের পাওয়া যায় ।

রঞ্জিত বাবুর সাথে আমাদের পরিচয় পর্বটাও হয়েছে এখানে এসে। পেশায় তিনি একজন তবলা বাদক। সারাক্ষণ দু’হাঁটুর উপর আঙুল চালিয়ে তবলা বাজান । একটা কথা কিন্তু বলা হয়নি, চেরাগ আলীর অনেক পরিচয়ের মধ্যে একটি হচ্ছে, উনি একজন সংগীত সাধকও বটে । রাগ, রাগিণী নিয়ে তার রয়েছে বিস্তর অভিজ্ঞতা । সে সব গল্প ধীরে সুস্থে শুনবো।

রঞ্জিত বাবু চেরাগ আলীর পাশে বসে সকলের আলোচনা শুনছিলেন আর নীরবে চাল চিবতে চিবতে দু’হাঁটুতে আঙুল দিয়ে তবলার বোল আওড়াচ্ছিলেন । চেরাগ আলীর কথা শেষ না হতেই বলে উঠলেন, এই যাচ্ছি দাদা। এখুনি চায়ের কথা বলে আসছি। কথাটা বলেই তিনি দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।

আমিও তাহলে যাই, মোড়ের দোকান থেকে গরম গরম ডালপুরি নিয়ে আসি । ঝন্টুও রঞ্জিত বাবুর পেছন পেছন ঘর হতে বের হয়ে গেল ।

এরপর চা এলো । সাথে এলো গরম গরম ডালপুরি । পুরানো ঢাকার ডালপুরিতে কামড় দিয়ে চায়ে চুমুক দেবার স্বাদই আলাদা । একদিকে পুরির মধ্যে থাকা মরিচের ঝাল অন্যদিকে চায়ের মধ্যে মিশে থাকা দুধ, চিনির মিষ্টতা দুয়ে মিলেমিশে জিহ্বায় অন্যরকম এক স্বাদের সৃষ্টি করে ।

চা, পুরি শেষ হলে ঝন্টু চেরাগ আলীর দিকে বেনসন এন্ড হেজেস এর নতুন প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল, চেরাগ দা, এবার তাহলে গল্পটা শুরু করুণ। চেরাগ আলী মৃদু হেসে ঝন্টুর হাত থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা নিয়ে হাসতে হাসতে বললেন,কি, ঘুষ দিচ্ছো বুঝি?

ঝন্টু দু’কানের লতি ধরে, জিহ্বায় কামড় দিয়ে মাথা নেড়ে নেড়ে বলল, ছি..ছি ... দাদা । এ আপনি কি বললেন, ঘুষ হতে যাবে কেন ? এরপর একটু থেমে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, এ তো আমাদের পক্ষ থেকে গল্প শুনার জন্য সামান্য 'দক্ষিণা' । তবে চাইলে একে আপনি গল্প দক্ষিণা বলতে পারেন ।

"গল্প দক্ষিণা!" এটা কিন্তু বেশ বলেছো। তবে গল্প কোথায়? আমি যা বলি তার সবই তো আমার জীবনের অভিজ্ঞতার কথা। তোমাদের কাছে সেসব গল্প বলে মনে হয় ভেবে অবাক না হয়ে পারি না ।

তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, ঠিক আছে । এত করে যখন বলছো, শুনো তাহলে।

এরপর চেরাগ আলী তার জীবন থেকে নিচের গল্পটা বলতে শুরু করলেন ।

চলবে .............।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জুন, ২০২২ সকাল ১১:৩৭
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পিটিভির আর্কাইভে ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ দেখা

লিখেছেন অর্ক, ১৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ২:২৫



‘খুব ভালো জঙ্গ চলছে। একের পর এক নাপাক হিন্দু সেনা হালাক (মৃত্যু) হচ্ছে। রাজাকার আলবদরদের নিয়ে পাকিস্তানের বীর সেনা যুদ্ধ জয়ের দ্বারপ্রান্তে। দুয়েক দিনের মধ্যেই হিন্দুস্থান হাঁটু গেড়ে বসে... ...বাকিটুকু পড়ুন

উপরোধের আগে

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ১৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪



একটা ক্ষণ,
ক্ষীণ, তবুও অবয়,
আমাকে হাজার বছর বাঁচিয়ে রাখবে সবুজ অটবীর আলেখ্যে,
তুমি এলে,
সেই পুরোনো মায়া হয়ে।

কতকাল পরে সম্মুক্ষে দু জোড়া চোখ?
সে প্রশ্নের প্লাবনে আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা কি আধুনিক যুগের জন্য প্রস্তুত।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:২৩

২০০৯ সাল থেকে সম্ভবত সকল সরকারি কর্মচারীদের ব্যাংকে বেতন হয়। এবং এই বেতন দেওয়ার পক্রিয়া ১০০% কম্পিউটার বেইস। সরকারি কর্মচারীদের বেতন সিজিএ অফিস হ্যান্ডেল করে। আর সম্ভবত আইবিবিএএস+ সার্ভার বেতন... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫৫ বছরে কেন আরেকটা রিফাইনারি হলো না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:৪৪


রাশিয়া থেকে তেল আনতে হলে আমেরিকার অনুমতি লাগবে। এই একটা বাক্য পড়লে অনেকে ভাববেন এটা কোনো রাজনৈতিক ভাষণের অংশ, কিংবা অতিরঞ্জন। কিন্তু এটা ২০২৬ সালের বাস্তবতা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ লেগেছে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৮৮

লিখেছেন রাজীব নুর, ২০ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৩



আপনারা কেমন আছেন?
আমি কেমন আছি, বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে কোনো অলৌকিক কিছু যেন জেনে ফেলেছি। না জানলেই বুঝি ভালো হতো। দুনিয়াতে যে যত কম জানে, সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×