somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফিরে দেখা বাংলাদেশ : ওয়ান ইলেভেন

১১ ই জানুয়ারি, ২০১৯ দুপুর ১:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বহুল আলোড়িত কথিত ‘ওয়ান-ইলেভেন’ এর বারো বছর পূর্তি আজ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি ঘটে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির এই দিনে। আমেরিকার টু ইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনাবহুল নাইন-ইলেভেনের (৯/১১) সাথে মিলিয়েই রাখা হয় দিনটির নাম। মূলতঃ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনাস্থা সৃষ্টি হওয়ার প্রেক্ষাপটে এক চরম রাজনৈতিক সংঘাত, অনিশ্চয়তা আর অস্থিরতার আবর্তের মাঝে ২০০৭ সালের আজকের রাতে আকস্মিক দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়। ওয়ান ইলেভেনকে বুঝতে হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে।

এক নজরে বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাংলাদেশের অধুনালুপ্ত একপ্রকারের শাসন ব্যবস্থা, যার অধীনে দুইটি নির্বাচিত সরকারের মধ্যবর্তী সময়কালে সাময়িকভাবে অনির্বাচিত ব্যক্তিবর্গ কোন দেশের শাসনভার গ্রহণ করে থাকে। সাধারণতঃ নির্বাচন পরিচালনা করাই এর প্রধান কাজ হয়ে থাকে। বাংলাদেশের সংবিধানের সংশোধনী অনুসারে দুই নির্বাচনের মধ্যকার সময়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ৩ মাসের জন্য ক্ষমতা গ্রহণ করে। এসময় সুপ্রিম কোর্ট হতে সর্বশেষ অবসর গ্রহণকারী প্রধান বিচারপতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁকে এক দল নিরপেক্ষ উপদেষ্টামণ্ডলী সাহায্য করে থাকে। তবে এসময় সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্ব রাষ্ট্রপতির হাতে থাকে।

প্রেক্ষাপট
১৯৮১ থেকে গণতন্ত্রের দাবিতে দীর্ঘ নয় বছরের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতন ঘটে৷ এরশাদ সরকারের পতনের পর সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তত্কালীন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন৷ শাহাবুদ্দিন আহমদের অধীনে ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিএনপি সবচেয়ে বেশি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এই নির্বাচনে সুক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ আনেন। কিন্তু তিনি এই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়ে শপথ গ্রহণ করেন। সেই থেকে পঞ্চম সংসদের যাত্রা শুরু হয়। বিএনপি সরকার গঠন করার কিছুদিন পর থেকেই বিরোধী দলগুলো সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংযোজনের জন্য সরকারকে চাপ দিতে থাকে৷

তত্ত্বাবধায়ক সরকার, ১৯৯১
বাংলাদেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংবিধান সম্মত ছিল না। সকল দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ প্রধান উপদেষ্টা হতে রাজি হন। তবে তার শর্ত ছিল, দ্বায়িত্ব পালন শেষে তাকে আবার নিজ কাজে ফিরে যেতে দিতে হবে। সকল দল এতে রাজি হন এবং বিএনপি সরকার গঠন করে সংবিধান সংশোধন করে তাকে আবার প্রধান বিচারপতির দ্বায়িত্ব পালনে ফেরত পাঠায়। ১৯৯১ সালে ঐ সরকারের অধীনের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। কিন্তু আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে সুক্ষ কারচুপির অভিযোগ তোলে কিন্তু তারা নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে নাই।

