জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের মধ্যে নানা বিষয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছে। দলের একটি অংশের নেতারা চাইছেন, একাত্তরের ভূমিকার কারণে বর্তমান নেতৃত্ব সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে যাক। এই অংশটি দলে অপেক্ষাকৃত উদারপন্থী। এই অংশের নেতারা মনে করছেন, ধর্মীয় নানা শর্ত শিথিল করে সবার জন্য জামায়াতকে উন্মুক্ত করা উচিত। তবে কট্টর অংশের নেতারা এর সঙ্গে একমত নন।
জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষস্থানীয় চার নেতার বিরুদ্ধে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার-প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ অবস্থায় দলের ভেতরে মান-অভিমান, দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ঘটনায় জামায়াতের নেতারা উদ্বিগ্ন। তবে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, এ আশঙ্কায় গণমাধ্যমের সঙ্গে এসব নিয়ে কথা বলতে চান না জামায়াতের নেতারা।
জামায়াতের একাধিক নেতা প্রথম আলোকে জানান, এ বছরের শুরুতে দলের নির্বাহী কমিটির একাধিক সদস্য কমিটির বৈঠকে একাত্তরে ভূমিকার কারণে ক্ষমা চাওয়া এবং একাত্তরে নেতিবাচক ভূমিকা নেই, এমন লোকদের নেতৃত্বে আনার প্রস্তাব দেন। তবে এই মতের বিরোধিতা করেন আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদসহ অনেকে। জামায়াতের যেসব নেতা এমন প্রস্তাব তুলেছিলেন, তাঁদের কটাক্ষও করা হয় বৈঠকে। পরে এ নিয়ে আর কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কিন্তু যাঁরা এমন প্রস্তাব তুলেছিলেন, তাঁদের নিয়ে জামায়াতের ভেতরে নানা সন্দেহ মাথাচাড়া দিয়েছে।
এ টি এম আজহারকে ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি করা নিয়ে বিরোধ: গত ২৯ জুন জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ গ্রেপ্তার হন। ওই রাতেই নায়েবে আমির মকবুল আহমাদ ভারপ্রাপ্ত আমির, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আজহারুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল নিযুক্ত হন। আজহারের এই নিয়োগ নিয়ে দলে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলদের মধ্যে আজহারের ওপরে ছিলেন মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লা। আমির ও সেক্রেটারি জেনারেলের গ্রেপ্তারের পর দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির বৈঠকে এক নেতা এ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তখন এ বিষয়ে নিজামীর লেখা চিঠি দেখিয়ে ওই নেতাকে শান্ত করেন অন্যরা।
নির্বাহী কমিটির তিন সদস্য নিষ্ক্রিয়: জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের ১৬ নেতার মধ্যে পাঁচ নেতা এখন কারাগারে। একজন আত্মগোপনে। আরও দুই প্রভাবশালী নেতা পরিষদের বৈঠকে যাচ্ছেন না। তাঁদের একজন মীর কাসেম আলী। অন্য একজন তাঁর নাম প্রকাশ না করতে প্রথম আলোকে অনুরোধ করেছেন। নির্বাহী কমিটির আরেক সদস্য আবদুর রাজ্জাকও দলীয় রাজনীতিতে অতটা সক্রিয় নন।
দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুজিবুর রহমান বলেন, দলে কোনো কোন্দল নেই। সবাই সব বৈঠকে থাকবে, এটা জরুরি না।
জামায়াতের নির্বাহী কমিটির একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, ‘জামায়াতকে নিয়ে আমি ব্যস্ত নেই। আমি আমার কাজ নিয়ে থাকি। তবে মেহেরবানি করে আমি চাই, আমার নাম করে যেন প্রথম আলোতে কোনো সংবাদ প্রচার না হয়।’
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করার দায়িত্বে থাকা নির্বাহী কমিটির এক সদস্যকেও সম্প্রতি দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওই নেতাকে নিয়ে দলের মধ্যে সন্দেহ-অবিশ্বাস দেখা দিয়েছে। জামায়াতের অনেক নেতা সন্দেহ করছেন, ওই নেতা সরকারের সঙ্গে যোগসাজশ করে চলছেন। একাত্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করার অভিযোগ থাকলেও সম্প্রতি একজন মন্ত্রী ওই নেতার সম্পর্কে সাংবাদিকদের বলেছেন, অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের তালিকায় তাঁর নাম নেই। এ নিয়ে জামায়াতের ভেতর নানা প্রতিক্রিয়া হয়।
মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে গোপন বৈঠক: প্রায় বছর খানেক আগে পল্টনে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির তিন সদস্য কামারুজ্জামান, মীর কাসেম আলী ও আবদুর রাজ্জাকের উপস্থিতিতে বিশেষ বৈঠক হয়। বৈঠকে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের অনেক সদস্যও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে জামায়াতকে আরও গণমুখী করার বিষয়ে কাসেম আলী একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সূত্র জানায়, ওই বৈঠকে অংশগ্রহণকারী নেতারা আলোচনা করেন, যেহেতু জামায়াতের বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতাসহ নানা অভিযোগ আছে, তাই তাঁদের সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে যাওয়া উচিত। আর জামায়াতকে অপেক্ষাকৃত উদার দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা উচিত, যাতে অন্য দলের নেতা-কর্মীরাও এতে যোগ দিতে পারেন।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী কেউ চাইলেই জামায়াতে যোগ দিতে পারেন না, নানা নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হয়। জামায়াতের একাংশের নেতারা মনে করেন, এসব কঠোর নিয়ম-কানুনের জন্য এত দিনও জামায়াত গণমুখী দলে পরিণত হতে পারেনি। এ জন্য জামায়াতের নীতি পরিবর্তন করা জরুরি।
এই বৈঠকের খবর ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর বৈঠকে অংশ নেওয়া অনেক নেতাকে তিরস্কার করেন দলের বর্তমান নেতারা। জানতে চাইলে জামায়াতের কর্ম পরিষদের সদস্য সাংসদ হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, এসব ব্যক্তিগত চিন্তা। দলের সিদ্ধান্তে এসবের কোনো প্রভাব নেই।
মীর কাসেম আলীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


