দুদক জানে না ‘কী করিতে হইবে’ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান অবশেষে স্বীকার করেছেন, দুদকের একার পক্ষে দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব নয়। কার অভাব তিনি বোধ করছেন, তা তাঁর কথা থেকেই আমরা বুঝে নিতে পারি। তিনি আরও বলেছেন, ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছাই দুর্নীতি দমনে প্রধান ভূমিকা রাখতে পারে।’ সেই সদিচ্ছা যেমন একালেও নেই, সেকালেও ছিল না। সেকাল মানে বিগত আমল। সেই আমলে ‘ক্ষমতাসীনেরা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এ সংস্থাকে ব্যবহার করত’। সেকালে সংস্থাটির রাজনৈতিক ব্যবহার হতো, একালে কী হয় তার উত্তর আমরা দুদক চেয়ারম্যানের কাছে পাব না। এর উত্তর দিতে পারেন মাননীয় অর্থমন্ত্রী।
দুদকের মামলার আসামি, হল-মার্কের এমডি তানভীর মাহমুদকে জামিন দিয়ে জেল থেকে বের করার কথা বলেছিলেন অর্থমন্ত্রী। পরে ‘সমঝোতা হয়নি’ বলে তাঁর কথার ফাঁকি ঢাকতে তাপ্পি লাগিয়ে দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি। কথা বদলালেও কাজ বদলায় না। তানভীর জোচ্চুরির মাধ্যমে কোটিপতি হওয়ার সহজ-সংক্ষিপ্ত উপায় করে নিয়েছিলেন, আর অর্থমন্ত্রী জোচ্চোরকে ধুয়ে মাসুম বানানোর ভোজবাজি শেখাচ্ছেন। নিজ নিজ ক্ষেত্রে উভয়েই অভূতপূর্ব। কোনো অর্থমন্ত্রী এমন সাফাই গাইতে পারেন, জানা ছিল না। তবে তিনি এক কথার মানুষ।
গত বছর হল-মার্কের দুর্নীতির কেলেঙ্কারি-বোমা সশব্দে ফাটলে তিনি বলেছিলেন, এগুলো ‘রাবিশ’ কথা। ‘চার হাজার কোটি টাকা বড় অঙ্কের অর্থ নয়’, এ রকমটা নাকি হয়েই থাকে ইত্যাদি। হল-মার্কের ল্যান্ডমার্ক দুর্নীতিও তাঁর কাছে যথেষ্ট মনে হয়নি, তিনি তাদের আরও টাকা দিতে চান। আগেকার যুগে চোরদের কেবল চুরি বিদ্যা জানলেই চলত না, ধরা না পড়ার ব্যবস্থাও করতে হতো। এখন সেই ব্যবস্থা করে দেন বিদ্বান অর্থমন্ত্রীরা। কিন্তু দুদক এখন কী করবে? হল-মার্কের চুরি করা টাকা উদ্ধারে যদি তানভীরকে জেল থেকে বের করতেই হয়, যদি তাদের আরও ঋণ দিতে হয়, তাহলে তো দুদকের নাকে খত দিয়ে মামলা প্রত্যাহার করা উচিত! গায়েন এক সুরে গাইবেন-বাজাবেন, আর সারিন্দা অন্য সুরে বাজবে; তা তো হতে পারে না।
অর্থমন্ত্রীর যুক্তিটি হলো: টাকা উদ্ধারে দরকার কারখানা চালু। আর সে জন্যই ওদের দরকার আরও ঋণ। তিনি আরও বলেছেন, ‘আমরা তাদের জামিন দিয়ে দেব, এতে জনগণের অর্থ ফেরত পাওয়া সহজ হবে।’ অর্থাৎ, চোরকে জামাই আদর করলেই চোর ভালো হয়ে যাবে। অদ্ভুত শোনালেও এই যুক্তিতেই তো চলছে সাধের বাংলাদেশ। অপরাধীর দায়মুক্তি, দুর্নীতিবাজদের প্রশস্তি আর খুনিদের ছাড়পত্র দেওয়াই এখানকার শাসনতরিকা। দুর্নীতি দমন তো দূরের কথা, ঘটে যাওয়া দুর্নীতির বিচারও কেন অসম্ভব হয়, মাননীয় অর্থমন্ত্রী সেই তরিকাই হাতে-কলমে বোঝাচ্ছেন। কিন্তু আমাদের এই বোঝাবুঝিকে ক্ষমতাসীনেরা কানাকড়িও দাম দেন না। বিরোধী দলের কাছেও এগুলো গলাবাজির ইস্যু, আন্দোলনের ইস্যু নয়। ঋণের দায়ে এ দেশে কোমরে দড়ি অথবা গলায় ফাঁস লাগে কেবল কৃষকের; কোটিপতি খেলাপিদের গলায় পড়ে ফুলমালা। তাঁদের কেউ কেউ বিভিন্ন সময়ের সেরা উদ্যোক্তা, সেরা ব্যবসায়ী কিংবা সেরা ‘দেশপ্রেমিক’ খেতাবেও ভূষিত হন।
