somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিষণ্নতা একটি ভয়াবহ মানসিক রোগ

১৭ ই মে, ২০২০ বিকাল ৫:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বিষণ্নতা এমন এক নীরব ঘাতক যা একজন মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে গ্রাস করতে থাকে আর তাকে এনে দেয় একাকীত্ব।আর এই একাকীত্ব তার এই অসুখকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।সে ঢুকে পড়ে বিষন্নতা-কষ্ট-একাকীত্বের এক দুষ্টু চক্রে। স্বপ্নহীন,আনন্দহীন এক দূর্বিসহ জীবন নিয়ে আমাদেরই মাঝে বাস করে আমাদেরই কেউ একজন।আসুন এই মানসিক রোগটি সম্পর্কে ভালভাবে জানি এবং বিষণ্ন মানুষগুলোকে আত্মসংহার ও আত্মহননের পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করিঃ-


১ নং বা ২ নং উপসর্গসহ নিম্নোক্ত যে কোন ৫ টি উপসর্গ যদি ১৫ দিনের বেশী আপনার মধ্যে থাকে (যে কোন কারণেই হোক না কেন) তাহলে আপনি নিশ্চিতভাবে মারাত্মক মাত্রায় বিষণ্নতায় ভুগছেন যা চিকিৎসা না করালে আপনার সুন্দর জীবন ধ্বংসের মুখোমুখি চলে যেতে পারে।উপসর্গগুলো হলোঃ

১) প্রায়ই মন খারাপ থাকা বা একাকী মনের কষ্টে কান্নাকাটি করা বা ভিতর থেকে কান্না ঠেলে আসছে এমন লাগা।

২) অধিকাংশ কাজে আনন্দ না পাওয়া এমনকি যেসব কাজে মানুষ যথেষ্ঠ আনন্দ পায় যেমন ঈদ, বিয়ে, জন্মদিন ও অন্যান্য পারিবারিক/সামাজিক অনুষ্ঠান বা শপিং-এ অনীহা তৈরি হওয়া বা অংশগ্রহন করে আনন্দ না পাওয়া কিংবা এ ধরনের অনুষ্ঠানে না যাওয়ার জন্য অজুহাত তৈরি করা। মানুষের সাথে মেলামেশা করতে ভাল না লাগায় দিন দিন একা হয়ে যাওয়া।

৩) খাওয়ার ব্যাপারে অরুচি/অনীহা; এমনকি ক্ষুধা না লাগলেও খেতে ইচ্ছে না করা(এরা সাধারণতঃ সকালের নাস্তা দেরি করে করে)। দিন দিন শরীর শুকিয়ে যাওয়া।অবশ্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে রোগি অতিরিক্ত খাওয়া-দাওয়া করে এবং মোটা হতে পারে।

৪) শরীর খুব দুর্বল বা ক্লান্ত লাগা। বিশেষত: কোন কাজ আরম্ভ করার আগেই মনে হওয়া যে দূর্বলতার জন্য কাজটা করতে পারব না।

৫) ঘুম না হওয়া বা ঘুম খুব পাতলা হওয়া বা বিছানে শোয়ার পরও সহজে ঘুম না আসা বা বার বার ঘুম ভেঙ্গে যাওয়া।বিশেষতঃ শেষ রাতে ঘুমটা আসে ফলে রোগি সকালে ঘুম থেকে দেরি করে উঠে।কিছু ব্যতিক্রম ক্ষেত্রে অবশ্য কারো কারো ঘুম বেড়ে যায়।

৬) দিন দিন মেজাজ চড়ে যাওয়া বা অল্পতেই বেশি বিরক্ত বা উত্তেজিত হওয়া। এমনকি রোগিরা অন্যের দেয়া ভাল উপদেশও সহ্য করতে পারে না।

৭) নিজেকে খুব অসহায় লাগা বা সকলের জন্য নিজেকে একটা বোঝা মনে করা অথবা সকল কষ্টের জন্য নিজেকে বা ভাগ্যকে বার বার দায়ী করা। আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া।ভবিষ্যত অন্ধকার দেখা।

