somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ একটি সরল আত্মসমর্পন

০১ লা মার্চ, ২০১১ সকাল ১০:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

লাশটিকে ঘিরে মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে, অন্তত একবার হলেও লাশটিকে সবাই এক পলক দেখতে চায়। এই মৃত লোকটি যখন বেঁচে ছিল, তখন সবাই তার নাম কতই তো শুনেছে। কারো হয়ত সামনা সামনি দেখার সুযোগ হয়েছে, কারো হয় নি। তাই শেষবারের মত এক পলক দেখে নেবার সুযোগ কেউ হাতছাড়া করছে না, এমন সুযোগ তো জীবনে বারবার আসে না।

বেলা বাড়ছে, রোদের প্রখরতাও বাড়ছে। কিন্তু মানুষের ঢল কিছুতেই কমছে না, রোদ উপেক্ষা করে সবাই দাঁড়িয়ে আছে, যতক্ষণ সম্ভব দেখে নিচ্ছে মৃত মানুষটাকে । লাশটার দিকে তাকালে এখনো একটু আধটু ভয় লাগে, মনে হয় একদৃষ্টতে যেন কার দিকে তাকিয়ে আছে। রোদের আলোয় চিক চিক করছে চোখদুটো। মরে যাবার পরও কেন যেন মানুষ কাছে যেতে ভয় পাচ্ছে, পলকহীন চোখদুটো বুজিয়ে দিতে সাহস পাচ্ছে না।

যখন বেঁচে ছিল তখন কি না করেছে লোকটা, কিন্তু লাশটার দিকে তাকালে যেন খুব অসহায় মনে হয়। কেমন বেদনার্ত চোখে তাকিয়ে আছে সবার দিকে, খুব কষ্ট পেয়ে মরেছে মনে হয়। হয়ত জীবিত অবস্থায় যে যত হিংস্র, মৃত্যুর পর সে তত অসহায়। মৃত লোকটিকে এক নামে সবাই চেনে। ড্যাগার মন্টু - ভয় পাইয়ে শহরের যে কারো আত্মা কাঁপানোর জন্য এই একটি নামই এতদিন ছিল যথেষ্ট। ড্যাগার সম্ভবত তার আসল নাম নয়, নিজের দেয়া নাম। এই লাইনে যারাই থাকে সবার নামেই এমন উদ্ভট উদ্ভট সব বিশেষণ যুক্ত থাকে।

ড্যাগার মন্টু করত না এমন কোন কাজ নেই, এই লাইনের কিংবদন্তি বলা যায় তাকে। শহরের ছোটবড় সকল মাস্তান, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, ছিনতাইকারী, পকেটমার, চোর আর ডাকাতদের নেতা ছিল সে। মন্টুর নামে থানায় যে কতগুলো কেস আছে তার ইয়ত্তা নেই, পুলিশকে জিজ্ঞেস করলেও হয়ত বলতে পারবে না। এত কেসের হিসাব পুলিশ কিভাবে রাখবে?
সরকারী দেলের নেতাদের শেষ ভরসা এই মন্টু। গত নির্বাচনে গফুর হাজী যখন শোচনীয়ভাবে হারতে যাচ্ছিল, তখন এই মন্টুই নাকি দলবল নিয়ে সব কেন্দ্র দখল করেছিল। অবশেষে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিলেন গফুর হাজী।
মন্টুর কথা আমি খুব বেশী কিছু জানি না, তবে আমার স্পষ্ট মনে আছে পাড়ার জোড়া খুনটার কথা। একই সাথে দুজন খুন হবার ঘটনা ওটাই আমাদের পাড়ায় প্রথম। সবাই যখন মন্টুর নামে কেস করতে গিয়েছিল, পুলিশ তখন কেস নিল না। কামাল সাহেবকে থানার ওসি বললেন, "ভাই, আর কত মামলা নেব মন্টুর নামে। জানেন তো, পনের বছর ধরে মন্টুকে খুঁজছি। পনের বছরেও যখন খুঁজে পেলাম না, আর পাবার আশা নাই। শুধু শুধু কেস করে কি লাভ, এর চেয়ে বাসায় গিয়ে নামাজ-কালাম পড়েন, দান-খয়রাত করেন, কাজে লাগবে।"

