somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জনগণ কী অব্যবস্থাপনা ও অ-টেকসই কিংবা হরিলুট উন্নয়নের সাজা পেতে যাচ্ছে?

০৮ ই আগস্ট, ২০২২ সন্ধ্যা ৬:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বাংলাদেশের অবস্থা কি এখন ‘গজকপিত্থবৎ’...? অদ্ভুত শব্দবন্ধটি কালেভদ্রে ব্যবহার করা হয় ‘অন্তঃসারশূন্য অবস্থা’ বুঝাতে। এখানে গজ অর্থ হল এক ধরনের ক্ষুদ্র কীট। কপিত্থ অর্থ হল কদবেল। কদবেল গাছ বানরের প্রিয় বিচরণস্থল বলে এই গাছের ফল কপিত্থ নামে পরিচিত হয়েছে। কদবেলের বোঁটার কাছে অত্যন্ত ক্ষুদ্র ছিদ্র করে গজপোকা ভেতরে ঢুকে ধীরে ধীরে কদবেলের মূল অংশ খেয়ে ফেলে। বাইরে থেকে বুঝা যায় না যে, পোকায় খেয়ে ফেলা কদবেল আসলেই অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়েছে।

সংস্কৃত প্রবাদে আছে----
আগচ্ছতি যদা লক্ষ্মীর্নারিকেলফলাম্বুবৎ।
নির্গচ্ছতি যদা লক্ষ্মীর্গজভুক্তকপিত্থবৎ।।

অর্থাৎ- নারিকেলে কোথা থেকে জল আসে কেউ যেমন তা জানে না তেমনি লক্ষ্মীও আসেন সবার অগোচরে। আবার লক্ষ্মী যখন চলে যান তখন সংসার বাইরে ঠিকঠাক মনে হলেও গজের খেয়ে ফেলা কদবেলের মতো ভেতরটা সারশূন্য হয়ে পড়ে। বাইরে থেকে আসলটা বুঝা যায় না। অর্থাৎ শূন্যগর্ভ সংসার গজভুক্ত কপিত্থবৎ (গজপোকায় খাওয়া কদবেলের মতো)। (‘প্রবাদের উৎস সন্ধানে’- সমর পাল)



কী সমাজব্যবস্থা, কী রাজনীতি, কী অর্থনীতি? এখন সবই গজকপিত্থবৎ। সমাজের প্রতিটি রূন্ধ্রে রূন্ধ্রে গজপোকারা ঢুকে মূলটুকু খেয়ে ফেলেছে/ফেলছে।

কুলাঙ্গার বাবা/মা আরো অধিক কুলাঙ্গার মেয়ে/ছেলের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাফাই গায়। অসৎ সরকারি কর্মকর্তা সৎ কথা বলে দেশের সমৃদ্ধি আনতে চায়। নীতিহীন রাজনীতিবিদ নীতির কথা বলে অপনীতির রাজনীতি করে। তাদের নষ্ট চেলাচামুণ্ডারা ভ্রষ্ট পথে চলে জনগণের কষ্ট বাড়িয়েই চলেছে। অসাধু ব্যবসায়ী সাধুতার শুভ্র আচ্ছাদনে মুখ লুকিয়ে অসততার নতুন নতুন নজির সৃষ্টি করে চলেছে। মানবসেবায় যার মুখ্য কর্ম হওয়া উচিত, সেই ডাক্তার শ্রেণি এক ধরনের আত্ন-প্রবঞ্চনায় মত্ত হয়ে দেশের স্বাস্থ্য খাতকে অস্বাস্থ্যকর করে তুলেছে। আইনের মাধ্যমে ন্যায়ের কথা বলে অসহায়দের সহায়তা করবে যে আইনজীবী-বিচারক, তাঁরা আজ অন্যায়কে ন্যায়ের মোড়কে বোতলবন্ধি করে বাজারজাত করছে। এভাবে শিক্ষকতা-ব্যাংক-বীমা থেকে শুরু করে প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষই কী এক ফেরোমনের গন্ধে চোরাপথে শুধু ছুটছে আর ছুটছে। এখানে এথিকস-মুল্যবোধ কিংবা ভালোত্বের এক কানাকড়ি দাম নেই।

এইভাবে কদবেলের ভেতরটা খেয়ে দেয়ে খেটে খাওয়া আপামর জনগণের জন্য শুধু চকচকে খোলস সর্বস্ব কাঠামোটা রেখে দিচ্ছে।
আর এইসব অবক্ষয় দেখার পরেও আম জনগণের অবস্থাও হয়েছে ‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে’। মানে যেমন যাচ্ছে দিন যাক না। ‘অন্যরা মরল কি বাঁচল তাতে আমার কি আসে যায়?’ যতক্ষণ না নিজে সেই চোরাবালিতে আটকে যাই ততক্ষণ এই বোধোদয় আমাদের কারোই হয় না। এ এক অদ্ভুত অবস্থা!