হল-মার্কের দুর্নীতি জানা কথা, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের আলামত স্পষ্ট, ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কিংবা এ-জাতীয় আরও অজস্র বৃহৎ প্রকল্পের দুর্নীতির কথা গুলিস্তানের ভিড়ে কান পাতলেই শোনা যায়। কিন্তু কেন ও কোন দায়ে পড়ে মন্ত্রীরা এসবের সাফাই গান, সেই আলোচনা ঘরে হয়, বাইরে বলায় ভয়। তানভীর মাহমুদের ঋণ তছরুপ, পদ্মা সেতুর অনিয়ম, শেয়ারবাজারে মহা জোচ্চুরি ইত্যাদি ঘটনা যদি কতিপয় ধুরন্ধরের একার হাতের কাজই হবে, তাহলে এক হাতের হাততালিও হতে পারে। তালি দুই হাতেই বাজে, তবে অপর হাতটি জনমানুষ দেখতে পায় না। সেই হাতের কাজ লুকাতেই তানভীরের বা আবুল হোসেনের বা এ রকম কারও বিচারের দাবিকে প্রহসনে পরিণত করা হয়। এভাবে অকার্যকর দুদকও প্রতিষ্ঠান হিসেবে রওনা হয় অন্তিম যাত্রায়। দুর্নীতি দমনের সব প্রতিশ্রুতির সমাধিলিপি হিসেবে ‘ওদের দরকার আরও ঋণ’ কথাটার কোনো জুড়ি নেই।
অথচ দরকার ছিল ‘ওদের’ সমুদয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে লোপাট হওয়া কোটি কোটি টাকা উদ্ধার করা। আরও ঋণ মানে আরও ছাড়, আরও ছাড় মানে জনগণের অর্থ চুরি করে একজন জোচ্চোরকে ধনকুবের বানানো। বাংলাদেশে ব্যক্তিগত, দলীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাটের আয়োজন যে রাষ্ট্রীয় লুটপাটেরই অংশ, স্বয়ং অর্থমন্ত্রীর কথা ও কাজ এবং দুদকের ব্যর্থতা তারই প্রমাণ। এ লোপাটের খেলায় দুদকের ভূমিকা অসৎ ভাষ্যকারের। এ ভাষ্যকার নিজে দুর্নীতি দেখতে পায় না, সংবাদপত্র বা অন্য কেউ দেখিয়ে দিলে বলে, দেখি নাই। সুতরাং, লুটপাটবান্ধব বাংলাদেশে যে ধরনের দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠান থাকা দরকার, সে রকমটাই আছে। দুদক ও লুটপাট দুজন দুজনার।
দুদক গত সোয়া চার বছরে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিক দুর্নীতির অনেক মামলা করে রেখেছে। সেগুলোর একটি ছাড়া কোনোটিই সাফল্যের মুখ দেখেনি। তারা সিঙ্গাপুর থেকে পাচার হওয়া কোকোর টাকার কিয়দংশ ফেরত আনতে পেরেছে। অথচ এ কৃতিত্বও দুদকের নয়। টাকা পাচারের ঘটনা ধরেছে এবং ফেরতের ব্যবস্থা করেছে বিদেশিরা। সরকারের ভূমিকা কেবল ঘটনাটিকে বিরোধী দলকে ঘায়েল করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আর মামলাটিও করেছিল বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের দুদক। এর পেছনে রাজনৈতিক অভিপ্রায় থাকা সম্ভব। যেমন তানভীর মাহমুদ বা আবুল হোসেনদের দুর্নীতির নিরপেক্ষ তদন্ত না হওয়ার কারণটিও রাজনৈতিক। আমার দুর্নীতি চোখের কাজল, তোমার দুর্নীতি চক্ষুশূল হলে তো চলবে না। দুর্নীতির বিচার যখন রাজনীতিকীকরণ হয়, তখন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুদক মাজার জোর বা মনের জোর সবই খুইয়ে ফেলে।
এভাবে একদিকে রাজনৈতিক ক্ষমতার চাপ-তাপ দুদককে ব্যর্থ করে; অন্যদিকে বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা দুর্নীতির বিচারের সব প্রচেষ্টাকে কানাগলিতে ঢোকায়। মামলার বিচার হতে অনেক বছর লেগে যায়। ১৯৯৬ সালের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি একজন ঋণখেলাপিকে বিলিয়নিয়ার রাজনীতিক বানিয়েছে; অন্যদিকে অনেককে বানিয়েছে পথের ফকির। কিন্তু ১৭ বছর পেরিয়ে গেল, কেউ কথা রাখেনি, কারও সাজা হয়নি। কারণ, বিচার সমাপ্ত হয়নি। ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ আমলের শেয়ার-কেলেঙ্কারির বিচার হলে এবারের আওয়ামী লীগ আমলে একই লোকের দ্বারা একই ঘটনা আবারও ঘটতে পারত না। আওয়ামী লীগ আমলেই কেন শেয়ার মার্কেটে কেয়ামত লেগে যায়, সেটাও এক প্রশ্ন বটে। তাই দুদকের বহুল আলোচিত বর্তমানের মামলাগুলো কোথায় হারিয়ে যাবে, তা কেউ বলতে পারে না। দুর্নীতির মামলার কাগজপত্র আদালতের মহাফেজখানায় কীটপতঙ্গের খাদ্য হয়, ন্যায়বিচারের দলিল হয়ে ওঠে না।
