সত্যজিত রায়ের সৃষ্টিগুলোর মধ্যে ফেলুদা একটি আলাদা জায়গা দখল করে আছে। সাহিত্যের ফেলুদা যখন সেলুলয়েডে উঠে এলো - তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, এবার বুঝি তার শ্রী কিছুটা হলেও নাশ হলো।
ফেলুদা চরিত্রটি জেমসবণ্ড বা শার্লক হোমসের মত নয়। এ একেবারেই বাঙালী চরিত্র। আমার আপনার মত ভাত মাছ খাওয়া বাঙালী। পার্থক্য কেবল একটাই, তিনি তীক্ষম বুদ্ধির অধিকারী। পেশীর জোর থেকে যিনি মস্তিষ্কের খেলায় বেশি মনোযোগী।
সত্যজিতের ছবিতে আমরা এই ফেলুদাকেই খুঁজে পাই। জয় বাবা ফেলুনাথ, সোনার কেল্লা ছবিগুলোতে আমরা দেখি তীব্র রসবোধ সম্পন্ন ফেলুদাকে। তার প্রতিটি কথা স্বতঃস্ফুর্ত কিন্তু অসাধারণ সেন্স অব হিউমার পূর্ণ। জয় বাবা ফেলুনাথ ছবিতে ফেলুদার সাথে হোটেলে দেখা হয় এক বডি বিল্ডারের, কিন্তু সেই বডিবল্ডার শুধু শরীরটাই গঠন করেছে, মস্তিষ্কের খেলায় ফেলুদা যখন বিপদ মোকাবিলা করেন, তখন সেই বডিবিল্ডার শারীরিক সমতা থাকা সত্ত্বেও পারলে পালিয়ে বাঁচেন। এই কনট্রাস্টটুকু দর্শক হিসাবে আমি প্রাণ ভরে উপভোগ করি। এর রসটুকু খুব সূক্ষ্ম মনে হয়। একই সাথে এও মনে হয় ফেলুদা যেন আমাদেরই মত একজন- খুব চেনা।
সন্দ্বীপ রায় যখন ফেলুদা তৈরী করলেন, তখন কেন যেন মনে হলো, তিনি ভুলে গেলেন - ফেলুদা চরিত্রটি সত্যজিত রায় তৈরী করেছিলেন একেবারে বাঙালী আদলে। সন্দ্বীপের বোম্বাইয়ের বোম্বেটে ছবিতে আমরা দেখি ফেলুদা কুমফু কারাতের এক ওস্তাদের সাথে সমানে লড়ছেন। সন্দ্বীপের ফেলুদার বুদ্ধি নাশ হয়নি, তিনিও তীক্ষম বুদ্ধির অধিকারী। নাশ ঘটেছে তার সেনস অফ হিউমারের। সত্যজিতের চিত্রনাট্যের সেই কাঁটা কাঁটা সংলাপ - তীব্র রসবোধ আমরা খুঁজে পাই না।
সব্যসাচী চক্রবর্তী নিঃসন্দেহে একজন গুণী অভিনেতা। তার চেহারা, কথা বলার ভঙ্গি - সবকিছুই ডিটেক্টিভ সুলভ। তারপরেও দর্শক হিসাবে সৌমিত্র চট্টপাধ্যায়ই আমার ফেলুদা হিসাবে প্রথম পছন্দ। কারণ? সৌমিত্রের চেহারা ও বাচনভঙ্গীর মধ্যে আমি ফেলুদার সেই চিরন্তন বাঙালীকেই খুঁজে পাই।
সন্দ্বীপের ফেলুদা আমার চেনা ফেলুদা নয় - যে ফেলুদার গল্প পড়ে আমার কৈশোর কেটেছে। সত্যজিতের চিত্রনাট্যে ফেলুদার সূক্ষ্ম ও রসে ভেজা সংলাপের স্বাদ থেকেও আমি এখানে বঞ্চিত।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


