somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নারী, পণ্য?

১৩ ই মে, ২০১৫ বিকাল ৪:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মেয়েরা, মন দিয়ে পড়ো, অন্তত ১০ মিনিট সময় নিয়ে পড়ো, কথা দিচ্ছি নিজেদের কে চিনতে পারবা। একটা বিস্তর গবেষণা তোমাদের নিয়ে। বিশেষ করে শেষ অংশটুকু খুব গুরুত্বপূর্ণ।
.
হে নারী,
আসলে আমরা তোমাদের অনেক সম্মান করি,
আমরা তোমাদের হাতে একটা জুস এর বোতল ধড়িয়ে দিয়ে দোকানের উপর সাইন বোর্ড লাগিয়ে দেই, আর আমের হলুদ রঙের সাথে মিল করে তোমাকে সাজিয়ে আমের মতো করে ফেলি। আর তোমাকে সম্মানিত করে বলি তুমি আমাদের ব্র্যান্ড এম্বাসেডর।
বাহ তোমার লাভ ১০ লক্ষ টাকা, কিন্তু আমাদের লাভ ১০ কোটি, হ্যাঁ তোমাকে সম্মান করি বলেই এতো টাকা পেলাম।
.
আরো অনেক ভাবে তোমাকে সম্মান করি, কখনো মানুষের সামনে নাচিয়ে, কখনো দুলিয়ে, কখনো সাজিয়ে, কখনো বা দেখিয়ে।
.
নারীদের অধিকার রক্ষায় আমরা অনেক বেশি সচেতন, কারন একটা পুরুষ ৫ হাজার টাকায় যে কাজ করে তার থেকে একজন নারী ২ হাজার টাকায় তার থেকে বেশি ও অনেক যত্নের সাথে কাজ করে, কারন তাদের DNA তেই যে আছে এই যত্নশীলতা।
আসলেই কত্ত সম্মান করি, তোমাদের বাইরে কাজ করা নিয়ে, আন্দোলন, সেমিনার আরো কত্ত কি।
তোমাদের সম্মান করি বলেই তো এয়ার হোস্টেজ, রিছিপ্সনিস্ট, পারসোনাল এসিস্টান্স, কাস্টমার কেয়ার, ফ্যাশান শো আরো হাজার জায়গায় তোমাদের সবার আগে রাখি.........
এরকম হাজারটা উদাহরন দেওয়া যাবে কিন্তু এবার মূল কথায় আসি,
.
আসলেই কি তোমাদের মনে হয় সেই স্বার্থপর পুজিবাদি সমাজে তোমাদের আমরা সম্মান করতে পারছি?
.
আসলেই তোমরা অনেক বোকা, তার প্রমান নিচে দিচ্ছি, ধৈর্য নিয়ে নিচে পড়তে থাকো।
.
তো প্রথমেই একটা কথা আমাদের সৃষ্টির শুরু থেকেই আমাদের মাঝে আমাদের বংশ রক্ষার স্বার্থে আমাদের মেকার একটা হরমন দিয়ে দিয়েছেন যেটার মাধ্যমে আমরা বিপরীত লিঙ্গের মানুষের প্রতি আকর্ষিত হই, তা নাহলে উপর ওয়ালা জানতেন যে এই অলস মানুষ জাতি নিজের খাবার খেতেও আলসেমি করে তারা তাদের বংশ রক্ষার ক্ষেত্রে তাইলে কি করবে? তারা তো সহবাসেও অনিহা দেখাবে ফলে সৃষ্টি তো শেষ হয়ে যাবে। তো এটার গভীরে বেশি না যাই, আপাতত এর নাম দেই 'কাম' , বিলিভ ইট অর নট এই কাম দিয়েই পৃথিবী চলছে।
.
আর ঠিক এই জিনিসটাকে আমরা খুব সফল ভাবে ব্যাবহার করছি, শুনতে খারাপ লাগলেও নারীকে আমাদের সমাজে কামের প্রতিক হিসেবেই ধরা হয়ে থাকে,
নাহলে আপনি কি ভাবছেন? আপনি মডেল, ব্র্যান্ড এম্বাসেডর, মানুষ আপনাকে চিনছে, বাহবা দিচ্ছে কিন্তু তা কেন? হেহে, আপনাকে সম্মান করি বলে তাই?
সো ফানি, ওই যে সেই হরমন, আপনাদের দিয়ে এটাই উদ্দেলিত করা হচ্ছে, আর সব থেকে অবাক করা বিষয় আপনারা একেই আপনাদের অধিকার হিসেবে ধরে নিচ্ছেন।
বুঝতেই পারছেন না আপনাদের কে মানুষের সামনে ধর্ষণ করা হচ্ছে। শত শত মানুষের কামের বস্তু হিসেবে আপনাকে উপস্থাপন করা হচ্ছে, কিন্তু এটা ডিপেন্ড করছে আপনি কোন টাইপের ভিতরে পরেন,
.
এক টাইপের নারী যাদের ইচ্ছা তাদের কে নিয়ে পুরুষরা ভাবুক, কামনা করুক, এদেই তাদের সফলতা, যেমন - সানি লিওন, ব্র্যান্ড এম্বাসেডর এর মতো তার ও একটা বাণিজ্যিক নাম পর্ণ স্টার।
.