৮) কাজে-কর্মে মন না বসা বা কথা মনে রাখতে না পারা অর্থাৎ অমনোযোগী হওয়া।

৯) বেঁচে থাকার আগ্রহ কমে যাওয়া। রোগি অনেক সময় বলে থাকে “অনেক কষ্ট নিয়ে বেঁচে আছি; তার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো।” ক্ষেত্র বিশেষে রোগি আত্মহত্যার চিন্তা বা চেষ্টা করে থাকে।বিশ্বে যত আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে তার সিংহভাগেরই কারণ বিষণ্নতা।



আনুষঙ্গিক লক্ষণ:-এগুলো বিষণ্নতার প্রত্যক্ষ উপসর্গ না হলেও বিষণ্ন রোগিদের মাঝে প্রায়ই দেখা যায়-

১)খুব অস্থির লাগা, বুক ধড়ফড় করা।

২)ঘাড় বা মাথার পিছনে ব্যথা হওয়া (Tension headache),মাথার মধ্যে ভোঁতা যন্ত্রণা হওয়া।

৩)জ্বর জ্বর লাগা অথচ মাপলে থার্মোমিটারে জ্বর উঠে না।

৪)শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ব্যথা হওয়া ও শরীর ম্যাজম্যাজ করা।

৫)গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা, হজমের অসুবিধা বা পায়খানা কষে যাওয়া।

৬)যৌন ইচ্ছা বা ক্ষমতা কমে যাওয়া;এ কারণে বিষণ্ন রোগীদের দাম্পত্য জীবন দূর্বিষহ হয়ে উঠে।

৭)ভয়/আতঙ্ক অনুভব করা,হঠাৎ চমকে উঠা।

৮)নেতিবাচক চিন্তাভাবনা বা ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখা (Pessimism)।

৯)চারপাশের মানুষকে শত্রু ভাবাপন্ন/ক্ষতিকর মনে করা বিশেষত কাছের মানুষদেরকে।ফলে পরিবারের সদস্য,বন্ধু-বান্ধব ও নিকটজনদের সাথে সম্পর্কের অবনতি হয়।কেউ কেউ নানা অজুহাতে বাড়ি থেকে দূরে চলে যায় বা চেষ্টা বা চিন্তা করে।এ বিষয়টি রোগিকে আরও একাকীত্বের মধ্যে ঠেলে দেয় যা তার রোগকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।

১০)নিজের মতামতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া এবং অন্যের মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া …..ইত্যাদি।





কি কারণে বিষণ্নতা হচ্ছে তার উপরে ভিত্তি করে বিষণ্নতাকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায়-

১)বাহ্যিক কারণে বিষণ্নতা (Exogenous Depression)-আপনজনের জটিল অসুখ বা মৃত্যু, প্রেমে ব্যর্থতা, বড় ধরনের অর্থনৈতিক লোকসান, যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া, পরীক্ষায় ফেল করা, বিভিন্ন ঔষধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় যে বিষণ্নতা দেখা দেয় তাকে Exogenous Depression বলে।

২)আভ্যন্তরীণ কারণে বিষণ্নতা (Endogenous Depression)-শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার নানা পরিবর্তনেও বিষণ্নতা দেখা দিতে পারে।যেমন Cushing’s Syndrome এ রক্তে কর্টিসোল হরমোন বেড়ে যাওয়ার কারণে বিষণ্নতা দেখা দেয়।গর্ভকালীন ও গর্ভ পরবর্তী সময়ে হরমোনজনিত কারণে অনেকেই বিষণ্নতায় ভূগে থাকেন।

৩)অজ্ঞাত কারণে (Idiopathic Depression)-এক্ষেত্রে বিষণ্নতার জন্য দায়ী কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।

