somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলাদেশ প্রসঙ্গসহ দেশ বিদেশের রত্ন - পাথর ( gemstone ) বানিজ্য নিয়ে একটি মুক্ত আলোচনা

০১ লা মে, ২০১৭ রাত ৮:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


রত্নের প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরদিনের। পান্না, হীরা, মুক্তা, পোখরাজ, অপ্যাল, গোমেদ ইত্যাদি রত্ন-পাথরগুলোর বেশীর ভাগই খনিজ পদার্থ। শত শত বছর ধরে প্রচন্ড চাপ ও তাপে ভূগর্ভে সৃষ্টি হয়ে থাকে রত্ন-পাথর। সৌন্দর্য চর্চার পাশাপাশি একে নিয়ে দেশে দেশে চলছে নৈতিক ও অনৈতিক বানিজ্য। নৈতিকতা ও অনৈতিকতার বিষয়টি নিয়ে আলোচনার পুর্বে এর পরিচয়গুলি একটু সংক্ষেপে দেখে নেয়া যাক । পৃথিবীতে প্রায় ১৩০ ধরনের মুল্যবান খনিজ পাথর আছে যা কেটে কুটে রত্ন-পাথর তৈরী করা যায় । যে সমস্ত খনিজ পাথর সচরাচর রত্ন পাথর হিসাবে ব্যবহৃত হয় তার মধ্যে Andalusite, Axinite,Benitoite,Bixbyte (Red beryl), Cassiterite,Clinohumite,Iolite, Kornerupine Natural moissanite, প্রভৃতি প্রধানতম । নীচে উল্লেখ যোগ্য কয়েকটি রত্ন-পাথরের সচিত্র পরিচিতি দেয়া হল । এছাড়াও রত্ন পাথর সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানার জন্য এখানে CLICK করতে পারেন ।

এন্ডালুসাইট (Andalusite)

একটি ধূসর, সবুজ, বাদামী, বা গোলাপী aluminosilicate খনিজ যাকে কাটাকাটি ও পলিস করে রত্ন পাথরে রূপান্তর করা যায় , স্পেনের Andalusia এলাকায় প্রথম আবিস্কৃত হয় বলে এই রত্ন পাথরটিকে Andalusite নামে অভিহিত করা হয় । নীচের চিত্রের বাদিকেরটি কাটিং পুর্ব একটি Andalusite পাথরের ছবি। বর্ণ এবং আকার ভেদে এর ক্যারট প্রতি দাম ৫০ ডলার হতে ২৬০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে ।



এক্সিনাইট জেমসস্টোন (Axinite Gemstones)

অ্যাক্সিনাইট ক্যালসিয়াম অ্যালুমিনিয়াম বরেট সিলিকেট খনিজ পদার্থ হতে এই দুস্প্রাপ্য রত্ন পাথরটির উদ্ভব ঘটে । এক্সিনাইট নামটি গ্রিক শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়েছে যার অর্থ 'কুঠার'। Axinite এর বর্ণ তার সঠিক গঠন অনুসারে পরিবর্তিত হতে পারে, তবে অধিকাংশই স্বর্ণালী বাদামী বর্ণের হয় । বর্ণ অনুযায়ী প্রতি ক্যারটের দাম ৭০ ডলার হতে ৫০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে



বেনিটোয়েট ( Benitoite)

বেনিটোয়েট একটি উজ্জ্বল নীল রত্ন পাথর যা বেয়ারিয়াম, টাইটানিয়াম এবং সিলিকা সমন্বয়ে গঠিত। এই বিরল রত্নটি ক্যালিফোর্নিয়ার সান বেনিটো কাউন্টিতে প্রথম পাওয়া যায় বলে বেনিটোয়েট হিসাবেই এর নামকরন হয়েছে । আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ক্যারট বেনিটোয়েটের দাম প্রায় ১৫০০ হতে ৪০০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে



রেড বিয়ারিল (Red Beryl)

রেড বিয়ারিল একটি অত্যন্ত বিরল প্রজাতির বেরিল খনিজ পাথর যা খুবই কম পরিমানে মেঙ্গানীজ হতে লাল রং এর স্ফটিক এ রূপান্তরিত হয় । সমগ্র বিশ্বের মধ্যে, রত্ন হিসাবে ব্যবহার উপযোগী স্ফটিক শুধুমাত্র একটি অবস্থানেই পাওয়া যায়, শুধু মাত্র যুক্তরাস্ট্রের বীবর কাউন্টির উটাহ ওয়াহ ওয়াও পর্বতমালা মধ্যেই এই রুবি-ভায়োলেট পওয়া যায় । উটাহ জিওলজিক্যাল সার্ভে অনুমান করে যে প্রতি ১৫০০০০ রত্ন মানের পাথরের মধ্যে লাল বেরিলের একটি স্ফটিক পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে উৎকৃষটমানের এই রেড বেরিলের বাজার দাম প্রতি ক্যারট ১০০০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে



ক্লিনহাউমাইট রত্ন পাথর (Clinohumite Gemstone)

ক্লিনহাউমাইট ১৮৭৬ সালে প্রথম আবিষ্কৃত হয়। সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত এটি বিশ্বের দশটি দুষ্প্রাপ্য রত্ন পাথরের মধ্যে একটি বলে গন্য । ইতালির নেপলসের মাউন্ট ভেসুভিয়াস এর বিস্ফোরণ নিকটবর্তী স্থান হতে প্রথম ক্লিনহিউমাইট আবিষ্কৃত হয় । কোন কোন দেশে যথা পাকিস্তানে এটা "মাউন্টেন অগ্নি" রত্ন- পাথর হিসাবেও পরিচিত । আকার এবং বর্ণ অনুযায়ী এর প্রতি ক্যারটের আন্তর্জাতিক বাজার দাম ৫০০ হতে ২০০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে



আয়লইট( iolite)

এটা অপেক্ষাতৃত সস্তা রত্ন পাথর । আন্তর্জাতিক বাজারে শ্রীলংকান আয়লইটের দাম ক্যারট প্রতি ১০০ হতে ১৫০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে ।



বৈদুর্যমণি বা (Cats Eye )

হলুদ , সবুজ বা খয়েরি রঙের রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম ক্রাইসোবেরিল (Chrysoberyl)। এই রত্নটির মূল উপাদান হল বেরিলিয়াম, অক্সিজেন ও অ্যালুমিনিয়াম (BeO.AI2O2) । এটি ১৮৮৪ সালে প্রথম গ্রিনল্যান্ডে আবিষ্কৃত হয় এবং ড্যানিশ জেমোনলজিস্ট আন্দ্রিয়াস Kornerup এর নামে এর Kornerup নামকরন হয় । বাদামী বা হলুদ স্ফটিক ফর্মে এটিকে পাওয়া যায় যা সাধারণত একটি অতি বিরল রত্ন পাথর। এটিকে কখনও কখনও Prismatine হিসাবেও উল্লেখ করা হয়। বাদামী হলুদ বর্ণের ৪.৩৮ ক্যারটের একটি শ্রীলংকান বৈদুর্যমণি রত্ন পাথরের (Chrysoberyl Cat Eye ) বাজার দাম ক্যারট প্রতি ৬০০ ডলার বা ২৬২৮ ডলার/গ্রাম ।



প্রাকৃতিক Moissanite

এযাবতকালের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক Moissanite রত্ন পাথরটি আবিষ্কৃত হয়েছে ইস্রায়েলে । আকার ও উজ্জলতা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাজারে Moissanite এর দাম ক্যারট প্রতি ২০০ ডলার হতে ৭০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে



পোখরাজ বা Sapphire

স্বচ্ছ বা হালকা হলুদ কিংবা হালকা নীল রঙের এই রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম টোপাজ (Topaz)।মূল উপাদান অ্যালুমিনিয়াম, সিলিকন, অক্সিজেন, হাইড্রোজেন এবং ফ্লোরিন [AI2SiO4(OH/F)2] । সাধারণত এর স্ফটিকগুলি খড়-হলুদ বর্ণের হয়ে থাকে, তবে তারা বিভিন্ন বর্ণেরও হতে পারে যেমন সবুজ, নীল, গোলাপী, ধূসর বা সাদা। নীচের ছবিতে দেখানো সর্ব বায়ের পাথরটি পলিশ পুর্ব একটি পোখরাজ পাথর ও সর্ব ডানেরটি একটি বিখ্যাত আমিরিকান গোল্ডেন পোখরাজ পাথর । আকার ও কোয়ালিটি ভেদে আন্তর্জাতিক বাজারে পোখরাজের দাম ২০ ডলার হতে ২৫০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে


পোখরাজ পাথরটি বিভিন্ন নামে ও সাজে গয়নার মধ্যে রত্ন হিসাবে ব্যবহৃত হয় , নীচে ছবিসহ দেখানো হল

পুষ্পরাগ মনি ( Yellow Sapphire )

সংস্কৃত নাম পুষ্পরাগ মনি , বাংলায় পোখরাজ নামেও পরিচিত , ইংরেজীতে yellow sapphire , এর বর্ণ হরিদ্রাভাব যুক্ত , সাদা ও সামান্য বাদামী । সর্বডানের টি ১৮ ক্যারট হোয়াইট গোল্ডের উপরে স্থাপিত যার বাজার মুল্য প্রায় ৩০০০ ডলার । তবে আকার ও গুনগতমান অনুযায়ী পুষ্পরাগ মনির আন্তর্জাতিক বাজার দর ক্যারট প্রতি ১৫০ হতে ২০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে


এটি শ্রী লংকা, জাপান , ব্রাজিল , আমিরিকা , বার্মা ও থাইল্যান্ডে পাওয়া যায় । জ্যোতিষ শাস্রমতে যাদের প্রচুর অর্থ উপার্জন হয় কিন্তু অর্থের উপরে কোন নিয়ন্ত্রন থাকেনা , যারা অর্থকে ধরে রাখতে পারেনা , যাদের প্রতিপত্তি ও সন্মানের অভাব রয়েছে বেকারদের কর্মপ্রাপ্তি ঘটেনা , রাজনৈতিক সফলতা হচ্ছেনা , দাম্পত্য জীবনে অসন্তোষ , পরনিন্দা কুড়াতে হচ্ছে, চরিত্র ভ্রষ্ট হচ্ছে প্রভৃতি রোধে পোখরাজ ধারণে উপকার হয় । উল্লেখ্য সকল প্রসংশাই একমাত্র সৃষ্টিকর্তার। এখানে রত্ন পাথরের সকল গুনাগুন ও বর্ননা জ্যোতিষীদের ভিত্তিতে দেয়া হয়েছে। মানুষের কর্মেই মানুষের ভাগ্য বদলায়, এর সাথে এই পোষ্ট লেখকের বিশ্বাস যুক্ত নয় । যাহোক এই পাথরটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যথা ইয়েমেন , ব্রাজিল , যুক্তরাস্ট্র , স্কটল্যান্ড , আয়ার ল্যান্ড, শ্রীলংকা , জাপান, দক্ষীন আফ্রিকা , মায়ানমার , সাইবেরিয়াতে পাওয়া যায় ।

নীলা Blue Sapphire

নীল বা হলুদ বর্ণের এই রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম কোরান্ডাম (Corundum), অ্যালুমিনিয়াম এবং অক্সিজেনই হল এর মূল উপাদান (AI2O2) । এটা নীল কান্তমনি নামেও পরিচিত । নীলা কয়েক প্রকারের হতে পারে যথা ইন্ত্রনীলা, স্টারনীলা, , গঙ্গাজলনীলা , অপরাজিতা নীলা , পীতাম্বরনীলা , রক্তমুখী নীলা ইত্যাদি । নীলা স্বচ্ছ উজ্বল নীল আভাযুক্ত রত্ন । নীলাকে আরবী/ফার্সী/উর্দুতে ইয়াকুত বলে । হোয়াইট গোল্ডের উপরে ১৪ ক্যারটের নীলা আংটির ( মাঝের ছবি) বাজার দাম প্রায় ৩২০০ ডলার , তবে আন্তর্জাতিক বাজারে নীলার প্রতি ক্যারটের বাজার দাম প্রায় ২০০ ডলারের ঘরে উঠানামা করে ।


