
ভয়, বাবাকে ভীষণ ভয় পায় পরিবারের সবাই-শুধু মীম ছাড়া। ছয়-সাত বছরের মা হারা মীমের কোন আব্দারে বাবা ‘না’ বলতে পারেন না। মিলি-মাশরাফি এই সুযোগটাই কাজে লাগায়। নিজেদের বিভিন্ন চাহিদা তারা মীমের মাধ্যমে বাবার কাছে পেশ করে। চৌধুরী ভাইয়ের দোকানের “বাবুল” বিস্কুট, লজেন্স মিলি-মাশরাফির খুবই পছন্দের। সকালে মীমকে কুরআন পাঠরত বাবার কাছে পাঠিয়ে ওরা পাশের ঘরে থেকে উঁকি দিয়ে দেখে। মীম বাবার কোলে বসে, উনি পাঠ বন্ধ করে আদুরে কন্যার থুতনি ধরে জানতে চান,
-মা, কি চাও?
ও আধো আধো স্বরে বলে,
- লজেন্স-বিস্কুট কিনব।
বাবা পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা সিকি পয়সা বের করে মেয়ের হাতে দেন।
মীম হেসে বাবার কোল থেকে নেমে ছোট্ট ছোট্ট পায়ে দৌড়ে বোন-ভাইয়ের কাছে চলে যায়।
কিছুক্ষণ পর দরজা খোলার শব্দ পাওয়া যায়, পরম আনন্দে তিন ভাই-বোন চৌধুরী ভাইয়ের দোকানের দিকে পা বাড়ায়। একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাবা অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।
সকালটা এত দ্রুত এগিয়ে চলে, মাঝে মাঝে বাবা তাল রাখতে পারেননা। আজও হয়েছে তাই। হেঁটে গেলে ৮ টার অফিসে সময় মত পৌঁছাতে পারবেন না। তাই একটা বাসে চড়ার চেষ্টা করেন। এক হাতে টিফিন বক্স আর ছাতাটা ধরেন, অন্য হাতে বাসের হ্যান্ডেল ধরতে যান। হাত ফসকে রাস্তায় পড়ে যান, ছাতা-টিফিন বক্সটা ছিটকে পড়ে হাত থেকে। কয়েকজন যুবক দৌড়ে এসে উনাকে রাস্তা থেকে তুলে পাশের একটা রিক্সায় বসান। উনি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে দেখেন টিফিন বক্সটা রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছে, পাশেই বড় মেয়ের যত্ন করে দেওয়া রুটি-আলুভাজি পড়ে আছে-একজন অসহায় বাবা মেয়ের মুখটা মনে করে ব্যথিত হন। দয়ার্দ্র কন্ঠে এক যুবক বলে,
-চাচা, ব্যথা পাইছেন?
-না, বাবা।
-না, না, আপনার পাঞ্জাবিতে রক্ত।
বাবা খেয়াল করে দেখেন তাঁর নতুন পাঞ্জাবির ডান হাতের কনুইটা ছিঁড়ে সেখান থেকে রক্ত বেরিয়ে হাতাটা লাল হয়ে গেছে।
-চাচা, হাতে ব্যান্ডেজ করাবেন?
-না বাবা, অফিসের দেরী হয়ে যাচ্ছে, অফিসে গিয়ে মলম লাগিয়ে নেব।
কেউ একজন ছাতা আর টিফিন বক্সটা রাস্তা থেকে তুলে বাবার হাতে তুলে দেয়।
যুবক রিকশাওয়ালাকে রাজী করায় বাবাকে অফিসে পৌছে দিতে।
রিকশা চলছে, বাম হাতে ছাতা, টিফিন বক্স- এখন ডান হাতে বাবা ব্যথা অনুভব করছেন। নতুন পাঞ্জাবিটা কত কষ্ট করে কিনেছিলেন।শরীর-মন দু’টোই আর যেন চলছে না, বাসায় ফিরে কারো একটু সেবা নেওয়ার জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠে। কিন্তু ছেলে-মেয়েরা উনার এই অবস্থা দেখলে কষ্ট পাবে, এই চিন্তা করে অফিসের দিকেই গেলেন।
ওভার টাইম ছিল, বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল। সবাই ঘুমিয়ে গেছে, শুধু বড় মেয়ে বাবার জন্য না খেয়ে বসে আছে। বাবার শরীরটা একটু গরম গরম লাগছে, মুখে রুচি নেই, বাপ-বেটি অল্প কিছু খেয়ে শুয়ে পড়ে।
বড় মেয়ের ডাকে বাবার ঘুম ভাঙ্গে।
বসন্তের রোদ জানলা গলে বিছানায় এসে পড়েছে, এত বেলা করে ঘুম থেকে কখনো ওঠেছেন বলে মনে করতে পারলেননা। দ্রুত ডান কনুইয়ে ভর দিয়ে ওঠতে গিয়ে ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলেন।মেয়ের ব্যাকুল কন্ঠ,
-বাবা, কি হয়েছে?
মেয়ে বাবার হাতটা উঁচু করে আঁতকে ওঠে, কনুইটা লাল হয়ে ফুঁলে আছে, গায়েও বেশ জ্বর।
কাঁদো কাঁদো গলায় মেয়ে জানতে চায়,
-কেমন করে হলো?
-বাস থেকে পড়ে গিয়েছিলাম।
এর মধ্যেই মিলি-মাশরাফি-মীম বাবার বিছানার কাছে এসে দাঁড়ায়।
-তুমি তো হেঁটেই যাও।
-অফিসের দেরী হয়ে যাচ্ছিল, তাই বাসে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম।
-তোমার কিছু হয়ে গেলে অফিস আমাদের দেখবে?
-সরকারের কাছ থেকে বেতন নেই, দেরী করে গেলে কি চলে?
মেয়ে বাবাকে চেনে, তাই বলে,
-ঠিক আছে, দেরী হলে তুমি রিকশায় যাবে, তবু বাসে উঠবে না।
-এই অভাবের সংসারে অযথা টাকা-পয়সা খরচ করা ঠিক না।
মীম বাবার হাত ধরে টানে,
-বাবা, আমি আর লজেন্স-বিস্কুট খাব না, ওই পয়সা দিয়ে তুমি রিকশায় করে অফিসে যাবে।
বাবা তাঁর ছোট্ট মীমকে দু’হাতে জড়িয়ে বুকের কাছে টেনে নেয়।
ছেলে-মেয়েরা অবাক হয়ে দেখে, কঠিন বাবার দু’চোখ বেয়ে অশ্রুর ধারা বয়ে সাদা-কালো দাঁড়ি ভিজিয়ে দিচ্ছে।
মোঃ শামছুল ইসলাম
ঢাকা
০৭ মার্চ ২০১৬
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে মার্চ, ২০১৬ রাত ১১:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




