
আমরা সেই মানুষ টাকেই পাগলের মতো ভেঙেচুরে ভালোবাসি, ভরসা করি, আঁকড়ে ধরি যার কাছে আমাদের মূল্য শূন্যের মানের চেয়েও ঢের কম। এই ভুল মানুষে মজে আমরা আমাদের পুরোটা জীবন বিষাদে বিষিয়ে তুলি, একাকিত্ব বেছে নেই, অন্ধকার খুঁজি, অনাহারে থাকি, নিজেকে কষ্ট দেই, আত্মহত্যা করি।
আমার ফ্রেন্ডের ব্রেকাপ হয়েছে অনেকদিন। সে এখনো ওর সেই হৃদয়হীন ভণ্ড মানুষ টাকে ভুলতে পারেনি। মাঝামধ্যেই ও আমার কাছে তার গল্প করে, মন খারপ করে। আমি ওর এসবে পাত্তা না দিয়ে ওকে বকাঝকা করি। যে মানুষ টা ওকে রেখে অন্য জায়গায় অন্য কাউকে নিয়ে সুখের সাগরে ভাসছে তাকে নিয়ে পড়ে থেকে ওর সমস্ত কিছু নষ্ট করার কোনো মানেই আমি দেখিনা; কিন্তু সে এসবেই পড়ে আছে, এসব থেকে বের হয়ে আসতে পারছেনা।
আজ হঠাৎ ও আমাকে নক করে বললো, ওর কিছুই ভালো লাগছেনা, অফিসের ডেক্সে বসে আছে, মনে হচ্ছে কিছু একটা করে ফেলবে। টেক্সট দেখে তড়িঘড়ি করে ওকে কল দিলাম। ও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে! কারণ সেই একটাই। সেই মানুষ, যে ওকে রেখে অন্য শরীরের গন্ধে মজে আছে।
আমি নিজেও ভীষণ ইমোশনাল মানুষ কিছু হলে সহ্য করার ক্ষমতা আমার থাকবেনা বলেই আমি কখনো এসবে জড়াইনি। জীবনে অনেক প্রপোজাল পেয়েছি, কেউ একজন বলেছিলো, আমি নাকি জীবনে এতোগুলো মুড়িও খাইনি যতোগুলো বার সে আমাকে লাভিউ বলেছে। মাস্টার্স পরীক্ষার পর তো এক বান্ধবী সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসেছিলো আমি সেটাও গায়ে না মেখে অন্যভাবে স্কিপ করে গিয়েছি। ইভেন যে মানুষ গুলো আমার ক্রাশ ছিলো, তাদের কাছ থেকে ইশারা পেয়েও তাদের হারিয়ে যেতে দিয়েছি;কিন্তু আঁকড়ে ধরিনি। কারণ, মানুষ কে ভুলে যাওয়া গেলেও তার সাথে কাটানো সময় গুলোকে ভুলে যাওয়া যায় না বলেই হয়তো মানুষ গুলো সারাজীবন বিষাদে ভুগে। আমি এই বিষাদে ভুগতে চাইনি আসলে।
দিনশেষে আমাদের এটা মনে রাখা জরুরি, আমরা কেবল আমাদের জন্যই বাঁচিনা, আমরা তাদের জন্যেও বাঁচি যারা আমাদের বেঁচে থাকা দেখে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা পায়। সেই সব মানুষের কোনো জায়গা আমাদের মাঝে রাখা উচিত নয় যাদের কাছে আমরা মূল্যহীন।
তসলিমার এই কবিতাটি আমার ভীষণ পছন্দ, লেখার বিষয়ের সাথে যোগসূত্র আছে বলে শেয়ার করলামঃ
এই শহরেই তুমি বাস করবে, কাজে অকাজে দৌড়োবে এদিক ওদিক
কোথাও আড্ডা দেবে অবসরে, মদ খাবে, তুমুল হৈ চৈ করবে,
রাত ঘুমিয়ে যাবে, তুমি ঘুমোবে না।
ফাঁক পেলে কোনও কোনও সন্ধেয় এ বাড়ি ও বাড়ি
খেতে যাবে, খেলতে যাবে,
কে জানে হয়তো খুলতেই যাবে আলগোছে কারও শাড়ি
আমার আঙিনা পেরিয়েই কোনও বাড়িতেই হয়তো।
এ পাড়াতেই হয়তো দু’বেলা হাঁটাহাঁটি করবে,
