
তুর্কি বংশোদ্ভূত হলেও ওজিল জার্মানির নাগরিক। তাই তিনি বলেন, আমার দুটি হৃদয়, এর একটি হচ্ছে তুরস্ক,অন্যটি জার্মানি।
কিন্তু ওজিল তুরস্ক প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানেরর সাথে দেখা করায় জার্মানরা তার প্রতি ক্রুদ্ধ।
[জার্মান ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান রেইনহার্ড গ্রিনডেল বলেছিলেন, ওজিলের উচিত সমর্থকদের কাছে এ ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়া। বিশ্বকাপ দলের ম্যানেজার ওলিভার বিয়েরহফও বলেছেন, জোয়াকিম লো এমন অবস্থায় ওজিলকে দলে না রাখলেও পারতেন! বিশ্বকাপের পর সবকিছু যখন ঠান্ডা হয়ে আসছে প্রায়, তখনই আবার আগুন জ্বালালেন।
বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগে ওজিলের ক্লাব আর্সেনাল বরাবরই বাজে খেলে। এর পেছনে নাকি ওজিলই
সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছেন। হোয়েনেসের যুক্তি, ‘যখনই আর্সেনালের সঙ্গে ম্যাচ ছিল, ওকে নিয়ে আমরা খেলেছি, কারণ আমরা জানতাম ওই দলের সবচেয়ে দুর্বল দিক। ওর যে সাড়ে তিন কোটি অনুসারী আছে, ওরা বাস্তব পৃথিবীতে থাকে না। ওদের ধারণা, ওজিল একটা ক্রস করলেই সেটা অসাধারণ।
আমাদের দেশে অগ্রগতির প্রক্রিয়ার অবস্থা বেশ খারাপ। আমাদের সেখানেই ফেরা উচিত, যেটা গুরুত্বপূর্ণ—খেলা। আর
খেলার দৃষ্টিকোণ থেকে সামনের বছরগুলোতে জাতীয় দলে ওজিলের কোনো জায়গা নেই।’] বন্ধনীর এই অংশটা প্রথম আলো থেকে নেয়া।
জার্মান ফুটবল ফেডারেশন আরো জানায়, ওজিল নাকি কয়েক বছর ধরেই খারাপ খেলছে। ওর জন্য নাকি নতুনদের সুযোগ দেয়া যাচ্ছে না। নতুনরা নাকি ওর চেয়ে ফার বেটার পারফর্ম করবে। জার্মানির দ. কোরিয়ার সাথে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়ার জন্য অভিবাসী ওজিল দায়ী .... ব্লা ব্লা ব্লা...
অথচ গত ছয় বারের চারবারই জার্মান বর্ষসেরা প্লেয়ার হয়েছিলেন ওজিল। ২০১২-১৫ পর্যন্ত টানা চারবার তিনি জার্মানির বর্ষসেরা ফুটবলার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
জার্মানির ২০১৪ বিশ্বকাপ জয়েও ছিল তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
আর ওজিলও প্রতিবাদী, বিদ্রোহী। এসব বর্ণবাদী আচরণের জন্য তিনি দল থেকে অবসর নিয়েছেন। তিনি বলেন,
"সাম্প্রতিক এসব ঘটনাবলীর কথা বিবেচনা করে আমাকে
অত্যন্ত দুঃখের সাথে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এটা খুবই কষ্টের যে জার্মানির হয়ে আমি আর আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলবো
না। এরকম বর্ণবিদ্বেষ এবং অসম্মান নিয়ে আমি জার্মানির হয়ে খেলতেও পারবো না।"
মেসুত ওজিল চরম কষ্টের সাথে আরো বলেন, জিতলে আমি জার্মান আর হারলে হয়ে যাই অভিবাসী।
এথেকেই বুঝা যায়, জার্মানরা কতটা মিথ্যাবাদী, কতটা খারাপ। যাইহোক এইসব বাদ দিয়ে এখন ওজিলের ক্যারিয়ার নিয়ে একটু জানি।
নীচের লেখাটি ১৫ অক্টোবর ২০১৭-তে অনলাইন নিউজপেপার অলিগলি ডট কমে প্রকাশিত হয়েছি। কিন্তু আমি যেরকমভাবে লেখা পাঠিয়েছিলাম ওখানে হুবহু সেরকমভাবে প্রকাশ করেনি। ধর্মীয় বিষয়ে একটি লেখা কেটে অন্য একটি লেখা তারা সংযোজন করেছিলেন।
যেহেতু সামু ব্লগে মুক্তমনে মত প্রকাশ করা যায় সেহেতু আমি লেখাটা আমার মত করেই দিলাম।
ফিচারটি এখান থেকে শুরু...
