somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অস্বস্তিকর পরিবেশ, অস্বাভাবিক প্রেক্ষাপট

১৪ ই মার্চ, ২০০৬ সকাল ৮:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রাত নেমে এলে এখানকার রাস্তাগুলো আঁধারে ঢাকা পড়ে। শুধু এক প্যারিস রোড ছাড়া আর কোথাও উজ্জ্বল আলোর দেখা মেলে না। রাস্তায় টিমটিমে বাতিতে আঁধার কাটে না। এই আঁধারকেই বুঝি বেশি ভয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের! তাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী হলগুলোতে সন্ধ্যা না নামতেই দারোয়ান গেটে শব্দ করে ছাত্রীদের ডেকে নেয়। প্রশাসন বলে, তারা নাকি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এ ব্যবস্থা করেছে! তাই সন্ধ্যার পরের ক্যাম্পাস আর ছাত্রীদের নয়। ছাত্রী হলের সান্ধ্য আইন বলবৎ রাখতে প্রশাসনের যে যুক্তি তাতে মনে হয়, সন্ধ্যার পরে ক্যাম্পাসে বুঝি হায়েনারা চড়ে। সেই হায়েনাদের রোখা, মানে ছাত্রীদের নিরাপত্তা দেয়া হয়তো প্রশাসনের কাজ নয়। তাদের কাজ উল্টোটা। সন্ধ্যা না নামতেই ছাত্রীদের খাঁচায় পুরে ফেলা। মাঝে মধ্যে প্রক্টর মহোদয়ের শাদা মাইক্রো নিয়ে এখানে ওখানে তর্জন গর্জন করে বেড়ানো। এই তবে তাদের কাজ! মানে ডাকাতের ভয়ে উনারা আগে থেকেই নিঃস্ব সেজে দিন কাটাবেন গাছের তলে!
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যখন রাতের নিরাপত্তা নিয়ে এতো উতলা, তখন তো নিশ্চিন্তেই ঘুমানো যায়। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক-শিার্থীরা কি নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারেন? নিশ্চিন্তে ঘুমালে শিকদের পরিণতি যদি হয় অধ্যাপক তাহেরের মতো? নিশ্চিন্তে ঘুমালে শিার্থীদের হলের কাটাতার কেটে যদি ঢুকে পড়ে দুর্বৃত্তরা?
অধ্যাপক তাহের। নৃশংসভাবে খুন হওয়া এই মানুষটির কী অপরাধ ছিলো? আমাদের কাছে এর জবাব নেই। নেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছেও। অধ্যাপক তাহেরের লাশ উদ্ধারের পর কয়েক শ' বিুব্ধ শিার্থী যখন কয়েক ঘন্টা দেরিতে হাজির হওয়া উপাচার্যকে ঘিরে ধরে বিচার চাইলেন, তখন উপাচার্য বললেন, বিচারের দায়িত্ব তাদের নয়। আমরাও জানি বিচারের দায়িত্ব তাদের নয়। কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটির পর একটি নৃশংস, মর্মান্তিক, ভীতিপ্রদ ঘটনা ঘটে যাবে আর তারা চেয়ে চেয়ে দেখবেন- এই দায়িত্বটিও তো তাদের নয়। প্রতিটি অঘটনের পেছনে লুকিয়ে থাকে দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা একটি প্রোপট। আর সেই প্রোপটের ওপর নির্ভর করে অঘটন ঘটার সম্ভাবনার হার। অধ্যাপক তাহেরের হত্যাকাণ্ড কী কারণে ঘটেছে তা জানা যায়নি এখনো। তবে এই হত্যাকাণ্ড যে কোনো বিচ্ছিন্ন প্রোপটে হয়নি তা নিশ্চিত। এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বিশ্ববিদ্যায়টিতে প্রশাসনিক স্বৈরতন্ত্রের হাতিয়ারগুলো দীর্ঘদিন ধরে যে প্রোপট তৈরি করে রেখেছে তারই ধারাবাহিকতায়। সুতরাং উপাচার্য হত্যার কারণ নাও জানতে পারেন, কিন্তু তিনি ও তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা প্রশাসনিক বেষ্টনী এই হত্যার দায়-দায়িত্ব এড়াতে পারবেন না।
এক বছর এক মাস আগের কথা। ঘাতকের হাতে প্রফেসর ইউনুস খুন হলেন। রাস্তায় রাস্তায় অবরোধ-বেরিকেড, ছাত্রদের আন্দোলন, বিােভে উত্তাল হয়ে উঠলো ক্যাম্পাস। সংবাদপত্রের পাতায় প্রফেসর ইউনুস হত্যার খবর এলো ফলাও করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী হয়েছে? দেশ নাড়িয়ে দেয়ার মতো একটি হত্যাকাণ্ডের চার্জশীট দিতে তদন্তকারী কর্মকর্তা চেয়ে আছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলের সবুজ সঙ্কেতের অপোয়। আসামী জামিনে বাইরে। আরেক আসামী 'উধাও'। কিন্তু মামলার চার্জশীট দিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের সবুজ সঙ্কেতের অপো কেনো? এটি কি তবে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা? তাও তো নয়। তাহলে তদন্তকারী কর্মকর্তার হাত গলে মামলাটির চার্জশীট দেয়া না