somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

উৎস আরণ্যক
হৃদয়ে আমার সাগর দোলার ছন্দ চাই অশুভের সাথে আপসবিহীন দ্বন্দ্ব চাই এখনো জীবনে মোহন মহান স্বপ্ন চাই দয়িতাকে ভালোবাসার মতোন লগ্ন চাই কবিতায় আমি তারার মতোন শব্দ চাই শান্তি আর কল্যাণময় অব্দ চাই।

বুক রিভিউ- চাঁদের অমাবস্যা

০১ লা মার্চ, ২০১৬ রাত ৮:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ-এর সর্বাধিক পঠিত, প্রশংসিত উপন্যাস নিঃসন্দেহে ‘লালসালু’। লালসালুতে পীরপ্রথা, মৌলবাদ, অজ্ঞানতা, সমাজ, মানুষ আর অর্থনৈতিক পরিবেশের যে সুন্দর, সুগঠিত এবং শিল্পিত চিত্র তিনি দিয়েছেন তার তুলনা বাংলা সাহিত্যে নেই। ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ মজিদ, যে কিনা ‘লালসালু’র মূল চরিত্র, তার ধূর্ততাও আমাদের কাছে সহনীয় আর স্বাভাবিক মনে হয়, তার কলমের যাদুর টানে। আমাদের মন তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে উঠলেও, আমরা শান্ত করি নিজেকে এটা ভেবে যে, এই অর্থনৈতিক পরিবেশে এটাই স্বাভাবিক। সেই সময়ের, স্থানের, মানুষের বর্ণনা ওয়ালীউল্লাহ দেন এভাবে-
“শস্যহীন জনবহুল এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের বেরিয়ে পড়বার ব্যাকুলতা ধোঁয়াটে আকাশকে পর্যন্ত যেন সদাসন্ত্রস্ত করে রাখে। ঘরে কিছু নেই। ভাগাভাগি, লুটালুটি, আর স্থানবিশেষে খুনাখুনি করে সর্বপ্রচেষ্টার শেষ নেই। দৃষ্টি বাইরের পানে, মস্ত নদীটির ওপারে, জেলার বাইরে- প্রদেশেরও; হয়তো-বা আরো দূরে। যারা নলি বানিয়ে ভেসে পড়ে তাদের দৃষ্টি দিগন্তে আটকায় না। জ্বালাময়ী আশা, ঘোরে হা-শুন্য মুখ-থোবড়ানো নিরাশা বলে তাতে মাত্রাতিরিক্ত প্রখরতা। দূরে তাকিয়ে যাদের চোখে আশা জ্বলে তাদের আর তর সয় না, দিনমান ক্ষণের সবুর ফাঁসির সামিল। তাই তারা ছোটে, ছোটে।”
এরকম এক সময়ে, অবস্থায় কি বাঁচতে চাওয়া খুব অপরাধ? আর মজিদ তো বাঁচতে চেয়েই মিথ্যের আশ্রয় নেয়। সে জানে, এ দেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ, এদের ভাঙিয়ে অন্তত বেঁচে থাকা যাবে। আর তার প্রতি পাঠকের এই সহানুভুতি শুধু তার লেখার গুনেই সৃষ্টি হয়। আসলে পাঠক চরিত্রগুলোর মতোই খুব বেশি দোলাচলে ভোগে তখন, সত্যাসত্য নিয়ে। তাই মাজিদের স্বার্থপর সমাজপতির মতো আচরণ, আমাদের তাকে ঘৃণা করতে উদ্বুদ্ধ করে, সে যখন খাতনা হয়নি বলে এক মধ্যবয়সীর শিন্নেরও চামড়া কেটে নেয়,তখন চঞ্চল হয়ে উঠি আমরা; আবার সত্যিই আবেগাক্রান্ত হয়ে পরি, যখন চিন্তা করি, সে বাধ্য এই মিথ্যাচার করতে। অন্তত বেঁচে থাকার জন্য। বেঁচে থাকার জন্য মানুষ কী না করে?
থাক, বাদ দেই ‘লালসালু’র কথা। ‘লালসালু নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে (যদিও উপন্যাসটি সেভাবে পঠিত হয়নি, পায়নি পাঠকপ্রিয়তা, সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বল অনেকে পড়েছেন বাধ্যহয়েই) কিন্তু এই অসাধারণ গুণী শিল্পির বাকি উপন্যাস দুটি প্রায় অপঠিত। চাঁদের অমাবস্যা আর কাঁদো নদী কাঁদো। আমি এখন, ‘চাঁদের অমবস্যা’ নিয়েই কিছু বলবো, যতটুকু উপলব্ধি করেছি।
