কোন দেশে ডেমোক্রেসি চলবে, না, ক্রিপ্টোক্রেসি চলবে সেটা সেই দেশের জনগণের ব্যাপার।
ডেমোক্রেসি সম্পর্কে সবাই জানেন, এমন কি, সংবিধানেও ডেমোক্রেসির কথা লেখা আছে। তাই ডেমোক্রেসি নিয়ে বলার বা লেখার কিছু নাই। কিন্তু অনেক দেশেই ক্রিপ্টোক্রেসি শাসন চললেও সেটা সম্পর্কে অনেকের ধারণা নাই। ক্রিপ্টোক্রেসি সম্পর্কে ধারণা না থাকার কারণ ক্রিপ্টোক্রেসি শব্দের মধ্যেই নিহিত আছে।
"ক্রিপ্টোক্রেসি" শব্দটি গ্রীক শব্দ "ক্রিপ্টোস" থেকে উদ্ভূত হয়েছে, যার অর্থ "লুকানো" বা "গোপন", এবং "ক্র্যাসি" শব্দের অর্থ "শাসন" বা "সরকার"। এটি সরকার বা ক্ষমতা কাঠামোর একটি রূপকে বোঝায়, যেখানে প্রকৃত শাসক বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জনসাধারণের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আড়াল করা হয়। এই ধরণের সরকার ব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরণের গোপনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া বা গোপন অপারেশন পরিচালনা করে যা সাধারণ জনগণের জ্ঞান বা যাচাই ছাড়াই রাষ্ট্রের নীতি ও কর্মকে রূপ দেয়।
ক্রিপ্টোক্রেসি শাসনের মূল বৈশিষ্ট্য সমূহ:
১. স্বচ্ছতার অভাব:
ক্রিপ্টোক্রেসি শাসন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার অভাব থাকে। এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় প্রকৃত সিদ্ধান্ত কে গ্রহণ করছে এবং তাকে নিয়ন্ত্রণ করার পদ্ধতি জনসাধারণের দৃষ্টি থেকে লুকানো থাকে।
২. লুকানো শক্তি কাঠামো:
যদিও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে ব্যবহার করে এই শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করা হয় কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির হাতে প্রকৃত ক্ষমতা থাকে না। তার পরিবর্তে গোপন নেটওয়ার্ক, গোপন সোসাইটি বা অপ্রকাশিত জোট সরকারী কার্যাবলীকে নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনা করে।
৩. তথ্য ম্যানিপুলেশন:
গোপনীয়তা বজায় রাখতে এবং লুকানো শাসকদের এজেন্ডাকে যাতে জনসাধারণ সমর্থন করে সেই কারণে তথ্য ম্যানিপুলেশন করা হয়। রাষ্ট্রের প্রতিটা তথ্যকে শাসকের সুবিধা মত বিকৃত করে জনসাধারণের সামনে পরিবেশন করা হয়। এই ক্ষেত্রে সংবাদ মাধ্যম ক্রিপ্টোক্রেট শাসকদের সহযোগী শক্তি হিসাবে কাজ করে।
৪. জবাবদিহিতার অভাব:
জনগণের চোখের আড়ালে থাকা শাসকরা জনসাধারণের কাছে দায়বদ্ধ নয়। কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে তারা জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়। অবাধ এবং নিয়ন্ত্রণহীন ভাবে তারা ক্ষমতা প্রয়োগ এবং অপব্যবহার করতে পারে।
৫. বিত্তশালীদের প্রভাব:
ক্রিপ্টোক্রেসি শাসনের সাথে বিত্তশালী পরিবার এবং গোষ্ঠীগুলি জড়িত থাকে। যেমন বৈধ এবং অবৈধ ভাবে সম্পদ অর্জনকারী বিত্তশালী পরিবার, বড় ব্যবসায়িক কর্পোরেশন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলি (পুলিশ এবং সেনাবাহিনী)। এই পরিবার এবং সংস্থাগুলি পর্দার আড়াল থেকে পুরা শাসন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে।
কিছু উদাহরণ:
ক্রিপ্টোক্রেসি শাসন ব্যবস্থায় শাসকর, এই ব্যবস্থার সুবিধাভোগী এবং অন্ধ সমর্থকরা বেশ বেপরোয়া এবং নৃশংস তাই সব উদাহরণ দেয়া যাবে না।
ঐতিহাসিক উদাহরণ:
সোভিয়েত ইউনিয়নে কেজিবি, পূর্ব জার্মানিতে স্ট্যাসি, ইরাকে সাদ্দাম হোসাইনের মুখাবরাত ইত্যাদি ঐ দেশগুলিতে ক্রিপ্টোক্রেসি শাসন ব্যবস্থার মূল এবং গোপন চালিকা শক্তি ছিল। এই সব গুপ্ত বাহিনী দ্বারা ঐ সব দেশে ক্রিপ্টোক্রেসি শাসন পরিচালনা করা হত। এই গোপন পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলি জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করতে এবং শাসনের ক্ষমতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এই সব বাহিনীর প্রধান, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এবং পরিবারবর্গ রাষ্ট্রের অগাধ সম্পদের মালিক হয়।