সর্বপ্রথম জামায়াত এবং তারপর আওয়ামী লীগ ১৯৯৩ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত বিল সংসদ সচিবালয়ে পেশ করে৷ এতে বলা হয়, জাতীয় নির্বাচনকে অবাধ ও নির্বাচনের সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবমুক্ত করার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধানে সংযোজন করা উচিত৷ কিন্তু বিএনপি প্রথম থেকেই এ দাবি অসাংবিধানিক বলে অগ্রাহ্য করতে থাকে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসলেও এখন বিএনপি আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে রাজী নয়। ১৯৯৪ সালের ২৭ জুন সংসদ ভবনে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ, জামায়াত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করে৷ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ওই রূপরেখাকে অসাংবিধানিক ও অবাস্তব বলে ঘোষণা করেন৷। বেগম জিয়া বলেন, একমাত্র পাগল ও শিশু ছাড়া কোন মানুষের পক্ষে নিরপেক্ষ হওয়া সম্ভব নয়। ৬ ডিসেম্বর ১৯৯৪ আওয়ামী লীগ, জামায়াত আলাদা সমাবেশ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নেয়ার জন্য সরকারকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেয়৷ সরকার তার অবস্থানে অনড় থাকায় ২৮ ডিসেম্বর বিরোধী দলের ১৪৭ জন সংসদ সদস্য পদত্যাগপত্র পেশ করে৷

১৬ নভেম্বর ১৯৯৫ থেকে একাধারে ৭ দিন হরতাল পালিত হয়৷ হরতাল আর অবরোধের ফলে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি চরম দুরবস্থার মুখোমুখি হয়৷ সরকার উপ-নির্বাচনে না গিয়ে ২৪ নভেম্বর জাতীয় সংসদ ভেঙ্গে দেয় এবং ১৮ জানুয়ারি ১৯৯৬ সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়৷ পরে তৃতীয়বারের মতো তারিখ পরিবর্তন করে নতুন তারিখ দেয়া হয় ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি৷ সব বিরোধী দল এ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়৷ বিরোধী দলগুলোর প্রতিরোধের মুখে ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়৷ দেশব্যাপী সহিংসতায় কমপক্ষে ১৫ জন নিহত হয়৷ সারা দেশ রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় নিপতিত হয়৷ ২৩ মার্চ প্রেস ক্লাবের সামনে সচিবালয়ের কর্মকর্তারা তাদের চাকুরির নিয়ম ভঙ্গ করে জনতার মঞ্চ স্থাপন ও সরকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত অবস্থান ধর্মঘটের ডাক দেয়। অসহযোগ আন্দোলনের মাঝেই ১৯ মার্চ খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হয় এবং ষষ্ঠ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে৷ কিন্তু সারা দেশে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা শুরু হয়৷ সরকার ২১ মার্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল সংসদে উত্থাপন করে৷ ২৬ মার্চ সরকার নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়৷ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে ৩০ মার্চ রাষ্ট্রপতি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয় এবং খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেন৷ রাষ্ট্রপতি সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করেন৷

তত্ত্বাবধায়ক সরকার, ১৯৯৬
দ্বিতীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে। ১৯৯৬ সালে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বাংলাদেশের সর্ব প্রথম সংবিধান সম্মত তত্ত্ববধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে ১৪৭ আসন লাভ করে এবং জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে। বিএনপি এই নির্বাচনে ১১৬ টি আসনে জয়লাভ করে দেশের সবচেয়ে বৃহত্তম বিরোধীদল হিসেবে সংসদে যোগ দেয়। আওয়ামী লীগ সরকার কোন রকমের চল-চাতুরি না করে ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধ্যায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়।

তত্ত্বাবধ্যায়ক সরকার, ২০০১
তৃতীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন বিচারপতি লতিফুর রহমান। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার দলীয় ঐক্য জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগ মোট ৩০০ টি আসনের মধ্যে ৫৮ টি আসনে জয়লাভ করে। দেশে বিদেশে এই নির্বাচন ব্যাপক প্রশংসা লাভ করলেও আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে স্থুল কারচুপির অভিযোগ তোলে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন তারা নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করবেন ও শপথ নেবেন না। পরে অবশ্য আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যগন শপথ নেন, এবং সংসদে যোগ দান করেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৬
এবার ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান ও নির্বাচন কমিশনকে দলীয়করণ করে পুরো তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেই বিতর্কিত করে ফেলে। এর কারণে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনাস্থা সৃষ্টি হওয়ার প্রেক্ষাপটে এক চরম রাজনৈতিক সংঘাত, অনিশ্চয়তা আর অস্থিরতার আবর্তের মাঝে ২০০৭ সালের আজকের রাতে আকস্মিক দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়। জারি করা হয় সান্ধ্য আইন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তত্কালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে প্রধান উপদেষ্টা করে তার নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। তবে শুরু থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আওয়ামী লীগসহ বিএনপি বিরোধীদলগুলোর আপত্তির কারণে নানা বিতর্ক শুরু হয়। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যেতে থাকলে সরকারের চার উপদেষ্টা পদত্যাগ করেন। নিয়োগ দেয়া হয় নতুন উপদেষ্টা। এরই মধ্যে ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নির্বাচনের ঘোষণা দেয়া হলে আওয়ামী লীগ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়।

