আওয়ামী লীগ নির্বাচনে যাচ্ছে না। বুধবার (3 জানুয়ারি) সকালেই (লন্ডন সময়) জানলাম, সিদব্দানস্নটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের এ সিদব্দানস্ন মহাজোট মেনে নিয়েছে। জাতীয় পার্টি তো (এরশাদ) আগেই ঘোষণা দিয়েছিল, তারা নির্বাচনে যাবে না। লিবডেমও আগেই বলেছিল, সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ দেশে তৈরি হয়নি। শেখ হাসিনার নির্বাচনে না যাওয়ার সিদব্দানস্ন ঘোষণার সময় লিবডেম, জাতীয় পার্টি এবং বাম দলগুলোর নেতারাও তার পাশে উপস্টি্থত ছিলেন। সুতরাং বলা চলে নির্বাচনে না যাওয়ার সিদব্দানস্নটি শুধু আওয়ামী লীগের একার নয়, এটা বিএনপি-জামায়াত ছাড়া দেশের ডান-বাম সব দলের। এবারের আন্দোলনে শেখ হাসিনার সব অসাফল্যের মধ্যে এটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য, তিনি মহাজোটের ঐক্য ধরে রাখতে পেরেছেন এবং দেশের রাজনীতিতে বিএনপি-জামায়াতকে একেবারে একঘরে করে ফেলেছেন।
নির্বাচনে না যাওয়ার সিদব্দানস্ন জানানোর সঙ্গে সঙ্গে মহাজোট নির্বাচনে যাওয়ার ক্ষেত্রে যে শর্তগুলো ঘোষণা করেছে, তার পেছনে যে দেশবাসীর পহৃর্ণ সমর্থন রয়েছে তা এবারের প্রতিটি আন্দোলনে প্রমাণিত হয়েছে। তাছাড়া এই দাবিগুলো না মানা হলে বাংলাদেশে সুষ্ঠু, স্ট্বচ্ছ ও অবাধ নির্বাচন কিছুতেই হতে পারে না। মহাজোট এবার ভোটার তালিকা সংশোধন, নির্বাচন তফসিল পুনঃনির্ধারণ, নির্বাচন-প্রশাসন সমঙ্হৃর্ণ নিরপেক্ষ করা, এরশাদ ও যেসব প্রার্থীর মনোনয়ন অন্যায়ভাবে বাতিল করা হয়েছে, তা পুনর্বিবেচনা করাসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষদ্বার পদ থেকে ইয়াজউদ্দিনের ইস্টস্নফা প্রদানের দাবি দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন।
আমার মতো ক্ষুদ্র বুদব্দির লোকের মতে, ইয়াজউদ্দিন যখন বিএনপি'র নির্দেশে অসাংবিধানিকভাবে প্যালেস কু্য-এর দ্বারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষদ্বার পদটি দখল করেন, তখনই তাকে মেনে নিয়ে এক ধরনের বৈধতা দান করা ছিল চৌদ্দ দলের সবচেয়ে বড় ভুল। এই কথাটা আমার কলামে তখনই আমি লিখেছি। নির্বাচন কমিশন থেকে আজিজ, জাকারিয়া বা মোদাবি্বর হটাও আন্দোলনের চেয়ে ইয়াজউদ্দিন হটাও আন্দোলন করাই ছিল তখনকার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। বিএনপি'র চত্রক্রানস্নের ফেদ্ধমওয়ার্কে আজিজ, জাকারিয়া, মোদাবি্বর চুনোপুঁটি, রাক্ষস চত্রেক্রর আসল প্রাণভোমরা তখন ইয়াজউদ্দিন। তাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে মেনে নেওয়া ছিল চৌদ্দ দলের সুইসাইডাল পলিসি। তাকে মেনে নেওয়ার অর্থই ছিল এই বৃদব্দ শিখ-ীর আড়ালে দেশে বিএনপি-জামায়াতের যে শাসন ও অদৃশ্য সরকার (রহারংরনষব মড়াবৎহসবঃ) কায়েম রয়েছে তাকে মেনে নেওয়া এবং সেই সরকারের ইলেকশন মেকানিজমের খৰের নিচে স্ট্বেচ্ছায় মাথা পেতে দেওয়া।
