somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইসকনের জৈববিবর্তন পাঠ-১

২৫ শে মার্চ, ২০১১ দুপুর ১২:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

স্বীকারোক্তি : এই লেখাটি পূর্বে অন্য একটি ব্লগে প্রকাশিত হয়েছিল বেশ কিছুদিন আগে। এবার সামুর পাঠকের সাথে শেয়ার করলাম। আশা করি ভালো লাগবে।

****************************************************************
এ বছরের (২০১০) মাঝামাঝি সময়ে আমাদের বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী কাউন্সিলের শ্রীমঙ্গল শাখার সদস্য সমীক সেন আমাকে ফোনে জানালো ঢাকাস্থ ইসকনের কিছু সদস্যের সাথে বির্তকের এক পর্যায়ে তারা একটি বই রেফার করেছে পড়ে দেখার জন্য। বলেছে ‘এত্ত যে বিজ্ঞান নিয়ে পণ্ডিতি দেখাও তোমরা, তবে এই বইটির বক্তব্য খণ্ডন করে দেখাও তো?’ পরপর কয়েকদিন তারা এই বই নিয়ে নাকি বেশ চেঁপে ধরছে। আমি ইসকনের এই বইটি দেখিনি, তাই সমীক বললো সে আমাকে বইটি দেখাতে চায়। আর সম্ভব হলে একটি জবাব তৈরি করে দিতে। কিছুদিন পর সমীকের কাছ থেকে বইটি পেলাম। বইয়ের নাম ‘বিজ্ঞান সনাতন ধর্ম বিশ্ব সভ্যতা’, লেখক গোবর্দ্ধনগোপাল দাস, ভক্তিবেদান্ত গীতা একাডেমি, নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ। বইটি হাতে আসার পর এক নিঃশ্বাসে পড়ে গেলাম। প্রচণ্ড এক উত্তেজনা তৈরি হলো নিজের মধ্যে। জবাব তৈরি করতে গিয়ে দেখি মেজাজ ঠাণ্ডা রাখতে পারছি না। বারে বারেই উত্তেজিত ধ্বনি বের হয়ে আসছে। আমি জানি না এখানকার কোন পাঠক এই বইটি পাঠ করেছেন কিনা? একজন বিজ্ঞানমনস্ক পাঠকের কাছে এই ধরনের বই পাঠের পর নিজেকে সংযত রাখা যথেষ্ট কঠিন। নিমকহারামির সীমা থাকা উচিৎ । বিজ্ঞান ছাড়া যাদের একদিনও চলে না, ওরা ভালো করেই জানে চব্বিশ ঘণ্টা হরি নাম জপ করলেও এক মুঠো চাল সিদ্ধ হয়ে মুখে জুটবে না। তিন লক্ষ বার, দশ লক্ষ বার হরি নাম জপ করলেও কলেরা, টাইফয়েড, যা, ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী ভালো হবে না। কারো বাপেরও সাধ্য নেই মন্ত্র পড়ে এদের সুস্থ করে তোলতে পারে। ধর্মীয়নেতারা নিজেদের অসুখের সময় ঠিকই মন্দিরে না গিয়ে হাসপাতালে দৌড় দেয়। ডাক্তার-ডায়গনিস্টিক সেন্টার আর ফার্মেসিতে আঠার মতো লেগে থাকে। এসব তো আমাদের চোখের সামনেই প্রতিনিয়ত দেখছি। দিনরাত নিরামিষ, নিরামিষ করে, ঠেলায় পড়লে মুরগির ঘুঘুলি খেতেও তখন চক্ষুলজ্জা হয় না। সেই বিজ্ঞানের বিরোধিতা করে যারা, বিজ্ঞানীদের বৈজ্ঞানিক বিতর্ক নিয়ে যারা মজা লুটার আনন্দ পায় তাদেরকে নিমকহারামের দল বলা হবে না তো কি বলা যায়, আমি জানি না। এর থেকে অনেক খারাপ উপাধি দেয়া যায়, কিন্তু আমার মতে এর থেকে ভালো উপাধি দেবার সুযোগ নেই।