বিষণ্নতা যে কারণেই হোক না কেন প্রায় সব বিষণ্নতায় ভোগা রোগিদের ব্রেনে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তনটি দেখা যায় তা হলো ব্রেনে ‘সেরেটোনিন’ নামক নিউরোট্রান্সমিটারের কার্যকারিতার পরিমাণ কমে যাওয়া। সেরেটোনিন কমে গেলে যে শুধু বিষণ্নতাই দেখা দেয় তা নয়;বরং অনেকক্ষেত্রেই এ কারণে ‘অবসেশন’ও দেখা যায়।অবসেশনের কারণে যে ঘটনার কারণে বিষণ্ন হয়েছে (প্রতিক্রিয়াশীল বিষণ্নতার ক্ষেত্রে) তা বার বার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে।রোগি হাজার চেষ্টা করেও এ চিন্তা মাথা থেকে বের করতে পারে না।ফলে বিষণ্নতা ও অবসেশনের দুষ্টু চক্রে আটকে যেতে পারে রোগি।



শিশু-কিশোরদের বিষণ্নতাঃআমি এ বিষয়টি আলাদাভাবে উপস্থাপন করলাম কারণ এ বয়সের বিষণ্নতাকে প্রায়শই উপেক্ষা করা হয় অথচ এর ভয়াবহ পরিণতি তাদেরকে তাৎক্ষণিকভাবে এবং প্রায় সারাজীবনই বহন করতে হয়।গবেষণায় দেখা গেছে শিশু-কিশোরদের প্রায় ৮% বিষণ্নতায় ভূগে থাকে।আর বিষণ্নতায় ভোগা শিশু-কিশোরদের ৭% আত্মহত্যা করে থাকে।শুধু তাই নয় বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়া শিশুদের পরবর্তী ৫বছরের মধ্যে পুনরায় বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার হারও খুবই বেশি-প্রায় ৭০%।বিষয়টির দিকে বিশেষভাবে নজর দেওয়ার জন্য অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ রইলো।



হাস্যোজ্জ্বল বিষণ্নতা(Smiling Depression):- এ ধরণের বিষণ্নতায় ভোগা রোগি মানুষের সামনে হাসিমুখে থাকে কিন্তু একাকী অবস্থায় বিষণ্নতার উপসর্গগুলো অনুভব করে।লুকিয়ে কান্না করা এদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।



শোক(Grief reaction)-প্রিয়জনের মৃত্যুতে শোকাগ্রস্থ ব্যক্তির উপসর্গসমূহ অনেকটাই বিষণ্নতা রোগের উপসর্গের মত।কিন্তু শোক সাধারণত ২সপ্তাহের মধ্যে কমে যায়।তাছাড়া বিষণ্নতার রোগি যেমন মানুষের সঙ্গ পছন্দ করে না কিন্তু শোকের ক্ষেত্রে মানুষের সঙ্গ প্রশান্তি আনে।তবে যদি শোকের উপসর্গসমূহ ২ সপ্তাহের বেশি তীব্রমাত্রায় থাকে তাহলে সেটাকে বিষণ্নতা রোগ হিসাবে চিকিৎসা করতে হবে।

মাসিক পূর্ব মন খারাপ(Premenstrual Dysphoria)- এর উপসর্গগুলো বিষণ্নতার মতই যা সাধারণত মাসিক শুরুর ২সপ্তাহ আগে থেকে শুরু হয় এবং মাসিক শুরুর সাথে সাথে উপসর্গগুলো চলে যায়।যেহেতু উপসর্গগুলো ২সপ্তাহের বেশি থাকে না তাই এটাকে বিষণ্নতা না বলে ডিসফোরিয়া বলে।

গর্ভকালীন বিষণ্নতা(Perinatal depression)- গর্ভকালীন সময়ে ১১%-২০% নারী বিষণ্নতায় ভূগে থাকেন।এ সময় আত্মহত্যার প্রবণতা বা সন্তান নষ্ট করার মানসিকতা কাজ করতে পারে।এসময় মায়ের বিষণ্নতা গর্ভস্থ শিশুর উপরও কুপ্রভাব ফেলতে পারে।সুতরাং এসময় বিষণ্নতার উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।