মেসুত ওজিল একজন জার্মান শৈল্পিক ফুটবলারের নাম যিনি ফুটবলপ্রেমীদের কাছে অ্যাসিস্ট কিং হিসেবেই পরিচিত। ওজিল খুবই দ্রুতগামী, ক্রিয়েটিভ এবং টেকনিক্যাল প্লেয়ার। তিনি মাঝ মাঠ থেকে আক্রমণভভাগে থাকা তার টিমমেটদের এমনভাবে বল তুলে দেন যে গোল করতে তাদের কোন বেগ পেতে হয় না। আর এজন্যই অনেকেই তার নাম দিয়েছেন অ্যাসিস্ট কিং কিংবা মিঃ অ্যাসিস্ট অথবা অ্যাসিস্ট মেশিন।
মাঠে তিনি মূলত প্লেমেকারের ভূমিকা পালন করেন, কখনো কখনো তাকে দেখা যায় বাম অথবা ডান প্রান্তের উইঙ্গার হিসেবে। আবার কখনো কখনো পিচের একেবারে মাঝখানে মধ্যমণি হয়ে সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের ভূমিকা পালন করেন তিনি।
মূলত বলের উপর ওজিলের অসাধারণ কন্ট্রোল, রেঞ্জ পাসে নিখুঁত নিশানা, নিখুঁত ক্রসিং ও দুর্দান্ত ভিশন তাকে করে তুলেছে একজন পারফেক্ট প্লে-মেকার।
ওজিলের ফুটবল ক্যারিয়ারঃ
ওজিল প্রথমদিকে জেলসেনকির্সেনের বিভিন্ন যুবক্লাবে খেলেন। এরপর তিনি ৫ বছর রট-উইস এসেনের হয়ে খেলেন।
এরপর ২০০৫ সালে ১৮ বছর বয়সে জার্মান ক্লাব শালকা ০৪ এর হয়ে সিনিয়র ক্যারিয়ার শুরু ওজিলের। ক্লাব কর্তৃপক্ষের সাথে বনিবনা না হওয়ায় ২০০৮ সালে তিনি শালকে ছেড়ে যোগদেন আরেক জার্মান ক্লাব ওয়েডার ব্রেমেনে।।
তিনি তার দলকে ২০০৯ ডিএফবি পোকাল জেতাতে ও উয়েফা কাপের ফাইনালে তুলতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন।
২০০৮-০৯ সালের বুন্দেসলীগায় ব্রেমেন ভাল না করতে পারলেও(১০ম স্থান), ওজিল প্রতিটি খেলায়ই তার প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন এবং ৩টি গোল ও ১৫টি গোলে সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে ওজিল তার অসামান্য প্রতিভার জানান দেন।
২০০৯-১০ মৌসুমে ব্রেমেন বুন্দেসলিগায় সম্মানজনক ৩য় স্থান লাভ করে; ওজিল ওই মৌসুমে ৩১ খেলায় ৯টি গোল ও ১৭ টি গোলে সহায়তা প্রদান করে।
জার্মানির জাতীয় দলের হয়ে ওজিলের অভিষেক হয় ২০০৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি নরওয়ের বিপক্ষে এক ফ্রেন্ডলি ম্যাচে।। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি অ্যাসিস্ট কিং ওজিলকে।।
২০১০ বিশ্বকাপে জার্মানির হয়ে ৩ এসিস্টের পাশাপাশি গ্রুপ পর্বর গুরুত্বপূর্ণ শেষ ম্যাচে ঘানার বিপক্ষে বক্সের বাইরে থেকে অসাধারণ এক গোল দিয়ে বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের জন্য মানে গোল্ডেন বলের জন্য নমিনেটেড হন ওজিল।।