সমীকের কাছে আমার ছোট একটি প্রতিক্রিয়া পাঠিয়ে দিয়েছিলাম বইটি পাবার সপ্তাহ দুয়েক পর। সমীক ইসকনের সদস্যদেরকে প্রতিক্রিয়াটি পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু সেই থেকে এরা সবাই চুপ। কয়েকবার তাগাদা দিয়ে এ বিষয়ে ওদের মুখ থেকে কোনো শব্দ বের করতে পারেনি। বিযুকা’র আরেক সদস্য বর্তমানে ইংল্যান্ড নিবাসী অসীম দাসকে ইমেইলে লেখাটি পাঠালে সেও এটিকে ফেসবুকে ইসকনের গ্র“পে পোস্ট দেয়। এখানে বলা অপ্রাঙ্গিক হবে না, বেশকিছু দিন আগে অসীম এবং আমার সাথে ইসকনের কিছু সদস্যের দীর্ঘ বির্তক হয়েছিল। সেখানে কয়েকবার ওদের মিথ্যাচার আর ভণ্ডামো হাতেনাতে ধরিয়ে দেয়ার পরও হুঁশ হয়নি। একটার পর একটা ইস্যু নিয়ে আসার পর শেষমেশ প্রাণের উৎপত্তি এবং জৈববিবর্তন নিয়ে বির্তকের এক পর্যায়ে ওদের কেউ কেউ আমাদের নসিহত করেছিল হারুন ইয়াহিয়ার ডারউইনিজম রিফুটেড এবং গোবর্দ্ধনগোপালের এই বইটি পড়তে। ওখানে নাকি সব আছে। আমি হাসবো না কি কাঁদবো বুঝতে পারলাম না। চোরে চোরে যে মাসতুতো ভাই তা আবারও প্রমাণিত হল! যাহোক, অনেক চেষ্টা করেও দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর ওদের কাছ থেকে কোনো জবাব না আসায় আমার এই পাঠ-প্রতিক্রিয়াটি ব্লগে আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম। ফেসবুকে আমিও এই লেখাটি প্রকাশ করেছিলাম। সেখানে কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে ম্যাসেজ পাঠিয়েছিলেন, কেউ কেউ কমেন্ট বক্সে মন্তব্য করেছিলেন লেখাটি ব্লগে প্রকাশ করার জন্য। সকলকেই আমার আন্তরিক ধন্যবাদ। জাকির নায়েক, হারুন ইয়াহিয়া প্রমুখের প্রচারিত তথাকথিত ইসলামি-বিজ্ঞানের মতো হিন্দু ভণ্ডের দল কি করে খ্রিস্টান আইডিওয়ালাদের তথ্য ধার করে হিন্দুত্ববাদী মোড়কে নতুন কিসিমের বৈদিক-বিজ্ঞান ছড়িয়ে দিতে চায় তা বোঝার পাশাপাশি, এদেরকে চিনে রাখার দরকার আছে। আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশে যেখানে বিজ্ঞানের কোনো প্রাতিষ্ঠানিকায়ন ঘটেনি এখনও, বিজ্ঞানের প্রতি পেশাদারিত্বমূলক মনোভাব গড়ে ওঠেনি, তাই বিজ্ঞান আর ধর্মের মিশেলে উদ্ভট জগাখিচুড়ি তৈরির প্রচেষ্টা ধর্মবাদীরা করেই যাবে-এ তেমন আশ্চর্যজনক নয়। তাই আমার মতে একজন বিজ্ঞান-আন্দোলন কর্মীকে বিজ্ঞানের তত্ত্ব-তথ্য-উপাত্ত জানার পাশাপাশি অবশ্যই ধর্মবাদীদের এই ধরনের ভণ্ডামির মনস্তত্ব এবং কর্মপ্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে। পপুলার লেভেলে শুধু ফিজিক্স, কেমেস্ট্রি, বায়োলজি সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকলেই চলবে না জানার পরিমাণ ক্ষেত্রবিশেষে আরো গভীরে নিয়ে যেতে হবে। আমি বলছি না যে, একজন বিজ্ঞান-আন্দোলন কর্মীকে বিজ্ঞানের সকল শাখাতেই টেক্স্টবুকের সমস্যা সমাধান পর্যন্ত জ্ঞান আহরণ করতে হবে। কিন্তু ইদানীং দেখা যাচ্ছে ধর্মবাদী বিজ্ঞান-ভণ্ডরা তাদের সকল আলোচনাতেই বিজ্ঞানের পরিচিত-অর্ধপরিচিত টার্মগুলো ব্যবহার করে, যাতে বিজ্ঞানের সাথে ধর্মের সামঞ্জস্য রয়েছে এমন একটি ধারণা গণচেতনার মধ্যে স্থান করে নিতে পারে। তাদের এ অপচেষ্টা অবশ্যই রুখতে হবে। তা সে যে ধর্মের তরফ থেকেই বিজ্ঞানের প্রতি আঘাত আসুক। এ দায়িত্ব প্রতিটি বিজ্ঞান-আন্দোলন কর্মীর, প্রতিটি বিজ্ঞান-চেতনাসম্পন্ন মানুষের।