নীল মাতৃত্ব বা MATERNITY BLUES: এটা ঠিক বিষণ্নতা নয় কিন্তু বিষণ্নতার খুব কাছাকাছি হওয়ায় প্রসঙ্গটি তুলে ধরলাম। প্রসব পরবর্তী সময়ে প্রায় ৮০% নারী এ সমস্যায় ভূগে থাকেন।প্রসব পরবর্তীতে দেহে হরমোনের মাত্রার হঠাৎ যে বিরাট পরিবর্তন ঘটে তার কারণেই এ সমস্যার উদ্ভব হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।এ সমস্যা সাধারণত প্রসবের ২ সপ্তাহের মধ্যেই স্বভাবিক হয়ে যায়।এ সময় যেসব উপসর্গগুলো দেখা দেয়-

১)কান্না কান্না ভাব, চোখে জল ছলছল করা বা হাউ মাউ করে কান্নাকাটি করা।

২)দ্রুত মুড পরিবর্তন।এই ভাল এই মন্দ বা এই স্বাভাবিক আবার একটু পরেই উত্তেজিত আচরণ।

৩)অস্থিরতা ও অসহিঞ্চুতা।অন্যের সামান্য সমালোচনা বা অবহেলার প্রতি তীব্র প্রতিক্রিয়াশীলতা দেখানো।

৪)নিজেকে অবহেলিত ভাবা বা নিজের দাম কমে গেছে এরকম মনে করা কিংবা অন্যরা তার প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলতে পারে ভেবে মন খারাপ করা।

৫)মনোযোগের ঘাটতি।কথা ভুলে যাওয়ার প্রবণতা।সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা।

৬)নবজাতকের সাথে এমন আচরণ করা যা দেখে মনে হয় যে সেটা তার আদরের সন্তান নয়।অনেকসময় মা তার নবজাতকের প্রতি আকর্ষণবোধ করেন না;এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে বিরক্তিবোধ করেন।

৭)ঠিকমত ঘুম না হওয়া বা ঘুম খুব পাতলা হওয়া কিংবা বার বার ঘুম ভেঙ্গে যাওয়া অর্থাৎ ঘুমে অতৃপ্তি।

এ সমস্যায় আক্রান্ত মায়ের প্রতি পরিবারের অন্যন্য সদস্যদের সহানুভূতিশীল আচরণ এবং এ সমস্যাটি যে প্রসব পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক একটি বিষয় এ ব্যাপারে তাকে আস্বস্ত করলেই এ সমস্যা থেকে প্রায় সবাই ১৫দিনের মধ্যে মুক্তি পেয়ে থাকেন।


প্রসব পরবর্তী বিষণ্নতা বা POSTPARTUM DEPRESSION: যদিও প্রাথমিকভাবে এটা নীল মাতৃত্ব বা ম্যাটারনিটি ব্লুজ এর মত মনে হয় কিন্তু এর উপসর্গগুলোর মাত্রা তীব্র থাকে এবং উপসর্গগুলো ২ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে দেখা যায়।প্রসব পরবর্তী সময়ে ৪২% নারী এ সমস্যায় ভূগতে পারেন বিশেষত যারা পূর্ব থেকেই বিষণ্নতায় ভূগছেন, যাদের বিষণ্নতায় ভোগার পারিবারিক ইতিহাস রয়েছে, যারা পারিবারিক সহিংসতার শিকার, সমাজের অবহেলিত নারী, অনির্ধারিত গর্ভধারণ, বৈবাহিক জীবনে যারা অসুখি, সদ্য প্রসূত সন্তানের অসুস্থতা ও কান্নাকাটি ইত্যাদি বিষয়গুলো প্রসব পরবর্তী বিষণ্নতা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিষণ্ন পিতৃত্ব বা SAD DAD: মায়েদের মত সন্তান জন্মাবার পর প্রায় ২৬% মত বাবাও বিষণ্নতার নানা উপসর্গে ভূগতে পারেন যা বিষণ্ন পিতৃত্ব বা স্যাড ড্যাড নামে খ্যাত।বিষয়টি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত থাকে সচেতনতার অভাবে।আবার তীব্র মাত্রার উপসর্গ দেখা দিলেও সেটাকে অনেক সময় ভিন্ন অর্থে বিবেচনা করে পরিবার বা সমাজের লোকজন যেমন ‘ছেলে না হয়ে মেয়ে সন্তান হয়েছে তাই মন খারাপ’, ‘সন্তান জন্মের সময় অনেক টাকা খরচ হয়েছে তাই দুঃশ্চিন্তায় আছে’, ‘সন্তানকে কীভাবে মানুষ করবে সে ভাবনায় উদ্বিগ্ন’, ‘পরকীয়ায় জড়িয়েছে তাই নিজ সন্তান জন্মে অখুশি’ ইত্যাদি।