২০১০ বিশ্বকাপে তার অসামান্য পারফরমেন্স এ মুগ্ধ হয়ে ইউরোপিয়ান জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ তাকে ১৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে কিনে নেয়।।
রিয়ালের হয়ে ১ম সিজনেই অসাধারণ পারফর্ম করেন ওজিল।সেই সিজনে মেজর লীগ গুলোর মধ্যে সরবোচ্চ ২৫ টি এসিস্ট করেন ওজিল।
২০১২ ইউরোতে ক্লাবের দুর্দান্ত নৈপুণ্য ধরে রাখেন এবং টুর্নামেন্টে যুগ্মভাবে সর্বো্চ্চ এসিস্ট মেকার হন (৩টি)।
রিয়াল মাদ্রিদে ওজিল তিনটি দুর্দান্ত সিজন পার করেন। কিন্তু তারপরেও সবাইকে বিস্মিত করে রিয়াল মাদ্রিদ তাকে অার্সেনালের কাছে বেচে দেয়।
রিয়ালের প্রতিটি দর্শককই ক্লাবের এই সিদ্ধান্তের প্রতি ক্রুদ্ধ ছিল।
অার্সেনালে তিনি কত ইউরোর বিনময়ে যোগ দেন তার অফিশিয়াল কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। তবুও তা ৬৩ মিলিয়ন ও ৫ বছর মেয়াদী বলে ধারনা করা হয়।
এর মাধ্যমে তিনি এর মাধ্যমে মেসুত ওজিল জার্মানির সর্বকালের সবচেয়ে দামী খেলোয়াড়ে পরিণত হন।
আর্সেনালের হয়ে প্রথম সিজনেই দারুণ খেলেন ওজিল।। দীর্ঘ ৯ বছর পর আর্সেনালকে ট্রফি জেতাতে প্রধান ভূমিকা রাখেন।। এছাড়া সেই বছর উয়েফার বর্ষসেরা দলের সদস্য হওয়ার পাশাপা শি ব্যালন ডি অরের জন্য আবারো নমিনেটেড হন ওজিল।
২০১৪ তে জার্মানির হয়ে বিশ্বকাপ জিতেন ওজিল। ২০১৪ বিশ্বকাপে তিনি দুটি অ্যাসিস্ট ও একটি গোল করেন।
আর এই ২০১৪ বিশ্বকাপের কিছু খেলা রমজান মাসে পড়েছিল। আপনি জেনে হতবাক হয়ে যাবেন যে, রোজা রেখেই ওজিল বিশ্বকাপের প্রতিটি খেলা খেলতে মাঠে নেমেছিল। অথচ রোজা রাখার পরেও তার পারফর্মেন্সে একটুও ভাটা পড়েনি।
২০১৪ বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল জেতায় প্রত্যেককে দেড় লাখ
ইউরো দেয় জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। আর বিশ্বকাপ জেতার কারণে জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন প্রত্যেক খেলোয়াড়কে আরো তিন লাখ ইউরো বোনাস দেয়ার ঘোষণা দেয়।
আর বিশ্বকাপ থেকে অর্জিত অর্থ অর্থাৎ মোট সাড়ে চার লাখ ইউরো হামলায় গাজার ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের দিয়ে সাহায্য করেন জার্মানি ধর্মপ্রাণ এই মুসলিম খেলোয়ারটি।
তাছাড়া আরো জানা যায়, ইসরাইলকে সমর্থন দেয়ায় ফিফা কর্মকর্তাদের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করেননি এই মুসলিম ফুটবল স্টার।
