আরও কিছুক্ষন মশার ঘুমতাড়ানি গান শুনে যখন ব্যাপারী কিংবা মনসুরের ফিরে আসার ব্যাপারে সে যথেষ্ট সন্দিহান হয়ে পড়লো,ঠিক তখনি হালকা চাঁদের আলোয় আমগাছের সারির পাশে হঠাৎ উদয় হয়ে চিনচিন নূপুরের আওয়াজ তোলা এক লাস্যময়ী নারীমূর্তি নেশার ঘোরে আধমরা নাজিমকে বুক,মুখ শুকিয়ে যেন পুরোপুরি মেরে ফেলার পাঁয়তারা করলো। মাথা ধরানো কদম ফুলের মিষ্টি গন্ধ হঠাৎ যেন চারপাশটাকে নিজের করায়ত্বে নিয়ে নিলো। কদম গাছের দিকে ধির পায়ে এগিয়ে যাওয়া ছায়ামূর্তিটাকে পিছন থেকে দেখে প্রথমে বুঝতে না পারলেও পরে আনিসের সাদা-রোগা বউয়ের মতোই মনে হলো নাজিমের। নিজের গয়নায় ঢাকা ধুমসি বউয়ের জায়গায় এই ছিমছাম শ্যামলা আলেয়া বিবির কথা ভেবে কতবার যে উত্তেজনার গরম তাওয়ার ওপর নিজেকে রুটির মতো ছ্যাকেছে সে,আহা। আজকের রাতটাকে হাজারবার গালি দেয়া নাজিম হঠাৎ যেন একটু কৃতজ্ঞ হলো অদেখা কারোর প্রতি। কি বলবে সে এটাকে? ভাগ্য! ব্যাপারীদের তার আগেই বাড়ি চলে যাওয়া,মনসুরের পেট খারাপ হওয়া,আনিসের হঠাৎ কাজে শহরে যাওয়া,আর এই নির্জন রাস্তায় এতো রাতে তার স্বপ্ননারীর কোমর দোলানো, একা একা। না ভাগ্য না, অন্য কিছু,আরও বড় কোন কিছু। কি করে ছাড়ে সে এই সুযোগ,অসম্ভব। নিশ্চয়ই আনিস নেই, লুকিয়ে লুকিয়ে তাই নিজের ভাতারের সাথে গোপন অভিসারে মত্ত হবার নেশাতেই ঘর ছেড়েছে সে। ভালোই হয়েছে, এখন নাজিম কিছু করলেও কাউকে মুখ খুলে কিছু বলতে পারবে না। যদিও মেঘের আড়ালে থাকা চাঁদের হালকা আলো, রাস্তার পাশের এই মাঝারি কদম গাছের বিশাল ছায়া, বড়সড় কাকতাড়ুয়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকা বাঁশঝাড়, রাস্তার পাশের ইট খসে পড়া ভাঙাচোরা কবরস্থানটা, কিছুক্ষণ পরপর শেয়ালের আর্তনাদ আর পথের ধারের শুকনা মলের চারিদিকে বনবন করা মাছির পাল জায়গাটাকে একটু আধভৌতিকই করেছে বটে, কিন্তু তাতে কি। সে পুরুষ, বাঘের না হলেও নিশ্চিত হাকিম ডাকাতের ছেলে, ভয় পেলে পাবে ওই খোলা চুলের মেয়ে মানুষটা, সে নিশ্চয়ই না।
টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালো নাজিম। এদিক সেদিক দুলতে দুলতে পিছু নিলো সে সেই ছায়ামূর্তির। নেশার ঘোরেও সে আলেয়ার থেকে দ্রুতই চলছে, যেন নিঃশব্দে পানির মধ্যে দ্রুত এগিয়ে আসা দাতকেলানো কুমির, যে করেই হোক, হরিণের তেষ্টা মেটার আগেই তাকে তার ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে হবে। এইতো, আরেকটু, আরেকটু। কিন্তু এক অতি ক্ষুদ্র পাথর কোন এক বৃহৎ জলহস্তীর মতো তার আর সেই শিকারের মাঝে বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো। থেমে গেলো সেই ছায়ামূর্তি, কান খাড়া করে শুনতে চাইলো নিজের শিকারির অবস্থান। জমে যাওয়া নাজিমকে আড়াল হবার কোন সুযোগ না দিয়েই ঘুরে দাঁড়ালো সে। থমকে দাঁড়ালো নাজিম, বিস্ময়ে, চমকে, হাহাকারে। নিজের শিকারের সেই হরিণের সাথে শুধু চোখ দুটো ছাড়া আর কিছুই মেলাতে পারছেনা সে। সিল্কের দুটো ঠোটের মাঝ থেকে ফেটে বেরিয়ে আসা ঝকঝকে সাদা দাঁত, আমরুলের মতো লালসাদা গাল,সরু কিন্তু থ্যাবড়ানো লম্বা,সাদা