এই খানেও একটা সাইকোলজি কাজ করে, যেমন সুদ এর অপর নাম মুনাফা, ঠিক তেমনি ব্রেইন কে বোকা বানানোর জন্য এভাবেই আপনাদের কে সন্তুষ্ট রাখা হয়।
.
আর আমি নিশ্চিত, আপনি উপরের ক্যাটাগরির নন, কারন ধর্ষণ কিন্তুক শারীরিক ভাবেই হয়না এক মাত্র, ভাবনায়, নজরে, চিন্তা ধারায় হাজার বার ধর্ষণ হয়, ছিঃ ছিঃ ভাবতেই কেমন লাগে যে আপনাকে নিয়ে হাজার মানুষ কতো ধরনের নষ্ট চিন্তা করছে।
আসলে সবই লৈঙ্গিক ছাঁচিকরণ, বুঝলেন নাতো? এবার আসল জিনিসটা বুঝুন,
.
আমরা নারীকে অধঃস্তন করে রাখতেই ব্যতিব্যস্ত। পুরুষকে আকর্ষন করার জন্য বিজ্ঞাপনে নারীকে হাজির করা হয় যৌনতার প্রতিবিম্ব হিসেবে, যেনো নারীর প্রথম কাজই হলো পুরুষকে আকর্ষন করা, যেনো পুরুষের সন্তুষ্টি অর্জন করাই পুরুষের শেষ ভরসা। কখনোবা স্নেহময়ী মা, আদুরে স্ত্রী, শান্তশিষ্ট মহিলা হিসেবে আবির্ভূত হন।
.
গণমাধ্যম তাত্ত্বিক মার্শাল ম্যাকলুহান তার ‘দ্য মেক্যানিকাল ব্রীজ’ গ্রন্থে বলেন, “আমাদের সম্মিলিত দিবাস্বপ্নকে বিজ্ঞাপন প্রতিবিম্বিত করে।” পুরুষতান্ত্রিক সমাজে আমরা প্রতিদিন বিজ্ঞাপনের শিল্পায়নে প্রতিবিম্বিত হতে দেখি ‘পুরুষতান্ত্রিক দিবা স্বপ্ন’।
নারী কলহপ্রিয়, শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল, পুরুষ সংসারসেবী প্রভৃতি বিশেষণে বিশেষায়িত হয়ে বিজ্ঞাপনে নারী উপস্থিত হয় পুরুষতান্ত্রিক স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটাতে।
.
লৈঙ্গিক ছাঁচিকরণ
.
ইংরেজি শব্দ ‘Stereotype’-শব্দটি প্রকাশনা জগৎ ‘Firmin Didot’ কর্তৃক সর্বপ্রথম ব্যবহৃত হয়। ১৮৫০ সালে আধুনিক ইংরেজিতে ‘Stereotype’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। (উইকিপিডিয়া)
‘Stereotype’-শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ দাঁড়ায় ‘ছাঁচিকরণ, গৎবাঁধা ধারণা বা বিশ্বাস’।
উৎপাদন ক্ষেত্রে ছাঁচিকরণ হচ্ছে একই ছাঁচে তৈরির ফলে সমজাতীয় এবং সমগুণ সম্পন্ন কোন কিছু উৎপন্ন হওয়া। আর সামাজিক প্রেক্ষাপটে বলতে গেলে- ‘কোন বিষয় সম্পর্কে গতানুগতিক ভাবে একটি বদ্ধমূল বা গৎবাঁধা ধারণা পোষন বা বিশ্বাস করাকেই ছাঁচিকরণ বলা যায়।’
মার্কিন সাংবাদিক স্যার ওয়াল্টার লিপম্যানের মতে, ‘Stereotype reflects the picture in our mind to the specific things.’
‘Cambridge Advanced Learner’s Dictionary’-তে ‘Stereotype’-এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে…’Stereotype means- A fixed idea that people have about what someone or something is like, especially an idea that is wrong: racial or sexual stereotype.’
আর ‘Gender’-এর সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে এভাবে…’The physical or social condition of being male or female.’

সার্বিকভাবে বলা যায়, ‘লৈঙ্গিক ছাঁচিকরণ হলো, নারী-পুরুষ সম্পর্কিত এমন কিছু নির্দিষ্ট ধারণা বা বিশ্বাস যা সত্য হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে। ’পৃথিবী ব্যাপি লৈঙ্গিক ছাঁচীকরণের কম-বেশি অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। যেমন: পুরুষ মাত্রই স্বাবলম্বী, সফল,পরিশ্রমী, উদ্যোমী,ক্ষমতাবান, শাসক এবং সৃষ্টিশীল হতে হবে। অন্যদিকে নারী মাত্রই নিষ্কর্মা, নির্বোধ, শোষিত, পুরুষের সেবাদাসী, নারীর জন্ম পুরুষের মনোরঞ্জন করার জন্য, পুরুষ ছাড়া নারী মূল্যহীন ইত্যাদি। উন্নত-অনুন্নত, শিক্ষিত-অশিক্ষিত এমনকি পুরুষের পাশাপাশি নারীদের নিজেদের মধ্যেও নিজেকে পুরুষের চেয়ে নিঁচু ভাবার প্রবণতা রয়েছে। আর সব সমাজেই এর সরব উপস্থিতির পেছনে কাজ করে পুরুষতন্ত্র, পুঁজিবাদ এবং ধর্ম। আর বর্তমানে এর প্রচার-প্রসার আর আধিপত্য টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব নিয়েছে পুরুষতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা পুঁজিবাদী মিডিয়া।
.