জ্যোতিষি রাশি চক্রমতে মকর ও কুম্ভ রাশির রত্ন এটি । এটি যাদের জন্য উপযোগী তাদেরকে অধিক ধনশালী ও ঐশ্বর্যশালী করে । মনকে শক্তিশালী করে ও সাহস যোগায় । কাশ্মীর অঞ্চলে ভাল জাতের নীলা পাওয়া যায় । অস্ট্রেলিয়া , আমিরিকা , মনটানা , শ্রলংকা, ও জার্মানীতেও ভাল মানের নীলা পওয়া যায় । তবে কাশ্মীরি নীলা পৃথিবী বিখ্যাত ।

রুবি( Ruby)/ চুনি

রুবি একটি লাল রঙের রত্ন পাথর, লাল ও গোলাপী আভার এই রত্নটিরও বৈজ্ঞানিক নাম কোরান্ডাম (Corundum), অ্যালুমিনিয়াম এবং অক্সিজেনই হল এর মূল উপাদান (AI2O2)। রুবি ঐতিহ্যগতভাবে একটি কার্ডিনাল রত্ন , এটা একসঙ্গে নীলকান্তমণি, পান্না, এবং হীরা সঙ্গে আসতে পারে । নীচের চিত্রে (সর্ব বাদিকেরটি ) একটি পলিশপুর্ব রুবি/চুনি রত্ন পাথর ।


রুবি রাগ অনুরাগের পাথর হিসাবে পরিচিত । এটাকে অনেক সময় চুনি , পদ্মরাগ মনিও বলা হয় , আবার কেও কেও এই পাথরটিকে রত্নরাজও বলে থাকেন । যাদের প্রশান্তির সাথে পরিপুর্ণতা প্রয়োজন তাদের জন্য রুবি একটি উতকৃষ্ট রত্নপাথর বলে জ্যোতিষবাবুরা মনে করেন । চুনি রত্নের তীব্র মাত্রার শক্তি ক্ষমতা রয়েছে বলে মনে করা হয় , তাই এটা নেতা-নেত্রী রাজা বাদশা এবং ধর্ম প্রচারকদের বুদ্ধি দৃপ্ত নির্দেশনা এবং মহত সিন্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে খুব পছন্দের পাথর হিসাবে বিবেচিত হয় বলে জ্যোতিষরা বলে থাকেন ।

কথিত আছে রুবি ঘোরতর অন্ধকার জীবন কাটিয়ে আলো নিয়ে আসতে সাহায্য করে । তবে জ্যোতিষ শাস্র মতে সবার জন্য এটা নয় , যাদের রবি ( সুর্য ) অশুভ শুধুমাত্র তাদের ক্ষেত্রেই প্রযোয্য । বলা হয়ে থাকে নীজের হাতে ভালবাসা তৈরী করা এবং কিভাবে সুখী হওয়া যাবে তা রুবি ধারনের পর থেকেই বুঝা যাবে । যাদের সন্তান ধারণ হয়না তাদের জন্য এ পাথর উত্তম বলে জ্যোতিষিরা দাবী করেন ।

পান্না বা Emerald

সবুজ বা স্বচ্ছ রঙের এই রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম বেরিল (Beryl)। বেরিলিয়াম, সিলিকন, অক্সিজেন এবং অ্যালুমিনিয়াম হল মূল উপাদান (3BeO.AI2O3,6SiO2)। সবুজ বর্ণ নিয়ে এটা গঠিত । এমারলড একটি সাইক্লোসিলেট , যার ষ্ফটিকে অসংখ্য ত্রিভুজাকৃতির বৈশিষ্ট বিদ্যমান , ফলে এটা মুল্যবান রত্ন পাথরে পর্যবেসিত । নীচের ছবিতে দেখানো কলম্বিয়ান রত্ন পাথর দিয়ে তৈরী স্বর্নের উপরে স্থাপিত ১৮ ক্যারটের অঙ্গুরীয়টির দাম ১৫০০০ ডলার অর্থাৎৎ প্রতি ক্যারট এর দাম প্রায় ১০০০ ডলার ।


ক্ষমতার পাথর হিসেবে পান্না দৈহিক, আবেগ ও আধ্যাত্মিক ভারসাম্যের প্রস্তাব করে। যদিও পান্না সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির পাথর, কিন্তু এটা বস্তুবাদী পাথর নয়। জ্যোতিষ শাস্রমতে পান্না হচ্ছে নিরাময়কারী , সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির পাথর , এটা আধ্যাত্মিক প্রবৃদ্ধি , স্পষ্ট দর্শন , স্মৃতি শক্তি, বুদ্ধিমত্তাযোগানো , অনুপ্রেরণা , আনন্দ , অন্তজ্ঞান , সংবেদনশীলতা, ভালবাসা , রোমাঞ্চ , সৌন্দর্য , , প্রশান্তি , ন্যায়বিচার , বন্ধুত্ব ও ঐকতাকে উৎসাহিত করে । ভালবাসার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা আনয়ন করে ।

হীরা ( Diamond)

হীরা হল সবচেয়ে শক্ত স্বচ্ছ আলোক বিচ্ছোরণ ক্ষমতা সমপন্ন একটি খনিজ পাথর যা জেমস জুয়েলারীতে ব্যপকভাবে ব্যবহৃত হয় । হীরার ইংরেজী ডায়মন্ড শব্দটি এসেছে গ্রীক শব্দ এডামাস ( ADAMAS) হতে যার অর্থ হল কঠিন বা অপরাজেয় । হীরা সত্যই অপরাজেয়, হীরা দিয়েই কাঁচ কাটা যায় । হীরা সর্বাপেক্ষা জ্যোতির্ময় রত্ন । লক্ষ বছর পুর্বে মৃত্তিকার অনেক নীচে নিখাদ কার্বন থেকে আগ্নেয়গিরির তাপ ও চাপে হীরার জন্ম । হীরাকে আরবীতে অলস্পাস বলা হয় । জ্যোতিষ শাস্রমতে সম্পদ , সুখ ও বিজয়ের প্রতিক বলে হীরাকে ধারণ করা হয় , সৌন্দর্য, শিল্পকলা , স্বামী স্ত্রীর সুখী দাম্পত্য জীবন গড়তে হীরা খুবই ফলদায়ক । ওজন ও আকৃতিভেদে প্রতি ক্যারট হিরার বাজার দাম প্রায় ১৫০০০ ডলার ।

যদিও বর্তমানে পৃথিবীতে হীরা খুবই দুস্প্রাপ্য ও মুল্যবান তবু এটা ধনাঢ্যদের এনগেজমেন্ট রিং এর সেন্টার পিছ হিসাবে স্থান করে নিয়েছে । হীরা আলো –ঝলমলে পাথর । হীরার বহুতলে আলো বার বার একে বেকে যায় বলেই তৈরী হয় বহু রঙা আলোর ফোয়ারা । রত্ন বিজ্ঞানীরা হীরাকে তার ভিতরের উজ্বল্যতা অনুযায়ী বর্ণের দিক হতে তিন ভাগে ভাগ করেছেন যথা (১) নীল সাদা রঙের হীরা (২) হলুদ সোনালী রঙের হীরা (৩) লাল রঙের হীরা । তবে বিন্দু ও রেখা বর্জিত সাদা উজ্বল হীরাকে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করা হয় এবং একে কমল হীরা বলেও ডাকা হয় । খনি হতে পাওয়ার সাথে সাথে হীরা উজ্বল ও জ্যোতির্ময় থাকেনা , একে কেটে পলিশ করে উজ্বল জ্যোতির্ময় করে গড়ে তোলা হয় ।


রেড ডায়ামন্ড সবচেয়ে দামী এবং দুষ্প্রাপ্য । পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত মাত্র ৩০ টির মত রেড ডায়ামন্ড পাওয়া গেছে এর অধিকাংশই আধা ক্যারটেরও কম ওজনের । ১৯৯০ সনে আলতো প্রনাবিয়া নামে এক ব্রাজিলীয় কৃষক আবিতাজিনহু নদীতে ৫.১১ ক্যারটের সবচেয়ে বড় লাল হিরকটি পায় । ২০০২ সালে এটা রত্ন পাথর ব্যবসায়ী Shlomo Moussaieff ৮ মিলিয়ন ডলারে কিনে নেয় । এর বর্তমান প্রাকলিত বাজার মুল্য ২০ মিলিয়ন ডলারের মত দাঁড়িয়েছে । তবে অন্যান্য ছোট খাট রেড ডায়মন্ডের বাজার দাম ১ মিলিয়ন ডলারের মত

কোহিনুর

কোহিনূর নামে খ্যাত হীরক খণ্ডের ইতিহাস অতি দীর্ঘ এবং বর্ণাঢ্য। এর ইতিহাসের সূচনা ১৩০৪ খ্রিস্টাব্দে। এটি বিভিন্ন রাজা বাদশাহ ও শাসকের হাত ঘুরে এখন সংরক্ষনের জন্য স্থান পেয়েছে টাওয়ার অফ লন্ডনে। কোহিনূর শাব্দিক অর্থ 'আলোর পর্বত' । হীরক খণ্ডটির ওজন ১০৬ ক্যারট । এর বর্তমান বাজার মুল্য সম্পর্কে কোন তথ্য নেই তবে ধারনা করা করা হয় বৃটিশ ক্রাউন সংগ্রহে থাকা ১০ হতে ১২ বিলিয়ন ডলারের জুয়েলারী ভুবনের মধ্যে এই কোহিনুরটি একটি অন্যতম ।

টাওয়ার অফ লন্ডন ( Tower of London)


কোহিনুরের ইতিহাস হতে জানা যায় ষোড়শ শতাব্দীতে এটা মালওয়ার রাজাদের অধিকারে ছিল এবং পরবর্তীকালে তা মোগল সম্রাটদের হাতে আসে এবং সম্রাট শাহজাহান নির্মিত ময়ূর সিংহাসনের শোভা বর্ধন করে।সিংহাসনটি ছিল ১০৮টি বড় আকৃতির চুনি পাথর আর ১১৬টি পান্না দিয়ে তৈরী । আর সিংহাসনের ওপর থাকা শামিয়ানা যে ১২টি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল সেগুলোর পুরোটাই মুক্তাখচিত। সম্রাট শাহজাহান এরপর এতে জগৎ বিখ্যাত হীরা কোহিনূর স্থাপন করেন।

শাহ জাহান ও তার ময়ূর সিংহাসন


সম্রাট শাহজাহানের পর সম্রাট আওরঙ্গজেবের কাছে ছিল এই হীরাটি । এই সময় কোহিনুরের স্থান ছিল মুঘল কোষাগারে। পরে মুহম্মদ শাহ রঙ্গিলার কাছে ছিল এই হীরাটা। উইকির মতে আওরঙ্গজেব তাঁর রাজধানী লাহোরে নিয়ে আসেন, কোহিনুর হীরার স্থান হয় তাঁর নিজ হাতে গড়া লাহোরের বাদশাহী মসজিদে ।

বাদশাহী মসজিদ , লাহোর , পাকিস্তান


মোগল সাম্রাজ্য যখন বিক্ষিপ্ত ও ধংসের দ্বারপ্রান্তে তখন নাদির শাহকে আমন্ত্রণ জানানো হয় মুসলিম শাসনের গৌরবোজ্জ্বল দিন ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করার জন্য । নাদের শাহ ১৬৯৮ – ১৭৪৭ পর্যন্ত শাহ হিসাবে ইরানের শাসনকর্তা ছিলেন । ১৭৩৯ সালে নাদের শাহ আগ্রা ও দিল্লি দখলের পর সেখান থেকে প্রচুর ধন-সম্পদের সঙ্গে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হীরাখচিত ময়ূর সিংহাসনটিও নিয়ে যান ।

১৭৩৯ সনে কারনাল যুদ্ধে দিল্লীকে পরাভুত করার কালে নাদির শাহ


কিন্তু তিনিও বেশীদিন কোহিনুর ধরে রাখতে পারেননি । আততায়ীর হাতে নাদির শাহ খুন হয়ে যাওয়ার পরে হীরা চলে যায় তার আফগান জেনারেল আহমেদ শাহ দুররানীর কাছে। তাঁর মৃত্যুর পর হীরা আসে তাঁর সন্তান তিমুর শাহর কাছে। তিমুরের কাছ হতে জামান শাহর হাতে আসে, সেখান থেকে সুজা উল মূলকের কাছে। তিমুর শাহর ছোট ছেলে সুজা উল মূলক তাঁর সৎ ভাই মাহমুদের কাছে পরাজিত হয়ে কাশ্মীরের গভর্নর আতা মুহাম্মদ খানের কাছে বন্দী হন ১৮১১ সালে। কিন্তু পাঞ্জাবের শিখ রাজা মহারাজ রঞ্জিত সিং সুজা কে উদ্ধার করেন এবং তাকে পরিবার সমেত লাহোরে পাঠিয়ে দেন। পরিবর্তে সুজা উল মূলক ১৮১৩ সালে রঞ্জিত সিং এর হাতে তুলে দেন কোহিনুর হীরা
উইকিপিডিয়া তথ্য মতে জানা যায় রঞ্জিত সিং উইল করে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরকে দিয়ে যান এই হিরা , তবে এই হীরা আদৌ ঐ মন্দিরে স্থান পেয়েছিল কিনা সে সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায়না সঠিকভাবে ।