ভূমিকা শেষে এবার মূল লেখাটিতে যাই। আগেই বলে রাখি গোটা লেখাটিতে তাড়াহুড়ার ছাপ স্পষ্ট। এখানে ছোট ছোট ১০টি পয়েন্টে ‘বিজ্ঞান সনাতন ধর্ম বিশ্ব সভ্যতা’ বইটির চতুর্থ অধ্যায়ের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছি। ব্লগে এ লেখাটি প্রকাশ করার ইচ্ছে হওয়ার পর ভাবলাম কয়েকটি পয়েন্ট বড় করে নিই। যাতে সাধারণ পাঠক, যারা গোবর্দ্ধনগোপালের বইটি পাঠ করেননি, তাদের কাছে আমার বক্তব্য বুঝতে সহজ হবে। তাই অল্প কয়েকটি জায়গায় ঈষৎ পরিবর্তন করেছি।

‘বিজ্ঞান সনাতন ধর্ম বিশ্ব সভ্যতা’ শিরোনামের বইয়ের গায়ে দাম যদিও লেখা নেই, তবে শক্ত কাভার, রঙিন ছবি আর কাগজের কোয়ালিটি দেখে বোঝা যাচ্ছে, বইটির মূল্য একেবারে যেনতেন নয়। সমীক এতো দামি বই কিনে আমার ঠিকানায় পাঠিয়ে আমাকে আসলে চিন্তার মধ্যে ফেলে দিয়েছেন। এটার কি সদ্বগতি করা যায় তাই ভাবছি! প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠার ঢাউস সাইজের বইটি সম্পূর্ণরূপে পড়া এখনো শেষ হয়নি তবে বেশকটি অধ্যায় আমার ইতিমধ্যে পড়া হয়েছে। অধ্যায়গুলি পড়ে আমার মনে হয়েছে, এই বইয়ের প্রতিক্রিয়া জানানোর মধ্যেই রয়েছে সদ্বগতির শ্রেষ্ঠ পথ। সেজন্য এ পথই বেছে নিলাম। সমীক আপনাকে আর একটু কষ্ট করতে হবে। নীচে এই বইয়ের একটি অধ্যায়ের উপর ছোট পরিসরে আমার বক্তব্য তুলে ধরছি। আপনি সম্ভব হলে এই চিঠির ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে ইসকনের সাথে যোগাযোগ করে নীচের পয়েন্টগুলোর ব্যাখ্যা দাবি করবেন। যদি ইসকনের সদস্যরা ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন করেন অর্থাৎ আমার জবাবের প্রেক্ষিতে তারা পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করতে ইচ্ছুক থাকেন তবে পরবর্তীতে আরো বিস্তারিতভাবে প্রত্যেকটি পয়েন্টে আলোচনা করতে বা লিখে দিতে রাজি আছি।