মিডিয়া: লৈঙ্গিক ছাঁচিকরণে
.
নারীকে প্রসাধন প্রিয়, দুর্বল, নির্বোধ, যৌনবস্তু, পুরুষ নির্ভর সত্তা, সংসারসেবী, কলহপ্রিয় ও গৃহকমী হিসেবে দেখানো হয়।
মিডিয়া সুকৌশলে ছাচিকরণ করে নারী ও সমাজের । ‘নারী হবে সেবাদাসী, রান্নাঘর আর স্বামী বাড়িই তার আশ্রয়স্থল, সংসার দেখাশোনা-বাচ্চা জন্মদান ও লালন পালনের ক্ষেত্রে তার থাকতে হবে অসীম অবদান, পুরুষ ছাড়া নারী অসহায়-মূল্যহীন, পুরুষের মনোরঞ্জন করার জন্যই নারীর জন্ম, নারী নিষ্কর্মা এবং নির্বোধ।’ এমন বার্তাই দেয়ার প্রচেষ্টা থাকে।
সমাজ বাস্তবতায় মিডিয়া নারীকে রাধুঁনী, সেবিকা, দুর্বল, অবলা, আবেগময়ী ভোগ্য বস্তু, পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করে। নারীর রুপায়ন ঘটায়-কর্মোদ্দীপক, সংসারী আবেগময়ী, বোকা, সন্তান লালন পালনকারী, পরনির্ভর, গৃহকোণবাসী, স্বামীর দাসী এবং সব মিলিয়ে গুরুত্বহীন হিসেবে উপস্থাপন করতে দেখা যায়। অন্যদিকে পুরুষকে কর্মজীবী, শক্তিশালী, কর্তা, পেশিবহুল, সাহসী, আত্মবিশ্বাসী, সিদ্ধান্তগ্রহণকারী হিসেবে উপস্থাপন করে। আর এভাবে গণমাধ্যম লৈঙ্গিক ছাঁচিকরণের মাধ্যমে নারী-পুরুষের মধ্যেকারকে ব্যবধান আরো বাড়িয়ে তুলছে। এর পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। কিভাবে গণমাধ্যম ছাঁচিকরণ করে কিংবা সমাজের মানুষের মধ্যে নারী সম্পর্কে গতানুগতিক বদ্ধমূল ধারণাকে প্রমোট করে বা জিইয়ে রাখে তা কয়েকটি বিজ্ঞাপন বিশ্লেষনের মাধ্যমে তুলে ধরার প্রয়াস থাকলো।
.
কেস স্টাডি-১:
পণ্যের নাম: সার্ফ এক্সেল, বিজ্ঞাপন সময় ব্যাপ্তি: ৩০ সেকেন্ড

একটু আধটু: সার্ফ এক্সেলের এ বিজ্ঞাপনটির ব্যাপ্তি ৩০ সেকেন্ড। প্রারম্ভেই দেখানো হয় গায়ক (আরজে) চিৎকার করে গান শেষ করেছেন। দুহাত গুণ্যে ভাসালেন। আর ব্যাক থেকে শব্দ আছে ‘ওয়ান মোর প্লিজ’।
দুটি শিশুর অটোগ্রাফ প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা দেখানো হয়েছে। শিশু দুটি পরস্পর ভাই-বোন। বোনটি আক্ষেপ করে বলে ওঠে ‘আমি অটোগ্রাফ কখনোই পাবো না।’ তখন ভাইটি বোনের মুখের দিকে তাকাই বেশ এবং পরক্ষণেরই দাঁড়ায়। গায়কের কাছ থেকে অটোগ্রাফ নিতে দৌড় দেয় ভাইটি। বাধা পেরোতো গিয়ে ‘দাগ’ লাগে ভাইটির টিশার্টে, দেয়াল বেয়ে ওঠে যায় সে অত:পর আরজের সামনে উপস্থিত হয়ে বলে ওঠে ‘ অটোগ্রাফ প্লিজ’।
আরজে মার্কার পেন নিয়ে আসে অটোগ্রাফ দিতে। তখন ব্যাক থেকে পুরুষকন্ঠে ওঠে আসে ‘নিম, সাবান বার আর লেবুর শক্তি নিয়ে এলো নতুন সার্ফ এক্সেল যা চকলেট সসের মতো কঠিন দাগও তুলে ফেলে খুব সহজেই।’ ভাই বোনের সামনে উপরের টিশার্টটি ওপরে টেনে তুলে ভিতরের গেঞ্জিতে প্রাপ্ত অটোগ্রাফ মেলে ধরে বোনের সম্মুখে। বোনের চোখে মুখে উচ্ছ্বাস। বোন বলে ওঠে ‘ভাইয়া তুমিইতো হিরো, অটোগ্রাফ দাও না’।
তখন ব্যাক থেকে আসে ‘নতুন সার্ফ এক্সেল, দাগ থেকেই দারুণ কিছু।
বিজ্ঞাপনটিতে জেন্ডার অসংবেদনশীলতা
অটোগ্রাফ পাবার আকাঙ্ক্ষা থাকে অনেকেরই। আপাতদৃষ্টিতে ভাই-বোনের অপরূপ সম্পর্ককে দেখানো হয়েছে চমৎকার ভাবে। বোন অটোগ্রাফ পেতে চায় আরজের কাছ থেকে। কিন্তু এতো মানুষ, এতো বাধা। বোনটির কাছে মনে হয়েছে তার দ্বারা অটোগ্রাফ প্রাপ্তি সম্ভব নয়। আর তাই বোনের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘আমি অটোগ্রাফ কখনোই পাবো না।’ তার চোখে মুখে মলিনতার ছাপ। তখন ভাইটি বোনের মুখের দিকে তাকাই। তার মুখেও মলিনতা। সে তখন নিজেই দৌড় দেয় অটোগ্রাফের জন্য। স্পষ্টত এখানে মেয়ে শিশুটির ‘কনফিডেন্সের’ অভাব দেখানো হয়েছে। কিন্তু তার ভাই বোনের জন্য মরিয়া হয়ে সকল বাধা পেরিয়ে গায়ে ‘দাগ’ লাগলেও সে দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে আরজের সামনে হাজির হয়। দাগ লাগা ওপরের টিশার্টটি ওপরে টেনে ভেতরে টিশার্টে অটোগ্রাফ নেয় ভাইটি।