যা-ই হোক, শেষপর্যনস্ন বঙ্গভবনে অধিষ্ঠিত সিন্দবাদের এই বিবেক ও সততাবর্জিত বৃদব্দ দৈত্য সমঙ্র্কে মহাজোট যে সচেতন হয়েছে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষদ্বার পদ থেকে তার সরে যাওয়ার ইসু্যটিকে অন্যতম প্রধান দাবি করেছে_ এটা আশার কথা। আরো একটি আশার কথা, চৌদ্দ দল_ বিশেষ করে আওয়ামী লীগ হাই কমান্ড বুঝতে পেরেছে আন্দোলন ছাড়া কেবল আপস ও পশ্চাৎপসরণের নীতি দ্বারা তারা ইপ্সিত লক্ষ্যে পেঁৗছাতে পারবেন না। এখন নির্বাচন থেকে সরে গিয়ে দাবি আদায়ের জন্য তাদের হাতে একমাত্র হাতিয়ার রইল আন্দোলন। এ আন্দোলন যদি তারা সঠিকভাবে গড়ে তুলতে না পারেন, তাহলে তাদের জন্য এবং দেশের জন্য আরো মহাবিপর্যয় অপেক্ষা করছে।
সবচেয়ে ভালো হতো, যদি চৌদ্দ দল শক্ত আন্দোলন পাশে নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্ট্তুতি নিত। এই যে মাঝে মাঝে আন্দোলন, তারপর তার রশি টেনে ধরা অর্থাৎ মালগাড়ির মতো আন্দোলনের থেমে থেমে চলা, আপসের সদ্বেশনে সহসা সবুজ বাতি জ্বালিয়ে দেওয়া, তাতেই বিএনপি-জামায়াত চত্রক্র অনমনীয় হওয়ার, একটার পর একটা অবৈধ ও অসঙ্গত কাজ করার সাহস পেয়েছে। তাদের ঔদব্দত্য ও একগুঁয়েমি সীমা ছাড়িয়েছে। যদি এমন হতো, দেশব্যাপী সুষ্ঠু-অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে আন্দোলন তুঙ্গে এবং সেই আন্দোলন পাশে নিয়ে চৌদ্দ দল নির্বাচনে যাচ্ছে, তাহলে আজকের উভয় সংকটে তাদের পড়তে হতো না।
চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচন চৌদ্দ দলকে পথ দেখিয়েছিল। কিন্তু সে পথ তারা অনুসরণ করতে পারেননি। বারবার আপসের চোরাবালিতে পা রেখেছেন। নইলে আন্দোলন সঙ্গে নিয়ে প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে গণপাহারা বসিয়ে এবং ভোট গণনা পর্যনস্ন তা অব্যাহত রেখে বিএনপি'র ইলেকশন মেকানিজম ব্যর্থ করা এবং নির্বাচনে বিজয় ছিনিয়ে আনা চৌদ্দ দলের পক্ষে সল্ফ্ভব ছিল। তারা সে পথে যাননি। এখন তাদের সামনে একটাই পথ খোলা, দাবি-দাওয়া আদায় অর্থাৎ সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ সৃষদ্বি না হওয়া পর্যনস্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা। বুধবার তারা সেই সিদব্দানস্নই ঘোষণা করেছেন। দেশের মানুষ বর্তমান পরিস্টি্থতিতে তাদের এ সিদব্দানস্নে অনুমোদন দেবে অথবা দিয়েছে তাতে সন্দেহ নেই।