তবে শুরু থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে বিএনপির দলীয়করণের নিত্য-নতুন কূটকৌশল এবং আওয়ামী লীগসহ বিএনপিবিরোধী দলগুলোর তাতে আপত্তি ও কঠোর থেকে কঠোরতর আন্দোলনে জনজীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। এ পরিস্থিতিতে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষিত হয়। তত্কালীন রাষ্ট্রপতি প্রয়াত ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ভেঙে দিয়ে জরুরি অবস্থা জারি করেন। তখন সেনাপ্রধান ছিলেন জেনারেল মইন উ আহমদ। সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন তিনি।জেনালের মইন উ আহমেদ নিজেই এক অনুষ্ঠানে ১১ জানুয়ারির জরুরি অবস্থা জারির দিনটিকে ’ওয়ান-ইলেভেন’ বা এক-এগারো (১/১১) নামে আখ্যায়িত করেন। অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির মাঝে ২০০৭ সালের ১২ জানুয়ারি ফখরুদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০০৯ সালের জানুয়ারীতে সংসদ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক অরাজকতা থেকে দেশকে বাঁচার থাগিদে শুরুতে জনগণ এই সেনানিয়ন্ত্রিত সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল। যদিও তাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ও কিছু বিতর্কিত কার্যকলাপের কারণে এই জনসমর্থন শেষ পর্যন্ত ছিল না। দুই বছর ক্ষমতায় ছিল বেসামরিকের মোড়কে মোড়ানো ওই সেনানিয়ন্ত্রিত সরকার। যদিও পর্দার আড়ালে থেকে প্রধান ভূমিকায় ছিলেন জেনালের মইন উ আহমেদ। এই সেনানিয়ন্ত্রিত সরকার আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ দুই দলের শীর্ষ নেতাদের অনেককেই গ্রেফতার করে। সংস্কারের নামে দুই নেত্রীকে রাজনীতির বাইরে পাঠাতে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ কার্যকরের চেষ্টা চালানো হয়। সামরিক বাহিনী ও দেশের একটি প্রভাবশালী মহল দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে প্রচারণা-প্রপাগান্ডা শুরু করে। এ চেষ্টায়ই ‘মাইনাস-টু ফর্মুলা’ হিসেবে বহুল আলোচিত।



এদিকে এক-এগারো বাঙালির স্বপ্ন দেখার যে শক্তি, তা দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে যায়। ১২ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশের নিত্যদিনের চালচিত্র বদলে যায়। নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শপথ হয়। শুরু হয় অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের শাসন। প্রথমেই তারা দুর্নীতি উচ্ছেদের নামে রাজনীতিবিদদের ধরপাকড় শুরু করে। সারাদেশে চলে অবৈধ হাট-বাজার আর বস্তি উচ্ছেদ অভিযান। অন্যদিকে তাদের টার্গেটে ছিল দেশের সব অঞ্চলের সব শ্রেণীর ব্যবসায়ী। তাদের শিকার হন রাজধানী ও মফস্বলের উঁচু ও নিচু পর্যায়ের সব শ্রেণীর রাজনৈতিক নেতাকর্মী। এদিকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হলেও বিভিন্নভাবে আন্দোলন গড়ে ওঠে। দ্রুত নির্বাচনের দাবিতে অনির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দিক থেকে ক্ষোভ-বিক্ষোভ শুরু হয়।এক পর্যায়ে আন্দোলন রাজপথে নেমে আসে। এক পর্যায়ে কুশিলবরা রণেভঙ্গ দেন। এ পরিস্থিতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। সেই সঙ্গে ঘরোয়া রাজনীতিরও অনুমতি দেয়। প্রায় দুই বছর নানা ব্যর্থতায় ভারাক্রান্ত হয়ে, দেশি-বিদেশি চাপ এবং বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদের নির্বাচন দিয়ে বিদায় নেয় এক-এগারোর ওই সরকার।