অটোগ্রাফ নেবার পর দেখা গেলো উচ্ছাস সহ ভাইটি বোনের কাছে ছুটে আসে ভাইটি। ওপরের টিশার্টটি উর্ধ্বে মেলে ধরে অটোগ্রাফটি বোনকে দেখায় সে। বোনের চোখেও প্রাপ্তির আভাস। এখানে যে বিষয়টি লক্ষণীয় যে, মেয়েটি যেখানে অটোগ্রাফ মনে মনে চাইলেও কনফিডেন্ড ছিলো না অটোগ্রাফ পাবার, কারণ তার সম্মুখে অনেক বাধা। বাধা অতিক্রম করার স্বাধ্য যেনো মেয়েটির নেই। কিন্তু ভাইটি সকল বাধা অতিক্রম করে অটোগ্রাফ সংগ্রহ করতে পেরেছে। বাধা পেরিয়ে অটোগ্রাফ আনতে পিছপা হয়নি ছেলে। ছেলের সাহস দুর্দান্ত, বাধা তাকে ক্ষান্ত করতে পারেনি।
আর এভাবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতিভূকে সামনে হাজির করে মিডিয়া। মিডিয়া পুরুষতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে যেনো বদ্ধপরিকর। সমাজের পুরুষের শক্তিশালী প্রভাবকে স্মরণ করিয়ে দেয় এ বিজ্ঞাপনটি। যেখানে মেয়ে শিশুটি অটোগ্রাফ সংগ্রহের সাহস করতে পারেনি সেখানে তার ভাই সকল বাধা পেড়িয়ে অটোগ্রাফ এনেছে সাহসিকতার সাথে। এখানে স্পষ্টত দৃশ্যমান যে, ছেলেরা ঝুকি নিয়ে কাজ করতে পারে কিন্তু মেয়েরা এমন বাধা আসলে ভয় পায়। ভয়কে জয় করার সাহসিকতা মেয়েদের নেই।

সার্ফ এক্সেলের বিজ্ঞাপনটিতে জেন্ডার ছাঁচিকরণ:
সমাজে প্রচলিত ভাবনাগুলোকেই তুলে ধরা হয়েছে আলোচ্য বিজ্ঞাপনটিতে। নিম্নে সেগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো-
মেয়ের সাহসী নয়: বোনটি নানা বাধার ভয়ে অটোগ্রাফ নেয়া সাহস করেনি। কিন্তু ভাইটি সাহস নিয়ে এগিয়ে যায় অটোগ্রাফ সংগ্রহ করতে। ভাইকে অনেক কনফিডেন্ট মনে হয়েছে, বোনটিকে নয়।
ঝুঁকি নেয় ছেলেরা: ঝুকি নেয়া মানসিকতা যেনো ছেলেদেরই। মেয়েটে এতো বাধা পেরোনোর ঝুকি নিতে চায়নি। কিন্তু ভাইটি ঝুকি নিয়েছে এবং পেরেছে।
সফল ছেলেরা, মেয়েরা নয়: সাহস না থাকলে কী সফল হওয়া যায়? বিজ্ঞাপনটি দেখানো হয়েছে মেয়েটি সাহসী নয়, ফলে তার দ্বারা সফলতা অর্জন করা যায় নি। কিন্তু ছেলেটি পেরেছে। কিন্তু পেরেছে ছেলেটি, সাহস আর কনফিডেন্টই সাহসিকতার চাবিকাঠি।
ছেলেরা দ্রুত গতির, মেয়েরা ধীর: ছেলেটির মধ্যে দ্রুগগতি লক্ষ্য করা গেছে। আত্মবিশ্বাস আর সাহস তার দ্রুততার মূলে। কিন্তু মেয়েটি আত্মবিশ্বাসী আর কম দ্রুতগতি সম্পন্ন।
ছেলেরা নিজের সফলতায় খুশি, মেয়েরা অন্যের সফলতায়: বাস্তবে দেখা যায় যে, স্বামীর সফলতায় স্ত্রী বেশ খুশি হন। তিনি নিজে কাজ করতে ব্যর্থ হন শৃঙ্খলে বন্দী হয়ে। ফলে স্বামীর কর্মের সফলতায় তাকে খুশি থাকতে হয়। বিজ্ঞাপনটিতে দেখা যায় যে, অটোগ্রাফ নিতে পেরে বেশ খুশি হয় ছেলেটি। আর ভাইয়ের সফলতায় খুশি বোনটি।


কেস স্টাডি-২
পণ্যের নাম: আরকু গুড়ো মসলা, বিজ্ঞাপন সময় ব্যাপ্তি: ৪০ সেকেন্ড

একটু আধটু: ৪০ সেকেন্ড সময়ব্যাপ্তির আরকু গুড়া মসলা বিজ্ঞাপন দেখলে আকৃষ্ট হবে যে কেউই। আপাত দৃষ্টিতে বিজ্ঞাপনটি কোনো ভাবে জেন্ডার অসংবেদনশীল মনে হবে না। বাংলার প্রচলিত কৃষ্টিই চোখে পড়বে আপনার। কিন্তু একটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বুঝা যায়, এটার জেন্ডার সংবেদনশীলতা কোথায়। চোখ ফেরানো যাক সে দিকেই।