নেহাত বিজ্ঞান-বিরোধী বই কিংবা ধর্মীয় বই হলে আমার কোনো আপত্তি থাকতো না। কোনো ধরনের জবাব দেয়ারও প্রয়োজন বোধ করতাম না। বাজারে রসময় দাসগুপ্তের মত লেখকদের বইয়ের তো অভাব নেই। তাই বলে কী সব বিজ্ঞান-বিরোধী বইয়ের জবাব দিতে হবে নাকি? কিন্তু কথা হচ্ছে, এ বইয়ে বিজ্ঞানের বিরোধিতা করতে গিয়ে এত্তো বেশি বিজ্ঞানের অপব্যাখ্যা, ভুল ব্যাখ্যা আর ম্যানুপুলেশন করা হয়েছে, তার কোনো সীমা নেই। বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানীরা যা বলেনি, তাই বিজ্ঞানের নাম করে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। যারা এই বইটি পাঠ করেননি, তাদের জ্ঞাতার্থে বলছি, এই বইয়ের মুখবন্ধ লিখে দিয়েছেন প্রফেসর ডঃ সুদীপ্ত ঘোষ, ডিপার্টমেন্ট অব্ মেটালার্জিক্যাল এন্ড মেটেরিয়ালস্ ইঞ্জিনিয়ারিং, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আই.আই.টি), খড়গপুর। মুখবন্ধের এক জায়গায় প্রফেসর সুদীপ্ত বলেছেন :

শ্রীল প্রভুপাদ বিজ্ঞানসম্মতভাবে আধ্যাত্মিক জ্ঞান-এ প্রবেশের উপযোগী প্যারাডাইমের খোঁজ বিশ্বের বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষকে জানাতে ভক্তিবেদান্ত ইনস্টিটিউট স্থাপন করেন। বৈদান্তিক ধারায় যে কোন আচার্যের মতো শ্রীল প্রভুপাদ অনুভব করেছিলেন যে কেউ যদি বিজ্ঞানসম্মতভাবে ও যুক্তিশীলতার সাথে প্রকৃত বাস্তব সত্যকে স্বরূপত জানতে চান, তাহলে তিনি সুনিশ্চিতভাবে ভগবদ্গীতা, বেদান্ত ও শ্রীমদ্ভাগবতের শিক্ষা-উপদেশে আস্থাবান হবেন। …প্রথিতযশা চিন্তাবিদ্, বিজ্ঞানী ও বিদগ্ধ ব্যক্তিদের রচনাকর্ম গভীরভাবে অধ্যয়ন-পর্যালোচনা করে গোবর্দ্ধনগোপাল দাস এই বইটিতে একজন যুক্তিশীল মানুষের অকৃত্রিম জিজ্ঞাসাকে উপস্থাপন করেচেন, যা ভগবদ্গীতার ও ভাগবতের সুমহান শিক্ষার অভিমুখে পাঠককে পরিচালিত করবে।"

প্রফেসর সুদীপ্ত ছাড়াও আরো যারা এই বইয়ের রচনায় পঞ্চমুখ হয়েছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন, ডঃ পুরুষোত্তম চক্রবর্তী, সিনিয়র প্রফেসর অব ফিজিক্স, সাহা ইনস্টিটিউট অব নিউকিয়ার ফিজিক্স, কলকাতা। ডঃ পুরুষোত্তম বলেছেন : “সনাতন ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে কোন সংঘাত নেই। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে কোনো ধর্মমতের সঙ্গে বিজ্ঞানের যে বিরোধ দেখা দিয়েছিল, তার জন্য প্রকৃত ধর্মকে দায়ী করা যায় না। প্রকৃত ধর্ম কখনো বিরোধ, সংঘাত, শোষণ সৃষ্টি করে না, বরং এইগুলোকে দূর করে মানব সমাজকে কলুষমুক্ত করে। প্রকৃত ধর্ম মতবাদ নয়, এটি আদি, অকৃত্রিম সনাতন সত্য।… বিজ্ঞান সনাতন ধর্ম বিশ্বসভ্যতা বইটি এই প্রয়োজনীয় দার্শনিক তত্ত্বকে গভীরতা দিতে সক্ষম হবে বলে আমার বিশ্বাস।"

ডঃ তাপস বন্দোপাধ্যায় (সায়েন্টিফিক অফিসার, ভাবা অ্যটমিক রিসার্চ সেন্টার, কলকাতা) বলেছেন : “বিজ্ঞান সনাতন ধর্ম বিশ্বসভ্যতা বইটি বহু নির্ভরযোগ্য তথ্যে সমৃদ্ধ; এটি প্রামাণিক তথ্যের সংকলন।