ওই সময়ের সরকার প্রধান ফখরুদ্দীন আহমদ এবং সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ
২০০৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। ক্ষমতার পালাবদলের পর ফখরুদ্দীন আহমদ বেশ কিছুদিন সরকারি বিশেষ নিরাপত্তায় দেশেই ছিলেন। এরপর ১/১১ কর্মকাণ্ডের কিছু বিষয় খতিয়ে দেখতে গঠিত সংসদীয় কমিটি ফখরুদ্দীনকে জেরার জন্য তলব করছে মর্মে খবর প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যে সপরিবার তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। আগে থেকেই মার্কিন নাগরিক ফখরুদ্দীন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড স্টেটের পটোম্যাকে যে দুটি বাড়ির মালিক তার একটিতে এখন তিনি স্ত্রীসহ থাকছেন। অন্য বাড়িতে থাকে তার মেয়ের পরিবার।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরও ১/১১ এর সময়ের সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেসময়ই ঘটে আলোচিত পিলখানা হত্যাকাণ্ড। পরে অবসর নিয়ে অনেকটা নীরবে ২০০৯ সালের জুন মাসে দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান তিনি। বর্তমানে নিউইয়র্কের জ্যামাইকার একটি বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় সাধারণ জীবনযাপন করছেন মইন ইউ আহমেদ। প্রথমে ফ্লোরিডায় ছোট ভাই ও ছেলের কাছে থাকলেও পরে ‘থ্রোট ক্যানসার’ ধরা পড়লে চিকিৎসার জন্য তিনি নিউইয়র্কে চলে যান। ক্যানসারের জন্য কেমোথেরাপি ও বোনম্যারো অস্ত্রোপচারের পর এখন অনেকটাই সুস্থ তিনি।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে দুটি প্রধান দল, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ছিল শেখ হাসিনা; বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নেতৃত্বে ছিল খালেদা জিয়া। আওয়ামী লীগ এরশাদের জাতীয় পার্টিসহ চৌদ্দদলীয় মহাজোট গঠন করে, অন্যদিকে বিএনপি জামায়াতে ইসলামী দল সহ চারদলীয় জোট গঠন করে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০, বিএনপি ৩০, জাতীয় পার্টি ২৭, জাসদ ৩ এবং জামায়াত ২টি আসনে জয়লাভ করে।

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল
যে আওয়ামী লীগ ১৯৯৩ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত বিল সংসদ সচিবালয়ে পেশ করে এর বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন করেছিল অবশেষে সেই আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় এসে ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। আর যে বিএনপি ক্ষমতায় থেকে প্রথম থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি অসাংবিধানিক বলে অগ্রাহ্য করেছিল তারাই এখন আবার ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবীতে সোচ্চার।
২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনী বিলের ২০ ও ২১ নম্বর প্রস্তাবনায় বলা হয়, সংবিধানের ৫৮(ক) অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত হইবে। সংবিধানের ২(ক) পরিচ্ছেদে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্ত হইবে। প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা পদসংক্রান্ত ১৫২ অনুচ্ছেদ সংশোধন ও ক্রান্তিকালীন এবং অস্থায়ী বিধানাবলী সংক্রান্ত ১৫০ অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নব্বই দিনের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন: সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব রেখে বিলে বলা হয়, ‘সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে—ক) মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙিয়া যাইবার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে; এবং খ) মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভাঙিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙিয়া যাইবার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে’ প্রতিস্থাপিত হবে।

এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ছাড়াই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ৫ই জানুয়ারি ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনটি নবম জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অধিকাংশ দলই বর্জন করে এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ও সতন্ত্রসহ ১৭টি দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এছাড়াও নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৪টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীরা বিজয়ী হওয়ায় নির্বাচনটি নিয়ে অনেক বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
একইভাবে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর বহুদলের অংশগ্রহনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনেও কারচুপির অভিযোগ থাকলেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২৫৬ আসন পেয়ে নিরঙ্কুশভাবে জয় পায়। জাতীয় পার্টি ২২, বিএনপি ৬ এবং অন্যান্যরা ১৪টি আসনে জয়লাভ করে।

(আশা করি তরুণ প্রজন্মের যারা বাংলাদেশের 'তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা', 'ভোটের অধিকার', 'গণতন্ত্র' এবং 'রাজনৈতিক দলগুলোর চরিত্র' নিয়ে বিভ্রান্ত লেখাটি তাদের কাজে আসবে। )

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া ও পত্রপত্রিকা
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই মার্চ, ২০১৯ রাত ২:৪১
৮টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মিশরের বহিস্কৃত প্রেসিডেন্ট ড: মোরসীর মৃত্যু নিয়ে বাংগালীরা বিভক্ত?

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৮ ই জুন, ২০১৯ রাত ১০:০৫



মিশরের বহিস্কৃত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোরসীর(১৯৫১-২০১৯) মৃত্যু নিয়ে বাংগালীরা বিভক্ত কেন? এই ব্যাপারটা নিয়ে বাংগালীরা একমত পোষণ করলে কেমন হতো? মিশরীয়রা অনেকটা বাংগালীদের মতো ঐক্যহীন জাতি, তাদের মাঝে বড় ৩টি... ...বাকিটুকু পড়ুন

অবশেষে জামিন পেলেন বেগম খালেদা জিয়া

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৯ শে জুন, ২০১৯ রাত ১২:০১



ছয় মাসের জামিন পেলেন বেগম খালেদা জিয়া

মানহানির অভিযোগে করা দুই মামলায় ছয় মাসের জামিন পেয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। আজ মঙ্গলবার হাইকোর্টের বিচারপতি মোহাম্মদ হাফিজ ও বিচারপতি আহমেদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের কাশ্মীর ভ্রমণ- ৫: অবশেষে শ্রীনগরে!

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১৯ শে জুন, ২০১৯ সকাল ১১:২৬

গাড়ীচালক মোহাম্মাদ শাফি শাহ সালাম জানিয়ে তড়িঘড়ি করে আমাদের লাগেজগুলো তার সুপরিসর জীপে তুলে নিল। আমরা গাড়ীতে ওঠার পর অনুমতি নিয়ে গাড়ী স্টার্ট দিল। প্রথমে অনেকক্ষণ চুপ করেই গাড়ী চালাচ্ছিল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

চারিদিকে বকধার্মিকদের আস্ফালন!!

লিখেছেন ঘূণে পোকা, ১৯ শে জুন, ২০১৯ সকাল ১১:৩৭

জাতি হিসেবে দিনে দিনে আমাদের মধ্যে এক অদ্ভুত মানসিকতা গড়ে উঠছে।
আমরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে অন্যকে বিচার করার এক অসাধারন দক্ষতা অর্জন করতে শিখে গেছি। আমাদের এই জাজমেন্টাল মেন্টালিটির... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন জনকের চোখে

লিখেছেন সেলিম আনোয়ার, ১৯ শে জুন, ২০১৯ দুপুর ১:১৬


আমি ছিলাম আল্লাহর কাছে প্রার্থনারত
হসপিটালের ফ্লোরে —পরিবারের সবাই
প্রতীক্ষার ডালি নিয়ে নতমস্তকে —আসিতেছে শিশু
ফুলের মতোন — ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শুভাগমন
কোন সে মহেন্দ্র ক্ষণে — পরম বিস্ময়ে সেই
... ...বাকিটুকু পড়ুন

×