নাক, আর আলুর মতো আধাগোলগাল মায়া মায়া মুখ,যেন ঝিলের জলে ভেসে থাকা কোন সাদা শাপলার মতো সাদা শাড়ির মাঝে নিজের গোঁড়াকে আড়াল করে রেখেছে পানির নিচের গোপন কোন পাতালপুরীতে,যেখানে হাজার হাজার অপ্সরীর রক্তবলী জন্ম দিয়েছে এই পথহারানো লাখো পুরুষের দীর্ঘশ্বাসের। এর কাছে কি পাবে নাজিম,জানে না,কিন্তু নিজের সর্বস্ব বিসর্জনের আত্মঘাতী খুনি খেলায় আজ সে হেরে যেতেই বেশি মরিয়া। আহা,কি মায়া,অথচ কাজ শেষ হলে এর ওপরও ক্ষুরের ধারটা পরীক্ষা করতে হবে। আফসোস। এতো সুন্দর একটা মেয়ের এমন করুণ পরিণতির কথা ভেবে নাজিম একটু ভারাক্রান্ত হয় বটে,শত হলেও তো সে রক্তমাংসেরই মানুষ।
পৌষের শীতেও ঘামতে থাকা নাজিম এগিয়ে গিয়ে হাত রাখে তাকে অবাক করে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির কাঁধে। ঠোঁটে ব্যঙ্গাত্মক হাসি নিয়ে যেন এক ঝটকায় নিজেকে সরিয়ে নিতে চায় মেয়েটি। পারেনা, বরং নাজিমের পায়ে পা বাঁধিয়ে ফেলে দেয়ার চেষ্টায় নিজেকে মাটির ওপর আছড়ে পড়তে দেখে সে। নাজিম টের পায় নিজের পাশবিক শক্তি,গাঁজার নেশা তার মাথা খেলেও এই জিনিসটাকে এখনো শুষতে পারেনি। চেপে বসে সে মাটির সাথে লেপটে থাকা সেই শরীরটার ওপর,সাপের মতো প্যাঁচাতে থাকা দেহটার মুখে বিদ্রূপের হাসি দেখার সময় আর নেই তার। হঠাৎ নিজের সাঁড়াশির মতো হাতের নিচে টের পায় সেই তুলার মতো শরীরের পাথরের মতো শক্ত হয়ে ওঠাকে,অনুভব করে এক সাদা কুয়াশার চাদরের অস্তিত্ব,তাকে যেন জড়িয়ে সরিয়ে নিচ্ছে তার শিকারের থেকে দূরে। দমে না নাজিম,গাঁজার বসতি তার মস্তিষ্কের আনাচে কানাচে মাকড়শার জালের মতো বিস্তৃত,ধোঁকা তো তার হবেই। গত পঁচিশ বছরে কয়লার মতো শক্ত কালো শরীরের গন্ধও শুঁকেছে সে,আর এই নাজুক ফুলটাকে সে ছেড়ে দেবে অন্য কারও পায়ের নিচে দুমড়ানোর জন্য,নাহ,এইতো,শুধু কাঁটাছড়ানো ডালটাকে উপড়ে ফেললেই নরম পাপড়ির নাগাল পাবে সে। হাত বাড়িয়ে ক্ষুরটাকে বের করে সে লুঙ্গির ভাঁজ থেকে,এক পোঁচে কেটে দেয় মেয়েটার ডান গালের অনেকটা। একাজটা তাকে একটু পরেই করতে হতো,নিয়তির বিড়ম্বনায় একটু আগেই করতে হচ্ছে তাকে।
ঠাণ্ডা বাতাসের এক ঝটকা বয়ে গেলো তাদের ওপর দিয়ে,কদম গাছটা যেন হাহাকার করে উঠলো তাতে,ছড়ছর শব্দে ভেঙে পড়লো খেজুরের ডাল।নাজিমের হাতের মধ্যেই নিজের আকার বদলাতে থাকলো সেই নারীমূর্তি, রক্ত হিম করা কানে তালা লাগানো হাসিতে গুমরে উঠলো চারিদিক। রক্তচোখা মেয়েটার টানটান মসৃণ চামড়ার জায়গাটা নিয়ে নিচ্ছে শতবর্ষীয় কোন বুড়ির ভাঁজ, আর হা করা মুখে সাদাকালো বিশ্রী দাঁতের ফাঁক থেকে লকলকে জিহ্বাটা জানান দিলো আদিম পিশাচের অস্তিত্বের। কিন্তু অনড় নাজিম, নিজের সাথে নিজের এই প্রতারণা তার মুখের মুচকি হাসি ছাড়া আর কোন পরিবর্তন আনতে পারে না। বনের বাঘিনীও আজ তার সামনে দিয়ে যাবার আগে তিনবার ভাববে। শয়তানও আজ তার কাছে কোন নচ্ছার, তার মতো কামুক হাজারো পুরুষের কাছে শয়তান আর নতুন আশা নিয়ে আসে না। মেয়েটার গা থেকে ভেসে আসা কদম ফুলের তীব্র ঘ্রাণ তার ক্ষুধাটাকেই বাড়িয়ে দেয়......আরও বেশি,আরও বেশি......