এর বাইরে আরো আছেন বিশ্বভারতীর রসায়নবিজ্ঞানী শ্রীবাসুদেবপ্রসাদ দাস, ক্যালফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞানী ডঃ পার্থ বিশ্বাস, ডঃ শেখ মকবুল ইসলাম (বিভাগীয় প্রধান, বাংলা সাহিত্য বিভাগ, সেন্ট পলস্ কলেজ, কলকাতা) প্রমুখের নামে এই বইয়ে বাণী ছাপানো হয়েছে। এঁদের নাম তুলে ধরে আমি শুধু এতটুকুই বোঝাতে চাচ্ছি যেনতেন চুনোপুটির হাতে রচিত নয় এ বইটি। এর সঙ্গে রাঘববোয়ালেরা জড়িত।

কিন্তু আমার মতে এ বই পাঠ করে একজন সাধারণ পাঠকের জ্ঞান কতটুকু বাড়বে জানি না তবে চকচকে প্রচ্ছদ, রঙিন ছবি, আর দামি কাগজের মধ্যে দিয়ে মুরগীর বিষ্ঠা ‘অমৃত’ বলে পরিবেশন করার কৌশল যে ভালো রপ্ত হয়েছে ইসকনের, তা সহজেই বোঝা যায়।

উপরোক্ত বইয়ের প্রত্যেকটি বাক্যে, প্রত্যেকটি অধ্যায়েই গণ্ডগোল রয়েছে। অসততার ছাপ রয়েছে। বিজ্ঞান সম্পর্কে যাদের জ্ঞান ‘ক অর গোমাংস’ তারা লিখেছেন বিজ্ঞানের বিরোধিতা করে বই!

‘সাবাস ইন্ডিয়া সাবাস!’ এ বইয়ে এতো ভুলের সমাহার যে প্রত্যেকটি লাইনের জবাব দিয়ে সঠিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করতে গেলে আমাকে কয়েকটি মহাভারত লিখে ফেলতে হবে! বুঝতে পারি না, একজন লেখক কি করে এতো কাণ্ডজ্ঞানহীন বর্জ্যপদার্থ রচনা করতে পারলেন? ন্যূনতম বৈজ্ঞানিক জ্ঞান না রেখে এত্তো উল্টাপাল্টা বক্তব্য সাধারণ জনগণকে গিলানো হচ্ছে, ভাবাই যায় না। ধর্মের পক্ষে সাফাই গেয়ে, বিজ্ঞান-বিরোধী বই তো বাজারে প্রচুর আছে। কিন্তু এই বইয়ের মতো ‘শতাব্দীর সর্বোচ্চ কলঙ্কিত আবর্জনা’ সত্যি বলছি, এর আগে আমার নজরে আসে নি। সমীক এ জন্য আপনাকে পুনরায় ধন্যবাদ। আমি কৃতজ্ঞ।

চতুর্থ অধ্যায়ের মধ্যেই আজকে আমার বক্তব্য সীমাবদ্ধ থাকবে। পরবর্তীতে বাকি অধ্যায় নিয়ে আরো জবাব পাঠানো হবে। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, আমার সম্পাদনায় চার্লস ডারউইনের ২০০তম জন্মবাষির্কী উপলে একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশের কাজ চলছে আর জৈববিবর্তন নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা আর ভুল ব্যাখ্যার জবাব দিয়ে ‘জৈববিবর্তন তত্ত্ব : নানা জিজ্ঞাসা’ শিরোনামের আরেকটি গ্রন্থ লেখা চালিয়ে যাচ্ছি। ডারউইনের স্মারকগ্রন্থ (ডারউইন : একুশ শতকে প্রাসঙ্গিকতা এবং ভাবনা) আশা করি আগামী বইমেলাতে প্রকাশ করা সম্ভব হবে। (প্রকাশিত হয়ে গেছে)। দ্বিতীয় বইটিতে ইসকনের বইয়ে জৈববিবর্তন নিয়ে উল্লেখিত প্রশ্নাবলী এবং ভুল ব্যাখ্যাসহ আরো প্রচুর প্রশ্নের জবাব লেখা চলছে এখনো। বিধায় এই চিঠিতে জীবের বিবর্তন নিয়ে বিজ্ঞান সনাতন ধর্ম বিশ্ব সভ্যতা বইয়ের ভুল ব্যাখ্যার জবাব ইচ্ছে করে কিছুটা সংক্ষিপ্ত আকারে দিচ্ছি।

