somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সঞ্জীব সন্ধ্যা (অসমাপ্ত)

২১ শে নভেম্বর, ২০০৭ রাত ১০:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে না হতেই বন্ধু মনিরকে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটলাম, গন্তব্য চারুকলা ইনস্টিটিউটের বিপরীতের ছবির হাট। সেখানে পাঁচটা থেকে সঞ্জীব চৌধুরী, আমাদের সঞ্জীবদার জন্য কনসার্ট হবে, কোনভাবেই দেরি হলে চলবে না। সময়মত গিয়ে দেখি কনসার্ট তখনো শুরু হয়নি, অবশ্য গানের যন্ত্রপাতি সব রেডিই আছে, কেবল শিল্পীরা নেই, মানুষ এসে ভীড় করেছে, তাদের সবারই অভিন্ন এক প্রিয় মানুষের জন্যে।

সন্ধ্যার পরে ভীড়টা আরো বহুগুণ বেড়ে গেল। কিন্তু গান শুরু হচ্ছে না দেখে খারাপ লাগছিল, এর মধ্যে আবার কেউ কেউ চলে যেতে শুরু করল, মানুষকে শান্ত করতে ঘোষণা হল, আসর আরম্ভ হবে, একটু অপেক্ষা করুন। ব্যানার লাগান হল, “সঞ্জীব সন্ধ্যা”, পাশে চারুকলার কোন ছাত্রের আঁকা সঞ্জীবের আত্মপ্রতিকৃতি। সন্ধ্যা আরেকটু বাড়লে পথ চলা এগিয়ে চলল কনসার্টের। শংকর সাঁওজাল, তার ক্ষুদ্র স্মৃতিচারণে আর কথায় স্মরণ করিয়ে দিলেন সবাইকে, সঞ্জীবের কথা। তিনি বললেন, সঞ্জীবের গান বেশি নয় সংখ্যায়। তার ফিচার পড়েছে এমন লোকও খুব বেশি নয়, কিন্তু তার গানের যে কোয়ালিটি, শৈল্পিক গুণ আর ক্ষমতা তা অনেকের তথাকথিত পরিমাণগুলোর থেকেও বেশি ভারি। তাই এখানে আজ এত ভীড়। তিনি চলে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থানীয় ছাত্ররাই গলায় তুলে নিল সঞ্জীবের গানকে।

আসরের প্রথম গান ছিল “সমুদ্রসন্তান”, ঐ যে, চোখটা এত পোড়ায় কেন, ও পোড়া চোখ সমুদ্রে যাও, তারপর একে একে “আমি তোমাকেই বলে দেব”, “সাদা ময়লা রঙ্গীলা পালে”, ”স্বপ্নবাজি”। একাধিক সঞ্জীবপ্রেমী সঙ্গীতজ্ঞরা গান ধরলেন, কখনোবা তার কোন সহকর্মী ভুলে-ভালে তার স্মৃতিকে স্মরণ করলেন। টোকন ঠাকুরের লেখা সঞ্জীবের জন্য এলিজি পাঠ করে শোনানো হল, মঞ্চের সবাই হাটু মুড়ে বসে তন্ময় হয়ে রইল। মঞ্চের ডানপাশে রাখা প্রজেক্টরে এরপর দেখান হল সঞ্জীবকে, গত বছরে “কনসার্ট ফর ফাইটার্স” নামক কনসার্টে সঞ্জীবের গাওয়া “স্বপ্নবাজি” দেখলাম। এ এক অন্য সঞ্জীব, তিনি যখন গানের ভিতরের কবিতা আবৃত্তি করছিলেন, তখন তার চোখ দিয়ে আগুন ঝরে পড়ছিল... তিনশটি লাশ, ঠাণ্ডা হিম... উচ্চারণগুলি সঞ্জীবকেই শিহরিত করে দিচ্ছিল। কিন্তু গোল বাঁধল তখন, প্রজেক্টরে আর দেখানো যাচ্ছিল না, বোধহয় সিডিতে স্ক্র্যাচ পড়েছে।

