দেশের সব মানুষের মানবাধিকার রক্ষায় স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন গঠিত হয়েছে। এরই মধ্যে কাজও শুরু করেছে। দেশে নতুন নতুন গণমাধ্যম প্রকাশ ও প্রচারের অনুমতি পাচ্ছে। এসব খবর নিঃসন্দেহে সবার জন্য উত্সাহব্যঞ্জক। দেশের নাগরিকরা এমন কার্যক্রমে সরকারকে প্রশংসাই করবে। কেননা নতুন ১০টি টেলিভিশন কিংবা ৫টি দৈনিক পত্রিকা চালু হলে অনেক শিক্ষিত বেকারের চাকরি হবে। আবার গণমাধ্যমও মুক্ত প্রতিযোগিতায় নিজেদের মেলে ধরতে পারবে। আর এমন প্রতিযোগিতা সাধারণত গণতন্ত্রকে সুসংহতই করে।
এমন ইতিবাচক উদ্যোগ দেখে যেমনি নাগরিক হিসেবে আমরা খুশি হই, তেমনি এর বিপরীত কিছু ঘটলে তাও আমাদের কষ্ট দেয়। মানবাধিকার রক্ষার উদ্যোগে জনগণের আনন্দিত হওয়ার জায়গাটা যেমনি সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি মানবাধিকার যদি নিভৃতে কাঁদে তাতে দেশবাসীর দুঃখিত হওয়াটা আরও বেশি জোরাল হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি মোহনা ও মাই টিভিসহ নতুন কিছু টেলিভিশন আসছে শুনে ভালোই লাগছে। সম্প্রচারও শুরু করেছে কোনো কোনো স্টেশন। এটা নিঃসন্দেহে সুখকর খবর। পক্ষান্তরে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা ও চ্যানেল ওয়ানসহ দেশে কিছু গণমাধ্যম বন্ধ হওয়ার খবরে আমরা কষ্ট পেয়েছি। এটা নিঃসন্দেহে একটি নেতিবাচক সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত দেশ ও জাতিকে পেছনে টেনে নেয়ার উদ্যোগ হিসেবেই দেখছি আমরা। একজন শিক্ষক হিসেবে যখন সহকর্মী কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করি, তখন কষ্ট অনুভব করি।
কেননা, সাধারণ কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে সেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেকার হওয়া এবং অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তের বিষয় জড়িত থাকে। কিন্তু গণমাধ্যম বন্ধ হলে এসবের পাশাপাশি মুক্তচিন্তা ও তথ্য জানার অধিকারকে হরণ করা হয়। সত্য খবর প্রকাশের ওপর ক্ষমতাশালীদের খড়গে সত্য তথ্য চাপা পড়ে যায়। সরকারের এ ধরনের কার্যক্রম জনগণের মানবাধিকারকে পদদলিত করে।
আর মানবাধিকার প্রশ্নে দৈনিক আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার ও বিভিন্ন উদ্দেশ্যমূলক মামলায় তাকে কারাগারে আটকে রাখার ঘটনা নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেশের যে কোনো মানুষকে ব্যথিত করবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে অনুভব করেছি, মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতারে সত্যিই আমাদের গণমাধ্যমে বড় ধরনের হুমকিতে আছে। শুধু গ্রেফতার নয়, তাকে একাধিকবার রিমান্ডে নেয়া, উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিভিন্ন মামলা দিয়ে হয়রানির পর অন্য সম্পাদক ও সাংবাদিকরা তথ্য জেনেও নিঃসন্দেহে সত্য লিখতে চাইবেন না। একজন পেশাজীবী হিসেবে আমার মনে হয়, মাহমুদুর রহমানকে মুক্তি দেয়ার মধ্যেই এখন বাংলাদেশের মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অনেকটা নির্ভর করছে।
কেননা মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হচ্ছে, তা নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন তোলার সুযোগ আছে। কেননা এক-এগারো সরকার বহু চেষ্টা করেও তার বিরুদ্ধে কোনোভাবে অভিযোগ আনতে পারেনি। তিনি যখন আপসহীনভাবে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে দেশে পুনরায় গণতন্ত্র আনার চেষ্টা করেছেন, তখন জরুরি সরকার তাকে গ্রেফতারের বহু চেষ্টা করেছে বলে আমরা শুনেছি। কিন্তু ফাঁকফোকর পায়নি। এক-এগারো সরকারকে বিদায় জানাতে যেক’জন ব্যক্তি বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন তাদের মধ্যে মাহমুদুর রহমান একজন।