পক্ষান্তরে অনেক লিখা হতেই জানা যায় রঞ্জিত সিং মারা গেলে হীরার মালিক হন তাঁর ১১ বছরের ছেলে মহারাজ দিলীপ সিং । কিন্তু ১৮৪৯ সালে ব্রিটিশরা দখল করে নেয় পাঞ্জাব আর বলা চলে দিলীপ সিং এর হাত থেকে কেড়ে নেয় কোহিনুর হীরাটি। এইভাবে এই উপমহাদেশের কাছ হতে হাতছাড়া হয়ে যায় অন্যতম মহামূল্যবান সম্পদটি। লর্ড ডালহৌসি ১৮৫০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষ থেকে মহারানী ভিক্টোরিয়ার হাতে তুলে দেন হীরাটি।

লর্ড ডালহৌসি ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হাউস


১০৬ ক্যারট ওজনবিশিষ্ট কোহিনূরটি স্থান পায় বৃটিশ মুকূটে। উপমহাদেশেরএক সময়ের অহংকার এখন বৃটেনে

১৮৮২ সালে কোহিনুর শুভিত রাজ মুকুট পরিহিত মহারাণী ভিক্টোরিয়ার ছবি


১৮৫০-এ দলীপ সিংহ ছিলেন নাবালক। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, নাবালক রাজাকে চাপ দিয়ে কোহিনুর নেওয়া হয় এবং সেই যুক্তিতেই ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতার সময় এবং তার পরে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দেও বর্তমান রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের রাজ্যাভিষেকের সময় কোহিনুর প্রত্যর্পণের দাবি তুলেছে ভারত। কিন্তু চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে তা খারিজ করে দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার।

কোহিনূরের মালিকানা নিয়ে আশির দশকেও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। ইরান, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, এর সত্ত্ব দাবি করেছিল। তবে বৃটিশ সরকার সব দাবিই প্রত্যাখ্যান করেছে এবং এসকলদাবী অযৌক্তিক বলে আখ্যায়িত করেছে



গোমেদ বা Garnet

গোমেদ স্বচ্ছ , উজ্বল লালচে বর্ণের পাথর । পাথরটিকে উর্দুতে গোমেদ বলা হয় । এর ভিতরের দিকে সুক্ষ বুদ বুদ এর মত দেখা যায় । অনেক পন্ডিত ও মনিঋষির মতে গোমেদ ধারণে হঠাত কোন দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করে ও অমঙ্গলকে দূরীভূত করে । হস্তরেখা বিজ্ঞানে এবং রাশিচক্রে রাহুর রুক্ষ দৃষ্টি হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য ও রাহুর অশুভ প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার জন্য গোমেদ রত্ন ধারণ করার কথা জ্যোতিষেরা বলে থাকেন ।
[imghttp://i.imgur.com/fAygz4e.jpg]

অপ্যাল( Opal)

রাসায়নিক সূত্র হিসাবে opal হল সিলিকা বা সিলিকন ডাই অক্সাইড এর একটি hydrated ফর্ম (SiO2 nH2O) । গঠনকালে পরিবেশগত অবস্থার উপর নির্ভর করে Opal বিভিন্ন বর্ণের বা বিভিন্ন গঠণের হতে পারে । একটি খাটি অপ্যাল রত্ন পাথরের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ৩০০০ ডলারের মধ্যে উঠানামা করে । তবে অপরিশোধিত অপ্যালের দাম অনেক কম । নীচের ছবির বাম দিকে দেখানো পাথর খন্ডটি সবচেয়ে মূল্যবান অপ্যালগুলির মধ্যে একটি। এটি ১১ ইঞ্চি লম্বা ও ৪ ইঞ্চি উচ্চতা ও ১৭০০০ ক্যারট ওজন বিশিষ্ট একটি অপ্যাল পাথর । ২০০৫ সালে অস্ট্রেলিয়ায় এটার দাম ২৫০০০০ অস্ট্রেলীয় ডলারে প্রাককলিত হয়েছিল।


জ্যোতিষিদের মতে এই রত্ন ব্যবহারে সব বিষয়ে জয়ী হওয়া যায় বলে প্রাচীনকালে রাজা বাদশাগন অতি যত্নের সাথে একে ব্যবহার করতেন ।অপ্যাল (Opal) তীব্র কামনা থেকে রক্ষা করতে অদ্বিতীয়। রাশিচক্রে চন্দ্র ও শুক্র গ্রহের উপর রত্ন হিসাবে অপ্যাল খুবই ফলদায়ক । শত্রুদমন, কাজে কর্মে সফলতা, মানসিক শান্তি, শরীর ও স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষ সহায়ক বলে জ্যোতিষীগন বলে থাকেন ।

ইংল্যান্ডের মহারানী ভিক্টোরিয়ার কাছে এই রত্ন ছিল খুবই প্রিয় , সুন্দরী নারীদের কাছেও এটা খুবই প্রিয় । ওপাল তীব্র কামনা হতে রক্ষা করতে অদ্বিতীয় । মধ্যযুগের লেখকেরা অপ্যালকে ঐন্দ্রজালিক পাথর বলে উল্লেখ করেছেন । মেক্সিকো, ব্রাজিল জাপান , লিবিয়া , ও অস্ট্রেলিয়ায় মুল্যবান অপ্যালের প্রধান উৎস ।
আন্দামুকা অপ্যাল নামে একটি অপ্যাল রত্নহার রানী এলিজাবেথ- ২ কে উপহার হিসাবে প্রদান করা হয়, এটি কুইন অফ অপ্যাল নামেও এখন বিশ্ব রত্ন-পাথর মার্কেটে পরিচিত।



নীলকান্তমণি বা ফিরোজা বা Tarquous

অস্বচ্ছ নীল বা নীলাভ সবুজ রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম টারকোয়েস (Tarquous)। কপার, ফসফরাস, অক্সিজেন, হাইড্রোজেন, ফ্লোরিন হল মূল উপাদান [CuO(AI2O3(P2O3)2, 9H2O]। এটা বেশ দামী এবং মূল্যবান রত্ন পাথর । এর অনন্য আকৃতির কারণে হাজার হাজার বছর ধরে অতি প্রিয় একটি রত্ন পাথর হিসাবে অলঙ্কৃত হয়ে আসছে । তবে সহজে একে নকল করার সুবিধার কারণে এবং কৃত্রিম ফিরোজা প্রবর্তনের মাধ্যমে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এটি অনেকটা নিশ্প্রভ হয়ে পড়েছে, এমনকি বিশেষজ্ঞদের কাছেও এটা সনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে ।


তবে ফিরোজা সৌন্দর্যের প্রতিভু রত্ন । বর্ণের দিক থেকে সবুজ , উজ্বল আসমানী নীল । এই রত্ন পাথরটিকে সংস্কৃতে পায়বজ, ফারসীতে ফিরোজা আর ইংরেজীতে Turquoise বলে । এটা পারস্যের জাতীয় রত্ন । ইসলামী ধর্মাবলম্বীরা সর্বোতকৃষ্ট রত্ন বলে ভূষন করে থাকেন । খৃষ্টান ধর্মাবলম্বরীরা এই রত্নকে শুভদায়ক মনে করেন । ফিরোজা রত্ন ব্যবহারে প্রকৃত স্বামী স্ত্রি , প্রেমিক প্রেমিকা সম্পর্ক গাঢ়তর হয়ে থাকে এবং পারিবারিক শান্তিসমৃদ্ধি রক্ষায় যথেষ্ট উপকারী হিসাবে জ্যোতিষিরা বলে থাকেন । খাঁটি ফিরোজা অতি উচ্চমুল্যে বাজারে বিক্রি হয় ।ইরানী ফিরোজা খুবই উতকৃষ্ট মানের । নকল ফিরোজা বাজরে পওয়া যায় , নকল ফিরোজা ওজনে ভারী হবে বা আপেক্ষিক গুরুত্ব বেশী হবে । আসল এর ভাল মানের ফিরোজার প্রাপ্তিস্থান মিশর , সৌদি আরব, তুর্কী, কালিফোর্নিয়া , অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাস্ট্র ,ইরাক , ইরাণ প্রভৃতি দেশ ।

কৃত্তিম উপাদানের রত্ন-পাথর

মুল্যবান খনিজ পাথর ছাড়াও কৃত্তিম উপাদান দিয়ে রত্ন পাথর সম অলংকারাদি তৈরী হচ্ছে , উল্লেখযোগ্যগুলি হল হাই-লিড গ্লাস , সিনথেটিক কিউবিক ঝিড়কনিয়া , ও সিনথেটিক মসাইনেট ।

কাঁচের গহনা

মানব ইতিহাসের প্রথম দিকে গ্লাস মূল্যবান উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। পাথর যুগে, চকচকে পাথরগুলিকে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ছুরির মত তৈরি করে শিকাড়ের কাজে ব্যবহার করা হত । অধুনা গ্লাসকে সহজেই নিন্মের চিত্রের মত রূপ দিয়ে আকর্ষনীয় করা যায় ও তা দিয়া গড়া যায় আকর্ষনীয় গহনা সেট ।



কিউবিক জিরকনিয়া (Cubic zirconia )

হীরার সমতুল্য ক্ষমতা আছে বলে হীরার বিকল্প রত্ন হিসাবে একে ব্যবহার করা হয়। Cubic zirconia (or CZ) is the cubic crystalline form of zirconium dioxide (ZrO2) এটা রত্ন পাথরের মধ্যে সবচেয়ে কমদামী । ডানের কিউবিক জিরকনের আংটিটির বাজার দাম মাত্র ৬০ ডলার ।



জৈব উপাদানের তৈরী জেমস - রত্ন
বিভিন্ন প্রকারের জৈবিক উপাদানের রত্ন রয়েছে যার মধ্যে প্রবাল, আইভরি ও মুক্তা উল্লেখযোগ্য ।

প্রবাল বা Corel

এটি অ্যান্টোজোয়া শ্রেণীভুক্ত সামুদ্রিক প্রাণীজ পদার্থ। এক ধরনের ক্ষুদ্র জীবের মৃতদেহ।শুধুমাত্র সমুদ্রের নীচেই পাওয়া যায়।গাঢ় রক্তবর্ণ বা হলুদাভ রক্তবর্ণ, গেরুয়া সাদা রঙের রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম Organic Gems। মূল উপাদান হল ক্যালসিয়াম, কার্বন ও অক্সিজেন (CaCO3)। এটি সিলিন সিনডিয়ার যুক্ত একটি গঠন যাতে রয়েছে অভ্যন্তরীণ বা বহিরাগত চুনযুক্ত স্ফটিক সদৃশ্য স্কেলিটন । এই ধরণের স্কেলিটন যুক্ত প্রাণীর কঙ্কালদেরও প্রবাল বলা হয়। এগুলিকে কেটে কুটে পলিশকরে তৈরী করা হয় আকর্ষনীয় গহনা সেট ।


এই প্রবাল রত্বের দ্বারা বহু রোগের উপশম হয় বলে জ্যোতিষ বাবুরা বলে থাকেন ।রোমানরা ছেলে-মেয়েদের গলায় প্রবাল রত্ন ধারণ করাত বিপদ আপদ থেকে রক্ষাকবচ হিসেবে এবং শিশুদের দোলনায় প্রবাল দন্ড লাগিয়ে রাখত । ইতালীতে প্রবালের মালা ধারন করা হয় কু'নজর এড়ানোর জন্য। জানা যায় প্রবাল রত্নে পদ যুগল সুস্থ্য থাকে বলে ব্যালে নৃত্য শিল্পীরা একে ভাগ্যের পাথর বলে মনে করেন।

আইভরি ( Ivory)