বৃদ্ধকালীন বিষণ্নতা (SENILE DEPRESSION):- যাদের বয়স ৬০ বা তারও বেশি তাদের মধ্যে এক ধরনের বিষণ্নতা দেখা দেয় যা সিনাইল ডিপ্রেসন নামে পরিচিত।কাজ থেকে অবসর, কোন কোন ক্ষেত্রে উপার্জনের সক্ষমতা না থাকা,সন্তানদের উপর নির্ভরশীল হওয়া,সন্তানদের কাছে না পাওয়া, একাকীত্ব, নিকটজনদের অবহেলা, নানাবিধ অসুখ বিসুখের উপস্থিতি,ঔষধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া, পরিচিতজনদের মৃত্যু,মৃত্যু চিন্তা ইত্যাদি বিষয়গুলো এ বয়সে বিষণ্নতার জন্ম দিতে পারে।এ বিষণ্নতার কারণে হৃদরোগে মারা যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে; ঝুঁকি বাড়ে আত্মহত্যারও।কোডাক ফিল্ম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ইস্টম্যান কোডাক কোম্পানীর প্রতিষ্ঠাতা আত্মহত্যা করেন নিচের চিরকুটটি লিখে-






চিকিৎসা না করালে একজন বিষণ্ন রোগী নিজ, পরিবার ও সমাজের কাছে বিরাট বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

*লেখাপড়ায় ফলাফল খারাপ করে

*চাকুরীক্ষেত্রে উন্নতি হয় না,ব্যবসায় সফলতা আসে না

*জীবনে উন্নতি বাঁধাপ্রাপ্ত হয়

*কর্মক্ষমতা বা দক্ষতা কমে যাওয়ায় দারিদ্রতায় ভূগতে হয়

*নিকটজনের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটে

*বিয়ের ব্যাপারে অনাগ্রহ দেখা দেয়

*পারিবারিক বা দাম্পত্য জীবনে অশান্তি নেমে আসে,কর্মে ও আচরণে অপরাধপ্রবণ হযে উঠে

*বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ে

*মাদকাসক্ত হতে পারে

*আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ে

*তাছাড়া শরীরে বিভিন্ন রোগ দেখা দেয যা টেষ্টে ধরা পড়েনা।


অর্থাৎ একজন বিষন্ন মানুষ সকল অশান্তির উৎস্য বা কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।






পৃথিবীতে এমন কোন দেশ নাই যেখানে এ রোগটি ব্যাপক আকারে বিস্তার লাভ করেনি।শিশু থেকে বৃদ্ধ,ধনী থেকে গরীব,শিক্ষিত-অশিক্ষিত,নারী কিংবা পুরুষ সবাই এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে।ধারনা করা হয় সাধারণ জনসংখ্যার ৮-১০% জীবনের কোন না কোন সময় বিষণ্নতায় ভূগে থাকেন।বিষণ্নতার প্রাদূর্ভাব পরিমাপের একটি পরিমাপক হলো Age standardised disability adjusted life year (DALY) rates per 100,000 inhabitants।এ পরিমাপক অনুসারে বিশ্বের সেরা ১০টি বিষণ্নতাপ্রবণ দেশের তালিকা নিচে উপস্থাপিত হলো। লক্ষ্যণীয় একমাত্র শ্রীলংকা ছাড়া সার্কভূক্ত সবগুলো দেশ ‘শীর্ষ ১০’ তালিকায় অবস্থান করছে-