পুরো বিজ্ঞাপন জুড়েই পুরুষ কণ্ঠ। বিশেষ কোনো চরিত্র চোখে পড়বে না। একটি গান পুরুষ কণ্ঠের। শেষের দিকে পুরুষেরই ব্যাপগ্রাউন্ড কণ্ঠ শোনা যায়।
স্ক্রিপ্টিংয়ের গানটি দেখা যাক, “যে লালেতে বাংলা আমার দারুণ চঞ্চল, সেই লালেতে ফাগুন রাঙাই সবুজ অঞ্চল। যে লালেতে নতুন স্বপ্ন তুলে নতুন পাল সে লালেতে যুগের হাওয়া উথাল পাতাল। যেই লালেতে হৃদয় জমিন দোলে চিরকাল মনোরে..রে.. এ..সে লালেতে আরকু মরিচ লাল।”
গানটি কোনো অসংবেদনশীলতা চোখে না পড়লেও সমস্যাটা ভিজ্যুয়ালে আপাত। কিন্তু দেখা যাচ্ছে পুরু গানটিই গেয়েছেন একজন পুরুষ। পুরুষতান্ত্রিক চেতনা এখানে স্পষ্ট। নারী পুরুষ সম্মিলিত ভাবে অথবা অংশ অংশ করে গাইতে পারতো।
ভিজ্যুয়ালে দেখা যায়, ‘নদীর পানি। বিশাল বহরে নৌকা বয়ে চলেছে। সব মাঝিদের পরণে লাল কাপড়।’ এই মাঝিদের সবাই পুরুষ। প্রচলিত ধারণারই প্রকাশমাত্র। গ্রামে মাঝে মাঝে নারীদেরও ছোটো নৌকার ক্ষেত্রে এই ভূমিকায় দেখা যায়। অথচ এখানেই মাঝি হিসেবে সবাই পুরুষ। ‘মাঝি শব্দটি যে কেবল পুরুষই হয়!’- তারই প্রতিফল এটি।
২য় দৃশ্যায়নে দেখা যায়, ‘দুটি ছেলে শিশু ঘুড়ির ‘ববিন’ ধরে সুতা ছাড়ছে। ঘুড়ি নিয়ে মাঠে যাচ্ছে। (একজনের কাছে ববিন দেখা যাচ্ছে আরেক জনের কাছে কেবল ঘুড়ি দেখা যাচ্ছে)’।
এখানেও স্পষ্টত পুরুষতান্ত্রিক আচরণ লক্ষ্যণীয়। ছেলেরাই যে কেবল ঘুড়ি উড়াই তা কিন্তু নয়, মেয়েরা মাঝে মাঝে আসে ঘুড়ি উড়াতে। কিন্তু এখানে তা প্রতিভাত হয়নি।
তৃতীয় দৃশ্যে দেখা যায়, ‘মা তার মেয়ে শিশুকে নিয়ে আয়নার সামনে দাড়ায়। (মেয়েটির পরণে লাল শাড়ি)। সিড়ি দিয়ে মেয়ে শিশুটি ওপরে উঠতে থাকবে। ওপরে ওঠে দাঁড়াবে। (জানালার পাশে)’। মা-রা যে কেবল মে শিশুকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে তা কিন্তু নয়। আপাত মনে করা যেতে পারে মেয়েদের। লক্ষণীয় মেয়েটির পড়নেও শাড়ি (অবশ্যই লাল রংয়ের)।
এই ছোট্ট বয়সেই মেয়েটি শাড়ি পড়িয়ে দেয়া হয়েছে। মনে হয় যেন মেয়ে যেনো মায়ের মতোই একদিন বউ হবে। (মায়েদের তাদের মেয়েদের শাড়ি পড়িয়ে দেখতে চান তার মেয়েকে বউ সাজালে কেমন দেখাবে)। যেনো স্বপ্নটা এখানেই দানা বাঁধে। তাও আবার আয়নার সামনে গিয়ে।
৪র্থ দৃশ্যে দেখা যায়, ‘একটি মেয়ে লাল কাপড় হাতে নিয়ে মাথার ওপর দিয়ে বাতাসে উড়াচ্ছে। বাইরে কাপড় নাড়া থাকবে (লাল কাপড়)। ৪টি শিশু (১ছেলে ও ৩মেয়ে) দড়ির নিচ দিয়ে দৌড়াচ্ছে।’ মেয়েরা কি কেবল কাপড় উড়াবে? এখানে দেখা যাচ্ছে ৩টি মেয়ে ও ১টি ছেলে দড়ির নিচ দিয়ে দৌড়াচ্ছে। কাপড় ধোয়ার বিষয়টি যে কেবলই নারীদের কাজ তা বোঝানোর প্রয়াস দেখা যায়। পুরুষতন্ত্র হাজির আবারো।
৫ম দৃশ্যায়নে দেখা যায় যে, ‘প্রেমিকা গাছের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। প্রেমিক এসে প্রেমিকার কানে লাল ফুল গেঁথে দেয়।’ বাংলাদেশর গ্রামীন প্রেমিক জুটির প্রচলিত কৃষ্টি এটি। এখানেও পুরুষতান্ত্রিকতার ছাপ সুস্পষ্ট। নারী তার প্রেমিকের জন্য অপেক্ষা করবে। এটাই যেনো রীতি। আর ফুল দিয়ে প্রিয়ার মন কেড়ে নেবে প্রেমিক।
