somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সিরাজ সিকদার: এক অপূর্ণ বিপ্লবীর জীবনগাঁথা

০৯ ই মার্চ, ২০১৬ দুপুর ১:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

Click This Link

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও প্রস্তুতি: সিরাজ সিকদারের রাজনৈতিক জীবনের শুরু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি এবং ১৯৬৬ সালে বুয়েটে শেরে বাংলা হলের নির্বাচিত সহ-সভাপতি হিসেবে। প্রথম জীবনে তিনি তৎকালীন পুর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির (হক-তোয়াহা) সাথে যুক্ত ছিলেন। কিন্ত হক-তোয়াহার রাজনৈতিক লাইনকে ভুল আখ্যায়িত করে তিনি সে পার্টি ত্যাগ করে, ১৯৬৭ সালে ঢাকার মালিবাগে “মাওসেতুং চিন্তাধারার গবেষনা কেন্দ্র” স্থাপন করে মাওসেতুং তথা মার্কসীয় দর্শন অধ্যয়নের একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। সে সময়ে দেশের অন্য কমিউনিস্ট ও বামপন্থীরা এ ধরনের গবেষনা কে টেস্টটিউব গবেষনা বলে বিদ্রুপ করতেন এবং সিরাজ সিকদারের দানা বেধে উঠা পার্টি প্রক্রিয়াকে টিটি (টেস্ট টিউব) বলে অভিহিত করতেন। মজার তথ্য হলো, সে কেন্দ্রটি তৎকালীন তথাকথিত জামাতদের চাপে পাকিস্তান সরকার নিষিদ্ধ করে দেয়। তথাকথিত জামাতিরা তাদের শত্রু চিনতে ভুল করেনি। (সুত্র: বাংলাপেডিয়া: সিরাজ সিকদার)। সৈয়দ আবুল মকসুদকেও সিরাজ সিকদার একথা বলেছিলেন বলে মকসুদ একটি নিয়মিত কলামে উল্লেখ করেছিলেন।

রাজনৈতিক কার্যকলাপ: কিন্তু সিরাজ সিকদার সে সময়ে সঠিকভাবে মার্কসীয় আলোকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে প্রথম দলিল প্রকাশ করে বামপন্থী মহলের দৃষ্টি আকর্ষন করেন। আগ্রহী ও অগ্রসর পাঠকেরা ইংরেজীতে অনুদিত তার দলিলটি পড়তে পারেন।

১৯৬৮’র ৮ই জানুয়ারী সিরাজ সিকদার পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির মূল প্রস্তুতি সংগঠন পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৮ সালেই সিরাজ সিকদার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তানের উপনিবেশ এবং সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে জাতীয় গনতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করে একটি স্বাধীন, প্রগতিশীল এবং সমাজতান্ত্রিক পুর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। (সিরাজ সিকদারের দলিল)। এই সালেই তাঁর পার্টির গেরিলারা ঢাকাতে জাতীয় পূনর্গঠন কেন্দ্রে (NBR), পাকিস্তান কাউন্সিলে এবং আমেরিকান তথ্যকেন্রে বোমা আক্রমন চালিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেন। ১৯৬৯ সালে পুর্ব বাংলার ছাত্র-গন আন্দোলনে শ্রমিক আন্দোলনের কর্মীদের সাহসী ভুমিকা বামপন্থী মহলে প্রশংসা অর্জন করে।

১৯৭০ সালের ৩রা ডিসেম্বর পল্টনে মওলানা ভাসানীর জনসভায় পুর্ব বাংলার জাতীয় গনতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার আহ্বান সংবলিত লিফলেট এবং ভবিষ্যতে স্বাধীন পুর্ব বাংলার পতাকা বিতরন করে। সে পতাকাটি, সিরাজ সিকদারের অনুসারীদের ভাষায়, এখনকার বাংলাদেশের পতাকা যার ডিজাইন করেছিলেন শ্রমিক আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় কর্মী অবাঙ্গালী আজমী (সুত্র: ব্লগে)। [আমিও সে লিফলেট ও পতাকা দেখেছি, তবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করছিনা।]