দেয়া উপরের ওপর নির্ভর করছে কেনো? আমি যদি অনুমান করি, মামলার আসামীরা সবাই ইসলামী ছাত্রশিবিরের ক্যাডার- সেটিই মূল কারণ। আমি যদি ধারণা করি, মামলাটির চার্জশীট দিলে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সরকারের শরীক স্বাধীনতা বিরোধী মৌলবাদী অপশক্তির অনেক অজানা কাহিনী বেরিয়ে আসবে- সেটিই চার্জশীট দিতে বিলম্ব হবার কারণ। আমার এই ধারণা শুধু আমার নয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ নগরীর অধিকাংশ সচেতন মানুষই জানেন কী কারণে এই চার্জশীট এখনো দেয়া হচ্ছে না। আমার সঙ্গে তাদের ধারণা হুবহু মিলেও যায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শীত-তাপ নিয়ন্ত্রিত ক েযে মাননীয় উপাচার্য মহোদয় বসে থাকেন, তার কাছে আমার প্রশ্ন, আপনাদের একজন সহকমর্ী মারা গেলেন। তার হত্যার চার্জশীট দিচ্ছে না। আপনারা কি একটিবারও সরকারের উধর্্বতন মহলে দাবি জানিয়েছেন চার্জশীটের জন্য? আপনাদের তো অনেক মতা! আপনাদের কথায় পুলিশ লাঠি চালায় শিার্থীদের ওপর। সেই মতা এখানে কোথায় উধাও হয়ে যাচ্ছে? কেনো আপনারা বলছেন না, আমরা প্রফেসর ইউনুস হত্যার বিচার চাই? কোথায় বাধা? যদি বিচার চাইতে না পারেন, তাহলে জনগণকে বলুন, কোথায় আপনাদের কণ্ঠ আটকে যাচ্ছে? জানি, বলতে পারবেন না। বলবেন না। তাই তো বলছি, আপনারা অধ্যাপক তাহেরের হত্যার প্রোপট তৈরি করে দিয়েছেন।
উপাচার্য মহোদয় অ্যধাপক তাহেরের লাশের গাড়ির সামনে বিুব্ধ শিার্থীদের যেসব দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিলো, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, উপাচার্যের সেই আশ্বাস আর আসল কাজ- দু'টো হয়েছে দু'রকম। ওই রাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের তাপসী রাবেয়া হলের পেছনে কাটাতারের বেঁড়া কেটে 4 যুবক ঢোকার চেষ্টা করেছে। ছাত্রীরা বলছেন, গার্ডরা চেষ্টা করলে ধরতে পারতো। কিন্তু তারা ধরেনি। প্রভোস্ট বলেছেন, এর আগের বারের অভিজ্ঞতা থেকে শিা নিয়ে তিনি নাকি রাতে যাননি হলে। কী শিা নিয়েছিলেন প্রভোস্ট? 2004 সালের 30 অক্টোবর এই হলটিতেই গভীর রাতে অস্ত্রধারী পুরুষ ঢুকেছিলো। সেই নিয়ে আন্দোলনকারী শিাথর্ীদের ওপর পুলিশ চালিয়েছিলো নির্মম নির্যাতন। শিকদের ধরে পিটিয়েছিলো এই পুলিশেরা। প্রশাসনের নির্দেশেই চলেছিলো এই নির্যাতন। শিা যদি নিতেন তাহলে তো নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতেন। কিন্তু তা না করে কী শিা নিলেন তারা? শুধু নিজের গতর বাঁচানোর শিা? হাজারখানেক ছাত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকেন যে শিক, তার তো শিা নেয়া উচিত কীভাবে ছাত্রীদের নিরাপত্তা দেয়া যাবে সে বিষয়টি। কিন্তু আফসোস, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে উল্টো রাজার শাসন। এখানকার কর্মচারিরা রাজনৈতিক ক্যাডার। তাদের কিছু বলা যায় না। তারা শিার্থীদের হলের পানির লাইন কেটে দেয়ার হুমকি দেবার পরেও বহাল তবিয়তে চাকরি করে। কারণ এখানে শিকরা পদ পাবার খায়েশে রাজনৈতিক কর্মীতে পরিণত হন। এখানে গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমাতে ওইসব রাজনৈতিক ক্যাডার শিকরা শিার্থীদের ওপর হামলা চালান। অবরুদ্ধ এই ক্যাম্পাসে মৌলবাদীরা চালায় নীরব সন্ত্রাস। প্রশাসন দেখেও দেখে না। শিার্থীরা আসে, 5 বছর পড়াশোনা করে, নীরব সন্ত্রাস আরো নীরবে সয়ে একখানা সার্টিফিকেট হাতে ধরে বেরিয়ে যায়।
সুতরাং মতিহার সবুজ চত্বরের যে গৌরব আর অহঙ্কারের কথা আমরা রূপকথার মতো মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনি, সেসব কথামালা বিদায় নিয়েছে অনেক আগেই। এখন বিদায় নিতে শুরু করেছেন সেইসব গৌরব আর অহঙ্কারের রূপকাররা। ভীতিকর আর অস্বস্তিকর পরিবেশে এক অস্বাভাবিক প্রোপট গড়ে উঠেছে এখানে। এই প্রোপটে আরো ভয়ঙ্কর অনেক কিছুই ঘটতে পারে- এই সত্যটি যতোদিন প্রশাসন উপলব্ধি করতে না পারবে ততোদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিার্থীদের দাবি আদায়ের আন্দোলন চালাতে হবে। কেননা আন্দোলনই মুক্তির পথ দেখায়।