মুলত হাতি ও ওয়ালরাসের দাঁত হতে যে আকর্ষনীয় অলংকারাদি তৈরী করা হয় তাই আইভরি হিসাবে রত্ন মার্কেটে খুবই উচ্চ দামে বেচা কেনা হয়ে থাকে । নীচের ছবিতে আইভরি হতে তৈরী একটি 'ইভ ফ্লোরাল সিলভার এবং আইভরি' গয়না সেটের ছবি দেখানো হল। এরকম একটি গয়না সেটের আন্তর্জাতিক বাজার দাম ৭০ হতে ৮০ ডলার যা বাংলা দেশী মুদ্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার টাকার মত ।



মুক্তা বা Pearl

এটি খনিজ পদার্থ নয়, প্রাণীজ পদার্থ। স্বাভাবিক মুক্তা ঝিনুকের মাংসল শরীরের ভিতর পাওয়া যায়। সাদা রঙের এই জৈব রত্নটির বৈজ্ঞানিক নাম Organic Gems। মূল উপাদান হল ক্যালসিয়াম, কার্বন ও অক্সিজেন(CaCO3) । মুক্তা চকমকি মতি বিশেষ । আরবীতে লুলুউ বলে । বর্ণের দিক হতে সাদা , হরিদ্রাভ , কৃষ্ণাভাযুক্ত ও রূপালী আভাযুক্ত হয়ে থাকে । সব ঝিনুকে মুক্তা জন্মায় না । সাগরবাসী ঝিনুকের ও ঝিল পুকুরের ঝিনুকের দেহে যে মুক্তা তৈরী হয় তার প্রস্তুতি খুবই সরল । হঠাৎ একটি বালুকনা যদি ঝিনুকের দেহে ঢুকে পড়ে , তখনই তাকে ঘিরে স্তরে স্তরে রসক্ষরণ হয় । সেটাই কালক্রমে পরিনত হয় মুক্তায় । বহু প্রকারের মুক্তা রয়েছে । রয়েছে সাগরবাসী, নদী ও ঝিলের ঝিনুকের মুক্তা , ঝিনুকের সে সকল মু্ক্তার নাম মাদার অফ পার্ল (Mother of Pearl), রয়েছে শুক্তি মুক্তা বা Oyster Pearl, এই মুক্তাটিই বাজারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় , রয়েছে শঙ্খমুক্তা বা Conch pearl এগুলি গোলাপী রঙের খুব দামী মুক্তা ।


শুক্তি মুক্তা পাওয়া যায় আরব সাগর , বঙ্গোপসাগর , পারস্য উপসাগর , অস্ট্রেলিয়া , জাপান , বোম্বে , শ্রীলংকা, মাদ্রাজ প্রভৃতি দেশের সাগরচারী ঝিনুক বা শুক্তির গর্ভে । এই মুক্তাটিই বাজারে সবচেয়ে বেশি বেচা কেনা হয় ।

সমুদ্রচারী বিশাল এক ধরণের শঙ্খের মধ্যে জন্মায় শঙ্খমুক্তা বা Conch pearl এগুলি গোলাপী রঙের খুব দামী মুক্তা । শুনা যায় বিশেষ এক বনবিহারী অজগর সাপ কিংবা ব্যাঙের মাথায় এক ধরণের মুক্তা পাওয়া যায় , তবে তা গল্প কাহিনীতেই দেখা যায় বাস্তবে কেও এদের দেখা পেয়েছেন বলে জানা যায় নি ।


বুড়ু হাতির দন্ত কোষ ও মস্তকে গজায় গজমুক্তা , এ গুলি গুলাকার দিপ্তিহীন ।


গজমুক্তা বা গজমণি কিংবা গজমতি বিশেষ প্রকারে হাতির শরীরে প্রস্তুত হয়ে থাকে । অনেকে বিশ্বাস করেন যে মূল্যবান এই গজমতি মহালক্ষীর বিশেষ পছন্দের। যার প্রভাবে প্রভুত ধনসম্পত্তির মালিক হওয়া যায়।

বাংলাদেশে মুক্তা চাষ

শুধু সাগরের ঝিনুকের মুক্তাই নয়, আজকাল পুকুরেও মুক্তার চাষ শুরু হয়েছে দেশে দেশে, যাকে কালচার্ড পার্ল বলে । জাপান ও ভারতে এ ধরণের মুক্তা প্রচুর উৎপন্ন হচ্ছে । বাংলাদেশও প্রণোদিত উপায়ে মুক্তা উৎপাদনে সফলতা এসেছে এই সাফল্যকে বাণিজ্যিকভাবে বিস্তারের লক্ষ্য নিয়ে সম্প্রতি স্থাপিত হয়েছে দেশের প্রথম মুক্তা গবেষণাগার। ময়মনসিংহে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বিএফআরআই) স্থাপিত এ গবেষণাগার মুক্তা উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে । দেশব্যাপী জরিপ চালিয়ে এ পর্যন্ত স্বাদু পানির ৫ ধরনের মুক্তা উৎপাদনকারী ঝিনুক পাওয়া গেছে। গবেষণা অব্যাহত রাখলে বাংলাদেশের অনুকূল পরিবেশে বিপুল পরিমাণ মুক্তা উৎপাদন সম্ভব। এ কাজে দেশের লক্ষ লক্ষ বেকার যুবক যুবতি নিয়োজিত হতে পারবে । এর সুফল হবে বহুমুখী ।

গবেষণায় দেখা গেছে, একটি ঝিনুক থেকে সর্বোচ্চ ১২টি মুক্তা তৈরি হয়। ছয় মাসে সর্বোচ্চ ৫ মিলিমিটার এবং গড়ে ৩ মিলিমিটার আকারে মুক্তা তৈরি হয়। এর আগে এই আকারের মুক্তা তৈরিতে সময় লেগেছিল ১২ থেকে ১৮ মাস। এ পর্যন্তা কমলা, গোলাপি, সাদা, ছাই এই চার রঙের এবং তিন আকারের (গোল, চৌকা , আঁকাবাঁকা) মুক্তা পাওয়া গেছে। এ মুক্তা দিয়ে তৈরী হচ্ছে মিঠা পানির মুক্তার গহনা সেট । ছবিতে দেখানো মুক্তার সেট পরিহিত ছবিটি সামুর শ্রদ্ধেয় সহ ব্লগার শায়মা আপুর সৌজন্যে প্রাপ্ত , সে জন্য তাঁর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা রইল ।


জ্যোতিষীরা বলেন রাশিচক্রে এটা কর্কট রাশী ও চন্দ্র গ্রহের রত্ন । এই রত্ন সততা, বিশ্বাস , আনন্দের ধারক । সৌন্দর্য , দেহ এ মনের শান্তি রক্ষার্থে শুভ ফলদায়ক । আয়ুর্বেদ মতে মুক্তাভস্ম মহা উপকারী ঔষধ । কথিত আছে মুক্তা রতি শক্তি বৃদ্ধির সহায়ক । জ্যোতিষ মতে চন্দ্র হল মনকারক গ্রহ । মানবমনে তার প্রভাবের ফলে মানুষের মনও হয়ে উঠে দ্রুতগামী । তাই বলা হয়ে থাকে যারা অকারণ দুশ্চিন্তা করে থাকেন অথবা আকাশ কুসুম রচনা করা যাদের নেশা , তারা মুক্তা ধারণ করে সুফল পেতে পারেন ।


জেমস নিয়ে প্রাচীন মিথস

মানব ইতিহাসে রত্ন -পাথর নিয়ে অনেক পৌরাণিক কাহিনী এবং কিংবদন্তি রয়েছে । রত্ন- পাথর কি মানুষের উপকার করতে পারে ? এ নিয়ে রয়েছে নানা কাহিনী , এর কিছু বিবরণ নীচে দেয়া হল ।

নীলা

নীলাকে নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় পৌরাণিক কাহিনীটি প্রাচীন গ্রিসের। এটা আন্তরিকতা এবং স্থিতিশীলতার প্রতীক । তাই আজও ভিক্টোরিয়ান জুয়েলারীতে ( রিং, ব্রেসলেট, নেকলেস,) নীলা বহূল পরিমানে ব্যাহৃত হচ্ছে । আশ্চর্যজনকভাবে এই পাথরের পৌরাণিক কাহিনী আধুনিক ও সাম্প্রতিক কালেও ছড়িয়ে পড়েছে ।

হিরা

প্রাচীন গ্রীক এবং রোমানরা বিশ্বাস করে যে হিরা হল নক্ষত্র থেকে পতিত ভগবানের ছায়া এবং স্ফোলিঙ্গ । প্লেটো হীরা সম্পর্কে লিখেছেন, এটা একটা স্বর্গীয় জীবিত আত্মা । রোমানরা হীরা পরতেন কারণ তারা বিশ্বাস করতেন এইগুলি জীবনের সমস্যা সমাধানে যাদুকরী ক্ষমতা প্রয়োগে সক্ষম, বিশেষ করে যুদ্ধের সময় সাহস যোগাতে অদ্বিতিয় । প্রাচীনকালের রাজাগণ হীরা এবং অন্যান্য মূল্যবান পাথর সাথে ভারী চামড়ার ব্রেসলেট পরে যুদ্ধক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতেন, কারণ বিশ্বাস করা হত হীরা তাদেরকে যাদুকরি শক্তি যোগাবে । রোমানরা মনে করত তারাই ভাগ্যবান যারা তাদের ব্রেসলেটের মধ্যে ঐন্দ্রজালিক হীরা ব্যবহার করতে পারবে ।

পান্না

প্রাচীন রোমান পন্ডিত প্লা্‌ইনী লিখেছেন পান্নার মধ্যে ভবিষ্যদ্বাণী করার একটি অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা রয়েছে । তাই রোমান সম্রাট নিরো গল্ডিয়েটরদের নজরদারির জন্য পান্না সানগ্লাস পরতেন। পান্না তার মালিকের মেমোরি বৃদ্ধি ও বুদ্ধিমত্তা বাড়ায় । কিছু কিংবদন্তি মতে পান্না হল মৎসকন্যার ধন, যা নাবিকদেরকে ঝড় বিপদের সময় নিরাপদ রাখে।


প্রাচীন রোমানরা বিশ্বাস করতেন যে সমুদ্রের দেবতা নেপচুনের কাছে পান্না পবিত্র তাই নাবিকরা সমুদ্রের বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এই পান্নাকে ব্যবহার করত ।

রুবি/চুনি

রুবি নিয়ে সবচেয়ে প্রাচীন প্রবাদটি হল, যে বাম হাতে এটা পরিধান করবে সে ভাগ্যমান হবে । হাজার হাজার বছর ধরে রুবি বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান রত্ন পাথর হিসাবে বিবেচিত । বলা হয়ে থাকে পৃথিবী সৃস্টির সময় বিধাতা যখন বারটি মুল্যবান পাথর সৃস্টি করেছিলেন তখন এর মধ্য়ে রুবী ছিল সবচেয়ে মুল্যবান পাথর এবং বাইবেলে রুবি প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে যে জ্ঞানের মুল্যের পরেই রূবির মুল্যমান । রুবিকে তাপ ও শক্তির প্রতিনিধিত্বকারী বলে মনে করা হত । প্রাচীন জনগোষ্ঠির লোকেরা মনিটিকে বুলেট বোমা হিসাবে ব্যবহার করত কারণ তারা বিশ্বাস করত যে একটি পানি ভর্তী পাত্রে একখন্ড রুবী রাখা হলে মহুর্তেই তা ফুটন্ত পানিতে পরিনত হয়ে যাবে ।

নীলকান্তমণি

প্রাচীন সভ্যতাগুলি বিশ্বাস করত যে পৃথিবীটাই একটি বিরাট নীলকান্তমণির উপর স্থাপন করা হয়েছিল, যা তার প্রতিফলন দিয়ে আকাশকে নীল রং করেছে। প্রাচীনকালে, নীলকান্তমণিকে ঈর্ষাবিরোধী এবং এমনকি বিষক্রিয়ার বিরুদ্ধেও সুরক্ষার জন্য বিবেচিত হত । একটি সাধারণ বিশ্বাস ছিল যে একটি বিষাক্ত সাপকে যদি নীলকান্তমণির উপরে রাখা হয়, তাহলে তা দ্রুত মরে যাবে! মনে করা হত নীলকান্তমণি ঐশ্বরিক অনুগ্রহের প্রতিনিধিত্বকারী তাই এটা রাজা বাদশাদের জন্য পছন্দের রত্ন ছিল। ব্রিটিশ ক্রাউন জুয়েলারীর অনেকগুলিই বড় নীল নীলকান্তমণি দ্বারা সুশুভিত , এমনকি প্রিন্স চার্লস লেডি ডায়ানার সাথে এনগেজমেন্টের জন্য একটি নীলকান্তমণি অঙ্গুরীয় বেছে নিয়েছিলেন।



