somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প ঃ মাটবর্ত ী (পর্ব 2)

২১ শে জানুয়ারি, ২০০৭ দুপুর ১:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পূর্ব প্রকাশের পর ঃ

এই গলিটা অপেক্ষাকৃত সরু। হাত পাঁচেক চওড়া হবে। দিনের বেলায়ও পাশাপাশি দুটো রিকশা যেতে পারে না। তার উপর আবার আছে সরু ড্রেন। ড্রেনে একটা বিড়াল মরে পচে আছে। উৎকট গন্ধ নাকে এসে লাগে।

গলিটা সামনে আরও সরু হয়ে যায়। ল্যাম্পপোষ্টের অষ্পষ্ট আলোয় তারা পথ চলে। দু'পাশে ছোট ছোট ঘর। পাকা দেয়াল, তার উপর টিনশেড। নালা পার হয়ে একটা ঘরের সামনে এসে ফজর আলি দাঁড়ায়। আস্তে আস্তে জানালায় টোকা দেয়।

এই প্রথম আছিয়া ভয় পায়। মৃদুস্বরে বলে, আমারে না গার্মেন্টসে কাম দেওনের কথা? এইডা কুনখানে আনলেন?

ফজর আলি বিরক্ত হয়। কিন্তু, সে বিরক্তি প্রকাশ করে না। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে সে জানে, একদম শেষ মুহূর্তে এসে মেয়েগুলো বেঁকে বসে। সামনে নিশ্চিত খাওয়া পরার ব্যবস্থা আছে জেনেও ওরা ঘর ভুলতে পারে না। সে সান্ত্বনা দেবার সুরে বলে, তোমারে জায়গামতই আনছি। রুস্তম ভাই তোমারে কাইল ঢাকায় নিয়া যাইব।

আছিয়া বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করে, আপনে যাইবেন না আমাগো লগে?

আমার যাওনের দরকার আছে নি? রুস্তম ভাই লোক ভালো, উনার সাথে যাইবা। কুনও ভয় নাই।

'ভয় নাই' শব্দ দুটো শুনে আছিয়া প্রচণ্ড আতঙ্কে অস্থির হয়ে ওঠে। দৃঢ়স্বরে বলে, আমারে রসুলপুর ফিরাইয়া দিয়া আসেন। আপনেগো লগে কুথাও যামু না। আপনেরা ঠগ, বাটপার।

ফজর আলি এবার রেগে যায়। অবশ্য রেগে যাবার মত যথেষ্ট কারণও তার আছে। সে কি না ঠগ? বাটপার? হ্যাঁ, সে গার্মেন্টসে কাজ দেবার কথা বলে আছিয়াকে সঙ্গে এনেছে। সে মিথ্যে কথা বলেছে। কিন্তু, ক্ষুধার জ্বালায় তিল তিল করে মরে যাবার চেয়ে আছিয়ার কাছে এই মিথ্যেটা বড় হলো?

ফজর আলি জোরে ধমক দেয়।
ধমক খেয়ে আছিয়া কাঁদতে শুরু করে। জোরে কান্না নয়। ইনিয়ে বিনিয়ে কান্না, যেন মৌচাকে গুণগুণ করে ওঠে অসংখ্য মৌমাছি।

ফজর আলি এবার ভয় পেয়ে যায়। কান্না শুনে আশেপাশের ঘর থেকে যদি কেউ বেরিয়ে আসে? তার রাগ আস্তে আস্তে পড়ে আসে। তার বদলে জেগে ওঠে ভয় মেশানো সহানুভূতি। জানালায় আবার টোকা দিতেই দরজা খুলে দাঁড়ায় সুঠাম দেহের এক লোক।

ফজর আলি বলে, রুস্তম ভাই, মাইয়াডা খালি কান্দে, আপনে ধমক ধামক দিয়েন না। বাচ্চা মাইয়াতো। বাড়ির জইন্য মন কান্দে। দুইদিনেই সব ঠিক হইয়া যাইব।

আছিয়া শেষবারের মত প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। ফজর আলি কাঁধের গামছা আছিয়ার মুখে চেপে ধরে। তারপর জোর করে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে হাতে একশ টাকা গুঁজে দেয়।

এরকম জোর জবরদস্তি করতে প্রথম প্রথম ফজর আলির বাঁধত। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। মেয়েগুলোর মনে কে যেন ঢুকিয়ে দিয়েছে, এসব অন্যায়। ফজর আলি কোনো ন্যায় অন্যায়ের পরোয়া করে না। এ কথা কে না জানে, পৃথিবীর সবচেয়ে আদি নিয়মই হলো ছিনিয়ে নেয়া। আজ তোমার আছে বলেই আমার নেই। সুতরাং, আমার যা নেই, তা আমি অবশ্যই ছিনিয়ে নেব। ফজর আলি তো তার ভাতের অধিকার ছিনিয়ে নিতে দু'বার ভাবেনি। ওসব ন্যায় অন্যায়ের চাটনি খেলে কবেই সে মরে ঢুসে যেত।