ইসলাম ধর্মের প্রতি এমন অনুরাগী হওয়ার কারণে প্রতিটি মুসলিমের হৃদয়ে ঠাই করে নিয়ে নিয়েছেন ওজিল নিজেকে। এজন্য সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে অনেকেই তার ছবিতে হেশ ট্যাগ দিয়ে লিখেন "ওজিল দ্য প্রাইড অফ মুসলিম'।
ওজিল ২০১১ থেকে ১৬ পর্যন্ত মোট ৫ বার জার্মান বর্ষসেরা ফুটবলারের খেতাব অর্জন করেন। একটানা চারবার এই পুরষ্কার জেতার পর মাঝে ২০১৪ তে একবার এই পুরষ্কার রিয়াল মাদ্রিদের তারকা ক্রুসের হাতে উঠে।
জিনেদিন জিদান, রোনালদিনহো, বেকহামের মতো গ্রেট প্লেয়ারদেরকে ইতোমধ্যেই অ্যাসিস্ট সংখ্যায় ছাড়িয়ে গেছেন ওজিল। বয়স সবে মাত্র ২৮। ইঞ্জুরিতে না পড়লে সর্বকালের সেরা অ্যাসিস্ট মেকার হওয়া সময়ের ব্যপার মাত্র।
ওজিল কি মাপের প্লেয়ার সেটা জানার জন্য গ্রেটদের কিছু উক্তি দেখা জরুরি। আসুন দেখে নেই ওজিল সম্পর্কে গ্রেটদের কিছু মন্তব্য।
মরিনহোর চোখে ওজিল একেবারেই ইউনিক। তার কোনো কপিপাবেন না। এমনকি খারাপ কপিও না।ওজিলের খেলার সহজাত স্টাইল ও অসাধারণ সব অ্যাসিস্ট এর কারণে মরিনহো ওজিলকে একবার জিনেদিন জিদানের সাথেও তুলনা করেছিলেন।
জাবি আলেনসোর মতে ওজিলের মতবখেলোয়াড় আজকের দিনে পাওয়া যাবেনা।সে খেলাটা খুব ভাল বুঝে এবং তার পর্যবেক্ষন দ্বারা সে সমন্বয় করে দলের আক্রমণের দুয়ার খুলে দেয়।
ফিলিপ লামের দৃষ্টিতে যারা ওজিলের সাথে খেলেছে তারা জানে সে কতটা বুদ্ধিমান। লামের দেখা সে সেরা ভিশনের অধিকারী খেলোয়াড়।
তবে মেসুত ওজিল সম্পর্কে সম্ভবত সবচেয়ে সেরা মন্তব্যটা করেছেনজার্মানি অনূর্দ্ধ-২১ দলের ম্যানেজার হোর্স্ট রুবেশ। তিনি মমনে করেন তাদের একজন নিজস্ব
মেসি আছে, তার কাছে সেই মেসি হল মেসুত ওজিল!”
ওজিলের শৈল্পিক ফুটবলে বিমোহিত হন না, বাতি লাগিয়ে খুঝেও এমন ফুটবলপ্রেমী পাওয়া অসম্ভব। ওজিলের শৈল্পিক ফুটবলে বিমোহিত হয়ে তাকে নিয়ে গ্রেটদের
এসব মন্তব্য থেকেই তো স্পষ্ট বুঝা যায় ওজিল কি মাপের খেলোয়ার।
আর হ্যাঁ, ওজিল শুধু অসাধারণ একজন প্লেয়ারই না। তিনি সেই সাথে একজন ধার্মিক ও ভাল মানুষও বঠে। আপনি সব প্লেয়ারদের হেটার পেলেও ওজিলের হেটার পাবেন না।
১৯৮৮ সালে আজকের এই দিনে ভালবাসার এ মানুষটি পৃথিবীতে আসেন। তার ৩০ তম জন্মদিনে তাকে জানাই প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আর ওজিল যেন ইঞ্জুরির কবলে না পড়ে আমাদের আরো কয়েকটি বছর দৃষ্টিনন্দন ফুটবল উপহারদিতে পারে, তার সহজাত শৈল্পিক ফুটবলে বিমোহিত করতে পারে, সেই শুভকামনা করি।


অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