পোখরাজ

মিশরীয়রা বিশ্বাস করত যে পোখরাজ সূর্য দেব রা’য়ের সোনার গহ্বরে রঙিন ছিল। প্রাচীন গ্রিকরা বিশ্বাস করত যে এর মধ্যে মানুষের শক্তি বৃদ্ধি করার অদৃশ্য ক্ষমতা রয়েছে। রোমানরা জুপিটারের সাথে পোখরাজ জড়িত আছে এবং একে সূর্যের দেবতাও হিসাবেও গন্য করত ।

সুর্য দেবতা রা এর প্রতিকৃতি


উনিশ শতকে রাশিয়ায় গোলাপী পোখরাজ আবিষ্কৃত হয়। রত্নটি এতটাই চিত্তাকর্ষক ছিল যে, কেবল জার, তার পরিবার এবং যাদের তিনি এর মালিকানা দিয়েছেন তারাই ব্যবহার করতে পারত । পর্তুগিজ রাজ মুকুটটি বিশাল আকারের পোখরাজ এর নমুনা।

ফিরোজা

প্রাচীন কাল হতেই মনে করা হত যে ফিরোজা মন্দ কাজ বা প্রভাব হতে রক্ষার জন্য একটি প্রতিরক্ষামুলক ব্যবস্থা হিসাবে কাজ করে কারণ এর অনেক আধ্যাতিক বৈশিষ্ট আছে বলে বিশ্বাস করা হত । প্রাচীন মেক্সিকোতে, ফিরোজা দেবতাদের জন্য সংরক্ষিত ছিল এবং মর্তের মানুষরা এর ব্যবহারযোগ্য ছিল বলে মনে করা হতোনা । এশিয়ায় বিশেষ করে দক্ষিন পুর্ব অঞ্চলে কুদৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ফিরোজা ধারণকে একট কার্যকর সুরক্ষা বলে বিবেচনা করা হত । মার্কিন যুত্তরাস্ট্রে বিশ্বাস ছিল এটা ধারণে শিকাড় বা লক্ষ্য বস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষমতা দান করে ।

মুক্তা

দীর্ঘ দিন ধরে "রত্ন রানী" হিসাবে মুক্তা পরিচিত । মুক্তা সম্পর্কে রয়েছে বেশ কিছু কিংবদন্তি । চায়নিজরা বিশ্বাস করে ড্রাগন আকাশে মেঘের সাথে যুদ্ধ করার ফলে সেখান হতে বৃস্টির সৃস্টি হয় এবং সেই ঝড়ে পড়া বৃষ্টিবিন্দু ঝিনুক গিলে ফেলায় সে গুলি মুক্তায় পরিনত হয় ।


প্রাচীন গ্রিকরা বিশ্বাস করত যে মুক্তার গহনা পড়া নববধুর দাম্পত্য জীবন সুখের হবে এবং মুক্তার মালা পরিধান করে থাকলে কোন দিন কোন কারণেই তাদের অশ্রুবিন্দু ঝড়বেনা ।


আসল নকল রত্ন পাথর ও তার উপকারীতা নিয়ে কিছু কথামালা

প্রাকৃতিক বা খাঁটি রত্নগুলো দুষ্প্রাপ্য ও মূল্যবান তাতে কোন সন্দেহ নেই । এগুলি অনেক সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। আসল রত্নের মূল্য প্রচুর। রাজা-বাদশারাই সেগুলি ব্যবহার করতে পারে। যেমন কোহিনুর হিরা । একরকম বহু মূল্যবান রত্ন মণিমাণিক্য দিয়ে রাজা-বাদশা-রানিদের মুকুট, কোমরবন্ধ, বাজুবন্ধে খোচিত করে পরিধান করা হত । কোন রাজা কত শৌখিন কত তাঁর রত্নভাণ্ডার আছে তা দেখানোর আয়োজন চলত পোশাকে-মুকুটে।

সেই মহামূল্যবান রত্নের মর্যাদা এখন গ্রহশান্তির জন্য তলানিতে এসে ঠেকেছে। এখন ঠগ-প্রতারক জ্যোতিষীবাবুদের রুজিরোজগারের পথ দেখাচ্ছে। রত্ন (Gems) এখন পাথরে (Stone) এসে জলের দামে বিকোচ্ছে। মামলা-মোকদ্দমা জিতিয়ে দিচ্ছে, সন্তানের চাকরি পাইয়ে দিচ্ছে, মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে, অশান্ত সংসারে শান্তি ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি আজ এগিয়ে এসেছে রত্নকে সুলভ করার কাজে যাতে জ্যোতিষবাবুরা খেয়েপড়ে বেঁচে থাকতে পারে ।


কৃত্রিম উপায়ে রত্ন-পাথর তৈরি করতেও সক্ষম হয়েছে মানুষ। যদিও আসল রত্ন দেখতে পাওয়া খুবই কঠীন তবুও সুযোগ পেলে রত্ন-পাথর আসল কি নকল সেটা জেনে নেওয়া যেতেই পারে । রত্ন-পাথর আসল কি নকল বোঝার জন্য অভিজ্ঞ চোখ প্রয়োজন। প্রথমত, রত্ন-পাথরের আকৃতি, রং, স্বচ্ছতা ও এর ভিতর সুক্ষ্ণ যেসব অবাঞ্চিত পদার্থ থাকে, তার বিন্যাস দেখে প্রাথমিক ধারণা তৈরি করতে হবে।এ ব্যাপারে সঠিক ধারণা পাওয়ার জন্য অনুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্য নিতে হবে। তবে রত্ন-পাথর যাচাই করার সব চেয়ে ভাল উপায় হল রত্ন-পাথরের প্রতিসরণাংক (Refractive Index)যাচাইকরা। রত্ন-পাথরের প্রতিসরণাংক জানা থাকলে তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে রত্ন-পাথরের সঠিক পরিচয় পাওয়া সম্ভব। কারণ কোনো বিশেষ রত্ন-পাথরের প্রতিসরণাঙ্ক নির্দিষ্ট, এর হেরফের বিশেষ দেখা যায় না। যেমন হিরের প্রতিসরণাংক ২.৪১৭। এ ছাড়া বিচ্ছুরণ (Dispersion)ধর্ম যাচাই করেও রত্ন-পাথর আসল কিংবা নকল তা যাচাই করা সম্ভব। তাছাড়া রত্ন-পাথরের কাঠিন্যতা (hardness),আপেক্ষিক গুরুত্ব (Specific gravity) ইত্যাদি ধর্ম যাচাই করে সহজেই নকল ও আসল রত্ন-পাথর চেনা যায় ।




রত্ন পাথরে জ্যোতিষি ভাষ্য

রত্ন পাথর আসল হোক কিংবা নকল হোক – জ্যোতিষীগন সেগুলি ব্যবহার করার নিদান দেন গ্রহশান্তির জন্য। তারা বলে থাকেন গ্রহদের যেমন নিজস্ব তেজ বিকিরণের ক্ষমতা আছে, প্রতিটি রত্মেরও তেমনই পৃথক পৃথক তেজ আহরণের ক্ষমতা আছে। সূর্য এবং গ্রহমণ্ডল থেকে বেরিয়ে আসা এই আলোকরশ্মিই আমাদের উপর নানাভাবে কাজ করে। ভুগর্ভে বা সমুদ্রগর্ভে যে সকল রত্ন-পাথর সৃষ্টি হয় তাহাও ওই সৌররশ্মিরই রাসায়নিক ক্রিয়ার ফল। তাই জ্যোতিষেরা বলে থাকেন রত্ন-পাথর ব্যবহারে সুফল পাওয়া যায় ।


পশু বা মানুষের রক্ত গায়ে মাখলে মানুষের শরীরের রক্তাল্পতা কমে যায় বলে যারা বিশ্বাস করেন তাদের মানসিক সুস্থতা নিয়ে সন্দেহ আছে বলে ধরে নেয়া যায় । সরাসরি লোহা চিবিয়ে খেলে বা শরীরে টন টন লোহা বাঁধলেও রক্তাল্পতা যে সারবে না তা হলফ করে বলা যায় ।তবে রত্নগুলির সৌন্দর্য অস্বীকার করা যায় না। রত্ন দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশ সাজিয়ে নিতে কার-না ভালো লাগে। কিন্তু গ্রহশান্তির নামে নীলা-পোখরাজ মানুষকে পরিয়ে দেয়া বা তার মাথায় বাড়ি দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়া সেটা মেনে নেয়া যায়না । ভয় দেখিয়ে, রত্ন কিনতে মানুষকে বাধ্য করার বিষয়টি অবশ্যই প্রতিবাদের যোগ্য । মানুষের শরীরে রত্ন-পাথরের কোনো ভূমিকা নেই। রত্ন-পাথরের কোনো ক্ষমতা নেই। ভালো কিছু করার ক্ষমতাও নেই, খারাপ কিছু করারও ক্ষমতা নেই। দুষ্ট প্রভাব বলতে যেমন কিছু নেই, তেমনি দুষ্ট প্রভাব হটানোরও কোনো ক্ষমতা রত্ন-পাথরের নেই রত্ন-পাথর মানুষের শরীরে কোনো বিক্রিয়া করে না। সারা শরীরে যেখানেই রত্ন-পাথর বাঁধা হোক না কেন , সেটা শুধু একটাই কাজ করবে সৌন্দর্য আভিজাত্য বৃদ্ধি। তা না হলে রত্ন পাথর শ্রমিক ও কারিগর যারা মাসের পর মাস বছরের পর রত্ন পাথর নিয়ে পরে থাকেন তাদের দিন কেন কাটে করুন হালে , তাদের প্রত্যেকেরইতো রাজা বাদশাহ বা সুসাস্থ্যের অধিকারী হিসাবে দেখা যেত !!

বেশ বিজ্ঞের মতো জ্যোতিষেরা চরম আত্মবিশ্বাসের উপর ভর দিয়ে বলে থাকেন – রত্ন-পাথর বিভিন্ন ক্ষতিকারক রশ্মি শোষণ করে মানুষের শরীরকে রক্ষা করে। উল্লেখ্য পৃথিবীর ওজোনস্তর পেরিয়ে সরাসরি ক্ষতিকর রশ্মী পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা অসম্ভব।এক-আধটু রশ্মি যে পৃথিবীতে আসে না, তা নয়। তবে সেই রশ্মি রত্ন-পাথর কেন -- পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত এমন কিছু আবিষ্কার হয়নি, যা দিয়ে ওইসব রশ্মি আটকে দিয়ে মামলা-মোকদমা ইত্যাদি জিতিয়ে দেওয়া যায়। বিজ্ঞানে এসব ধান্দাবাজির কোনো জায়গা নেই।
জ্যোতিষ বিষয়ক কিতাবগুলিতে দেখা যায় নীলা ধারণে ক্যান্সার সেরে যাবে। হিরে বা পীত পোখরাজ ধারণে ডায়াবেটিস থেকে মুক্তি পাওয়া যায় । পীত পোখরাজ ধারণ করে বৃহস্পতিকে খুশি করতে পারলে বন্ধ্যা নারীও গর্ভবতী হবে। নেতা-মন্ত্রীও হওয়া যায়। এরকম কঠিন কঠিন রোগ সারাতে পারে রোগীরা। তাহলে আর দরকার কী চিকিৎসা আর চিকিৎসকের ? দরকার কি এত খুন খারাবি করে দেশে অশান্তি হরতাল ডেকে ক্ষমতার মসনদে যাওয়ার , মুল্যবান রত্ন ভান্ডার গায়ে চড়িয়েই তো মন্ত্রি মিনিষ্টার হওয়া যায় !!