এটা কি শুধুই নতুন চেতনার সমাজব্যবস্থার ফলে নিষ্ঠুর উদাসীনতা? নাকি কোনো রহস্যময় কালো চাদরে ঢাকা অজানা ‘ভয়’! নাকি ভয়ের কারণেই উদাসীনতা নামের ছলনা!

অনেকে হয়ত মনে করে এ আর এমন কী! গণতন্ত্রে এই রকম সামান্য অন্যায়-অবিচার চলতেই পারে। থামুন মশাই!!

জার্মানিতে বাচ্চাছেলেদের শুনানোর জন্য একটি লোকগীতি আছে। সেখানে দেখানো হয়েছে কীভাবে সামান্য একটি পেরেকের অভাবে রাজত্ব হারিয়ে যেতে পারে?

For want of a nail, the shoe was lost
For want of a shoe, the horse was lost
For want of a horse, the rider was lost
For want of a rider, the battle was lost
For want of a battle, the kingdom was lost
And all for the want of a horseshoe nail.

অর্থাৎ একটি পেরেকের অভাবে ঘোড়ার খুর কাজ করে নি। খুরের সমস্যার ফলে ঘোড়া কাজ করে নি। ঘোড়া না থাকাতে অশ্বারোহী সৈন্য পাওয়া যায় নি। অশ্বারোহী সৈন্যের অভাবে যুদ্ধে হেরে গেল। যুদ্ধ হেরে যাওয়াতে রাজত্ব হারালো। এ সব কিছু ঘটল ঘোড়ার খুরের একটি পেরেকের অভাবে। বাটার ফ্লাই ইফেক্টের সাথে তুলনা করা যেতে পারে।

তাই ‘সুশাসন’কে যদি ‘পেরেকে’র সাথে তুলনা করা যায় তাহলে আমরা এই বাচ্চাছেলেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কতটা আশাবাদী। আকবর আলি খান তাঁর ‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’ বইয়ে এই নিয়ে বিস্তর বর্ণনা দিয়েছেন।

কোভিড বাবু ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কদবেলের এই চকচকে খোলসটাকে আছড়ে ভেঙে ফেলে দেখিয়ে দিলো যে ভেতরে শুধুই ফাঁকা এক মহাশূন্য?



উপরের লেখাটি ২০১৮ সালে লিখেছিলাম এই ব্লগে। আমার প্রায় লেখাতে বারবার বলার চেষ্ঠা করেছি উন্নয়ন সাসটেইনেবল না হলে এর কুফল জাতিকে ভোগ করতে হবে একদিন। ঠিক চার বছর পরে কদবেলের সেই খোলস ভেঙ্গে পড়ে ভেতরের কদর্য রূপটি উন্মোচিত হচ্ছে এখন।

যদিও এতে ‘রাঘব বোয়াল’ ও দেশ-বিদেশ থেকে সিঙ্গাপুর-কানাডা দেখা তাঁদের চাটুকার শ্রেণি তথা হালুয়া-রুটির ভাগিদারদের কিছু যায় আসে না। জনগণের হাতে ‘ভোট’ নামক যে হাতুড়ি নেতাদের পশ্চাতে গদাম দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকত সেই হাতুড়ি তো এখন দেশপ্রেমিক ‘মহান নেতা’র আশির্বাদে জাতীয় জাদুঘরে খাঁটি সরিষার তেল দিয়ে যত্নে রাখা হয়েছে। আর তাই সারের দাম বস্তা প্রতি ৪০০ টাকা বাড়লেই কী আর ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ৫০% বাড়লেই কী? তারা তো আর ধান-চাল উৎপাদন করবে না। ঢাকা শহরে যে ব্যক্তি ২৫/৩০ হাজার টাকা বেতনে চার/পাঁচ সদস্য নিয়ে বাস করছে, তারা কীভাবে জীবনযাত্রা নির্বাহ করছে/করবে, এটি নব্য গোয়েবলসরা সযতনে এড়িয়ে যাবে। কদবেল ভাঙ্গলে তো নাঙ্গা দশা। নিজেকে পাবলিক প্লেসে কে নাঙ্গা দেখতে চায়?