নিজের মুখের হাসিটাকে আরও বিস্তৃত করে নাজিম, সেই সাথে শক্ত হয় সেই রহস্যময়ীর গলায় তার বা হাতের চাপ, আর ডান হাতের ক্ষুরটাও রেখে যেতে থাকে তার জাদুকরী চিহ্ন। জানেনা নাজিম, শয়তান কোন গাছের আড়ালে বসে তাকে দেখে গর্বে, আতঙ্কে কাঁপছে। চারিদিকে প্রলয়ঙ্কারি বাতাসের ঝড়, আর কালো মেঘের চোখরাঙ্গানি তার মুখের দাঁত ঘষার খসখসে শব্দের সামনে এসে লেজ গুটিয়ে পালাচ্ছে। আর কিছুটা, আর কিছুক্ষণ, এইতো, মেয়েটার চোখের বাঁকা হাসি সরে গিয়ে আস্তে আস্তে ভর করছে কালো নির্জন ভয়, নাজিমের ভয়। শব্দ করে হাসে নাজিম, মেয়েটা আর্তনাদ করে কিনা সেটা তাই আর বুঝতে পারে না সে। শুধু মেয়েটার গা থেকে কদম ফুলের তীব্র গন্ধ তার মাথাটা একটু ধরিয়ে দেয়।
উঠে দাঁড়ায় নাজিম, তৃপ্তির চিহ্ন নিয়ে কপাল থেকে ঘাম গড়িয়ে পড়ে। আঁধারের পশুর জয় হলো আজ, মানব পশুর। মাথাটাকে হাল্কা করে নাজিম, নেশা কেটে যাচ্ছে তার, কাজ শেষ করতে হবে অতিদ্রুত। এদিক ওদিক দেখে সে, হাত থেকে পড়ে যাওয়া ক্ষুরটার খোঁজে এদিক সেদিক তাকায়। একসময় খুঁজে পায় সে, ঘুরে দাঁড়ায় নিজের অপূর্ণ কাজ শেষ করার জন্য। কিন্তু......কোথায় সেই মেয়ে???? চাঁদের আলো-আঁধারের ছিনিমিনি খেলায় শুধু একটু আগের বয়ে যাওয়া ঝড়ের ধ্বংসচিহ্নই সে দেখতে পায়। পালিয়েছে মেয়েটা, এতো দ্রুত, অবিশ্বাস্য। তাহলে কি সবই স্বপ্ন, ক্ষুরের গায়ে লেগে থাকা রক্ত, তার ক্লান্তি, কদম ফুলের তীব্র ঘ্রাণ, পথের ধুলায় নিজের ধূসর সাদা রং আর নিজের বিজয়ী গৌরব, সব !!!!! নাহ, মিথ্যা না, মিথ্যা না, সব সত্যি। শুধু এখন বুঝতে পারছে না সে, কোন কারণে, কোন এক কারণে। কিন্তু এখন সেটা বোঝার সময় নেই। তাকে এখান থেকে সরে পড়তে হবে, দ্রুত। না জানি বজ্জাত মেয়েটা কোথায় পালিয়েছে, আবার লোকজন ডেকে তার মানইজ্জত নষ্ট করার পাঁয়তারা করছে কি না। নাজিম হাটতে থাকে, একটু দ্রুত, শালার মনসুরকে খুঁজতে হবে, কই গিয়ে যে মরছে ও, কে জানে।
বেশি দূর যেতে হয় না তাকে, বড়জোর হাত ত্রিশেক। আম গাছের সারির পিছে, যেখান থেকে মেয়েটা এসেছিলো, তার কাছেই মনসুরের নিথর দেহটা লুঙ্গির কোঁচ খোলা অবস্থায় খুঁজে পায় সে, যে কাজ করতে বসেছিল তা আর শেষ করা হয়ে ওঠেনি।
নিজের পিঠের মাঝ বরাবর কিছু টের পায় নাজিম, হয়তো পৌষের শীতলতা ছাড়া আর কিছুই না। এতটুকু দূরে ছিলো, মাত্র !!! মনসুরকে মেরে তো তাকেও মারতে পারতো, সে তো এখানেই ছিলো, মনসুরের যাবার পরেও ঘণ্টা দুয়েক। কিন্তু সে কি করে বেঁচে গেলো? আশ্চর্য্য !
একটু যেন মাথা দুলে ওঠে নাজিমের, গাঁজার নেশায়, নাকি মনসুরের গা থেকে ভেসে আসা কদম ফুলের তীব্র ঘ্রাণে, বুঝে উঠতে পারে না সে।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে মার্চ, ২০১৫ বিকাল ৫:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