৬ষ্ঠ দৃশ্যে দেখা যায় যে, ‘ট্রাক দিয়ে লাল মরিচ কারখানার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কারখানার সামনে কেবল পুরুষ আছে।’ নারীদের কাজের ক্ষেত্র যেনো কেবলই ঘর। পুরুষরা কারখানায় কাজ করে। মরিচের কারখানায় যে কবল পুরুষরাই কাজ করে এমন নয়। অথচ এখানে কেবল পুরুষদের দেখানো হয়েছে।
বিজ্ঞাপনটির ভিজ্যুয়ালের দিকে দৃষ্টি দিলেই কেবল সাদামাঠার আড়ালে জেন্ডার অসংবেদনশীলতা চোখে পড়ে। ৩য় দৃশ্যে নারী ঘরে, ৫ম দৃশ্যে নারী প্রেমিকা হিসেবে বাহিরে আসলেও তাকে এখানে নিস্ক্রিয় হিসেবে দেখানো হয়। লাবণ্যময়ী ও যৌনতার প্রতিভূ হিসেবে প্রেমিকা যেনো হাজির হয়েছে ওই দৃশ্যায়নে। অন্যদিকে দৃশ্যে কারখানায় কেবল পুরুষদের ভূমিকাটিকেই দেখানোর প্রয়াস লক্ষ্য করেছি।
সর্বশেষ দৃশ্যে দেখানো হয়, ‘গুড়া মরিচ প্যাকেটে। আর একটি পাত্রে গুড়ো মরিচ নারী হাতে’। মরিচতো রান্না-বান্নার কাজেই ব্যবহৃত হয়। মরিচের গুড়ো হাতে নারী। রান্না-বান্না যে নারীদের কাজ এটা মনে করিয়ে দেয় দেয় এই বিজ্ঞাপনটি। আপাতদৃষ্টিতে সেটা হয়তো চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। রন্ধনশৈলীর সাথে যেনো নারীর এক গভীর সম্পর্ক তাই প্রতিভাত হয় এখানে।
আরকু গুড়ো মসলার বিজ্ঞাপনটিতে জেন্ডার অসংবেদনশীলতা
বিজ্ঞাপনটি আপাত দৃষ্টিতে সংবেদনশীল বলেই মনে হতে পারে। তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করলেই জেন্ডার অসংবেদনশীলতা দৃষ্টিগোচর হবে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের হেয় করা হয় বিভিন্নভাবে কিংবা নারীরা বর্তমানে যেকাজে আছে তাদেরকে ঐ কাজগুলোতে রেখে দেবার পুরুষীয় চেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে। নৌকার মাঝি যেনো সবাই পুরুষ। অথচ আমরা গ্রামে দেখি মাঝে প্রয়োজনের তাগিদে নারীরাও নৌকা চালাচ্ছে, যদিও সেটা খুবই কম। নারী ঘরে কাজে ব্যস্ত থাকবে এমনটা চাওয়া পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতারই নামান্তর। ৩য় দৃশ্যে এক মাকে আমরা দেখতে পায় যে, ঐ নারী তার মেয়েকে নিয়ে শাড়ি পড়িয়ে আয়নার সামনে দাড়িয়ে স্বপ্ন বুনছেন। যেনো তার চাওয়া কন্যাসন্তানটি একটিন বড়ো হয়ে তার মতোই ‘নারী’ হবে কিংবা হবে বউ।
২য় দৃশ্যে লক্ষ্য করা যায় যে, ২ছেলে শিশু ঘড়ি ওড়াতে যাচ্ছে। দু জনই যে ছেলে। তার মানে কী মেয়েরা ঘুড়ি ওড়ায় না কিংবা ঘুড়ি ওড়াবে না। নারী –পুরুষ সংখ্যায় প্রায় সমান সমান। অথচ ২টি মেয়ে শিশু কোথায় গেলো। নিশ্চয় মেয়ে শিশু ২টি মায়ের সাথে গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত, ফলে তার মাঠে আসাে হয়ে ওঠেনি। কিন্তু কাপড় শুকানোর জায়গায় ৩টি মেয়ে শিশু আর ১টি ছেলে। এখানে কী মেয়েদের ট্রেনিং পিরিয়ড নাকী? ভবিষ্যতে কাপড় ধোয়া আর কাপড় শুকানোর কাজটি ‘তোমাদের’ই করতে হবে।
নারী থাকবে অকর্মঠ আর পুরুষ হবে উজ্জীবনী শক্তি সমৃদ্ধ কর্মঠ ব্যক্তি। কারখানার সামনে পুরুষকে দেখানো হলেও নারীকে দেখানো হয়েছে ঘরে ভেতরে। শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, নারী হাতে গুড়ো মরিচ। রান্না-বান্নার কাছে নারীর ভূমিকা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আর ৫ম দৃশ্যে তো প্রেমিকা কেবল পুরুষের অপেক্ষায় দাড়িয়ে আছে। আর পুরুষ এখানে সক্রিয় ভূমিকায়।
অযাচিতভাবে ৫ম দৃশ্যে নারীর যৌনতা ও সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

‘আরকু গুড়ো মসলা’ বিজ্ঞাপনটিতে জেন্ডার ছাঁচিকরণ
