অনেকদিন পর বাড়িতে আসলাম। প্রচন্ড গরমে সন্ধ্যা হতেই বিদ্যুৎ মহাশয় লুকোচুরি খেলা আরম্ভ করেছেন। তীব্র দাবদাহ থেকে রক্ষা পেতে উঠোনে মাদুর পেতে শুয়ে আছি। মাঝে মাঝে ঝিরি-ঝিরি দখিনা বাতাস এসে শরীর-মন জুড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে। মাথার ওপরে অসীম আকাশে তারাগুলি মিটিমিটি জ্বলছে। মিটিমিটি জ্বলতে থাকা তারাগুলো হঠাৎ করে ফিরিয়ে নিয়ে গেল সেই ছোট বেলার বৈশাখ-জৈষ্ঠ্যের দুরন্ত দিনগুলিতে। কি অসাধারণ স্বপ্নময় ছিল একেকটা দিন। বৈশাখের শুরুতে গাছের আমগুলো একটু একটু করে বড় হতে থাকত। নিজের ছুরি ছিল না, তাই ঝিনুক কুড়িয়ে সেটি টিউবয়লের শক্ত শানে ঘষে ঘষে পেছন পাশ ছিদ্র করে কাঁচা আম কাটার উপযোগী করে তুলতাম। এরপর থেকে পুরো বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য জুড়ে ইংলিশ হাফ প্যান্টের পকেটে একছত্র আধিপত্য থাকত সেই ঝিনুকের। সেই সময় বৈশাখ আসতেই স্কুল শুরু হতো ভোরে এবং সকাল ১২ টার মধ্যে স্কুল ছুটি হয়ে যেত। স্কুল থেকে ফিরে ব্যাগটি কোনোমতে বারান্দায় রেখে, রান্না ঘর থেকে কাঁচা লবণ কাগজে মুড়িয়ে নিয়ে ছুটে যেতাম আম বাগানে। দল বেঁধে বাগানে ঘুরে ঘুরে আম কুড়াতাম আর ঝিনুক দিয়ে কেটে গলাধকরণ করতাম। আমাদের বাগানে একটা গাছের আম মিষ্টি ছিল। সেই গাছের আম পেড়ে সেটি কেটে খেতে খেতে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি। এমন সময় সামনে দুই তিন জন সমবয়সী হাজির। এখন ওদেরকে আমের ভাগ যাতে না দিতে হয় এজন্য আম মুখে নিয়ে এমন টকের ভাব করলাম যে, ওরা বলেই ফেলল তোর এই টক আম খাবো না, যাই মিষ্টি আম কুড়িয়ে নিয়ে আসি। আম খেতে খেতে চলে যেতাম আমাদের বড় পুকুর পাড়ে। পুকুর পাড়ে গিয়ে অনেকসময় কাঁচা মরিচ যোগাড় করে সেটি দিয়ে আম মাখিয়ে খেতাম। আম খাওয়ার পর স্নানের পালা। দল বেঁধে পুকুরে নেমে পড়তাম। যে যত জল ঘোলা করতে পারবে তার স্নান ততটাই মধুর। এর সাথে ছিল ঘোলা জলে স্নান করতে করতে মুখের ওপরে কাদা লেপটে গোপ হয়ে যাওয়া। এভাবে স্নান সেরে চোখ লাল করে বাড়িতে হাজির। মায়ের মধুমাখা ব্যবহার সাথে নিয়ে দুপুরের খাওয়া শেষে ঘুমানোর পালা। মা ঘুম পাড়িয়ে রেখে যেতেন আর আমি ঘুমের ভান করতাম। মা পাশ থেকে চলে যেতেই ভো দৌড় আম বাগানে।আম বাগান ঘুরে বিকেলের দিকে উঠে যেতাম তাল গাছের রস খেতে। তালের রস খেলে খুব ঘুম আসে তাই সন্ধ্যা বেলা পড়তে বসলেই ঘুম বাবাজির আগমন। আর সাথে মায়ের হাতের পিঠে পড়া ধুমধাম আওয়াজ।জৈষ্ঠ্য মাসে আম পাকার সময় আসলে সন্ধ্যায় উঠোনে পড়তে বসেলও কানটা খাড়া থাকত। আম পড়ার শব্দ হলেই একসাথে তিন-চারজন লাইট নিয়ে ভৌ দৌড়। পাকা আম যে কুড়িয়ে পেত তার মুখে রাজ্যের হাসি। আবার ভোরবেলা উঠে আম কুড়ানোর প্রতিযোগিতা। আর ঐ সময় গ্রীষ্মকালীন অবকাশ থাকায়, অনেকগুলো কাজিন চলে আসত আমাদের বাড়ি। ফলে প্রত্যেকটা দিন নতুনের আবাহন নিয়ে হাজির হতো। গাছ পাকা কাঠাল খেতে হবে কিন্তু কাঠাল আর পাকে না। অগত্যা গাছে উঠে কাঠাল মুচড়িয়ে রেখে আসতাম এবং কয়েকদিন পরে ঠিকই পেকে যেত। পাকলেই গাছ থেকে পেড়ে উদরপূর্তি সারা। আমাদের কয়েকটা লিচু গাছ ছিল। লিচু রক্ষার জন্য আমার সেজ কাকা গাছের গোড়ায় কাটা দিয়ে রাখত এবং গাছের ওপরে মাচা করে ঘুমাতো। একদিন সন্ধ্যাবেলা কাকা বাজারে আমরা ঠিক করলাম লিচু চুরি করব। লিচু মোটামুটি পাড়া শেষের পথে। এমন সময় দেখি কাকা আসছে লাইট নিয়ে। গাছ থেকে নেমেই দৌড় অন্য দিকে। দূরে গিয়ে লিচু খেয়ে বাড়িতে এসেছি। খুব খুশি, কারণ কাকা লিচু চোর ধরতে পারে নি। কিন্তু বিপত্তি ঘটল পরের দিন। সকাল বেলা কাকা লিচু গাছের নিচে একজোড়া স্যান্ডেল খুঁজে পেল। খোঁজ নিয়ে জানা গেল স্যান্ডেল জোড়া আমার। এই খবর শোনার পর ভয়ে বাড়ি আসি না কারণ কাকার মারের খুব ভয় পাই। অবশেষে বিকেলে পাকড়াও হলাম, শুরু হলো উত্যম মধ্যম। চুরি করে নিজেদের গাছের লিচু খাওয়ার ভাবনা চিরতরে উধাও। এখন যখন উঠোনে বসে লিখছি আমার কাকা পাশে বসে আছেন। লিখছি আর ভাবছি, আবার যদি সেই দিনগুলি ফিরে পেতাম, আবার যদি লিচু চুরির দায়ে কাকার হাতের মার খেতে পারতাম! কিন্তু তা আর হবে না, কারণ কাকার ভাইপো এখন বড় হয়ে গেছে, সে এখন চাকরি করে…সত্যি কি বড় হয়ে গেছি!
আবার যদি লিচু চোর হতে পারতাম!
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই এপ্রিল, ২০১৬ রাত ১০:৩২
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
শুধু উপবাস নয়, আত্মশুদ্ধি অর্জনই রোজার মূল উদ্দেশ্য
শুধু উপবাস নয়, আত্মশুদ্ধি অর্জনই রোজার মূল উদ্দেশ্য