অথচ কী সুযোগটাই না ছিল দেশকে প্রকৃত অর্থেই ধাপে ধাপে মালয়েশিয়া-দক্ষিণ কোরিয়া-সিঙ্গাপুর স্টাইলে (অথোরিটারিয়ানিজম) উন্নতির শিখরে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু চাইলেই তো সবাই সবকিছু করতে পারে না বা হতে পারে না। এর জন্য সর্বপ্রথম দরকার একটি স্ট্রং এথিকস। গোটা জাতির এখানেই মাজাভাঙ্গা অবস্থা। দুর্বল ভিত্তির উপর যে ঘর তৈরি করা হয়েছে, তা আজ হোক কাল হোক ভেঙ্গে পড়বেই, এটা গোয়েবলসরা জেনেও না জানার ভান করলেও দেশের প্রতিটা লোক জানে…কবে সেটাই দেখার বিষয়? এখনও সময় আছে সাধুর ভান না করে সত্যিকারের সাধু সাজা দেশ ও জাতির স্বার্থে! যদি প্রকৃত অর্থেই দেশপ্রেম নামক মহার্ঘ বস্তুটির বিন্দু পরিমাণ হলেও অবশিষ্ঠ থেকে থাকে তথাকথিত মহামানবদের?
**********************************
@আখেনাটেন-২০২২
ছবি: Zahoor, Dawn
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই আগস্ট, ২০২২ সন্ধ্যা ৬:৫৭
২০টি মন্তব্য ২১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ব্লগ জানাচ্ছে আমার ব্লগিংয়ের বয়স ৯ পেরিয়ে ১০ এ পড়েছে

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ০৬ ই অক্টোবর, ২০২২ রাত ১২:২০

সময় যে কত দ্রুত গড়ায়! অথচ মনে হয় এই তো সেদিন ব্লগ খুললাম।

ব্লগ সম্পর্কে প্রথম শুনি গণজাগরণ মঞ্চের উত্থানের সময়। শাহবাগের সেই আন্দোলনের ঢেউ সারাদেশে আছড়ে পড়েছিল। ব্লগের একটা আহবান... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা ব্লগে এক যুগ

লিখেছেন কাছের-মানুষ, ০৬ ই অক্টোবর, ২০২২ ভোর ৫:২২

ব্লগ-এ আমার একযুগ পূর্ণ হল!

আমি সাধারণত বছর শেষে বর্ষপূর্তি-মর্ষমুর্তি নিয়ে উহ আহ করি না! তবে এবছর মনে হল এক যুগ বাংলা ব্লগে কাটিয়ে দিলাম! সেই হিসেবে ডাইনোসর আমলের ব্লগার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ব্লগ

লিখেছেন কেএসরথি, ০৬ ই অক্টোবর, ২০২২ সকাল ৮:৩০

২০২০এ শুরু করেছিলাম এই ব্লগটা। এখন ২০২২! যাই হোক! তাও শেয়ার করলাম।
---------------------------------------------

ফুল বাগানে হাটাহাটি, টরন্টো 2020





পাতা ঝড়ার দিন, টরন্টো, 2020







তুষার ঝড়ের পর কোন এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন প্রকৃত গুনীজনই আরেকজন প্রকৃত গুনীজনের কদর.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৬ ই অক্টোবর, ২০২২ সকাল ৯:২০

একজন প্রকৃত গুনীজনই আরেকজন প্রকৃত গুনীজনের কদর বুঝতে পারে....



প্রখ্যাত গায়ক মান্না দের একবার বুকে ব্যাথা হয়, তখন তিনি ব্যাঙালোরে, মেয়ের বাড়িতে। তিনি দেবী শেঠির নারায়ণা হৃদয়ালয়ে ফোন করে জানালেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

তোমাদেরই একজনা ( দশ বছর শেষে ব্লগ জীবনের এগারো বছরে পদার্পনে...)

লিখেছেন সেলিম আনোয়ার, ০৬ ই অক্টোবর, ২০২২ দুপুর ১:০২



এখনো যে ঢের বাকি—
কল্পনার ফানুস এঁকে গন্তব্যে দু'চোখ রাখি
অপার মিথোজীবিতায় যেতে যে হবে বহুদূর
চলার পথে আসলে আসুক বাঁধা—
পেরোতে হয় যদি দূর— অথৈ সমুদ্দুর
ভয় কী
তোমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×