somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এক ফুটবল শিল্পী...

১৮ ই জুন, ২০১৪ রাত ১২:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ইতালি দেশটায় 'সৌন্দর্য্য' বিষয়টি বড়ই কদরের। আর 'শিল্প' বিষয় তাদের মাটির প্রতিটি কণায়। এই দুটি বিষয় যখন এক হয়ে যায় তখন এক 'অপরূপ সৃষ্টির' উদ্ভব হয়, যাকে হয়তো নামে প্রকাশ করা যাবে না। কখনো খেয়াল করেছেন এই 'অপরূপ সৃষ্টির' এক অংশ আমরা প্রায় প্রতিদিনই দেখি, যা একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ পা থেকে আসে। সেই মানুষটি আন্দ্রেয়া পিরলো।

মাত্র ১৬ বছর বয়সেই ব্রেসিয়ার হয়ে খেলা এই ডিপ লাইয়িং মিডফিল্ডার নজর কেরেছিলেন ইন্টার মিলান কোচ মিরসেয়া লুচেসুর, তাই দেরি না করে পিরলোকে সাইন করান তিনি। তবে প্রথম মৌসুমে পিরলো ছিলেন অনেকটাই নিজের ছায়া, তাই পরের মৌসুমে রেজিনায় লোনে পাঠানো হয় তাকে। এক মৌসুম নিজের প্রতিভার পরিচয় দিয়ে যখন আবার ইন্টারে ফেরেন তখন আবারো দলের প্রথম একাদশে জায়গা পেতে ব্যার্থ হন। তাই বাকি মৌসুমে আবারো লোনে ব্রেসিয়ায় কাটাতে হয় তাকে।

তবে এবার ছিল গল্পের টার্নিং পয়েন্ট, সতের মিলিয়ন ইউরোতে জয়েন করেন এসি মিলানে। মিলানই ছিল সেই ক্লাব যে একজন প্রতিভাবান খেলোয়ারকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ডিপ লাইয়িং মিডফিল্ডার ও বিশ্বসেরা সেট-পিস স্পেশালিস্ট হিসেবে তৈরি করে। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে দলের ছিলেন অপরিহার্য, তুলেছিলেন গোটা মিডফিল্ডের দায়িত্ব। কাকা-সিডর্ফ-ইনজাঘী ত্রয়ীর মতো ফরোয়ার্ডদের ফর্মের তুঙ্গে নিয়ে যেতে এক বিরাট অবদান রাখেন। আবার পাতো-রবিনহো-রোনালদিনহো দের সাফল্যেও তার বিরাট ভূমিকা ছিল। মালদিনি-কাফু-বোনেরাদের কাজ সহজ করে দেন হঠাত্‍ ডিফেন্সিভ খেলে। দলের হয়ে জেতেন দুটি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ, লিভালপুলের কাছে ২০০৫ সালের সেই মহাকাব্যিক ফাইনালে না হারলে সংখ্যাটা তিন হতে পারত। ২ বার করে সিরিআ ও সুপার কাপ জেতেন, একবার করে জেতেন কোপা ইতালিয়া, সুপারকোপা ও ক্লাব বিশ্বকাপ।

তারপর ২০১১ তে আসেন জুভেন্টাসে। মিলফিল্ড লিড করেন মার্চিসিও ও ভিডালকে নিয়ে। জুভেন্টাসের হয়ে প্রথম গোলটি করেন কাতানিয়ার বিরুদ্ধে ফ্রি-কিক থেকে। সেই মৌসুমে করেন মৌসুমের সবচেয়ে বেশি এ্যাসিস্ট ১৩ টি, জেতেন সিরিআ, ভিদালের সাথে ছিলেন সিরিআ বর্ষসেরা একাদশে। পরের মৌসুমে বেশ কিছু চোখ ধাঁধানো ফ্রি-কিক থেকে গোল করেন। টানা তিনবারের মতো নমিনেশন পান ফিফা ব্যালন ডি'অর এর। হন সিরিআ ফুটবলার অফ দ্যা ইয়ার। এবারো জেতেন সিরিআ ও সুপারকোপা। এই মৌসুমেও আছেন দারুন ফর্মে, সিরিআ জেতা তার জন্য সময়ের ব্যাপার।