এমন সময় মঞ্চে এলেন বাপ্পা মজুমদার। আমার ব্যক্তিগত ধারণা ছিল, গান গাওয়া তো দুরে থাক দু’এক কথা বলতেই বাপ্পা ভেঙ্গে পড়লেন। কিন্তু সঞ্জীবের সব থেকে কাছের মানুষগুলোর একজনকে কি ভেঙ্গে পড়লে চলে? তিনি ভেঙ্গে পড়লেন না, বললেন, এখানে যে সঞ্জীবের জন্য বক্তৃতা না হয়ে গান হচ্ছে, তা অনেক বড় সম্মানের। এরপর দলছুটের সবার পক্ষ থেকে যারা সশরীরে হাজির ছিলেন, ধন্যবাদ জানানো হল, সঞ্জীবের স্ত্রীকে, যিনি সঞ্জীবের দেহটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে দান করে অসাধারণ সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন। বললেন, সঞ্জীবের পরিবারকে নিয়ে তাঁদের পরিকল্পনার কথা। তবে কথাতেই বাপ্পা থেমে গেলেন না, গলায় ঝুলিয়ে নিলেন গিটার, সবাইকে শুনিয়ে দিলেন সঞ্জীবের সব থেকে প্রশংসিত গান, আমি তোমাকেই বলে দেব। পিনপতন নিরবতায় সবাই সেই সঙ্গীত স্বাদ আস্বাদন করলেন। গান শেষে বাপ্পা হেঁটে চলে যাচ্ছিলেন, কিন্তু দর্শকরা তা মানবেন কেন? “ওয়ান মোর” চিত্‌কারে নিরুপায় হয়ে ধরলেন “চাঁদের জন্য গান”, গানের ভেতরের লাইন, পাগল কষ্ট পেয়ে চলে যাবে ফিরেও আসবে না গাওয়ার সময় বললেন, পাগল আসলেই চলে গেছে। সেই সময়ের দৃশ্য খুব কষ্টের, গানের সঙ্গে গলা মিলাতে গিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন বুলেট, তবে বাপ্পা অবিচল। গানের শেষে টিএসসির এক কর্মচারী সঞ্জীবের কথা বলতে গিয়ে হাঁউমাউ করে উঠলেন, বাপ্পা তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন, তবু কাঁদলেন না, বেশি কষ্টের এটাই সমস্যা, কাঁদা যায় না। এসময় করতালিতে ভেসে গেল ছবির হাট।

এভাবেই এক সময় শেষ হল “সঞ্জীব সন্ধ্যা”। গানের আসর শেষ হল, গান তবু থেকে গেল। থেকে গেল... সঞ্জীব আর তার টিএসসির ঘাস।

জেবতিক আরিফের ব্লগের পরিপূরক



সর্বশেষ এডিট : ২২ শে নভেম্বর, ২০০৭ বিকাল ৫:৩২
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মহাজন জিন্দা হ্যায়!!!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৭



মনে পড়ে, ঠিক এক বছর আগে গত বছর এই সময়ের দিকে ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে যাচ্ছিল 'মহাজন স্যারকে আরও ৫ বছর বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে দেখতে চাই' টাইপের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম অটুট, মৌলভিরা নন: সমালোচনা মানেই অশ্রদ্ধা নয়

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৬



নবী ইউসুফ (আ.)-এর সময় মিসরীয়রা 'আমুন' দেবতার পূজা করত। মিসরের শাসক আপোফিসকে তার পিতা তৎকালীন পুরোহিতদের কুচক্রী স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এই পুরোহিতরা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজ্যসভা থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৈশব- কৈশোর বেলার গল্প

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৭



আমাদের শৈশব ছিলো অতিশয় প্রাণপ্রাচুর্যময় যদিও শৃঙ্খলাপূর্ণ।
একালের মতো বিলম্বিত শয্যা ত্যাগ রীতিমতো গর্হিত অপরাধ! শয্যা ত্যাগ করেই বিশেষত অবকাশের দিন গুলোতে নিয়মিত গন্তব্য ছিলো কারো কারো খেলার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ পাখির জগত

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:০০



টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।

টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।

বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোহভঙ্গ!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:৪৮



পদ্মা সেতু নিয়ে কত অপবাদই না দেয়া হয়েছিলো! বলা হয়েছিলো- বাংলাদেশ কখনো নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় প্রকল্প করতে পারবে না। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ায়। অথচ শেষ পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×