যখন ছোট ছিলাম, কত কি না চিন্তা করতাম - চোখের সামনে যারা জ্যান্ত মানুষ মেরে ফেলে, তারা কি মানুষ? তাদের হৃদয়ে কি কোন কোমলতা নেই? দয়া-মায়া নেই? ভালোবাসা নেই? মানুষকে কাঁদতে দেখলে আমার তো কান্না পায়, ওদের কি পায় না? কান্না না পাক, একটুও কি খারাপ লাগে না? কষ্ট হয় না?

পরদিনই পত্রিকার প্রথম পাতায় হেডলাইন হল মন্টু। বড় বড় লাল অক্ষরে লেখা, "টপ টেরর ড্যাগার মন্টুর আত্মহত্যা"। হেডলাইনটা শুধু আমাকেই না, সারা দেশের মানুষকে হতবাক হয়েছে। যে চোখের পলকে জ্যান্ত মানুষের লাশ ফেলে দিতে পারে, মানুষ মারা যার কাছে ছেলেখেলা, সে কেন আত্মহত্যা করবে?

নিউজটার কয়েকটা লাইন একবার পরে বিশ্বাস করতে পারলাম না, কয়েক বার পড়লাম, জোরে জোরে শব্দ করে পড়তে থাকলাম - "সামিনারর সাথে মন্টুর সাত বছরের ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। গত সপ্তাহে এক প্রবাসী ব্যবসায়ীর সাথে সামিনার বিয়ে হয়ে যায়। এই আকষ্মিক বিচ্ছেদের ব্যাথায় ভালোবাসার কাছে সহজ আত্মসমর্পন করে গতকাল ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে আত্মহত্যা করে মন্টু।"

প্রায় সপ্তাহখানেক হয়ে গেল, কিন্তু সহজ কিছু প্রশ্নের উত্তর শত চেষ্টা করেও খুঁজে পাচ্ছি না। যে ভালোবাসতে পারে, প্রিয়জন হারানোর বেদনায় যার মন কাঁদে, ভালোবাসার মানুষকে না পাওয়ায় যে জীবন দিতে পারে, পিঁপড়ার মত মানুষ মারা কিভাবে তার পক্ষে সম্ভব? মন্টু কি আমাদের মত সাধারণ একজন মানুষ? তার হৃদয়েও কি আনন্দ ছিল, দুঃখ ছিল, ভালোবাসা ছিল, ব্যাথা ছিল? হয়ত এককালে আর দশজনের মত আবেগে ভরা সাধারণ মানুষই ছিল মন্টু; আমাদের আঘাত আর সমাজের চাপে বাধ্য হয়েছে সে নিজেকে বদলাতে। সবকিছুই বদলে ফেলেছিল মন্টু, কেবল নিজের হৃদয়কে বদলাতে একটু দেরী করে ফেলেছে।

সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে আগস্ট, ২০১৩ রাত ১২:১৫
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

অভিনব প্রতারনা - ডিজিটাল প্রতারক

লিখেছেন শোভন শামস, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:১৮



একটি সাম্প্রতিক সত্য ঘটনা।
মোবাইল ফোনে কল আসল, একটা গোয়েন্দা সংস্থার ছবি এবং পদবী সহ। এই নাম্বার সেভ করা না, আননোন নাম্বার। ফোন ধরলাম। বলল আপনার এই নাম্বার ব্যবহার করে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আগে নিজেকে বদলে দিন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:৪১



"আমার স্বামী সংসারের কুটোটাও নাড়ান না। যেখানকার জিনিস সেখানে রাখেন না। মুজা খুলে ছুঁড়ে যেখানে সেখানে ফেলে দেন। নিজেকে পরিষ্কার রাখতে বারবার ভুল করেন! এতো বছর বিবাহিত জীবন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×