জুয়েলারির মালিক, রত্ন-পাথর বিক্রেতা, উৎপাদনকারী, খননকারী, উত্তোলনকারীদের একমাত্র ভরসা এই জ্যোতিষ পন্ডিতেরাই । জ্যোতিষরাই একমাত্র সক্ষম নিন্মবিত্ত মধ্যবিত্ত সাধারণদের মধ্যে রত্ন-পাথর বিক্রি করা সুযোগ করে দেয়ার । রত্ন-পাথর বিক্রির বাজার তৈরি করে দিয়েছেন এই জ্যোতিষবাবুরাই। নাহলে একচেটিয়াভাবে ধনীরাই শুধুমাত্র রত্ন ব্যবহার করত। গরীব দেশে এর ব্যাবসা কী জম জমাট হত ?

বর্তমানে জ্যোতিষেরা জ্যোতিষকে শাস্ত্র বলে চালাতে চায়, অনেকে আবার একটু দুঃসাহসিক হয়ে একে বিজ্ঞানও বলে থাকেন। বৈদিক যুগে জ্যোতিষ বলতে বোঝাত দিন, বছর, ঋতু ইত্যাদির গণিতসিদ্ধ বিচার পদ্ধতি।সেখানে আছে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানের সঙ্গে বৃষ্টি ও কৃষি সম্বন্ধীয় বিষয়। এই গ্রহ-নক্ষত্রদের সঙ্গে মানুষের ভাগ্য যুক্ত করা হয়নি।এই জ্যোতিষে ভবিষ্যকথন নেই, ভাগ্যকথা নেই, গ্রহ-নক্ষত্রের অহেতুক রাগরোষের কথা নেই। এই জ্যোতির্বিজ্ঞান গ্রিস যাযাবরদের হাত ধরে জ্যোতিষ হয়ে গেছে । মানুষের ভাগ্য গণনার ফাকিবাজী পদ্ধতি এতদিন টিমটিম করত , যত দিন যাচ্ছে, মানুষের চাহিদা বাড়ছে, যতই না পেয়ে হতাশ হচ্ছে ততই জ্যোতিষীদের রমরমা বাড়ছে। গলিতে গলিতে এখন জ্যোতিষী গড়াচ্ছে। রত্ন- পাথরের ব্যবসা রমরমা হচ্ছে ।

বিশ্বের কয়েকটি বিখ্যাত রত্ন –পাথর উৎপাদনকারী দেশ

কলম্বিয়া

বিশ্বের মোট Emerald এর শতকরা ৭০-৯০ ভাগ যোগান দিয়ে থাকে কলম্বিয়া ।
কলম্বিয়ার পার্বত্য অঞ্চলে পাওয়া যায় বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ এমারেল্ড ।


আফ্রিকা

উৎকৃষ্ট মানের ডায়মন্ড আহরনের জন্য আফ্রিকা বিশ্বব্যাপী পরিচিত । এই আশ্চর্যজনক পাথর সরবরাহে সর্বাধিক অবদানের জন্য উল্লেখযোগ্য দেশগুলি হলো দক্ষিণ আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র, ঘানা, সিয়েরা লিওন, দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকা, অ্যাঙ্গোলা , তানজানিয়া এবং মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র।


পূর্ব আফ্রিকায় কেনিয়া, তানজানিয়া এবং মোজাম্বিকের মতো দেশগুলি রুবি, নীলকান্তমণি, "তানজানাইট" পান্না, আলেকজান্ডারাইট, অ্যাকারমারিয়ার, রোডোলাইট এবং "tsavorite" গার্ডেন এবং টেমপ্লেইন উৎপন্নের জন্যও পরিচিত।

শ্রীলংকা

রত্ন পাথর উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে শ্রীলংকা অন্যতম , ৫০ টিরও বেশি বিভিন্ন ধরণের রত্ন পাথর পাওয়া যায় শ্রীলংকায় যার মধ্যে নীলকান্তমণি অন্তর্ভুক্ত । শ্রীলংকা রত্ন পাথরগুলি ধনী দেশগুলির নিকট সবচেয়ে জনপ্রিয় । বিভিন্ন ধরনের বহুমূল্যবান রত্ন গুলি সেখানে থাকার কারণে একে " ভারত মহাসাগরের ট্রেজার বক্স" নামেও অভিহিত করা হয় । শ্রীলংকার রতনপুরাতে অবস্থিত পাহাড়ী এলাকায় একটি বিখ্যাত রত্ন আহরণ কেন্দ্র রয়েছে, যা "জেম টাউন" নামে পরিচিত। শ্রীলংকার সবচেয়ে মূল্যবান রত্ন পাথরগুলি গ্রেট ব্রিটেন ও রাশিয়ার মত বিভিন্ন দেশের রাজকীয় জহরত হিসাবে ব্যাবহৃত হচ্ছে ।

শ্রীলংকার রতনপুরায় অবস্থিত আদম চুড়া (Adam’s Peak) পাহাড় যা শ্রী পদ ( Holy Foot) নামেও পরিচিত ।


কিংবদন্তি বলছে বুদ্ধ তার পাদদেশটি প্রথম এখানে রেখেই দ্বীপটির চারপাশে ঘুরেছিলেন , যা চূড়ার পিছনে একটি বড় পদচিহ্ন হিসাবে রেখে চলেছে। সেখানকার খ্রিস্টান এবং মুসলমানগন বিশ্বাস করেন যে সৃস্টি কর্তার আদেশে বেহেস্ত হতে ফেরেশতাগন কতৃক হযরত আদম ( আ.) প্রথম এখানেই পতিত হয়েছিলেন , আর হিন্দুরা এটিকে ঈশ্বর শিবের পদাঙ্ক হিসেবে মনে করেন । সমস্ত প্রধান ধর্মের কাছে পবিত্র এই সুন্দর পাহাড়ী তীর্থস্থানটির পাদদেশে পাথরের ভাজে ভাজে পাওয়া যায় মহামুল্যবান রত্ন পাথর, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল রুবি, নীলকান্তমণি, স্পিনিল, ফাইনেস্ট ক্রিসোব্রেল (ক্যাট-আই এবং আলেক্রেড্রিটি সহ), পোখরাজ, ট্যুরিজমিন, কোয়ার্টজ, পেরিডট, চন্দ্র পাথর, গারনেট, জিরকন এবং অন্যান্য রত্ন পাথর ।

মায়ানমার

বিশ্বের সর্বাধিক রুবী উৎপাদনকারী দেশ হল মায়ানমার, বিশ্বের মোট রুবীর প্রায় ৯০% মায়ানমার সরবরাহ করে থাকে ।
মায়ানমারের মোগোক (Mogok ) পৃথিবীর সবচেয়ে খ্যাতনামা রত্ন খনি। সবচেয়ে ব্যয়বহুল চমৎকার রত্ন পাথর সরবরাহ করার কারণে এটা “Valley of Rubies” হিসাবে পরিচিত, । মোগোকের সবচেয়ে উৎপাদিত পিট হল সাফারি খনি যা প্রতিদিন ৮০০ গ্রাম রত্ন পাথর উৎপাদন করে যা হতে দৈনিক প্রায় ৪০০০ ক্যারেট রত্ন পাথর পাওয়া যায়।
মায়ানমারের অন্যান্য মূল্যবান রত্ন পাথরের মধ্যে রয়েছে যা নীলকান্তমণি, স্পাইন , ইম্পেরিয়াল জেড প্রভৃতি। এই দেশটির রত্ন পাথরের বেশিরভাগই এশিয়ান দেশগুলি যথা থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের বাজারকে সমৃদ্ধ করে ।

মোগোক (Mogok ) এর পাহাড়ী এলাকার রত্ন পাথর খনি হতে রুবী সংগ্রহ



অস্ট্রেলিয়া

বিশ্বের মোট অপ্যাল উৎপাদনের প্রায় ৯০ ভাগই উৎপাদিত হয় অস্ট্রেলিয়ায় ।
অস্ট্রেলিয়া বিভিন্ন ধরণের বর্ণালী Opal সরবরাহ করে। অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় খনিগুলি নিউ সাউথ ওয়েলসের কোবর পেডিতে অবস্থিত। কোবর পেডির পুরনো খনিগুলি এখন সুন্দর সুন্দর ভূগর্ভস্থ ঘরে পরিণত হয়েছে।



রত্ন খনি শ্রমিক শোষন ও নির্যাতন

খনি থেকে অথবা পাহাড় কেটি জেমস আহরন একটি শ্রমসাধ্য কাজ আবার এটাকে গেমলিং এর সাথেও তুলনা করা যায় । বলা হয়ে থাকে ৬০০ মন পাথর ভাঙলে নাকি মাত্র এক তোলা হিরা পাওয়া যায় । একারণে এর সাথে জড়িত শ্রমিকদেরকে একদিকে করতে হয় কঠোর পরিশ্রম আরদিকে করতে হয় অনিশ্চিত আয় অর্জনের জীবন যাপন । খনি ও পাহাড় কেটে রত্ন পাথর সংগ্রহের চিত্র প্রায় সব দেশে একই রকম ।

প্রায় সর্বত্রই দেখা যায় ঝুকিপুর্ণ কাজের জন্য শ্রমিকদেরকে দেয়া হয়না নিরাপদ ইউনিফর্ম , ফলে প্রায়ই তারা মারাত্মক দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে থাকে ।


দক্ষীন আফ্রিকায় একজন নারী খনি শ্রমিককে কোমরে দড়ি বেধে ক্রেন দিয়ে খনি গর্ভে নামানোর দৃশ্য



মায়ানমারের Mogok Stone Tract এ রুবীর সন্ধানে ছোট্ট বালিকাটি পাথর ভাঙ্গার মত কঠিন কাজেরত



রত্ন পাথর আহরনের ফলে মানব ও পরিবেশ বিধ্বংসী প্রভাব

দেশে দেশে রত্ন পাথর শিল্পের মানব বিধ্বংসি ফলাফল জগতবাসি প্রত্যক্ষ করছে । আফ্রিকার কয়েকটি অঞ্চলে হিংস্র সংঘর্ষের জন্য হীরা ব্যবহার করা হয়েছে বলে বহু কথাই মিডিয়াগুলিতে রয়েছে ।

বিংশ শতাব্দির শেষ প্রান্তে ডায়মন্ড সংঘাত নিয়ে সেহরালিয়্ন ,এঙ্গোলা ও কঙ্গোর মধ্যে হয়েছে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ । ১৯৯৪ সনে সেহরালিয়নের Revolutionary United Front (RUF)সেখানকার হিরক অঞ্চলের নিয়ন্ত্রন নেয়ার সময় পঞ্চাশ হাজারের বেশী মানুষ হত্যা করেছে এবং [link|https://en.wikipedia.org/wiki/Sierra_Leone_Civil_War|প্রায় ৪.৫০ মিলিয়ন মানুষকে গৃহছাড়া করেছে।
অপরদিকে সাম্প্রতিককালে দেখা গেছে রত্ন-পাথর ব্যবসাটি কিছু দেশকে যেমন মায়ানমারের সামরিক শাসনকে সমর্থন করে গেছে । সামরিক শাসন বন্দের জন্য আমিরিকা সহ বিশ্ব মানবাধিকার সংস্থাগুলি মায়ানমারের রত্ন ব্যবসা বয়কটের আহ্বান জানানোর পরেও মায়ানমারের সামরিক সরকার নিয়মিতভাবে রঙ্গিন রত্ন পাথর নিলামে বিক্রয় অব্যাহত রাখে , যার ফলে এই আহবান সত্বেও প্রতি বছর মায়ানমার হতে গড়ে ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশ্ব রত্ন বানিজ্য হয়েছে । মায়ানমারের রত্ন খনিগুলি সামরিক কর্তৃপক্ষের দখলীভুত হয়ে ব্যাপক ভূমি বিধ্বংসী কার্যকলাক, জঞ্জাল, চাঁদাবাজি, জোরপূর্বক শ্রম, শিশু শ্রম, পরিবেশ দূষণ এবং অনিরাপদ কাজের পরিবেশ সহ কঠোর অবস্থার দ্বারা রত্ন পাথর শ্রমিকেরা ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জেমসস্টোন মাইনিং এলাকায় খনি শ্রমিকেরা দুষিত পানি নিয়মিত ব্যবহার করছে । ফলে তারা বায়ু ও জলবাহিত রোগ শোকে ভুগছে । সে সাথে ব্যপকহারে ভুমি ক্ষয়তো ঘটেই চলেছে । সার্বিক ইকোসিসটেমে বিরূপ প্রভাব পড়ছে উদাহরন স্বরূপ বলা যায় কোরাল রিফ এ ব্যাপক ক্ষতি সহ ভুঅভ্যন্তরে গুহার সৃষ্টি করছে ।



