1971 সালের 20 আগস্ট বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান পাকিস্তানের করাচির মৌরিপুরের বিমানঘাঁটি থেকে একটি টি-33 জঙ্গী বিমান হাইজ্যাক করে ভারতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ভারতীয় সীমান্তের কাছাকাছি বিমানটি বিধ্বস্ত হলে তিনি ও পাকিস্তানি পাইলট দুজনেই নিহত হন। ফা:লে: মতিউর রহমান যখন বিমান নিয়ে ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন তখন ভারতীয় বিমান বাহিনীর লোকরা বিমান হাইজ্যাক সম্পর্কীত পাকিস্তানিদের সব কথাবার্তা শুনতে পেয়েছিল। মতিউরের বিমানকে পাহারা দিয়া আনার জন্য ভারতীয় ফাইটার প্লেনও আকাশে উড়েছিল। মতিউর রহমান ভারতের সীমান্ত থেকে মাত্র তিন মিনিটের দূরত্বে ছিলেন। স্বাধীনতাও ছিল মতিউরের কাছ থেকে মাত্র তিন মিনিটের দূরত্বে।
এই ঘটনার পরে পাকিস্তানে অবস্থানরত, বিশেষ করে পাকিস্তানের বিমান বাহিনীতে কর্মরত বাঙালীদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। পাকিস্তানিরা বাঙালী অফিসার ও কর্মচারীদের দেখলে বিদ্্রুপ এবং তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে কথা বলতো। কেউ কেউ মুখ খিস্তি করেও গালি দিত। জাত গোলাম প্রভুর এ গালিগালাজে তেমন কিছু মনে করেনা, এমন কিছু বাঙালীও পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে ছিল। যদিও তাদের সংখ্যা ছিল খুবই কম।
এমন অবস্থায় পাকিস্তানের প্র তি একান্ত অনুগত বাঙালী অফিসার উইং কমান্ডার সাইদ আহমেদ বেগ পাকিস্তান বিমান বাহিনী প্রধানের বাণী নিয়ে উপস্থিত হল। করাচির ড্রিগরোড বিমানঘাঁটির সকল বাঙালী অফিসার এবং কর্মচারী এ কত্রিত করে দারুণ এক বক্তৃতা রাখলো। তার মূল প্রতিপাদ্য ছিল , 'ভাইসব, আমাদের বাঙালীদের উচিত পাকিস্তান নামক রষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকা। মতিউর রহমানের মত বিশ্বাসঘাতকতা না করে পাকিস্তানের প্রতি যাদের আনুগত্য নেই তাদের উচিত হবে বিমানবাহিনী থেকে পদত্যাগ করা' । পাকিস্তান-প্রেমিক উইং কমান্ডারের বক্তব্য শুনে বেশিরভাগ বাঙালী কর্মচারী-কর্মকর্তাদের মনে যথেষ্ট বিরূপ প্রতিক্রিয়া হলেও কেউ তা প্রকাশ করতে সাহসী হলেন না। সবাই চুপ করে রইলেন। শুধুমাত্র এক জন ছিলেন এর ব্যতিক্রম। সাইদ আহমেদের বক্তব্য শেষ হলে, হালকা পাতলা গড়নের চুপচাপ স্বভাবের মানুষ ফ্লাইং অফিসার ওয়ালীউল্লাহ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, "Sir, I owe my allegiance to Bangladesh and not to Pakistan. I want to resign from my service." পরের দিনই তিনি চাকুরি থেকে পদত্যাগ করলেন।
ফ্লাইং অফিসার ওয়ালীউলর সাহস দেখে সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেল। বর্তমান অবস্থায় চিন্তাও করা সম্ভব না যে, একাত্তর সালে পাকিস্তানে অবস্থান করে সমবেত জনতার সামনে কোনো বাঙালী অফিসার বলতে পারে, "Sir, I owe my allegiance to Bangladesh and not to Pakistan. "
শত্রুর ঘাঁটিতে বসে এমন অসীম সাহসী বাণী উচ্চারণকারী এ বীর কে স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা কততুকু সম্মান দিয়েছি বা তাঁকে আমরা কজনই জানি ? বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে কেবল উইং কমান্ডার পদ প্রাপ্ত হয়ে তিনি অবসর গ্রহন করেন। আর পাকিস্তানের প্রতি একান্ত অনুগত, পা চটা কুত্তা এবং বীর শ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানকে বিস্বাসঘাতক বলে সম্বোধনকারী উইং কমান্ডার সাইদ আহমেদ বেগ বাংলাদেশে এসে বিমানবাহিনীতে গ্রুপ ক্যাপ্টেন পদমর্যাদায় উনি্নত হয়। তারপর বাংলাদেশ সরকারের পূর্ণ সেক্রেটারির পদমর্যাদায় পৌছে অবসর গ্রহন করে। হায়রে প্রিয় স্বদেশ আমার! এখানে যুদ্ধে পা হারিয়ে মুক্তিযোদ্ধা এক পায়ে রিকসা চালিয়ে অথবা ভিক্ষা করে পশুর মত জীবন যাপন করে। আর রাজাকার মন্ত্রী হয়ে মার্সিডিজ গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়িয়ে চলাফেরা করে। ছিঃ । ঘেন্না ধরে যায় নিজের উপর।
- --------------------------------------------------------------------------
তথ্য সূত্র: বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান স্মারক গ্রন্থ ।। মিলি রহমান সম্পাদিত
আগামী প্রকাশনী
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৬:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