মহাজোটকে এখন আন্দোলনে নামতেই হবে। 7 ও 8 জানুয়ারি দেশব্যাপী অবরোধের ডাক দিয়ে তারা সেই পথেই এগুচ্ছেন। এ আন্দোলনের মোকাবিলায় বিএনপি এখন কী করবে? বিএনপি জন্মাবধি যে আচরণের পরিচয় দিয়ে এসেছে তাতে মনে হয়, তাদের কব্জায় বন্দি প্রশাসনিক শক্তি ব্যবহার করে তারা এ আন্দোলন দমনের চেষদ্বা করবে। পাশাপাশি দেদার টাকা ছড়িয়ে চৌদ্দ দলের কিছু প্রার্থীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য প্রলুব্ধ করতে চাইবে। সেই সঙ্গে '96 সালের 15 ফেব্রুয়ারির মতো একটি একতরফা জালিয়াতির নির্বাচন করে একটি অবৈধ সনস্নানের (সরকারের) জন্ম দিতেও তারা পারে।
এই অবৈধ সনস্নানটি '96 সালে অবশ্য অাঁতুড়ঘরেই মারা গিয়েছিল। প্রবল গণআন্দোলন এবং সরকারি কর্মচারীদেরও এক বৃহৎ অংশের বিদ্রোহে অবৈধ সনস্নানটিকে অাঁস্টস্নাকুড়ে ফেলে দিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল। এবার অবশ্য বিএনপির আশা তারা এই জানুয়ারি মাসে অনুরূপ নির্বাচনের মাধ্যমে আরেকটি অবৈধ সনস্নান জন্ম দিয়ে তাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে। কারণ সরকারি প্রশাসনের এবার বিদ্রোহী হওয়ার সল্ফ্ভাবনা কম। তাছাড়া অর্থ ও অস্ট্পের সাহায্যে তারা মহাজোটের আন্দোলন দমনের আশা রাখে।
এ ধরনের প্রত্যাশা থেকে বিএনপি যদি মহাজোটের দাবি-দাওয়া উপেক্ষা করে ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে একটা একতরফা নির্বাচন দ্বারা নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করে এবং সরকার গঠন করে তাহলে বিস্ট্মিত হওয়ার কিছু নেই। তাদের মাথায় সুবুদব্দির উদয় হলে তারা মহাজোটের দাবি মানার ব্যাপারে নমনীয় হবেন এবং একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ সৃষদ্বিতে সল্ফ্মত হবেন। তাতে তাদের জান ও মান দুই-ই রক্ষা পাবে। কিন্তু পাকিস্টস্নানের গোয়েন্দা চত্রক্র আইএসআইয়ের যে কৌশল ও প্রত্রিক্রয়া তাদের মধ্যে কাজ করছে, তাতে বিএনপি সহজে অথবা সহসা নিজেদের একগুঁয়েমি ত্যাগে রাজি হবে বলে মনে হয় না। যদি হয় তাহলে বাংলাদেশের মানুষ এক মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা পাবে।
কিন্তু লন্ডনে বসে গত দু'দিন ঢাকায় যেসব বল্পব্দু রাজনীতিক ও সাংবাদিকের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ করেছি, তারা কেউ মনে করেন না, বিএনপির নেতা-নেত্রীদের মাথায় সুবুদব্দি ও শুভবুদব্দির উদয় হবে এবং তারা 15 ফেব্রুয়ারি-মার্কা আরেকটি অবৈধ সনস্নান জন্ম দিতে বিরত থাকবেন। এবার তাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা এই যে, এরশাদকে সঙ্গে নিয়ে তার দলকে তিন শ' আসনেই প্রতিদ্বন্দি্বতা করার সুযোগ দিয়ে এই একতরফা নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়ার যে চেষদ্বা তারা করবেন এবং আগামী সংসদে এরশাদকে সংসদীয় বিরোধী দলের নেতা বানিয়ে একটি গৃহপালিত বিরোধী দল খাড়া করবেন, তা তারা আর পারছেন না।