১. চতুর্থ অধ্যায়ের শিরোনাম ‘বিবর্তনবাদ : কল্পবিজ্ঞান যখন বিজ্ঞান’। শিরোনাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে এই অধ্যায়ে কি কি আলোচনা হয়েছে এবং লেখক কি বলতে চাচ্ছেন। এই অধ্যায়ের ভূমিকা একেবারে ফালতু কথায় ভরপুর। যত্তসব বকওয়াস। আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি কার্ল স্যাগান, ফ্রান্সিস ক্রিক মোটেই বিবর্তন-বিরোধী ছিলেন না। ১৫৪ পৃষ্ঠায় যেমন দাবি করা হয়েছে। কার্ল স্যাগানের ‘কসমস’ ডকুমেন্টারিটি সারা বিশ্বেই জনপ্রিয়। বিশেষ করে বিজ্ঞানের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের কাছে। জনপ্রিয় এ বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যচিত্রটি বাংলাদেশের বিটিভিতে একসময় প্রচারিত হয়েছিল। এখনও বাজারে এই ডকুমেন্টারি সিডি-ডিভিডি আকারে পাওয়া যায়। ৭টি পর্বে তৈরি কসমস ডকুমেন্টারিতে লেখক মহাবিশ্বের উৎপত্তি সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছিলেন, তেমনি বহির্বিশ্বে প্রাণের অস্তিত্ব, পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব, জীবের বিবর্তন প্রক্রিয়া, মানব সভ্যতার বিকাশ ইত্যাদি ক্রমান্বয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কার্ল স্যাগান সারা বিশ্বের অত্যন্ত পরিচিত বিজ্ঞানমনস্ক গবেষক ছিলেন। তাকে জৈববিবর্তন তত্ত্বের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর উদ্দেশ্য কি? বইটিতে বলা হয়েছে ফ্রান্সিস ক্রিক ডিএনএ বা জিন আবিষ্কারক। ভুল বক্তব্য। ফ্রান্সিস ক্রিক-জেমস ওয়াটসন যৌথভাবে একটি ‘যুগ্ম সর্পিলাকার’ মডেলের মাধ্যমে ডিএনএন’র গঠনের ব্যাখ্যা দিয়ে ছিলেন। ওয়াটসন-ক্রিকের মডেল তৈরির বছর খানেক আগে থেকেই জীবকোষে ডিএনএ’র অস্তিত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিৎ ছিলেন। এমন কি ডিএনএ’র উপাদান (চারটি নাইট্রোজেনঘটিত জৈবক্ষার অ্যাডেনিন (A), থায়ামিন (T), গুয়ানিন (G), সাইটোসিন (C)) সম্পর্কেও জানতেন। জানতেন না শুধু, এসকল উপাদান দিয়ে ডিএনএ’র অভ্যন্তরীণ গঠন কেমন। যা ওয়াটসন-ক্রিক যৌথভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। ফ্রান্সিস ক্রিক জৈববিবর্তনের বিরোধী ছিলেন এমন তথ্যের উৎস কি? সম্পূর্ণ মিথ্যে বক্তব্য। আর ডিএনএ এবং জিন এক কথা নয়। সহজ কথায় হচ্ছে, জীবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান প্রোটিনের সাংকেতিক লিপি হল ‘জিন’ (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জিন ডিএনএ’তে অবস্থিত, কিছু ভাইরাসের ক্ষেত্রে আরএনএ’তে)। যা জীবের বংশগতির একক। একেকটি ‘জিন’ একেকটি প্রোটিনের সাংকেতিক লিপি। কয়েকটি ‘কোডন’ মিলে জিন গঠিত। কোডন হচ্ছে তিনটি নাইট্রোজেনঘটিত জৈবক্ষারের মিলিত রূপ; যেমন ACT কিংবা GCA।