‘চাঁদের অমাবস্যা’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৪ সালে। দ্বিতীয় উপন্যাস তাঁর। প্রথম উপন্যাস, বহুল আলোচিত ‘লালসালু’র (১৯৪৯) প্রায় ১১ বছর পর এর আবির্ভাব। প্রকাশিত হয় ‘নওরোজ কিতাবিস্তান’ থেকে। প্রচ্ছদ করেছিলেন নিজেই। (পরবর্তীতে সৈয়দ শামসুল হকও নিজের কয়েকটি বইয়ের প্রচ্ছদ নিজেই করেছিলেন)। বইটি তিনি লিখেছিলেন ফ্রান্সে অবস্থানকালে। উৎসর্গ পৃষ্ঠায় লেখা-
“এই উপন্যাসের বেশির ভাগ ফ্রান্সের আলপস পর্বত অঞ্চলে পাইন-ফার-এলম গাছ পরিবেষ্টিত ইউরিয়াজ গ্রামে লেখা হয়”
সে যাই হোক, “চাঁদের অমাবস্যা” নিঃসন্দেহে ব্যাতিক্রমধর্মী একটা রচনা। এর স্বাদ আলাদা; রচনারীতি অচেনা অনেকটা, ভাষা আলোআঁধারের, পরিবেশ পরিজন যদিও চেনা কিন্তু উদ্ভুত পরিস্থিতিতে অচেনা লাগে সবাইকে। মাঝে মাঝে মনে হয় কোন থ্রিলার পড়ছি বুঝি, কিংবা সিডনি সেলডনের রহস্য উপন্যাস কোন। কিন্তু এটা সস্তা কোন রহস্য উপন্যাস নয়। মানবজীবনের এক চরম উপাখ্যান। মানবমনের চিরন্তন খেলা, ভয়, লালসা, প্রেম, ধর্ম আর ধূর্ততার উপাখ্যান।
উপন্যাসটি শুরুই হয় অস্বাভাবিক এক মৃত্যু দিয়ে। দরিদ্র, অল্প শিক্ষিত এক যুবক, যে অন্যগ্রাম থেকে শিক্ষক হিসেবে এই গ্রামে এসেছে, সে, গভীর রাতে একজনকে অনুসরণ করতে গিয়ে জড়িয়ে পড়ে এক জীবনমরণ ফাঁদে। কাদের, সেই গ্রামেরই এক প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান, যাকে সবায়ই দরবেশ ভাবে, তাকে অনুসরণ করে শিক্ষক কৌতূহল বসে। স্কুলশিক্ষক আরেফ আলীর মন শুধু জানতে চেয়েছিল, “কী করে কাদের এতো রাতে?”। তার মনে হয়, কাদের দরবেশ মানুষ, তার কাছে জীনভূত আসাও অস্বাভাবিক নয়, সে তাই তাকে অনুসরণ করে। অনুসরণ করতে গিয়েই সে আবিষ্কার করে এক মৃতদেহ। যুবতীর। অর্ধউলঙ্গ- যার পায়ে পড়েছে বাঁশপাতা কেটে পালিয়ে আসা চাঁদের আলো।
শিক্ষক হতভম্ভ হয়ে পড়ে অনেকটা। সারারাত ছোটাছুটি করে সে, অকারণে। তার মনে হয় কেউ তাকে দেখছে, সবসময়। সেই রাতেই আবার তার কাদেরের সঙ্গেও দেখা হয়ে যায়, রহস্যজনকভাবে। কাদেরকে দেখে আরও ভীত হয়ে পড়ে শিক্ষক। সেই রাতে ভোরবেলা সে কোনরকমে নিজ ঘরে পৌঁছে।
তারপর পেঁচিয়ে যায় কাহিনী। সে কাদেরকে সাহায্য করে, মৃতদেহটা লুকিয়ে ফেলতে। কিন্তু তার মনে প্রশ্ন জাগে, কে, কেন, কীভাবে এই খুন করেছে। তার সন্দেহে কাদেরের নাম তালিকার শীর্ষে, কিন্তু সে মানতে পারে না। আরও গভীরে যায় সে, গভীরে, গভীরে। “গভীরে যাও আরও গভীরে যাও/ এই বুঝি তল পেলে/ ফের হারালে”। যখন সে খুঁজে পায় খুনিকে, বিস্মিত হয়ে যায়। বাকরুদ্ধ।
তারপর, সে এই দোলাচলে ভোগে যে, যে সত্যটা জেনেছে, সেটা প্রকাশ করবে কিনা। নিরন্তর দ্বিধায় ভোগে সে। আর লেখক আমাদের সামনে তুলে ধরেন তার মনে প্রতি মুহূর্তের আলোকচিত্র। সে দরিদ্র শিক্ষক- যদি যা সে জেনেছে, প্রকাশ করে তবে চাকরি খোয়ানো থেকে শুরু করে প্রাণে মরারও ভয় থাকে। কিন্তু নিজের ভেতরে তার নিরন্তর যুদ্ধ চলে, তার মনে হয় সে যদি লুকিয়ে রেখে সত্যটা, বেঁচে যায়, তবে সে বেঁচে থাকা হবে তেলাপোকার মতো বেঁচে থাকা। কিন্তু প্রকাশ করেই বা তার কী লাভ? যুবতীকে সে চেনে না, আগেও কোনদিন দেখেনি, তবে কেন রিস্ক নেবে?
এভাবেই এগিয়ে যায় কাহিনী, গল্প। শেষ না করা পর্যন্ত পাঠক থাকে নিরন্তর দ্বিধায়। এটা যেমন উপভোগ্য তেমনই ভয়ংকর। সব মিলিয়ে অনবদ্য এক উপন্যাস ‘চাঁদের অমাবস্যা’। না পড়লে পড়ে ফেলাটা জরুরী, খুব জরুরী।