স্বাধীনতা যুদ্ধ ও সিরাজ সিকদার: ১৯৭০ সালের শেষের দিকে সিরাজ সিকদার তাঁর কেন্দ্রীয় কার্যালয় বরিশালের পেয়ারা বাগানে স্থানান্তর করেন এবং একটি বাহিনী গড়ে তুলতে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৭১ সালের ৩রা জুন সিরাজ সিকদার আন্দোলনের পরবর্তী ধাপ, একটি পূর্নাঙ্গ কমিউনিস্ট পার্টি, পুর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। অতিদ্রুত সেই বাহিনী বরিশাল, ফরিদপুর, মুন্সীগঞ্জ, ময়মনসিংহ সহ পূর্ব বাংলার বিভিন্ন স্থানে বিকাশিত হয়ে পাকিস্তানীদের দুঃশ্চিন্তার কারন হয়ে দা্ঁড়ায়। পাকিস্তানি সেনা বাহিনী গান বোট এবং হেলিকপ্টার ব্যবহার করেও সিরাজ সিকদারের মূল ঘাটি ভাঙ্গতে ব্যর্থ হয়ে, হাজার হাজার বাঙ্গালীকে বন্দুকের মুখে পেয়ারা বাগান কাটাতে বাধ্য করে। এই সময়েই সিরাজ সিকদার তাঁর অত্যন্ত বিখ্যাত দলিল, “ছয় পাহাড়ের দালালদের নির্মূল করুন” শীর্ষক দলিল ও প্রচারনাপত্র রচনা করেন। সে দলিলে তিনি সঠিকভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পরিনতি নিয়ে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎবানী করেন। যা সত্য বলে প্রমানিত হয়েছিলো। ১৯৭১ এর আগস্ট মাসে সিরাজ সিকদারের নেতৃস্থানীয় সহযোগী আজমীকে আলোচনার কথা বলে ডেকে নিয়ে হত্যা করে। আজমীর স্মরণে সিরাজ সিকদার একটি কবিতায় বলেছেন, “উত্তর প্রদেশ থেকে এসে তুমি হলে বাংলার বেথুন”!! এরপরেই মুজিব বাহিনীর প্রতিআক্রমনে সর্বহারা পার্টি যুগপৎ পাকিস্তানি বাহিনী ও মুজিব বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়।

সিরাজ সিকদারের স্বাধীনতা পরবর্তী ভুমিকা: স্বাধীনতার পরে পরে সিরাজ সিকদার ১৮টি দাবী সংবলিত একটি লিফলেট শেখ মুজিবকে উদ্দেশ্য করে প্রকাশ ও প্রচার করেন। সেখানে দেশপ্রেমের প্রমান দিতে সেই ১৮টি দাবী (যার মূল সুর ছিলো ভারতীয় সম্প্রসারনবাদের কবল থেকে মুক্তি) পূরনের আহ্বান জানান। অতি স্বাভাবিকভাবেই শেখ মুজিব বা সরকার এ লিফলেটের কোন প্রতিক্রিয়া দেখাননি। এরপরেই সিরাজ সিকদার শেখ মুজিবকে ভারতের দালাল ও বাংলাদেশকে ভারতের উপনিবেশ বলে রাজনৈতিক প্রচারনা শুরু করে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তাঁর প্রধান দাবীগুলোর মধ্যে যা জনপ্রিয়তা অর্জন করে তা হলো, ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক নিয়ে যাওয়া পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অস্ত্র ফেরত আনার দাবী, আওয়ামী লীগের একাংশের নির্বিচার লুন্ঠন এবং সরকারের ফ্যাসিবাদী শাসননীতির বিরুদ্ধে। একই সাথে সর্বহারা পার্টির গেরিলারা ৭৩-৭৪ সালে ১৪টি থানা এবং ৭৯টি পুলিশ ফাঁড়ি লুট করে অত্যন্ত শক্তিশালী সশস্ত্র কমিউনিস্ট পার্টিতে পরিনত হয়। ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে সর্বহারা পার্টি ১৬ই ডিসেম্বরকে কালো দিবস আখ্যা দিয়ে দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করে এবং গ্রামাঞ্চলে ও অনেক ছোট শহরে সে হরতাল পালিত হয়। (সিরাজ সিকদার তাঁর “ছয় পাহাড়ের দালালদের নির্মূল করুন” শীর্ষক প্রচারপত্রে পাকিস্তানীদের পরাজয় এবং ভারতের সহযোগিতায় অর্জিত জয়কে বাংলাদেশের জনগনের উত্তপ্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে পতনের তুল্য হবে বলে ভবিষ্যৎবানী করেছিলেন। তিনি ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছিলেন সে সীমান্ত লোপ পাবে, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ভারত কর্তৃক বাধাগ্রস্থ হবে এবং বাংলাদেশের সরকার ভারতের অনুগত হবে )। একই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামে কমরেড মানবেন্দ্র নারায়ন লারমার সহযোগিতায় ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে পদচ্যুত লে. কর্ণেল জিয়াউদ্দিনের পরিচালনায় একটি কোম্পানী সৃস্টি করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থান কালে সিরাজ সিকদার তাঁর আশাবাদী মনের পরিচয় রেখে একটি কবিতায় লিখেছেন, “…পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে যায় মুরং তরুনী। অঙ্গে তার ছোট্ট আবরনী, কী নিটোল স্বাস্থ্যবতী। কবে তার কাঁধে শোভা পাবে রাইফেল একখানি?”

