গান শেখার ব্যাপারে ছোটোকাল থেকেই প্রচন্ড আগ্রহ আমার। সবার সামনে না গাইলেও বাথরুম সিংগিংটা নিয়মিত চলতো সবসময়। উচ্চশিক্ষায় ময়মনসিংহে গিয়েও গান শেখার আগ্রহটা দমিয়ে রাখতে পারিনি। আমাদের ইনস্টিটিউটের একই বর্ষের ক্থজন এবং এক সিনিয়র ভাইয়ের উৎসাহে ভর্তি হলাম ময়মনসিংহ সঙ্গীত বিদ্যালয়ে। সময়টা ১৯৮৫ সাল।
সিনিয়র রেজাউল ভাইয়ের কাছে শুনেছিলাম সঙ্গীত সম্পর্কে অনেক কথা। গান শুনতাম শুধু। গান এবং সঙ্গীতের পার্থক্যটা তেমন বুঝতাম না। তবে সঙ্গীত কথাটা শুনতেই একটা শ্রদ্ধাভাব এসে যেতো প্রাণে। বিরাট গাম্ভীর্য এসে ভর করতো মনে। সেই সঙ্গীত শিখতেই গেলাম সঙ্গীত বিদ্যালয়। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে আমাদের ওস্তাদ ছিলেন শ্রদ্ধেয় ইমদাদুল হক।
বলছিলাম রেজাউল ভাইয়ের কথা। ক্লাসে বসে সবাই হারমোনিয়াম নিয়ে সারেগামাপাধানিসা করছি। ক্লাসে ঢুকলেন রেজাউল ভাই। সিনিয়র ভাইকে সালাম জানিয়ে হারমোনিয়াম এগিয়ে দিলাম। বেশ ভাব নিয়ে বসলেন রেজাউল ভাই। আমরা বললাম- রেজাউল ভাই, ওস্তাদ আসার আগে আমাদের কিছু শেখান না!
দারুণ আগ্রহে রেজাউল ভাই শুরু করলেন। গান শেখার ক্লাসেও রেজাউল ভাই আমাদের সিনিয়র ছিলেন। হারমোনিয়ামের রীড দেখিয়ে দেখিয়ে সাতটি স্বর সম্পর্কে বললেন তিনি। আরও বললেন কোন গুলো শুদ্ধ, কোন গুলো কড়ি বা কোমল স্বর। আমি আগা-মাথা কিছুই বুঝলাম না। এক এক করে সবাইকে ডেকে স্কেল ধরিয়ে দিলেন। কাউকে বললেন- তোমার বি-ফ্লাট, আর তোমার সি-শার্প ইত্যাদি।
আমাকে কাছে ডেকে নিলেন তিনি। সা-আ-আ-আ করতে বললেন কতোণ। তারপর বললেন- তোমার গলা সি-শার্প। এবার শুরু হলো সারেগামা সাধার পালা। রেজাউল ভাইয়ের কাছে হারমোনিয়াম। আমি কোনোমতে সারেগামপা পর্যন্ত গেলাম। আমার আর ধানিসা পর্যন্ত যাওয়া হলো না। গলা গেলো ক্র্যাক করে। আমার কাসমেট রিন্টু বেশ ভালো রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতো। ও হো হো করে হেসে উঠলো।
এরপর রেজাউল ভাই শুরু করলেন শাস্ত্রীয় সংগীতের কথা- সারেগামাপাধানিসা এই স্বরগুলো নিয়ে হয় রাগ। মোট রাগ ১০টি। শুদ্ধ স্বর নিয়ে হয় রাগ ইমন। কোমল স্বর সংমিশ্রণে ভৈরবী- এরকম কতো কী! আমি শুধু মাথা নাড়ি। ার রিন্টু মুখ টিপে হাসে। মনে অপেক্ষায় থাকি কখন আসবেন ওস্তাদজী।
অবশেষে ওস্তাদজী আসলেন। রেজাউল ভাইয়ের মুখ হা হয়ে গেলো। ওস্তাদজীকে সবাই সালাম করলেন। আমিও করলাম। ওস্তাদজী বললেন- রেজাউল কী শেখাচ্ছিলে ওদের? রেজাউল ভাইয়ের উত্তর নেই কোনো। চুপ করে রইলেন। আমরা বললাম- ওস্তাদ, সারেগামা শিখাচ্ছিলেন। ওহ্ তাই- বলে ওস্তাদজী ক্লাস শুরু করলেন।
ওস্তাদজী সবাইকে নিয়ে কতোক্ষণ সারাগাম করলেন। তারপর এক একজন করে কাছে ডাকলেন। হারমোনিয়ামের রীড ধরে স্বরগুলো শেখালেন। স্কেল ঠিক করে দিলেন। আমার গলা হলো বি-ফ্লাট। এবার আমি সারেগামাপাধানিসা পর্যন্ত সহজেই সাধতে পারলাম। খাতায় তুলে নিলাম কিছু পাল্টা। যা দিয়ে বাসায় বসে গলা সাধতে বললেন ওস্তাদজী।
এরপর বেশ ক্থটি ক্লাসের পর আমরা পেলাম ঠাট এবং রাগের ধারণা। ওস্তাদ বললেন- ঠাট মোট ১০টি। বিলাবল, কল্যাণ, কাফি, ভৈরব, ভৈরবী, টোড়ি, মারবা, পূরবী, খাম্বাজ ও আশাবরী। এই দশটি ঠাটের নামে মৌলিক রাগও আছে। তবে রাগ-রাগিনীর সংখ্যা অনেক। এখনও নতুন রাগ-রাগিনী সৃষ্টি করছেন বিখ্যাত ওস্তাদগণ। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টি অনেক রাগ-রাগিনীও আছে। আর সেদিন জেনেছিলাম- শুধুমাত্র শুদ্ধ স্বর নিয়ে ঠাট বিলাবল-এর কথা।
এরপর ক্লাসে রেজাউল ভাই সঙ্গীত শেখাতে আর কোনোদিন হারমোনিয়াম নিয়ে বসেননি আমাদের সামনে। কারণ আমরা ততোদিন নিজেদের গলার স্কেল এবং ঠাট ও রাগের পার্থক্যটা বুঝতে পেরেছিলাম। বুঝতে পেরেছিলাম নির্দিষ্ট কিছু কিছু রাগের জন্য নির্দিষ্ট ঠাট সম্পর্কেও। তবে দুষ্টু ছেলেরা এরপর থেকে আড়ালে আবডালে রেজাউল ভাইকে রাগাউল ভাই বলে ডাকতেন। (চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জানুয়ারি, ২০০৭ সকাল ৭:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