২. ১৫৪-১৫৫ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, “গ্যালাপেগাস দ্বীপে জাহাজ পৌঁছালে ডারউইন সেখানে পাঁচ সপ্তাহ কাটান, লক্ষ্য করেন জীববৈচিত্র্য। সেখানে তিনি কিছু ফিঞ্চ প্রজাতির পাখি দেখা পায়। প্রায় ১৪টি প্রজাতির ফিঞ্চ রয়েছে এই দ্বীপে। ডারউইন কিছু নমুনা সংগ্রহ করেন, ডায়েরীতে লেখেন। কিন্তু তখন তাঁর বিবর্তনবাদের কথা মনে হয়নি আদৌ! …কোষের ডিএনএ-এ কোডিং মেকানিজম সম্বন্ধে তাদের (ডারউইন এবং পক্ষীবিশারদ জন গোল্ড-অনন্ত) কোনো ধারণাই ছিল না সেই সময়। কেবল বাহ্য আকৃতি বিচার করে এই ঘটনার প্রায় সাতাশ বছর পর ডারউইন বই লিখে উপস্থাপন করেন তার ন্যাচারাল সিলেকশান তত্ত্ব।” ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বের ইতিহাস সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা আর ভুল ব্যাখ্যা প্রচার পেয়েছে এ বাক্যগুলিতে। জৈববিবর্তন তত্ত্বের ইতিহাস সম্পর্কে অবগত থাকলে এতো চটজলদি মিথ্যে কথা বলা যেত না। বোঝা যাচ্ছে লেখক উদ্দেশ্যমূলকভাবে ইতিহাসের ম্যানুপুলেশন ঘটিয়েছেন। বলা হচ্ছে, ‘ডারউইন কিছু নমুনা সংগ্রহ করেন’। শুধুমাত্র গ্যালাপোগাস থেকে সংগৃহীত নমুনার তালিকা আমি তুলে দিচ্ছি : তিন প্রজাতির কচ্ছপের বাচ্চা, ১৬ প্রজাতির শামুক, সম্পূর্ণ নতুন ১৫ প্রজাতির মাছ, সামুদ্রিক সরীসৃপ ইগুয়ানা, ধেড়ে ইঁদুর, নেংটি ইঁদুড়, সীল, পেঙ্গুইন, মোট ২৬ প্রজাতির পাখি যথা পেঁচা, কবুতর, রেন, ফাইচোর, থ্রাশ ফিঞ্চ প্রজাতির পাখি। ডারউইন ১৩ প্রজাতির ফিঞ্চ পাখি নমুনা হিসেবে সংগ্রহ করেন। পাঁচ বছরের বিগল জাহাজের ভ্রমণ শেষে ইংল্যান্ডে ফিরে এসে ডারউইন তার প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব দাঁড় করানো জন্য শুধুমাত্র ফিঞ্চ পাখির বাহ্যিক গঠনের উপর নির্ভর করেননি, টানা বিশটি বছর সংগৃহীত বিভিন্ন পশু-পাখি নিয়ে গবেষণা করেছেন, বিভিন্ন জীববিজ্ঞানীর সঙ্গে তার বক্তব্য শেয়ার করেছেন। ডারউইনের জীবনী নিয়ে বাজারে প্রচুর বই আছে। বাংলা ভাষায় আমি রেফার করবো ড. ম. আখতারুজ্জামানের বিবর্তনবিদ্যা (বাংলা একাডেমী থেকে ২০০০ সালে প্রকাশিত, নতুন সংস্করণ হাসান বুক হাউজ, ঢাকা), নারায়ণ সেনের ডারউইন থেকে ডিএনএ এবং চারশো কোটি বছর (আনন্দ প্রকাশনী, কলকাতা), অনন্ত বিজয় দাশ সম্পাদিত ‘ডারউইন : একুশ শতকে প্রাসঙ্গিকতা এবং ভাবনা ’ (অবসর প্রকাশন, ২০১১, ঢাকা) কিংবা বন্যা আহমেদের বিবর্তনের পথ ধরে (অবসর প্রকাশন, ঢাকা) বই থেকে এ ব্যাপারে বিস্তারিত জেনে নিতে।