বর্তমান আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের বিরুদ্ধেও আমার দেশ পত্রিকাকে সঙ্গে নিয়ে মাহমুদুর রহমান সত্য প্রকাশের যে আপসহীন ভূমিকা রেখেছেন, তা নিয়ে মানুষের মুখে নানা বিশ্লেষণ আছে। অনেকে এমনও বলছেন, সরকারের প্রথম বছরেই দুর্নীতি-অনিয়মের খবর প্রকাশসহ সরকারের সমালোচনা করেই তিনি নিজের বিপদ ডেকে এনেছেন। বিষয়টি আমার কাছে হাস্যকর মনে হয়। সত্য প্রকাশ করায় সরকারের শক্তি কিংবা মেয়াদের প্রথম বা শেষের প্রশ্ন আসছে কেন? সত্য সবসময়ই সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টাই তো আমাদের মহামানবরা করেছেন। সে পথ ধরে আমাদের এগুলে দোষ কোথায়?
তবে কি মাহমুদুর রহমান এ সত্য পথ ধরে এগুতে চেষ্টা করে অন্যায় করেছেন! আর এ অন্যায়ের জন্য তিনি দু’মাসেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে দুঃসহ জীবনযাপন করছেন। পত্রিকায় পড়েছি, ‘তাকে বর্বর কায়দায় গ্রেফতারের পর ১২ দিন রিমান্ডে নিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। রিমান্ডের পৈশাচিক কাহিনীর কিছুটা তিনি আদালতে দাঁড়িয়ে বর্ণনা করেছেন। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৪৭টি মামলা দেয়া হয়েছে।’
একটি বিষয় পুরো জাতির কাছে স্পষ্ট—প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমান এদেশের মেধাবী সমাজের একজন প্রতিনিধি। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট (আইবিএ) থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। পেশাগত জীবনের একজন সফল উদ্যোক্তা। একজন বেসরকারি উদ্যোক্তা হয়ে তিনি জ্বালানি উপদেষ্টারও দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশকে উন্নতি ও প্রগতির পথে এগিয়ে নিতে তার মেধা ও মনন সম্পদ হিসেবে কাজ করেছে। এটাকে সম্মান জানানো আমাদের সবার কর্তব্য।
এভাবে একজন নাগরিককে, একজন সম্পাদককে, একজন পেশাজীবীকে নির্যাতন করে মানবাধিকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হচ্ছে। এ পথ থেকে সরকারের সরে দাঁড়ানো উচিত। মানবাধিকার কমিশনেরও উচিত এসব ইস্যুতে সোচ্চার হওয়া। আমাদের সহকর্মীরা (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক) মানবাধিকার কমিশনে দায়িত্ব পালন করছেন। আশা করছি, তারা সব ধরনের সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় দায়িত্ব পালনের স্বার্থে মাহমুদুর রহমানের পাশে দাঁড়াবেন। আর গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে শক্তিশালী করার স্বার্থে সরকারও তাকে মুক্তি দেবে; যা বাংলাদেশের গণমাধ্যম থেকে অস্থিরতা দূর করবে।
লেখক : ড. আবুল হাসনাত
প্রফেসর, ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
মাহমুদুর রহমানের মেধা দেশের উন্নয়নে সম্পদ হিসেবে কাজ করেছে
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!
প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন
মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন
ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!
ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!
সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন
এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে
একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।
গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।