গ্রেফতার ও হত্যা: ১৯৭৪ সালের ৩০শে ডিসেম্বর চট্টগ্রামে গ্রেফতার হয়ে সিরাজ সিকদার ঢাকায় আনীত হন এবং ২রা জানুয়ারী ১৯৭৫ সালে রক্ষীবাহিনীর কেন্দ্রীয় দপ্তর সাভারে সাজানো বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।

ভুল-ত্রুটি নিয়েও একটি কমিউনিস্ট আন্দোলনকে সাফল্যের সাথে সিরাজ সিকদার এগিয়ে নিয়ে গেছেন। কমরেড সিরাজ সিকদার জিন্দাবাদ।

সূত্রঃ http://blog.bdnews24.com/Bang_la/142111
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই মার্চ, ২০১৬ দুপুর ১:০৭
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আম্রকাননের আগুন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ৩১ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:২১


আম্রকাননের আগুন

এপ্রিলের এক দুপুর।
বাতাসে বারুদের গন্ধ, আকাশে অনিশ্চয়তার মেঘ।
মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় আমগাছের ছায়ায় এসে দাঁড়ালেন কয়েকজন মানুষ।
দূরে চুয়াডাঙ্গা জ্বলছে, তবু এখানে শপথ।
একটি আমবাগান সেদিন হয়ে উঠল একটি দেশের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ব্লগ -৮ ভগ্ন শাখা- ভগ্ন জীবন

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ৩১ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:২৫

জীবনের ভগ্নদশা অনেকটা এমন এক বৃক্ষের মতো, যার ডালপালা একে একে বিলুপ্ত হয়েছে।

একসময় যে শাখাগুলোতে স্বপ্ন, সম্পর্ক ও সম্ভাবনার পাতা দুলত, আজ সেখানে শূন্যতা ও নীরবতা। তবু কাণ্ডটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

/স্বাধীনতা বিরোধীদের safe home আগে ছিলো লিবিয়া আর এখন হলো তুরস্ক।

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ৩১ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:১২

/স্বাধীনতা বিরোধীদের safe home আগে ছিলো লিবিয়া আর এখন হলো তুরস্ক।

/শুধু তাই না, তারা খোলাখুলি ভাবেই আমাদের স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াতের সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। ৭১ এর মানবতাবিরোধী অপরাধের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাদ্রাসা ও জঙ্গী আতঙ্কের অর্থনীতিতে এক নির্বোধজীবি আত্মভোলা জাতির আয়না

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ৩১ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩

এক

বুদ্ধিজীবিরা নাকি জাতির বিবেক! তা সে তো ভালো কথা। কিন্তু সাধারণত যা ভালো তা যখন খারাপ তখন সাধারণত তা খুবই খারাপ। একটা জাতির সবচেয়ে মজার কিন্তু করুণতম দৃশ্য হলো তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাষ্ট্র ব্যর্থদের দায়িত্ব নেয় নাকি ব্যর্থতার সংজ্ঞাই রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত হয়???

লিখেছেন সুব্রত দত্ত, ৩১ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৪

আমাকে যারা চেনেন অথবা আমার অন্যান্য লেখা যাদের পড়া আছে তারা জানেন আমি একজন নিহিলিস্ট। একজন নিহিলিস্ট ‘রাষ্ট্রধারণা’য় বিশ্বাসী নয়। রাষ্ট্র সম্পর্কে সে উদাসীন। আমি নিজেও রাষ্ট্র সম্পর্কে উদাসীন। কিন্তু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×