সর্বশেষ এডিট : ০১ লা মার্চ, ২০১৬ রাত ৮:৩০
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এইচ এস সি রেজাল্ট ২০২৬ -ঢাকা বোর্ড

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৯

খুব অদ্ভুত ব্যাপার। আমাদের সময়ে চলে এলো নাকি? সেই চার দশক আগের মতন !
যা তথ্য পেলামঃ

In the 2026 HSC examinations, a total of 297,621 candidates appeared... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেখে শূন্য চাকত

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫২


কেমন করে সাজাও তুমি?
কলমের সাথে- খাতার প্রেম,
মাটির সাথে মৃত্যুর লাশ,
ঘাসের গায়ে ঘাসফড়িংর কাশ।
শেষ বিকালে ভাবনার সাথে
চিন্তার হয় রে অবকাশ-
সবিই যেনো শূন্যে প্রেমে আশ
হাত গুটানো-জীবনের নাশ;
বাস্তবতার হয় নির্দয় স্বার্থপর
সময়ের শুধুই... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের হ্যালোইন উদযাপন

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩


আজ ছিল হ্যালোইন। এই উৎসব ফসল কাটার মৌসুমের শেষ ও শীতের শুরু - এই উপলক্ষে হলেও বছরের এ সময়ে কানাডায় ঠান্ডা পড়ে যায়। তবে আজ আবহাওয়া ছিল ভালো। সারাদিন রোদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৫



সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

ফরাসি ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি বাক্য- Cherchez la femme। অর্থাৎ, ‘সেই মেয়েটিকে খোঁজ’।

ফরাসি লেখক আলেকজান্ডার ডুমা (Alexandre Dumas) ১৮৫৪ সালে তাঁর উপন্যাস Les Mohicans de Paris-এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

দারিদ্র্য কি মানুষকে মহান করে তোলে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৪৬


হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশের শেষ জনপ্রিয় লেখক। তিনি ছিলেন একাধারে একজন গুণী লেখক ও নাট্যনির্মাতা। হুমায়ূন আহমেদ সমুদ্রবিলাস নামে একটি নাটক নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে একজন শিক্ষক ছিলেন, নাম চ্যালেঞ্জার। তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×