৩. একই পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘১৮৫৯ সালে তার (ডারউইন) ‘দি ডিসেন্ট অব ম্যান …দি অরিজিন অব স্পিসিস বইয়ে প্রথম ইভলুশন শব্দটি ব্যবহার করেন।’ ডিসেন্ট অব ম্যান বইটি ১৮৫৯ প্রকাশিত হয়নি। এটি প্রকাশিত হয়েছে ১৮৭১ সালে। অরিজিন অব স্পিসিজ বইটি প্রকাশিত হয়েছে ১৮৫৯ সালে। বইটির পুরো নাম : The Origin of Species by Means of Natural Selection, Or the Preservation of Favored Races in the Struggle for Life। তাছাড়া ‘ইভলুশন’ (Evolution) শব্দটি ডারউইন নিজে আবিষ্কার করেননি এবং প্রথম ব্যবহারও করেননি। এমন কী ডারউইনের পূর্বসূরি ল্যামার্ক বা হেকেল পর্যন্ত না। ডারউইন জীবের বিবর্তন প্রক্রিয়া বোঝাতে ব্যবহার করেছিলেন ‘পরিবর্তনসহ উত্তরাধিকার’ (Descent with modification)। অরিজিন অব স্পিসিজ বইয়ের একদম শেষ প্যারায় একবার মাত্র ডারউইন ইভলুশন শব্দটি উল্লেখ করেছেন তাও ভিন্ন অর্থে। জার্মান জীববিজ্ঞানী আল ব্রেখট ফন হেলার (Albrecht Von Haller ) ১৭৪৪ সালে ইভলুশন শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে মার্চ, ২০১১ দুপুর ২:৩২
৬টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

যদি জানতেম আমার কিসের ব্যথা......

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ বিকাল ৩:২৪

দুঃখ কষ্ট যশ খ্যাতির আর এক নাম চার্লি চ্যাপলিন...

চার্লি চ্যাপলিন। পৃথিবীর চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন মহান হৃদয়ের মানুষ আর আসেননি। স্বয়ং সত্যজিত রায়ের মতে- "পৃথিবীর চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সর্বকালের... ...বাকিটুকু পড়ুন

পূর্ণদৈর্ঘ্য মরিয়ম মান্নানের মা (ফান ফটো পোস্ট)

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ সন্ধ্যা ৬:৫৩

সোশ্যাল মিডিয়ায় গত কয়েক দিন মরিয়ম মান্নান নামটি খুব দেখা গেছো। আজ তার একটি রফা হলো-


টানা ২৯ দিন আত্মগোপনে থাকা রহিমা বেগমকে অবশেষে ফরিদপুর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙলা সাহিত্যের বহুমুখী অনন্য প্রতিভাধর সাহিত্যিক ' আবদুশ শাকুর'

লিখেছেন শেরজা তপন, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ রাত ৮:৩৬


আবদুশ শাকুর
প্রথমে ইংরেজী সাহিত্যে মাস্টার্স করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী সাহিত্যের( প্রথমে ঢাকা কলেজ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েঃ ১৯৬৫-৬৭) শিক্ষকতা দিয়ে শুরু পরে পরে সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে সচিব হিসেবে অবসর নেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

'যৌন কর্মীর ছেলে'

লিখেছেন মোহাম্মদ গোফরান, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ রাত ১১:১০


আমার বয়সে যারা আছেন তারা এই বাক্যটির সাথে পরিচিত। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম যে আসলেই প্রশ্নফাঁস জেনারেশন তা পোস্টটি পড়লে আরেকটু নিশ্চিত হওয়া যাবে সম্ভবত। স্টুডেন্ট লাইফে 'ব্যাচেরল' নামক একটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

অহনাকে যে গানটি অহরহ শোনাতাম

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ রাত ১১:৩৯

আমার ল্যাপটপ অন থাকা মানে অবিরাম গান বাজতে থাকা। গান বাজে ল্যাপটপে, গান ঝরে কণ্ঠে, একটা কনসার্টেড সুর-মূর্ছনার তালে তালে ল্যাপটপের বাটনগুলোর উপর অনবরত আমার আঙুলগুলো খেলতে থাকে।

অহনার সাথে যখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×