কয়েকদিন ধরেই ভাবছিলাম কিছু গল্প দেই - ধারাবাহিকভাবে .....এক পৃষঠা করে .... 3/4 টা পোস্টে শেষ হবে এক একটা গল্প ---
এই সময়টার জন্যই ফজর আলি ওঁত পেতে থাকে।
বন্যার জল শুকিয়ে যাবার পর চারদিকে শুধু ক্ষুধা। প্রচণ্ড ক্ষুধায় ওরা ঘর ছাড়ে। ওদের কেউ অনাথ কিশোরী, কেউবা সদ্য যৌবনে পৌঁছেছে, কেউ পোড় খাওয়া গ্রাম্য বধু। সবার সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মহাকাব্যিক ক্ষুধা।
একদিকে কাম পিপাসায় ছটফট করা শহুরে মানুষ, অপরদিকে উদরপূর্তির নেশায় বেরিয়ে পড়া সুলভ গ্রাম্য নারী। খাদ্য খাদকের এই আদিম চক্রের মাঝে ফজর আলি।
এই সময়টায় তার একদণ্ডও বিশ্রাম মেলে না। চায়ের দোকান চালাবার জন্য সে একটা বাচ্চা ছেলেকে রেখে দিয়েছে। তারপরেও দিনের বেলায় তাকে প্রায়ই দোকানে গিয়ে বসতে হয়। রাতে সে বেরিয়ে পড়ে শিকারের সন্ধানে। এতটুকু ক্লান্ত হয় না। কাঁচা পয়সার একটা সুবাস আছে। সেই সুবাস তার সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।
আজও কাঁচা নরম আইল ধরে হাঁটছিল ফজর আলি। পেছনে আছিয়া। আছিয়াকে সে এনেছে রসুলপুর থেকে। হাঁটতে হাঁটতেই ফজর আলি বিড়ি ধরায়। বিড়িতে টান দিয়ে আছিয়াকে বলে, জলদি কইরা পা চালাও। মাঝরাইতের আগেই আমাগো শহরে যাইতে হইব।
আছিয়া নির্বিকারভাবে চেয়ে থাকে ফজর আলির মুখের দিকে। মৃদুস্বরে বলে, এট্টু জিরায়ে লই।
ফজর আলি ধমকে ওঠে, জিরানোর টাইম মেলা পাইবা। অহন অত টাইম নাই। ভালয় ভালয় তোমারে পার করতে পারলেই বাঁচি।
আছিয়া তবু দাঁড়িয়ে থাকে। আকাশ পাতাল ভাবে। ভেবে লাভ নেই, তবু ভাবে। আসলে ভাববার মতাও তার কিছু অবশিষ্ট নেই। দাঁত দিয়ে খাবার চিবানোর মধ্যে যে আনন্দ, সে আনন্দ ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে সে ভাবতে পারে না। ফজর আলির রাগী চোখের দিকে তাকিয়ে সে ভয়ে ভয়ে বলে, আপনার খিদা লাগছে? চিড়া খাইবেন?
ফজর আলি দেয়াশলাই জ্বালায়। দেয়াশলাইয়ের কাঠিটা উচুঁ করে ধরে কিছুক্ষণ আছিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে। দেখে তার মায়া হয়। না খেতে পেয়ে শরীরটা হয়েছে পাকানো দড়ির মত, যেন কেউ সব রস শুষে নিয়ে গেছে। লম্বা দেহটা একটু কুঁজো। এই রকম শুকনো আকর্ষণহীন চেহারার মেয়েকে দিয়ে ছিনালি হয় না।
কিন্তু এ কথাও সত্য যে, পেটে ভাত পড়ে না বলেই ওরা ঘর ছাড়ে। ফজর আলি পাকা জহুরি। সে জানে, দু'বেলা দু'মুঠো ভাত ঠিকমত পেটে পড়লেই ওদের শরীর আবার ভরে উঠবে, আকর্ষণ ফিরে আসবে। এসব ক্ষেত্রে সচরাচর তার ভুল হয় না।
দেয়াশলাইয়ের কাঠিটা ফেলে দিয়ে সে বলে, সামনে লক্ষ্মীপুর। ঐ গ্রামডা পার হইলেই শহর। টহল পুলিশ কিছু জিগাইলে বোবা হইয়া থাইক না। কইবা, আমি তোমার মামু। মামুর লগে শেষ রাইতের ট্রেনে চাইপা ঢাকায় যাইতাছ।
আছিয়া কিছু না বলে নিঃশব্দে পা চালাতে শুরু করে।
লক্ষ্মীপুরে ঢুকবার মুখে মেঠো পথটা একটু সঙ্কীর্ণ। গ্রামটাতে অবস্থা সম্পন্ন- গৃহস্থই বেশি। দুর্ভিক্ষের ছোঁয়া এসে লাগেনি। লক্ষ্মীপুর নামটাকে সার্থক করতেই যেন লক্ষ্মী এসে এ গ্রামে স্থায়ীভাবে বাসা বেঁধেছে। এখানকার পুরুষেরা ভাল খেতে পায়, বৌ ঝি'রা ভাল কাপড় পরে। ঠিকমত খেতে পেয়ে এই গ্রামের কুকুরগুলো পর্যন্ত হৃষ্টপুষ্ট।
ফজর আলি আর আছিয়াকে দেখে দু'তিনটে কুকুর ঘেউ ঘেউ শুরু করে। ফজর আলি জানে, ওরা কামড়াবে না, ধাওয়াও করবে না। তবু সে ভয় পায়, যতটা না কুকুরকে, তার চেয়ে বেশি মানুষকে। কুকুরগুলো একটানা চিৎকার করলে গাঁয়ের লোক বেরিয়ে আসবে। সে নিম গাছের ঝুলে পড়া একটা ডাল ভেঙে নিয়ে কুকুরগুলোকে তাড়া করে। কুকুরগুলো দূরে সরে গিয়ে মৃদু গরগর করতে থাকে।
ফজর আলি আছিয়াকে নিয়ে শহরের সুরকি বিছানো রাস্তায় ওঠে। রাস্তাটা প্রবেশমুখে বেশ চওড়া। দু'পাশে পরপর কয়েকটা পাকা দালান উঠেছে। কোন কোন বাড়ির চেহারায় আধুনিকতার ছাপও আছে। বাড়িগুলো পার হয়েই রেল স্টেশন। স্টেশন থেকে তারা কিছুটা ঘুর পথে যায়। রেল লাইন পার হয়ে বড় মাঠের মধ্য দিয়ে তারা আর একটি গলিতে এসে ওঠে ....................... (চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।