ফজর আলি বিশ্বাস করে, মানুষ কেবলমাত্র নিজে চাইলেই তার ভাগ্য বদলাবে। কোনো আল্লাহ, খোদা বা ভগবান এসে তার ভাগ্য বদলে দিয়ে যাবে না। আর বিশ্বাস করে বলেই সে আজ পেট ভরে খেতে পায়। চোর নয়, ডাকাত নয়, গুণ্ডা নয়, বদমাশ নয়, বা তার মত দালালও নয় এমন মানুষ অনেক আছে। সৎ মানুষের সে রকম অভাব এখনও ঘটেনি। তবে ব্যাপারটা এই যে, এত সৎ মানুষ থাকা সত্ত্বেও ফজর আলি দিনের পর দিন না খেয়ে থেকেছে, স্টেশনের প্লাটফর্মে রাত কাটিয়েছে। ঐসব ভাল মানুষের দল তাকে মালসা ভর্তি ভাত দেয়নি। ফজর আলি তাই নিজেই নিজের পথ খুঁজে নিয়েছে।

তার অভাব ছিল একটা সংসারের। নিজ বুদ্ধি বলে সংসারও সে পেতেছে। স্টেশনের বুড়ো চায়ের দোকানদার রহমত মিয়ার মেয়েকে সে বিয়ে করেছে।

স্টেশনের মাঠ পার হলেই যে গ্রাম, সেই গ্রামেই ছিল রহমত মিয়ার বাড়ি। তার একমাত্র মেয়ে জয়তুনকে বিয়ে করে ফজর আলি সেই বাড়িতে এসে উঠেছিল বছর চারেক আগে। তারপর একদিন রহমত মিয়া টুপ করে মরে গেল। এখন চায়ের দোকান আর বাড়ি দু'টোরই সে পুরোদস্তুর মালিক বনে গেছে।

ফজর আলি সরু গলিটা পেরিয়ে আসে। হাঁটতে হাঁটতেই বিড়ি ধরায়। স্টেশনের মাঠটার কাছে গিয়ে থামে। মাঠ পার হলেই তাদের গ্রাম। সেই গ্রামে তার বাড়ি। বাড়িতে জয়তুন তার জন্য অপেক্ষা করছে।

সে বাড়িতে যেতে পারে, আবার আলতা বানুর কাছেও যেতে পারে। ডানদিকের রাস্তা ধরে মাইল দুয়েক গেলে শহরের শেষ মাথায় আলতা বানুর খুপরি।

আলতা বানুকেও আছিয়ার মত ঢাকায় চালান দেবার কথা ছিল। কিন্তু, সে যে আর দশটা মেয়ের মত নয়। সে কথায় কথায় হাসতে পারে, ইচ্ছে হলে কাঁদতে পারে, অভিমানে ঠোঁট ফুলাতে পারে। তার জংলা শাড়ির পরতে পরতে লুকিয়ে থাকে দুরন্ত যৌবন, সেই সাথে অতি আকর্ষণীয় এক রহস্য। এই রহস্যের জন্যই আলতা বানুকে ফজর আলি বেঁচে দিতে পারেনি, নিজের করে নিয়েছে।

ফজর আলি বিড়িতে শেষবারের মত একটা টান দেয়। তারপর, বাড়ির পথ না ধরে ডানদিকের পথে হাঁটতে শুরু করে ....... (চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সব দুনিয়ার আহার যোগাই, আমরা না পাই খাইতে

লিখেছেন ঢাকার লোক, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৬:৩৪



সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বাওন হাওরের বর্গাচাষি আলী আকবর। কেমন আছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ কৃষিকাজ করি খালি বাঁইচ্যা থাকার লাগি। কোনো লাভ নাই।’ হিসাব কষে বলেন, এখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

গুম আর গুপ্ত

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:১৫


খোঁজ করলে দেখাি যাবে, কুকুর-বিড়াল পালকদের অনেক কাছের আত্মীয়-পরিজন অনেক কষ্টে জীবন কাটাচ্ছে। তাদের প্রতি কোনও দয়া-মায়া নেই; অথচ পশুদের জন্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৮৯

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৫



মসজিদে বসে মদ খেতে দাও, অথবা সেই জায়গাটা দেখাও যেখানে আল্লাহ নেই।

বহুদিন ধরে গল্প লেখা হয় না!
অথচ আমার গল্প লিখতে ভালো লাগে। সস্তা প্রেম ভালোবাসা বা আবেগের... ...বাকিটুকু পড়ুন

=পাতার ছাতা মাথায় দিয়ে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৯


মনে আছে ছেলেবেলায়
ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি এলে,
পাতার ছাতা মাথায় দিয়ে
হাঁটতাম পথে এলেবেলে।

অতীত দিনের বৃষ্টির কথা
কার কার দেখি আছে মনে?
শুকনো উঠোন ভিজতো যখন
খেলতে কে বলো - আনমনে?

ঝুপুর ঝাপুর ডুব দিতে কী
পুকুর জলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

তালেবান ঢাকায়, রাষ্ট্র ঘুমায়

লিখেছেন মেহেদি হাসান শান্ত, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:৩২

জুলাই অভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশে অনেক কিছু নতুন হইছে। নতুন সরকার, নতুন মুখ, নতুন বুলি। কিন্তু একটা জিনিস খুব চুপচাপ, খুব সাবধানে নতুন হইতেছে, যেইটা নিয়া কেউ গলা ফাটাইতেছে না। তালেবানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×