১)যারা অতিরিক্ত মানসিক চাপে থাকেন বা মানসিক চাপ সহ্য করার সক্ষমতা কম।

২)দারিদ্রতার কষাঘাতে নিমজ্জিত ব্যক্তি।

৩)বিষণ্ন বাবা-মায়ের সন্তানেরা।

৪)যারা সদ্য আপনজনকে হারিয়েছেন।

৫)যৌন সহিংসতার শিকার ব্যক্তিরা।

৬)সন্তান জন্মদানের অব্যবহিত পরের সময়ে মায়েরা।

৭)আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের ব্যর্থতা বা বঞ্চনার শিকার ব্যক্তিরা।

৮)যারা দীর্ঘমেয়াদী জটিল অসুখে ভূগছেন।

৯)বয়ঃসন্ধিকাল থেকে পরবর্তী কয়েক বছর (Teen age)।

১০)বিষণ্নতা তৈরি করতে এমন ঔষধ সেবনকারী ও মাদকাসক্তরা।





বিষণ্নতাবিরোধী ঔষধ দিয়েই মূলতঃ এর চিকিৎসা করা হয়;তবে বেশ কিছু ক্ষেত্রে ঔষধের সাথে সাথে কাউন্সেলিংও বেশ ভাল কাজ করে।বিষণ্নতাবিরোধী ঔষধগুলো বেশ ধীরগতিতে কাজ করে তাই অবস্থার উন্নতি হতে ২-৩সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।আবার একই ঔষধ একই মাত্রায় সকলের ক্ষেত্রে সমভাবে কাজ নাও করতে পার।তাই ২-৩সপ্তাহ পরপর চিকিৎসক ঔষধ বা ঔষধের মাত্রা পুণঃনির্ধারন করে থাকেন।

বিষন্নতাবিরোধী ঔষধগুলোর কোনটিই পাশ্বপ্রতিক্রিয়া মুক্ত নয়।তবে সময়ের সাথে সাথে অধিকাংশ ঔষধই সহনশীল হয়ে যায়।তাই প্রতিটি ঔষধ সেবন করার সাথে সাথে এগুলো সম্পর্কে আপনার জানা উচিত।এসব তথ্য আপনি ঔষধের প্যাকেটের ভিতরের লিফলেটেই পাবেন।


কতদিন ঔষধ খেতে হয়ঃ-সাধারণতঃ উন্নতি হওয়ার ৩মাস পর চিকিৎসক ঔষধ বা এর মাত্রা কমাতে শুরু করেন এবং উন্নতি অব্যাহত থাকলে আস্তে আস্তে তা বন্ধ করে দেন।তবে কারো কারো ক্ষেত্রে এটা ৬মাস বা ১২মাস কিংবা তারচেয়েও বেশি সময় লাগতে পারে।একটা বিষয়ে রোগীদের খুব সতর্ক থাকা প্রয়োজন উন্নতি দেখে হঠাৎ করে ঔষধ খাওয়া বন্ধ করবেন না;করলে এ রোগের উপসর্গ আবার দ্রুত ফিরে আসতে পারে।

কোথায় চিকিৎসা পাবেনঃ-জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট,শ্যামলী,ঢাকা;বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল ইউ. হাসপাতাল(পিজি হাসপাতাল)-এর মানসিক রোগ বিভাগে;সকল মেডিকেল কলেজের মানসিক রোগ বিভাগে।এছাড়াও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের ব্যক্তিগত চেম্বারে আপনি এ চিকিৎসা পাবেন।


সুতরাং কারণ যাই হোক না কেন কারো মাঝে বিষণ্নতার উপসর্গ দেখা মাত্র তাকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের নিকট নিয়ে যান এবং সঠিক চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে তার জীবনকে সঠিক পথে ও সুস্থ্যভাবে পরিচালিত হতে সাহায্য করুন।মনে রাখবেন ‘বিষণ্নতা’ একটি রোগ এবং উপদেশ ও শাসন এ রোগের প্রতিষেধক নয়।

ধন্যবাদ যারা কষ্ট করে আর্টিকেলটি পড়লেন।

সতর্কতাঃউপরোক্ত তথ্যগুলো কেবল সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য দেওয়া হলো;রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার জন্য নয়।

সূত্রঃ

Review of General Psychiatry,4th edt,DSM-IV

Current Medical Diagnosis & Treatment.