আধুনিক রূপ:
নির্বাচিত সরকারের ভিতর ডিপ স্টেট হিসাবে ক্রিপ্টোক্রেসি শাসন কাজ করতে পারে। সামরিক বা বেসামরিক ব্যুরোক্রেসি, পুলিশ এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা নির্বাচিত সরকারের ভিতরে অবস্থান করে সরকার পরিচালনা করে। এই শাসনের সহায়ক শক্তি হিসাবে বিচার ব্যবস্থা এবং সংবাদ মাধ্যম এদের কর্মকাণ্ডকে জনগণের চোখের আড়ালে রাখতে সাহায্য করে। সংবাদ মাধ্যম এদের কর্মকাণ্ডকে আড়াল করে রাখে এবং বিচার ব্যবস্থা এদের আইনি রক্ষাকবচ প্রদান করে।
ষড়যন্ত্র তত্ত্ব:
ক্রিপ্টোক্রেসি শাসন ব্যবস্থায় ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বেশ কার্যকর। গোপন কর্মকাণ্ডের কোন কিছু প্রকাশ্যে চলে আসলে সেটাকে ষড়যন্ত্র এবং চক্রান্ত হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। কট্টর জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম, আদর্শিক চেতনা এবং ধর্মকে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সাথে মিশিয়ে ক্রিপ্টোক্রেসি শাসনের অবৈধ কর্মকাণ্ডকে জনসাধাৰন থেকে আড়াল করা হয়।
গভীর অনুধাবন:
শুধু মাত্র রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার এবং কিছু কূটনৈতিক বিষয় ছাড়া বাকি সব বিষয় জনগণের জানার অধিকার আছে। নির্বাচন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির মাধ্যমে শাসকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে না পারলে ক্রিপ্টোক্রেসি শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার আর কোন বিকল্প পথ নেই। জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ করে ক্রিপ্টোক্রেসি শাসন আরো শক্তিশালী এবং বেপরোয়া হয়ে উঠবে।
ক্রিপ্টোক্রেসি শাসনে একটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তা যেমন বিঘ্নিত হয়, তেমনি আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হয়। তাই আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং অনেক বিদেশি রাষ্ট্র ক্রিপ্টোক্রেসি শাসনের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে চায়। ক্রিপ্টক্রেট শাসক এবং এর সমর্থকরা এই প্রচেষ্টাকেও ষড়যন্ত্র হিসাবে চিহ্নিত করে।
ক্রিপ্টোক্রেট শাসকরা চায় অন্য দেশেও ক্রিপ্টোক্রেট শাসন ব্যবস্থা বজায় থাকুক। এতে জনস্বার্থ বিরোধী তাদের গোপন কর্মকাণ্ড এবং জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ করতে সুবিধা হয়। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক সরকারের পক্ষে আরেকটি গণতান্ত্রিক সরকারের সাথে কাজ করতে অনেক সুবিধা জনক।
সারসংক্ষেপ:
ক্রিপ্টোক্রেসি জনগণের কাছ থেকে লুকানো এবং গোপনীয় একটি শাসনব্যবস্থা। যেখানে রাষ্ট্রের প্রকৃত শাসন ক্ষমতা জনসাধারণের দৃষ্টির বাইরে থাকে। এই ধরণের শাসন ব্যবস্থায় শাসকদের কর্মকাণ্ডের কোন জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতা থাকে না। শাসকরা তাদের ইচ্ছা অনুসারে ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারে। তাই যেসব দেশে ক্রিপ্টোক্রেসি শাসন বিদ্যমান সেই সব দেশে উন্মুক্ত ও গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলা প্রয়োজন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে সরকারের জবাবদিহিতা বাড়ার সাথে সাথে লুকানো প্রভাবগুলি বিলুপ্ত হবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ বন্ধ হবে।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জুন, ২০২৪ রাত ৩:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