তা না পারলে তাদের সামনে এখন একটাই পথ, তথাকথিত চারদলীয় জোট ভেঙে দিয়ে জামায়াতকে বিরোধী দলের প্রক্সি দেওয়ার জন্য আলাদাভাবে দাঁড় করানো এবং জামায়াতের আরো কিছু বেশি প্রার্থীকে সংসদে বিজয়ী ঘোষণা করে তাদের মাধ্যমে সংসদীয় বিরোধী দল খাড়া করা। আমার সন্দেহ আছে, গোটা সিভিল ও মিলিটারি অ্যাডমিনিসদ্ব্রেশন (জুডিসিয়ারিসহ) এবার কুক্ষিগত করার পরও বিএনপি '96 সালের ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের একতরফা খেলা খেলতে চাইলে তাতে সফল হবে কি-না। দেশের সব মানুষ এখন বিএনপি-জামায়াতের ওপর ত্যক্ত, বিরক্ত এবং মহাক্ষুব্ধ। অক্টোবরে ক্ষমতা ত্যাগের (সত্যিকার অর্থে ক্ষমতা ত্যাগ করেনি) পরও তাদের চত্রক্রানস্নের রাজনীতি, একটার পর একটা অসাংবিধানিক কার্যকলাপ দেশের মানুষের চোখে নগ্গম্নভাবে ধরা পড়েছে। এ অবস্ট্থায় মহাজোটের আন্দোলনের ডাকে জনসিংহ যদি সত্যি গর্জে ওঠে, তাহলে এসটাবলিসমেন্টের সব অংশ বিএনপির প্রতি পক্ষপাতিত্দ্ব দেখাবে বা হাওয়া ভবনের হুকুম মেনে চলতে চাইবে, তা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করেন না।
তাহলে মহাজোটসহ আওয়ামী লীগ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালে কী ঘটতে যাচ্ছে বাংলাদেশে? নৈরাশ্যবাদীদের ধারণা, বাংলাদেশ আরেকটি বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ঢাকায় বিদেশী কূটনীতিকরা, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষদ্ব্র ও ভারত যদি কঠোর চাপ প্রয়োগ করে বিএনপির হুঁশ ফেরাতে না পারে অথবা হুঁশ ফেরাতে না চায়, তাহলে সংঘাত-সংঘর্ষ অনিবার্য। আর আশাবাদীরা মনে করেন, গোটা দেশবাসীর অসনস্নোষ ও বিরোধিতার মুখে বিএনপি 15 ফেব্রুয়ারি-মার্কা আরেকটি অবৈধ সনস্নান জন্ম দিতে পারবে না। এবার সনস্নান জন্ম দেওয়ার আগেই তাদের পিছু হটতে হবে। চাই কি ক্ষমতা ছেড়েও পালাতে হবে।
ঢাকার বাজারে গুজব, তারেক রহমানকে যে এখন আর দলের রাজনীতির মঞ্চে সামনের কাতারে খুব একটা দেখা যাচ্ছে না এবং তার মুখে কথার তুবড়ি ফুটছে না তার কারণ, হাওয়া ভবনের সুরক্ষা হবে না জেনেই গত পাঁচ বছরের দেদার লুটপাটের টাকা সামলাতে তিনি ব্যস্টস্ন। কোন দেশে কীভাবে এই অর্থ-সমঙ্দ সরানো যায়, তা নিয়েই তার সময় বেশি কাটছে। বিএনপি অতি দুরাশায় আওয়ামী লীগের সামনে নির্বাচনে যোগ দেওয়ার কোনো পথই খোলা রাখেনি। একটার পর একটা বাধার প্রাচীর তারা খাড়া করেছে। ফলে নির্বাচন থেকে সরে গিয়ে আওয়ামী লীগকে আন্দোলনে নামার একটি মাত্র খোলা পথের দিক এগুতে হয়েছে। বিএনপি অতীত থেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি। এবারের শিক্ষা তার জন্য শেষ শিক্ষাও হতে পারে।
:::সমকাল:::
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