Epidemiology of Depression

Depression-Wikipedia

Depression in childhood & adolescence
Deprssion in children


ছবিঃসকল ছবি ইন্টারনেট থেকে নেওয়া হয়েছে।এ আর্টিকেলটি কেবলই তথ্যমূলক;এর কোন বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য নেই।তারপরেও কপিরাইট ভায়োলেশনের কারণে কারো আপত্তি থাকলে তা জানা মাত্র সে ছবি বা ছবিসমূহ এই আর্টিকেল থেকে অপসারণ করা হবে।(All the images in this article are collected from different web sites & have been used for non-commercial purposes.If anyone has any objection of using these images,I’m assuring their removal upon getting valid complaint)।

কৃতজ্ঞতাঃব্লগার নতুন ভাইয়ের প্রতি যিনি বিষণ্নতার বিষয়ে লিখতে প্রেরণা যুগিয়েছেন।


সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই মে, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:১৮
২৯টি মন্তব্য ২৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নায়লা নাইমের বিড়ালগুলো

লিখেছেন শাহ আজিজ, ২১ শে অক্টোবর, ২০২০ রাত ৮:৫৯



একজন মডেল নায়লা নাইম সাড়ে তিনশ’ বিড়াল পালেন একটি স্বতন্ত্র ফ্লাটে ঢাকার আফতাবনগরে । পাশেই তার আবাসিক ফ্লাট । গেল চার বছরে অসংখ্য বার দর কষাকষি করেও... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ তালব্য শ এ এশা

লিখেছেন অপু তানভীর, ২১ শে অক্টোবর, ২০২০ রাত ১০:০৬

মাঝে মাঝে নিজের নির্বুদ্ধিতার নিজেকে একটা কষে চড় মারতে ইচ্ছে হয় । নিজের চড়ে খুব একটা ব্যাথা অবশ্য লাগে না । আর চাইলেও খুব জোরে নিজেকে চড় মারা যায়ও না... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটা বৃহৎ জীবনের নেশা

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২১ শে অক্টোবর, ২০২০ রাত ১১:০৪

এমন সময়ে তুমি আসবে, যখন বিভোর বসন্ত
অঘোরে লাল-নীল-হলুদ ছড়াবে; তখন নবীন কিশলয়ের
মতো গজিয়ে উঠবে প্রেম। পৃথিবীর চোখ
তৃষ্ণায় ছানাবড়া হবে, মানুষে মানুষে অদ্ভুত সম্মিলন।

কখনো কখনো এত বেশি ভালো লাগে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষ কেন গালি দেয়?

লিখেছেন রাজীব নুর, ২২ শে অক্টোবর, ২০২০ রাত ২:৩৫



'হারামজাদী ছিনাল
বজ্জাত মাগী
খানকী বেইশ্যা

মিয়া বাড়ির কাচারির সুমুখে লম্বালম্বি মাঠ। মাঠের পর মসজিদ। সে মসজিদের সুমুখে বসেছে বাদ-জুমা মজলিস। খানিক দূরে দাঁড়ান ঘোমটা ছাড়া একটি মেয়ে। গালি গুলো ওরই... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ কাঁচের মেয়ে

লিখেছেন সামিয়া, ২২ শে অক্টোবর, ২০২০ বিকাল ৪:৩০




আমার বিয়ে হয়েছিলো মাঘ মাসের উনিশ তারিখে আমি প্রতিদিনের মতনই স্কুলে গিয়েছিলাম ক্লাস নিতে। পড়াশোনা ইন্টারের পর আর হয়নি অভাব অনটনে আর বখাটেদের উৎপাতে সেটা ছেড়ে দিয়েছিলাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

×