সারসংক্ষেপ
রমজানের রোজা ইসলামের অন্যতম মৌলিক ইবাদত। সাধারণ মুসলিম সমাজে রোজা ভঙ্গের ধারণা প্রধানত পানাহার ও যৌন সংসর্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ কুরআন,... ...বাকিটুকু পড়ুন
ভ্রমণব্লগ: আলোছায়ার ঝলকে এক অপার্থিব যাত্রা”
মালয়েশিয়া আমার বেশ পছন্দের একটি দেশ। আমার জীবনের একটি অংশের হাজারো স্মৃতি এই দেশে। একটা সময় ছিল যখন এই দেশ ছিল আমার সেকেন্ড হোম। এখন ও আমার আত্নীয়-স্বজন, ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধবের... ...বাকিটুকু পড়ুন
Will you remember me in ten years!

উপরের ছবিটি ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে একজন ব্লগার তার এক পোস্টে দিয়েছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন দশ বছর পর কেউ তাকে মনে রাখবে কিনা!! গতমাসে এই পোস্ট যখন আমার নজরে এলো, হিসাব... ...বাকিটুকু পড়ুন
মানুষ

মানুষ আসলে কী?
Sophies Verden কেতাবে নরওয়েজিয়ান ইয়স্তেন গার্ডার (Jostein Gaarder) এক বিশাল বয়ান পেশ করেছেন ছোট্ট মেয়ে সোফির জীবনের গল্প বলতে বলতে। নীতি-নৈতিকতা, জীবন-জগৎ, সৃষ্টি নিয়ে সোফির ধারণা ছিলো... ...বাকিটুকু পড়ুন
শোনো হে রাষ্ট্র শোনো
নিশ্চল শহরে আজ ক্ষুধারা হাঁটে পায়ে পায়ে
ফুটপাথে শুয়ে রয় ক্ষুদার্ত মুখ।
চালের বস্তার সেলাই হয়নি ছেড়া,
রুটির দোকানে আগুন ওঠেনি জ্বলে।
ক্ষুদার্ত আধার জাপটে ধরে আষ্টেপৃষ্টে।
আমার চোখ লাল, ভেবো না নেশায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।