জুরাইন বাজার থেকে রেল লাইন ধরে সামনে হেটে চলেছি। কানে হেডফোন গান বাজছে "তুমি আসবে বলেই " । মাঝ রাত বলা চলে । পাশেই একটা গার্মেন্টস ছুটি হলো । বের হবার রাস্তাটা খুব সরু । আমি তাকিয়ে দেখলাম তারাহুরা করে বের হবার সময় একটা ছেলে খুব সহজেই সামনের একটা মেয়ের স্পর্শকাতর যায়গায় হাত দিলো । মেয়েটা কিছু বলতে না পারলেও মুখের অংগভঙ্গিতে ঘৃনা প্রকাশ করে বের হল । এটা এখানকার প্রতিদিনের চিত্র । এটা মেয়েটার প্রতিটি সময়ের হিসাব । খুব দ্রুত পায়ে মেয়েটি হেটে চলেছে । সারে এগারোটায় তার ছুটি হয় । খুব দ্রুত হাটলে তার বাসায় যেতে লাগে দশ মিনিট । তবুও বাড়িওয়ালা তার দিকে খারাপ নজরে তাকায় । অফিসের বস , সুপারভাইজার চাইলে খুব সহজেই তার শরীরে হাত দিতে পারে । সে আসলে তথাকথিত সমাজের ভোগের বস্তু হিসেবেই বিবেচিত । সারাদিন খাটুনির পর যখন ক্লান্তি জড়ানো পায়ে হেটে চলে ,রাস্তার পাশের মানুষগুলোও যেন কিভাবে তাকায় ।
যে মেয়েটির কথা বলছিলাম, মেয়েটি বের হয়েই চায়না একটা মোবাইল বের করে টাইম দেখে খুব দ্রুত হেটে চলেছে ঘরের পানে । ঘর ঠিক নয় কোনো মতে মাথা গোজার ঠাই । বস্তির একঝুপরির মধ্যে কয়েকজন মিলে ঠাসাঠাসি করে থাকে । এটাতেই প্রশান্তি । মেয়েটি হেটে চলেছে । কেউ একজন তার ভালবাসার মানুষ আছে । চায়না মোবাইলটি বের করে টাকে ফোন দেয় । " আপনের ছুটি অইছে ? আমি বাসায় যাইতাছি । হুনেন আমার আর ভাল লাগেনা । আপনে কবে ভাল একটা চাকরি পাইবেন ? আমারে ঘরে তুলবেন ? হ মারে কল দিসিলাম । বাজানের শরীলডা বালানা । আচ্ছা রাখি। বালো থাইকেন । " মেয়েটি ফোন রেখে হেটে চলে । ঘরে ঢুকতেই বাড়িওয়ালার রুম থেকে ভেসে আছে " মাগীর যা চলন, কই এতো রাইতে কি করে কে জানে । আরোতো মাইয়া আছে তারাতো এতো রাইতে ফিরে না । " মেয়েটি মুখ বুঝে সব শুনে হাতমুখ ধুয়ে আস্তে করে শুয়ে পড়ে । সকালে উঠে আবার কাজ । দেরি হলে যে বেতন কাটা । এমনেই সকালে উঠে বাথরুম থেকে শুরু করে সব কিছুতেই সিরিয়াল ধরতে হয় । বাথরুম বলা যায় কিনা জানিনা , বস্তির একপাশে ডোবার উপর বাশের সাকোর মত করে দেয়া, চারপাশে চটের বেড়া দেয়া ।
এভাবেই চলে এই সব মানুষের জীবন । মানুষনা । মানুষ আর গার্মেন্টসের মেয়েরা কি এক ! ?
জুরাইন বাজার রেললাইন ধরে নারায়নগঞ্জের দিকে একটু হাটলে যে বঊ বাজার তা থেকে আরেকটু সামনে একটা খোলা যায়গায় রেললাইনের উপর বসে আছি । কানে ফুল ভলিউমে বাজছে আজম খানের গান রেল লাইনের ওই বস্তিতে জন্মেছিল একটি ছেলে । কাছের মানুষদের কাছ থেকে যখন কষ্ট পাই তখন এভাবেই আমি রেল লাইনে বসে গান শুনি । মন খুব খারাপ থাকলে ইংরেজীতে স্ট্যাটাস দেই । কষ্ট কিংবা মন খারাপ কিনা জানিনা । সেই মেয়েটির কথা ভাবছি । জেমসের সেই সেলাই দিদিমনি । যে এই শহরে আমাদের পাশেই বাস করে , অথচ আমরা তার খোজ রাখিনা । সেই মেয়েটি যে ঘরে বৃদ্ধ বাবা আর অসুস্থ মায়ের চিন্তায় শত অপমান সয়ে কাজ করে যাচ্ছে । সেই মেয়েটি , যার খোজ মুক্তিযুদ্ধজীবি বা জাতীয়তাবাদজীবি কেউ ই খোজ রাখেনা।
খুব ইচ্ছে করছে কাছে গিয়ে বলি , তুমি আমাদেরই বোন ,আমাদেরই মত কেউ । তুমি পোশাক শিল্পি । তোমাকে স্যালুট । কিন্তু যাচ্ছিনা । বিবেকে বাধছে । ওদের কাছে ছোট হয়ে যাবো এই ভয় ।বসে বসে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছি । নিজেকে দেশপ্রেমিক বানানোর এর চেয়ে ভাল উপায় আর কি হতে পারে ।
বিঃদ্রঃ প্রতিটি পেশার প্রতিটি মানুষই সম্মানিত । আসুন আমরা তাদের সম্মান দিতে শিখি । সম্মান দিতে না পারি , অন্তত তাদের যেন মানুষ ভাবতে শিখি ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