রত্ন পাথর বানিজ্যে অনৈতিকতা

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে রত্ন পাথরগুলি বিশ্বের বিলাসী পণ্য বাজারে গুরুত্বপুর্ণ স্থান দখল করে নিয়েছে । Wall Street Journal মতে টপ কোয়ালিটি রুবী রত্ন পাথরের প্রতি ক্যারটের দাম ১৯৭৫ সনে যেখানে ছিল ২৫০০ ডলার সেখানে ২০১৭ সনে এর দাম ৫৩৯২৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে । নীল sapphire এর দাম ১০০০ ডলার হতে বেড়ে ১৫১০০ ডলার হয়েছে ।

অনেক দেশে যেমন পাকিস্তানে রত্ন পাথরের এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি কতৃপক্ষের নজড়ে পড়েনি । এই রত্ন পাথরের ব্যবসাকে ইনফরমাল মার্কেটিং ক্যাটাগরী হিসাবে গন্য করে একে সর্বপ্রকার প্রকার কঠীন নজরদারীর বাইরে রাখা হয়েছে । একটি
ইনফরমাল শিল্প খাত হিসাবে বহুবিদ অশুভ কায়দা কানুন নিয়ে এই রত্ন -পাথরের ব্যবসাটা দুনিয়া জোড়ে ফুলে ফেপে উঠেছে, এটা মুলত এখন wonderland for criminals


অনেক দেশ বিশেষ করে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে এই জেমস্‌ বানিজ্য কতৃপক্ষের অগোচরে অসাবধানতায় বেড়ে উঠলেও বিশ্বের ইনডাসট্রি লিডারগন কিন্তু তাদের চোখ কান খোলা রেখেছে। সুযোগ নিতে তারা মোটেও কোন ছাড় দোয়নি । নব্বই দশকে খনি হতে হিরা আহরন কার্যক্রমে যেমন অনৈতিকতা দেখা গিয়েছিল ঠিক একইভাবে জেমসস্টোন পলিশিং এবং এর রংগীন মুর্তী দেয়ার ক্ষত্রেও অনেক অনৈতিকতার ছাপ দৃষ্ট হচ্ছে । নিউ ইয়র্কের একটি জুয়েলারী দোকানে যে রত্ন পাথরটি বিক্রয় হয় তা খনি হতে আহরণের পর কাটিং , সেটিং এবং কালারিং এর পর প্রায় অর্ধ ডজন হাত বদল হয়ে যখন জুয়েলারী দোকানে পৌঁছায় তখন সেই পলিস্ড কালার্ড জেমস্টোনের আদি নিবাস নির্ধারণ করা খুবই কঠীন হয়ে দাঁড়ায় কারন এই হাত বদলগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই থাকে আনডকুমেন্টেড । এ গুলি সনাক্ত করার জন্য কোন উপযুক্ত মেশিনও নেই সবার কাছে ।

যদিও International Colored Gemstone Association (ICA) জাতি সংঘের সহায়তায় এ লক্ষ্যে কিছু কাজ করছে তার পরেও এই ব্যবসার অনৈতিকতার বিভিন্ন চোরাগুপ্তা অন্ধি সন্ধি গুলি বন্দ হয়নি, বরং ক্রমেই তা বেড়ে চলেছে ।

যতই প্রতিবন্ধকতা সৃস্টি করা হোক না কেন ক্রিমিনালগন ঠিকই তাদের রাস্তা বের করে নিচ্ছে । উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে এখন বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক কাজ যথেষ্ট পরিমানে হচ্ছে যা বিশ্ববাসীর নজড়ও কাড়ছে ।

Gem cutters ply their trade in Namak Mandi, the historic gem bazaar in Peshawar’s old city.


আফগানিস্তানের অফিসিয়াল জিউলজিকেল সার্ভে প্রতিবেদন অনুযায়ি দেখা যায় তারা তাদের ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের মুল্যবান খনিজ পাথরের চোরাচালান বন্ধ করতে পারছেনা কোন মতেই । কুখ্যাতভাবে এ গুলির অধিকাংশই কড়াকড়ি নজরদারী এড়িয়ে খুব সহজেই পাহাড়ী পথ বেয়ে টরকাম বর্ডার পারি দিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে পাকিস্তানের পেশোয়ারে । আফগান কতৃপক্ষ সবসময় অভিযোগ করে আসছে পাকিস্তান এই কাঁচা রত্ন পাথরগুলিকে কাটিং সেটিং ও প্রয়োজনীয় রং মাখিয়ে জুয়েলারী প্রোডাকশনে এর ভেলু এডিশন বাড়িয়ে বানিজ্য করার মানষে তলে তলে উদার নীতি পালন করে চলছে ।

পাকিস্তানের সরকারী উদার নীতির ফলে অনেক কিছুই ঘটছে । আফগান মুলুক হতে কাঁচা রত্ন পাথর পাকিস্তান , সেখান হতে গায়ে রং ডং মাখিয়ে পারি দিচ্ছে কলমবিয়াতে , যার রয়েছে জেমসস্টোন বানিজ্যে বিশ্বজোড়া সুনাম । উল্লেখ্য জেমসন্টোন বানিজ্যে দেশ ভিত্তিক সুনামের য়থেস্ট মুল্য রয়েছে । কলম্বিয়ার খাটি রত্নের কথা সকলেই জানে , ফলে কলম্বিয়ান রত্ন হিসাবে এর দামটাও বৃদ্ধি পায় সেরকম ভাবে ।

কলম্বিয়ার অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ানগন কতৃক খাটি রত্ন পাথর প্রক্রিয়াকরনের দৃশ্য


অনুরূপভাবে বার্মিজ তথা মায়ানমারের রত্ন পাথরেরও যথেষ্ট কদর রয়েছে বিশ্ব বাজারে যা আফগান পাথর হতেও বেশী মুল্য ধরে । তাই পাকিস্তান হতে আফগান পাথরগুলি থাইল্যান্ডের ব্যাংককে পাড়ি দিয়ে অন্যরূপ ধরে বার্মীজ রত্ন পাথর হিসাবে বিশ্ব বাজারে প্রবেশ করছে দেদারছে ।

উপরে বর্ণিত প্রক্রিয়ায়, রত্ন পাথরের উৎসের প্রকৃত ইতিহাস মুছে ফেলা হয়। শুধু কি তাই এগুলি জংগী অর্থায়নেও ব্যবহৃত হচ্ছে । উত্তর আফগানিস্তানের একটি জংগী গোষ্ঠি সেখানকার রত্ন পাথরগুলি যে কোন মাদক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দিতে পারে, যারা পরে পেশোয়ারের একটি ব্যবসায়ী গুষ্ঠির মাধ্যমে সেগুলিকে কলম্বিয়ার কাছে হস্তান্তর করতে পারে , যেখানে তা আবার কলম্বিয়ার রত্ন পাথরের সাথে মিশে বিশ্ব বাজারে প্রবেশ করে। কানাডায় একজন ব্যক্তি যখন একটি জহরত পান্না কিনেছেন তিনি কি তখন জানতে পারবেন যে এগুলি জঙ্গিদের জন্য অস্ত্র ক্রয় কিংবা আফগানিস্তানের ড্রাগ ব্যাবসায়ীদের জন্য অর্থ লুণ্ঠনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ।

আর একটি অনৈতিক কাজ হচ্ছে বৈদেশিক বানিজ্যে রত্ন পাথরের বিভিন্ন নাম ব্যবহার করে উচ্চ শুলক হার পরিহার করা , সে সাথে আন্ডার ইনভয়েসিং তো আছেই । অনেক সময় মুল্যবান রত্ন পাথরগুলিকে piece of coloured glass পরিচয়ে সুলভে শুল্ক পথ পাড়ি দেয়ার কথাও শুনা যায় বিভিন্ন সময়ে ।

এসব বিষয়ে বাংলাদেশর কথাও সকলেরই কম বেশি জানা আছে । ভারতীয় Gems and Jewelry Export Promotion Council (GJEPC) এরজুয়েলারী প্যানেলের আহ্বায়ক পঙ্কজ পারিখ বলেছেন Bangladesh is one of the big market for gems and jewelry in the region even with high import duties. And even with 67 percent (reduced duty on diamonds to 15 per cent from 67 per cent last year) duty on imported jewelry products, the country is a hot bed for smuggled items. Indian products are finding their way through Dubai to Bangladesh .

বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৩০০০ কোটি টাকার জুয়েলারী বানিজ্য হয় এর মধ্যে ভারত হতে বাংলাদেশে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার জুয়েলারী রপ্তানী হয় বলে পারিখ উল্লেখ করেছেন । এই বানিজ্যটি কি সঠিকভাবে হয়, না রত্ন পাথর নিয়ে বিশ্ব বানিজ্যের মতই এখানেও কোন বিচিত্রতা আছে তা শুধু কতৃপক্ষই বলতে পারেন ।

ভারতীয় সস্তা পাথরে বাংলাদেশী রত্ন পাথরের মার্কেট সয়লাব

ভারত সহ বিদেশ হতে যে সমস্ত রত্ন পাথরগুলি দেশে আসছে সেগুলির চক মকা দৃশ্য কিছুটা দেখা যাক নীচে
বিভিন্ন রত্ন পাথর বিক্রেতার ওয়েব সাইট হতে সংগৃহীত রত্ন পাথরের ছবি -১


বিভিনান রত্ন পাথর বিক্রেতার ওয়েব সাইট হতে সংগৃহীত রত্ন পাথরের ছবি -২


এখানে উল্লেখ্য আসল রত্ন পাথরকে এত মসৃন চকচকে পালিশ করা যায়না ও তা করাও হয়না ,খালী চোখে নয় যন্ত্রের সাহায্যে সেগুলির সঠিকতা নিরোপন করা যায় । যন্ত্রে ফেলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জেমস পাথরের বৈশিষ্ট যথা ( আপেক্ষিক গুরুত্ব , ক্যারট বা ওজন , প্রতিসরণাংক) ইত্যাদি তালিকার সাথে মিলিয়ে ধরা যায় পাথরটি নকল না আসল , কিন্তু সে ব্যবস্থা কি আমাদের রত্ন পাথর বিপনী বিতান গুলিতে আছে? না তা মানা হয় ? ক্রেতা সাধারণই বা সে সম্পর্কে কতটুকু ওয়াকেবহাল , তবে নিশ্চিত করে বলা যায় রত্ন পাথর বিক্রেতাগন সাথে নিয়ে জ্যোতিষবাবুর প্রেসক্রিপশন শুধু ক্রেতাদের মাথাতেই হাতুরীর ঘা মারছেন আর পকেট হাতরিয়ে নিচ্ছেন তাদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে ।

একটি আন্তর্জাতিক জেমসস্টোন ইন্ডাসট্রির এই ওয়েব লিংক এ ব্রাউজ করলে বিশ্বব্যপী রত্ন পাথর বিক্রেতাদের নাম ঠিকানা পাওয়া য়ায় , এখানে অনুসন্ধানে বাংলাদেশি বেশ কিছু ব্যবসা প্রতিষঠানের নাম ঠিকানা পওয়া যায় যারা রত্ন পাথর আমদানি ও বিপনণে নিয়োজিত আছে বলে দেখা যায় । তাদের বিভিন্ন ওয়েব সাইট হতে সংগ্রহীত কিছু রত্ন পাথরের বাংলাদেশী বাজারে বিক্রয় দাম নীন্মে দেখানো হলো , এ লিখাটির উপরের অংশে বিভিন্ন রত্ন পাথরের আন্তর্জাতিক বাজার দাম সম্পর্কে সংস্লিষ্ট পাথরগুলি আলোচনা কালে উল্লেখ করা হয়েছে , এখন নীচের চিত্রটি হতে সচেতন পাঠক যা বুঝার বুঝে নিতে পারেন অনায়াসে ।

৩০০০ টাকা হতে ৬০০০ টাকা মুল্যমানের রত্ন পাথরের ছবি ( প্রতি পিছ পাথরের দাম, কিনতে গেলে ওজন জানা যাবে )


৬৫০০ টাকা হতে ১৮০০০ টাকা মুল্যমানের রত্ন পাথরের ছবি ( প্রতি পিছ পাথরের দাম,কিনতে গেলে ওজন জানা যাবে )