বিজ্ঞাপনটি কিভাবে ছাঁচিকরণ করা হয়েছে তা সংক্ষিপ্ত আকারে ব্যাখ্যা করা হলো-
নারী থাকবে ঘরে, পুরুষ বাহিরে: বিজ্ঞাপনটিতে লক্ষ্য করা যায় যে, পুরুষকে দেখানো হয়েছে অর্থ উপার্জনকারী হিসেবে। কারখানায় কেবল পুরুষদের দেখানো হয়েছে। ২য় দৃশ্যে ২টি ছেলে শিশুর ঘুড়ি ওড়ানোর দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে। ১ম দৃশ্যে দেখানো হয়েছে পুরুষই নৌকা চালায়।
নারী অকর্মঠ, উদ্যমী পুরুষ: নারীকে কেবল স্বপ্নচারী হিসেবে দেখানো হয়েছে। ৩য় দৃশ্যে দেখা যায়, মা তার মেয়েকে নিয়ে আয়নার সামনে দাড়িয়ে আছে। লালেতে তার স্বপ্ন, মেয়ে একদিন বউ হবে(!)। আর কর্ম উদ্যমী পুরুষ কারখানার কাজ কিংবা নৌকা চালানো তথা অর্থনৈতিক দন্ডমুন্ডের মালিক।
অপেক্ষা কেবল নারীই করে: ৫ম দৃশ্যে দেখা যায়, প্রেমিকা তার প্রেমিকের জন্য গাছের শীতল ছায়ায় দাড়িয়ে অপেক্ষা করছিলো। প্রেমিক এসে প্রেমিকার কানে লাল ফুল গেঁথে দেয়। বাংলাদেশর বিভিন্ন অঞ্চলে এমন দৃশ্য দেখায় প্রায়শ। এখানেও পুরুষতান্ত্রিকতার ছাপ সুস্পষ্ট। নারী তার প্রেমিকের জন্য অপেক্ষা করবে। এটাই যেনো রীতি। আর ফুল দিয়ে প্রিয়ার মন কেড়ে নেবে প্রেমিক। গ্রামে দেখা যায় যে, স্বামীর জন্য অধীর আগ্রমে স্ত্রী বসে থাকে। স্বামীকে ছাড়া স্ত্রী খেতে চায়না। অথচ স্ত্রীকে ছাড়াই কিন্তু স্বামী তার পেট পূজা সাড়ে। তবে কী নারী কেবল পুরুষের জন্যই অপেক্ষা করবে?
যৌনতা আর চেহারাই নারীর অবলম্বন: বিজ্ঞাপনটি দেখা যায় যে, অযাচিতভাবে ৫ম দৃশ্যে নারীর যৌনতা ও সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এক নারী অপেক্ষা করছে তাও আবার রূপে ঐশ্বরিয়া হয়ে।
সার্বিক পর্যালোচনা
উদ্দিষ্ট বিজ্ঞাপন ২টি ক্রিটিক্যাল চোখে দেখলে সার্বিকভাবে দেখা যাবে যে, নারী কেবল বিজ্ঞাপনে স্থান পেয়েছে সৌন্দর্য বর্ধনস্বরূপ। নারী ও বিজ্ঞাপনকে যেনো ঘনিষ্ট আত্মার বাঁধনে বাধা। নারীকে বিজ্ঞাপনে হাজির করা হয় পণ্য হিসেবে। অযাচিতভাবে নারীর সৌন্দর্য আকর্ষনের জন্য তুলে ধরা হয়েছে। নারীর যৌনতাকে তুলে ধরার প্রয়াসও অযাচিতভাবেই। টেক্স্ট-এর কাজে লাগুক বা না লাগুক বিজ্ঞাপনে নারীকে যেনো আনতেই হবে। আর সে আনয়ন অযাচিতভাবেই।
নারী সম্পর্কে সমাজে প্রচালিত যে ধারণায় তাকে কখনো চ্যালেঞ্জ করেনি বিজ্ঞাপন দুটো। বরং নারীকে দেখানো হয়েছে দুর্বল, ঘর কুনো, ভীতু, অকর্মঠ, যৌন বস্তু, পুরুষের অপক্ষোয় বসে থাকা রমনী হিসেবে। অপরপক্ষে পুরুষকে দেখানো হয়েছে কনফিডেন্ড, সাহসী, কর্মঠ, অর্থনৈতিক দন্ডমুন্ডের মালিক হিসেবে।
সার্ফ এক্সেলের বিজ্ঞাপনটিতে সমাজে প্রচলিত ভাবনাগুলোকেই তুলে ধরা হয়েছে। মেয়ের সাহসী নয়, ঝুঁকি নেয় ছেলেরা, সফল ছেলেরা, মেয়েরা নয়, ছেলেরা দ্রুত গতির, মেয়েরা ধীর, ছেলেরা নিজের সফলতায় খুশি, মেয়েরা অন্যের সফলতায় এমন প্রচ্ছন্ন বার্তা লুকায়িত ছিলো বিজ্ঞাপনটিতে।
অপরদিকে আরকু গুড়ো মসলার বিজ্ঞাপনটিতেও প্রচ্ছন্নভাবে নারীকে হেয় করা হয়েছে। নারী থাকবে ঘরে, পুরুষ বাহিরে, নারী অকর্মঠ, উদ্যমী পুরুষ, অপেক্ষা কেবল নারীই করে, যৌনতা আর চেহারাই নারীর অবলম্বন এমন চিত্রায়ন দেখা গেছে।
বলা যেতে পারে সমাজের প্রতিটি রন্দ্রে নারীরা যেমন অবলা হিসেবে প্রকাশ পায় পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বাস্তবতায়, ব্যতিক্রম নয় গণমাধ্যমে প্রচারিত বিজ্ঞাপনে।
শেষের কথা
নিজের শান্তি ও স্বস্তি সে দেখো জলের দামে