5ফেব্রুয়ারি 2006
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাসওয়ার্ড রিসেট করতে সমস্যা এবং ওয়েবসাইটে ক্যাপচা এরর (Invalid site key) সংক্রান্ত।

লিখেছেন চারাগাছ, ২৪ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৭:১৪


পাসওয়ার্ড রিসেট করতে সমস্যা এবং ওয়েবসাইটে ক্যাপচা এরর (Invalid site key) সংক্রান্ত।


প্রিয় সামু সাপোর্ট টিম,
আশা করি ভালো আছেন। আমি সামহোয়্যার ইন ব্লগের একজন নিয়মিত পাঠক ও লেখক। দীর্ঘদিন ধরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কালবেলার মুগ্ধতা থেকে নবকুমারের গ্ল্যামার দুনিয়ায়

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৪ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:৪০



সমরেশ মজুমদার আমার বরাবরই প্রিয় লেখকদের একজন। কৈশোর আর যৌবনের এক বড় অংশ জুড়ে তিনি ছিলেন আমার মনোজগতে। বই কিনে পড়া, পাড়ার লাইব্রেরিতে গিয়ে বই পড়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

সরকার যদি ৩% হারে লোন দেয় দেশের প্রতিটি বাড়ীর ছাতে সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা করলে বিদ্যুের কস্টের অনেকটাই কিছুটা সমাধান হইতে পারে।

লিখেছেন নতুন, ২৪ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:০৬


দেশে বর্তমানে Net Metering Guideline–2025 অনুযায়ী অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়া যায় এবং তা বিলের সঙ্গে সমন্বয় হয়। এটা খুবই ভালো একটা ব্যবস্থা, সরকারের উচিত এটাকে আরো উতসাহিত করা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

চিরবিদায়ে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় শায়িত ডা. খায়রুল ইসলাম – Regional Director for South Asian Countries, WaterAid UK

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৪ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:৫৪




২০ অগাস্ট ২০২৬, বৃহস্পতিবার রাতে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে ফিরে ঘুমাতে ঘুমাতে কিছুটা দেরি হয়ে গিয়েছিল। ফলে সকালে উঠতেও দেরি। আগের দিন দুপুরে বিদ্যুৎ এক ঘণ্টার জন্য চলে যাবার পর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আন্দোলনের সময় বেকারদের দরকার ছিল, এখন কি আর নেই?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:২০


সারজিস আলমকে দেখে একসময় মনে হয়েছিল, বাংলাদেশের রাজনীতিতে হয়তো সত্যিই নতুন কিছু আসতে যাচ্ছে। কোটা আন্দোলনের আইকনিক মুখ, গর্বিত ঢাবিয়ান, এনসিপির বড় নেতা। শেখ হাসিনার আমলে সকাল বিকাল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×