বাংলাদেশের দুর্নীতি চলতে পারার একটি বড় কারণ নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি প্রতিষ্ঠান চালানোর মতো শক্ত লোকের অভাব। যাঁরা সত্যিকারভাবে দুর্নীতির দমন চান, তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয় না। যাঁরা এখানে নিয়োগ পান, তাঁরা বশংবদ বনে যান। যেসব কর্মকর্তা, কর্মচারী ও আইনজীবী নিয়োগ পান, তাঁদের অধিকাংশই অদক্ষ। অদক্ষতা সুবিধাবাদ সৃষ্টি করে। সুবিধাবাদীরা তখন দুর্নীতি ঠেকানোর চেয়ে দুর্নীতিবাজদের ইনামের প্রতি বেশি শ্রদ্ধাশীল হন। এসব কারণেই দুদকের মামলা সাক্ষ্য-প্রমাণ বুড়ির ঘরের চালের মতোই ছিদ্রময়।
এগুলো সবই উপসর্গ। আসল অসুখ আমাদের রাজনীতি ও রাষ্ট্রচরিত্র। পুরো ব্যবস্থাটিই দাঁড়িয়ে আছে দুর্নীতির ওপর। দুর্নীতি দমন মানে নিজের পায়ে কুড়াল মারা। আসল ঘটনা হলো ওই সরকার; যারা সবই জানে, বুঝে কিন্তু কিছুই করে না। নিজের ঘরে কে আর জেনেশুনে আগুন লাগায়? তারা জানে, দুদক শক্তিশালী হলে, স্বাধীন হলে সেখানে সাহসী, সৎ প্রশাসক নিয়োগ করলে এবং তাঁরা পদ ও প্রতিপত্তি না দেখে দুর্নীতিবাজ ধরা শুরু করলে বর্তমান ধারার রাজনীতিও অচল হয়ে যাবে। দেশের বহু ক্ষমতাবান ও সেলিব্রিটি মানুষজনকে তখন আর টেলিভিশনে দেখা যেত না, তাঁদের দেখতে হতো গরাদের ফাঁক দিয়ে। পুরো ব্যবস্থার মধ্যেই তখন বিরাট ওলটপালট ঘটে যেত। দুর্নীতি দমনের আত্মঘাত তাই কেউ করবে না।
সুতরাং, রাজনৈতিক ব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা এবং ব্যাংক-ব্যবস্থার প্রধান কাজ হলো জনগণের অর্থ ও সম্পদ কোটিপতি শ্রেণীর হস্তে সমর্পণ করার মিহি বন্দোবস্ত করা। আশির দশকে যাঁরা সরকারি ব্যাংকের ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই এখন বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালক পদ অলংকৃত করে আছেন। অর্থনীতির নীতি নির্ধারণে তাঁদের ভূমিকা ব্যাপক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক মইনুল ইসলাম জানাচ্ছেন, ‘তারকা খেলাপির অনেকেই এখন রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে বিভিন্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান বা পরিচালক হিসেবে আবারও ক্ষমতা দেখাচ্ছেন’ (প্রথম আলো, ৮ জুলাই ২০১২)। চোরাচালানই ছিল ওই ৩১ তারকা খেলাপির প্রধান ব্যবসা। এ ব্যবসার অর্থায়ন হয়েছে রাষ্ট্রীয় ঋণে। কী ভয়ানক এবং কী মর্মান্তিক! দুর্নীতি থাকলে তাই চোরাচালান থাকবে, কালোবাজারি থাকবে, সন্ত্রাস-গডফাদার-মাফিয়াতন্ত্র থাকবে, রাজনীতি সহিংস হবে, সহিংস রাজনীতি আর লুটপাটের অর্থনীতি মানুষের জীবন নেবে, দেশের ভবিষ্যৎ খেয়ে ফেলবে। তারপর একদিন তাঁরা পগারপার হবেন দূর বিদেশে। তাঁদের সঙ্গে জনগণের আর হবে নাকো দেখা!
এই মহাপ্রলয়ের কাহিনিতে দুদক কখনো বিবেক, কখনো দর্শক মাত্র। আর জনগণের ভূমিকা? আসুন, শিয়াল পণ্ডিতের পাঠশালার গল্পটি আবার পাঠ করি। আমরা এমনই কুমির, আমরা বারবার ঠেকি কিন্তু শিখি না।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