ইন্টারন্যাশনাল লেভেলে তিনি যতটা ভালো খেলেছেন তা খুব কম খেলোয়ারই খেলতে পেরেছে। জাতীয় দলের হয়ে সবচেয়ে বেশি সফল ছিলেন ২০০৬ বিশ্বকাপে, যারা খেলা দেখেছেন তারা জানেন কি যাদুটাই না দেখিয়েছিলেন মাঠে। সেমি ফাইনালে স্বাগতিক জার্মানিকে হারিয়ে তার দল ওঠে ফাইনালে, একটি এ্যাসিস্ট করে সেই ম্যাচের সেরা খেলোয়ার ছিলেন তিনি। ফাইনালে ইতালি তার কর্ণারেই সমতা ফেরায়। সেই ম্যাচে একের পর এক নিখুঁত থ্রু পাসে ফ্রান্সের ডিফেন্সকে সব সময়েই রেড এ্যালার্টে রেখেছিলেন। হয়েছিলেন তৃতীয় বারের মতো ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ, জেতেন বিশ্বকাপ, পান ব্রোন্জ বল এবং করেন সবচেয়ে বেশি এ্যাসিস্ট। ২০১২ ইউরোতেও ছিলেন ইতালির অপরিহার্য অংশ। দলকে নিয়ে যান ইউরো ফাইনালে। আন্দ্রে ইনিয়েস্তার সাথে যৌথভাবে হন সর্বোচ্চ এসিস্টদাতা।

সত্যি বলতে এই ইতালিয়ান লেজেন্ড অন্যান্যদের মতো ওতটা গিফটেড ছিলেন না। ক্ষিপ্রতা, ফিজিক্যালিটি অথবা নোটেবল কোনো ডিফেন্সিভ অ্যাবিলিটি যেমন স্লাইড ট্যাকল বা মার্কিং এ্যাবিলিটি তার ছিল না। তবে টেকনিক, বল কন্ট্রোল, ড্রিবলিং, অসাধারণ ভিশন ও সৃজনশীলতা তাকে করে তুলেছে অতূলনীয়। হঠাত্‍ দেওয়া টাচ দিয়ে ছিন্নভিন্ন করতেন পুরো ডিফেন্ফিভ লাইনআপকে। আর তার ট্রেডমার্ক অ্যাকুরেট পাসিং জাবি আলোন্সো বা জেরার্ডের মতো শুধু লং পাসেই সীমাবদ্ধ না, থ্রু পাসেও আছে সেই যাদু। যখনই ডেড বলের সামনে দাড়ান, বিশ্বের সকল কিপারেরই বুকে ধরে যায় কাপন, মাঝে মাঝে সেই কাপনকে বন্ধ করে দেন দারুন সব বাঁকানো ফ্রি-কিকের মাধ্যমে। ইতালির খেলায় তিনি এতটাই চমত্‍কার সব পাস দিতেন যে পরে তার নাম রাখা হয় 'দ্যা আর্কিটেক্ট'। যুভেন্টাসে গিয়ে নাম পান 'দ্যা প্রফেসর' আর 'মোজার্ট'।

মার্সেলো লিপ্পি একবার বলেছিলেন, 'পিরলো একজন সাইলেন্ট লিডার, সে তার কথা পায়ের মাধ্যমে বলে। শুরুতে যে 'অপরূপ সৃষ্টির' কথা বলে ছিলাম তার জন্য দরকার ছিল 'সৌন্দর্য্য' আর 'শিল্প'। ইতালিয়ানরা ফুটবলকে অনেক আগেই 'শিল্প' বানিয়ে ফেলেছিল, বাকি দরকার ছিল সেই 'সৌন্দর্য্য', যা যাদুর মতো বের হতো পিরলোর পা থেকে। তৈরি করেন সেই 'অপরূপ সৃষ্টি' যা কোটি কোটি মানুষ মনে রাখবে রূপকথার আকারে।

আর সেই রূপকথার নায়ক, আন্দ্রেয়া 'দ্যা ম্যাজিশিয়ন' পিরলো।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জুন, ২০১৪ রাত ১২:১৫
৬টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি আসলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৪



“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন “, “মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়” – এসব প্রচারণা আমাদের দেশে অনেকদিন ধরেই হয়ে আসছে। বিশেষ করে ফেসবুকে আকছারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ঃ নদী-নালায় ভেসে থাকা স্বদেশের কান্নাঃ শহীদদের প্রতি নিবেদিত একটি কাব্যগাথা জাতির রক্ত, অশ্রু ও স্বাধীনতার অমর ইতিহাস

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:০৫


পঁচিশে মার্চ ১৯৭১
রাত্রি তখন গভীর, নগরীর বাতিগুলো
যেন অনাগত বিপদের সামনে অসহায়
ঢাকার আকাশে হঠাৎ গর্জে উঠল কামান
ট্যাংকের চাকার নিচে কেঁপে উঠল রাজপথ
গুলি ছুটে গেল মানুষের ঘুমন্ত জানালায়
আগুন ছড়িয়ে পড়ল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×