হাতের নাগালেই থাকবে,
হয়তো কখনও জানিয়েও দেবে আমাকে, যে, কাছেই
আছো,
কুঁকড়ে যেতে থাকবো, কুচি কুচি করে নিজেকে কাটতে
থাকবো
দেখা না হওয়ার যণ্ত্রণায়, তবু বলবো না, এসো।
বলবো না,
তোমাকে সুযোগ দেব না বলার যে তোমার সময় নেই,
বা ভীষণ ব্যস্ত তুমি ইদানিং
তোমার অপ্রেম থেকে নিজেকে বাঁচাবো আমি।
তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে না।
বছর পেরোবে, তোমার সঙ্গে দেখা হবে না আমার,
দেখা না হতে না হতে ভুলতে থাকবো তোমার
সঙ্গে দেখা হওয়াটা ঠিক কেমন ছিল
কী রঙের সার্ট পরতে তুমি, হাসলে তোমাকে ঠিক
কেমন দেখাতো,
কথা বলার সময় নখ খুঁটতে, চোখের দিকে নাকি অন্য
কোথাও তাকাতে,
পা নাড়তে, ঘন ঘন চেয়ার ছেড়ে উঠতে, জল খেতে
কিনা, ভুলতে থাকবো।
দেখা না হতে না হতে ভুলতে থাকবো তুমি ঠিক
দেখতে কেমন ছিলে,
তিলগুলো মুখের ঠিক কোথায় কোথায় ছিল, অথবা
আদৌ ছিল কিনা।
তোমার চুমু খাওয়াগুলো ঠিক কেমন, জড়িয়ে পেঁচিয়ে
চুলে বা বুকে মুখ গোঁজাগুলো
ঠিক কেমন, ভুলতে থাকবো।
অনেকগুলো বছর পেরিয়ে যাবে, তোমার সঙ্গে আমার
আর দেখা হবে না।
এক শহরেই, অথচ দেখা হবে না।
পথ ভুলেও কেউ কারও পথের দিকে হাঁটবো না,
আমাদের অসুখ বিসুখ হবে, দেখা হবে না।
কোনও রাস্তার মোড়ে কিংবা পেট্রোল পাম্পে
কিংবা মাছের দোকানে, বইমেলায়, রেস্তোরাঁয়,
কোথাও দেখা হবে না।
আরও অনেকগুলো বছর পর, ভেবে রেখেছি, যেদিন হুড়মুড়
করে
এক ঝাঁক আলো নিয়ে সন্ধে ঢুকতে থাকবে আমার
নির্জন ঘরে,
যেদিন বারান্দায় দাঁড়ালে আমার আঁচল উড়িয়ে
নিতে থাকবে বুনো বৈশাখি
এক আকাশ চাঁদের সঙ্গে কথা বলবো যে রাতে
সারারাত
তোমাকে মনে মনে বলবোই সেদিন, কী এমন হয় দেখা
না হলে,
দেখা না হলে মনে হতো বুঝি বেঁচে থাকা যায় না,
কে বলেছে যায় না, দেখ, দিব্যি যায়!
তোমার সঙ্গে দেখা হয়নি কয়েক হাজার বছর, তাই
বলে কি আর বেঁচে ছিলাম না?
দিব্যি ছিলাম!
ভেবেছি বলবো,
তুমি তো আসলে একটা কিছুই-না ধরনের কিছু,
আমার আকাংখা দিয়ে এঁকেছিলাম তোমাকে,
আমার আকাংখা দিয়ে তোমাকে প্রেমিক
করেছিলাম,
আমার আকাংখা দিয়ে তোমাকে অপ্রেমিকও করেছি
তোমাকে না দেখে লক্ষ বছরও বেঁচে থাকতে পারি!
অপ্রেমিককে না ছুঁয়ে, অনন্তকাল।
এক ফোঁটা চোখের জল বর্ষার জলের মতো ঝরে ধুয়ে
দিতে পারে
এতকালের আঁকা সবগুলো ছবি, তোমার নাম ধাম
দ্রুত মুছে দিতে পারে চোখের জল।
তোমাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে।
আমাকে একা বলে ভেবো না কখনো, তোমার অপ্রেম
আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকে।
ছবিঃ গুগল
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জুন, ২০২৩ বিকাল ৪:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