কেমন বেচেছে এই আসবাব বা সামগ্রীর কাছে
আত্মার মহিমা খুলে পড়েছে সে বস্তুর পোষাক।
- ধুলোমাটির মানুষ: মহাদেব সাহা
পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে সর্বদা ‘অবলা’ হিসেবে নির্মাণ করার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায় সর্বত্র। আধা-সামন্তবাদী বাংলাদেশে নারীর উপস্থাপন সে ঘরানার বাইরে ছিলো না কোনো সময়ই। মিডিয়াও পুরুষতন্ত্রের বাহক হিসেবে নারীকে অধঃস্তন হিসেবে দেখায়। নারী উন্নয়নের বাল্লিকী ছড়ালেও কার্যকরণ ঠিক তার উল্টো। টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনের দিকে চোখ ফেরালে তা আমাদের কাজে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ব্যবসার হাতিয়ার হিসেবে অথবা পণ্যের প্রসারে পুজিবাদী গোষ্ঠী নারীকে ‘পন্য’ হিসেবেই উপস্থাপন করছে। অযাচিতভাবেই নারী সৌন্দর্য ও যৌনতাকে পুরুষের সামনে তুলে ধরা হয়। নারীকে উপস্থাপন করা হয় রূপ মনোহরিণী, সংসারী, অকর্মঠ, ভীতু, দুর্বল প্রভৃতিরূপে। যোগাযোগের ছাত্র হিসেবে আমরা সে বিষয়গুলো উপলব্ধি করার চেষ্টা করি বারবার। আমরা আশা করি আমরা যখন এক্ষেত্র গুলোতে কাজ করবো তখন জেন্ডার অসংবেদনশীলতা, ছাঁচিকরণ প্রভৃতি বিষয়গুলোকে মাথা রেখেই বিজ্ঞাপন তৈরিতে সচেষ্ট হবো।
সবচেয়ে বড়ো বিষয় হলো- মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখতে হবে। নারী কিংবা পুরুষ হিসেবে নয়। জয় হোক মানবতার। জয়তু মনুষ্য প্রজাতি।

নাও এবার তোমার বাসার টিভি অন করো, ২ মিনিট কিছুক্ষন বিজ্ঞাপন দেখো।
আর কিছুক্ষন ভাবো,
কি কিছু আচ করতে পেরেছ?
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই মে, ২০১৫ বিকাল ৪:০৮
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

গরীবের বউ সবার ভাবি

লিখেছেন অপলক , ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:০২



৩৬ জুলাই আন্দোলনের পর অনেক আশায় ছিলাম। আশার গুড়ে বালি। তত্বাবধায়ক সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক গভর্ণর ড. আহসান এইচ মনসুর বুদ্ধিদীপ্ত প্ররিশ্রম করে ২০২৬ জানুয়ারীতে রিজার্ভে রেখে গেছেন ৩৫... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন থেকে যারা আওয়ামী লীগকে ভালোবাসেন এখন তাদেরকে আওয়ামী লীগের প্রয়োজন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০



ক্ষমতায় গেলে কোন দল যাদেরকে মনে রাখে না ক্ষমতায় গেলে তাদেরকেই তারা সবচেয়ে বেশী মিস করে। সেই নিখাঁদ দল প্রেমিকদেরকে এখন আওয়ামী লীগ খুঁজছে। তারা লগি বৈঠা নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৫



আমার এক বন্ধু আছে। ধরা যাক, নাম তার করিম। করিমকে একদিন চায়ের দোকানে একজন বলল, “আপনি নাকি ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা?” করিম চায়ের কাপ নামিয়ে বলল, “ভূয়া হলে লাভটা কী?” লোকটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫ই আগস্ট ছিলো আরো একটি ১৫/২১শে আগষ্টের অপচেষ্টা।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫২



২১শে আগস্ট পালন করা অর্থে , আমার কাছে মনে হচ্ছে আবারো জঘন্য কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। কারন আমরা ঐ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার সম্পন্ন করতে পারিনি। আমরা যারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×