ভারত , মায়ানমার ও থাইল্যান্ডের রত্ন ব্যবসায়ীদের লুলোপ দৃষ্টি বাংলাদেশের সম্প্রসারমান জুয়েলারী মার্কেটের প্রতি । এখানে নতুন করে পুজিবাদি অর্থনীতির বিকাশ ও নব্য ধনাঢ্য শ্রেণীর সৃস্টি হচ্ছে অসাধারণ দ্রুত গতিতে । দেশে এখন কোটিপতির সংখ্যা লক্ষাধিক । ধন্যাঢ্য গুষ্ঠির কাছে রত্ন পাথর পরিধান ও সংগ্রহে রাখা এখন আভিজাত্যের প্রতিক । খুব কম সংখ্যকই ধনাঢ্য ব্যক্তি, ব্যবসায়ী , বড় চাকুরীজীবি এমনকি ধর্মীয় নেতা পাওয়া যাবে যাদের গায়ে ও হাতের আংগুলে রত্ন পাথর কিংবা রত্ন পাথরের গহনা নেই । এটাকে নিরোৎসাহিত করার কোন উপায় নাই , এর সাথে যুক্ত হয়েছে জ্যোতিষ বাবুদের ভয় দেখানো ও আশাবাদী কথামালা । সবদিক বিবেচনায় দেখা যায় এটা এদেশে এখন একটি দ্রুত বিকাশমান শিল্পকলা ও বানিজ্যিক কার্যক্রম হিসাবে পরিগনিত । রত্ন পাথর ও জুয়েলারী প্রক্রিয়াকরণ , পলিশিং, ডিজাইন প্রনয়ন, যোগান ও বিপননের সাথে দেশের প্রায় ৫ লক্ষ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিয়োজিত আছে ।

দেশের ছোট বড় প্রায় সকল শপিং মলের জুয়োলারী দোকান গুলিতে বিভিন্ন প্রকারের জুয়েলারী ও রত্ন পাথরের বিপুল পরিমান নয়নমুগ্ধকর সমাহার এখন সকলেরই নজর কাড়ে ।


জুয়েলারী শিল্পে এগুলির যোগান ও বিপনন সম্পর্কে লিখতে গেলে এই পোষ্টের কলেবর অনেক বড় হয়ে যাবে । তবে এ বিষয়গুলি প্রায় সকলেরই জানা । জুয়েলারী বৈধ ও অবৈধ পথে যে ভাবে আসছে তার চিত্র অনেক সময় মিডিয়াতেও ফলাও করে প্রকাশিত হচ্ছে , জানা যায় অমুক তমুক বিমান বন্দরে কত হাজার তুলা স্বর্ণালংকার ধরা পরেছে । তবে এটা মুলত সিসটেমের বাইরে যা চলে যায় তার অতি ক্ষুদ্র অংশই দৃষ্টিগোচর হচ্ছে । তবে সিসটেমের মোরকে যেগুলি আসে তার খবর কে রাখে । শুনা যায় সেগুলির কিছু যায় উৎপাদনে আর কিছু যায় চোরাচালানে কিংবা বিবিধ বিষয়ের দাম পরিশোধনে । যাহোক সে ভিন্ন কথা ।

আমাদের কথা হলো, এই বিকাশমান শিল্পটি হতে কিভাবে সর্বোচ্চ নৈতিক সুযোগ সুবিধা নেয়া যায় সেটাই বিবেচনা করা । এ শিল্পের বিভিন্ন দিকের উপরে প্রয়োজন কিছু মৌলিক তথ্যের আদান প্রদান ক্রেতা বিক্রেতা ও এর কলাকুশলি সকলের জন্যে । দেশে এ সম্পর্কে ব্যাপক জন সচেতনতা না থাকায় এর সুফল হতে অনেকেই বঞ্চিত । এ শিল্পে ক্রেতা ও বিক্রেতা ও শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ রক্ষার জন্য দেশের কতৃপক্ষ এগিয়ে আসতে পারেন । গড়ে তুলতে পারেন গবেষনা ও প্রশিক্ষন কেন্ত্র । জনগনকে জেমস বৈষিষ্ট ও প্রকৃত জেমস সনাক্ত করনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও গবেষণা পরিষদ ( BCSIR) প্রয়োজনীয় সহায়তা করতে পারেন । ভারত ও থাইল্যাণ্ডে জেমস নিয়ে গড়ে উঠেছে বিশাল বিশাল গবেষনা ও প্রশিক্ষন কেন্ত্র, সে তুলনায় আমাদের এখানে এখন পর্যন্ত নামকা ওয়াস্তে জুয়েলারি ম্যানুফ্যাকচারিং বা গহনা তৈরির কাজে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), এর নকশা প্রশিক্ষন কেন্দ্র হতে কিছু কার্যক্রম পরিচালিত হয় বলে জানা যায় । বাংলাদেশ জুয়েলারী সমিতির কার্যকলাপ শুধু তার মেম্বারদের স্বার্থ রক্ষার্থেই সীমিত এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটটি দীর্ঘদিন ধরে শুধু আন্ডার কনসট্রাকশন হিসাবেই দেখা যায় , তবে সেখানে তাদের পার্টনার হিসাবে ভারতীয় Gems and Jewellery Export Promotion Council (GJEPC), কেই দেখা যায় ব্যাসায়িক স্বার্থে।

তাই কথা হলো এই মহুর্তে দেশে দক্ষ একদল জেমলজিস্ট বা সুদক্ষ প্রফেশলাল রত্ন শ্রমগুষ্ঠি গড়ে তুলা বিশেষ প্রয়োজন । এরা বিকাশমান এই শিল্পের চাহিদার সাথে তাল রেখে দেশ ও বিদেশের শ্রম বাজারে নিয়োগলাভের সুবিধাও নিতে পারবে । আন্তর্জাতিক শ্রম বাজারে একজন দক্ষ জেমলজিস্ট এর প্রারম্ভিক বাৎসরিক বেতন ৩০০০০ ডলার হতে শুরু হয় । একজন লেবরেটরী জেমলজিষ্টএর বেতন ৪০০০০ হতে ৬৫০০০ ডলার , জেমসন্টোন এপ্রাইজারের বেতন ৫০০০০ হতে ৭০০০০ ডলার ,জেমসস্টোন জুয়েলারের বেতন ৩০০০০ হতে ৬৫০০০ ডলার । জেমলজির উপরে বাংলাদেশে কোন কলেজ বা বিশ্ব বিদ্যালয় ডিগ্রী কোর্স নেই, তবে পৃথিবীর অনেক দেশই জেমলজির উপরে স্নাতক (সন্মান) , ডিপ্লোমা ও স্বল্প মেয়াদী সার্টিফিকেট কোর্স পরিচ্লনা করে থাকে । যথা যুক্ত রাজ্যের বার্মিংহাম সিটি বিশ্ববিদ্যালয়েGemmology and Jewellery Studies - BSc (Hons) কোর্স
Canadian Institute of Gemologyতে জেমলজির উপরে ডিপ্লোমা কোর্স
থাইল্যান্ডের Asian Institute of Gemological Sciences এ ডিপ্লোমা কোর্স
এছাড়াও ব্যাংককের GIA হতেও জেমিলজির উপরে গ্রাজুয়েট কোর্স পরিচালনা করা হয় । ভারতের মোম্বাই , নিউইয়র্ক ও লন্ডনেওGIA এর শাখা কেম্পাস আছে । শুধুমাত্র নিউ ইয়র্ক ছাড়া অন্য সকল কেম্পাসেই বিদেশী ছাত্রদের জন্য স্কলারশীপেরও ব্যবস্থা আছে । এখানে CLICK করে বিস্তারিত জানা যেতে পারে । আগ্রহী কেও যদি এটা না দেখেন তা হলে স্কলারশীপের সুযোগ মিস হয়ে যেতে পারে, ২০১৭/১৮ সেসনের জন্য স্কলারশীপের আবেদনের সময় কাল হলো আগস্ট হতে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ।

আন্তর্জাতিক জেমলজি সোসাইটিও( IGS ) রত্ন পাথর শিল্পের বিভিন্ন দিকের উপরে সার্টিফিকেশন কোর্স পরিচালনা করে থাকে । অপেক্ষাকৃত কম টিউশন ফি ( ৪০০ ডলারের মত) দিয়ে অন লাইনেও এ কোর্স করা যায় । আগ্রহী যে কেও এখানে CLICK করে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারবেন ।

পরিশেষে বলতে চাই স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বিস্তৃত মুল্যবান এ রত্ন- পাথর শিল্পটিকে শুধু মাত্র রত্ন ব্যাবসায়ী , জ্যোতিষবিদ ও দেশের ধনাঢ্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিকাশমান এ শিল্পটিকে দেশের নিন্ম থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত সকল শ্রেণী পেশার মানুষের কাছে নৈতিক , সামাজিক ও অর্থনৈতিক কল্যান মুখি কর্মকান্ডে পরিনত করার প্রচেষ্টা গ্রহন এবং সে আঙ্গীকে তা প্রয়োগ একান্ত কাম্য । ভাগ্য পরিবর্তন, বিপদ হতে মুক্তি কিংবা আরোগ্য লাভের নিমিত্ত ব্যবহৃত না হয়ে এটা ব্যাবহৃত হোক কেবলি সৌন্দর্যময়ী ও কল্যানমুলক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে ।

ধন্যবাদ কষ্ট করে এতক্ষন সাথে থাকার জন্য ।

ছবি সুত্র : কৃতজ্ঞতার সহিত অন্তরজাল
কথা ও তথ্য সুত্র : প্রসঙ্গিক ক্ষেত্রে যথাস্থানে লিংক দেয়া হয়েছে ।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা মে, ২০১৭ রাত ৮:১৩
৯৩টি মন্তব্য ৯৪টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাপ বাপকেও ছাড়ে না!!! পার্ট -২

লিখেছেন ঘূণে পোকা, ২২ শে আগস্ট, ২০১৯ দুপুর ২:০৫



সাবেক স্বরাষ্ট্র-প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর...একটা সময় প্রচুর ক্ষমতার মালিক ছিলেন!
এতো বেশি আতিশয্য যে এক শার্ট ২য় বার পড়তেন না,
ওয়ারড্রপে ২০০০ শার্ট রিজার্ভ ছিল!
আজ তার ১ শার্টে মাস পার হয়,... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাস্তায় পাওয়া ডায়েরী থেকে-১০৬

লিখেছেন রাজীব নুর, ২২ শে আগস্ট, ২০১৯ বিকাল ৩:২১



১। বই পড়াটা আপনার উন্নতির জন্য সবচেয়ে শর্টকাট রাস্তা।
একটা টাই, একটা স্যুট, একটা ব্র্যান্ডেড শার্টের চেয়ে একটা ভাল বই আপনাকে বেশি স্মার্ট করবে। বইপড়া স্বাভাবিকভাবেই মানুষকে স্মার্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

এক বাস্তব কুসংস্কারের গল্প।

লিখেছেন জাদিদ, ২২ শে আগস্ট, ২০১৯ বিকাল ৪:০০

কুসংস্কার নিয়ে গত কিছুদিন ধরে একটু পড়াশোনা করার চেষ্টা করেছি। কুসংস্কার কি শুধুই অযৌক্তিক যেকোনো বিশ্বাস বা অভ্যাস নাকি কাকতালীয় কিছু ঘটনার প্রেক্ষিতে কোন ঘটনা যা এক সময় সমাজে স্বীকৃত... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০ জন ডাক্তার, ২০০ জন স্বাস্থ্যকর্মী ডেংগুতে আক্রান্ত

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২২ শে আগস্ট, ২০১৯ রাত ৮:১৮



Hospitals are not mosquito free!

ডেংগুর শুরুতেই ঢাকা মেডিক্যাল, পিজি ও অন্যান্য সরকারী হাসপাতালগুলোর উচিত ছিলো, বংগবন্ধু মিলনাতন, ও এই ধরণের সব বড় বড় মিলনায়তন, ও কম্যুনিটিটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সমন্বিতা (পর্ব-২)

লিখেছেন পদাতিক চৌধুরি, ২২ শে আগস্ট, ২০১৯ রাত ১১:৫৬



ডাক্তারবাবুর ঘোষণার পরে আর দেরি না করে বাড়ির লোকের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্দেশ্যে কাকাবাবুর ব্যাগের ভেতরে ছোট্ট একটি ডাইরি থেকে পাওয়া সপ্তর্ষি দার ফোন নম্বরে কল লাগালাম। প্রথম কলেই লাইন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×