চাপের মুখে একেকজনের প্রতিক্রিয়াটা হয় একেক রকম, কেউ ভেঙে পড়ে, কেউ আবার পাল্টা জবাব দিয়ে ফিরে আসে। ক্রিকেটের চিরাচরিত এই রীতিরই আরেকটি প্রদর্শনী দেখা গেল কাল চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে।
দুজনের অবস্থাটা ছিল একই রকম। বাংলাদেশের সবচেয়ে ‘বিখ্যাত’ ক্রিকেটার বলে পাদপ্রদীপের আলো মোহাম্মদ আশরাফুলের ওপরই বেশি ছিল, কিন্তু চাপ কোনো অংশে কম ছিল না রকিবুল হাসানেরও। দুজনেই ওয়ানডে দল থেকে বাদ পড়েছেন, রকিবুল তো বাইরে ছিলেন বাংলাদেশের সর্বশেষ টেস্টেও। অসাধারণ এক সেঞ্চুরি করে রকিবুল চাপ-টাপ আপাতত ঝেড়ে ফেলেছেন, নিশ্চিত করেছেন দিন পাঁচেক পর এই মাঠেই হতে যাওয়া প্রথম টেস্টের একাদশেও নিজের নামটা। আর জেমস ট্রেডওয়েলের এক নিরীহ বলে মাত্র ১ রানে ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে ক্যাচ দিয়ে পাহাড়সমান চাপটাকে আরও ভারী করেছেন আশরাফুল। আশরাফুলের রান না পাওয়া আর ট্রেডওয়েলের ৬ উইকেট যদি বাংলাদেশের জন্য সতর্ক সংকেত হয়, তাহলে রকিবুলের সেঞ্চুরি ছাড়াও খুশির খবর, বাঁহাতি স্পিন-জুজুটা আরও আঁকড়ে ধরেছে কেভিন পিটারসেনকে। বাঁহাতি স্পিনারের একটি বলই খেলেছেন, আউট সেটিতেই।
দলের ২০২ রানের মধ্যে তাঁর একারই ১০৭, দু অঙ্ক ছুঁয়েছেন আর মাত্র তিনজন, বিশ পেরিয়েছেন একজন, সবচেয়ে বড় জুটিটাও মাত্র ৩৫ রানের। এতসব পরিসংখ্যানও বোঝাতে পারছে না রকিবুলের ইনিংসটাকে। আরেক পাশে শীতের পাতার মতো টপাটপ উইকেট পড়তে দেখেছেন, কিন্তু তিনি শুরু থেকেই ছিলেন আত্মবিশ্বাসের প্রতিমূর্তি। ট্রেডওয়েলকে সীমানার কাছাকাছি উড়িয়ে ফেলে রানের খাতা খুলেছেন, পরের ওভারে লিয়াম প্লাঙ্কেটের বলে দুর্দান্ত স্কয়ার ড্রাইভে চার, পরের ওভারে আবার লং অনে উড়িয়েছেন ট্রেডওয়েলকে, এবার সীমানা পার। পুরো ইনিংসেই ছিল এমন আত্মবিশ্বাসী সব শটের পসরা। ১৫টি চারের সঙ্গে তিনটি ছয়, সবগুলোই ট্রেডওয়েলের বলে। এর শেষটি গিয়ে পড়েছে স্টেডিয়ামের বাইরে।
উইকেটে ঘাস, ইংল্যান্ড নেমেছে চার পেসার নিয়ে, চারজনই আবার ছয় ফুটের বেশি লম্বা। প্রস্তুতি ম্যাচ বলে তার পরও টস জিতে ব্যাটিং নিতে দ্বিধা করেননি আশরাফুল। যত সময় গড়িয়েছে ততই অবশ্য বোঝা গেছে উইকেটের চেহারা আর চরিত্র পুরোই আলাদা। বাউন্স আছে, তবে তা যথেষ্টই মন্থর। চার পেসার থাকার পরও তাই ১৬তম ওভারে বোলিংয়ে ট্রেডওয়েল, মিডিয়াবক্স প্রান্ত থেকে টানা ২৭ ওভার বোলিং করে নিয়েছেন ৫ উইকেট, শেষ উইকেটটি প্রান্ত বদলের পর প্রথম ওভারেই।
উইকেটের মতো ভুল বুঝিয়েছিলেন জুনায়েদও, দারুণ তিনটি চার মারার পর হঠাত্ করেই অফ স্টাম্পের বাইরে খোঁচা। নড়বড়ে শুরুর পর শামসুর রহমানকে যখন মনে হচ্ছিল নিজেকে ফিরে পাচ্ছেন, তখনই আউট। ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে দুর্দান্ত ক্যাচ নিয়েছেন বেল, তবে এটি ক্যাচ ছিল কি না সন্দেহ তা নিয়েই। এক বেল ছাড়া আবেদন করেননি আর কেউই, আম্পায়ারের তা দেখতে বয়েই গেছে! দর্শনীয় ক্যাচ ছিল আরেকটি, মিডঅনে গাছ থেকে আম পাড়ার মতো বলে লাফ দিয়ে শুভাগতর যে ক্যাচটি নিলেন স্টিভ ফিন, উচ্চতা ৬ ফুট ৭ ইঞ্চি না হয়ে ৫ ইঞ্চি হলেও হয়তো তা হয়ে যেত চার। উচ্চতাকে কাজে লাগিয়ে বাড়তি বাউন্সে এই ফিনই পরে টানা দু ওভারে আউট করেছেন সগীর ও ডলারকে।
লাঞ্চের আগে একটি বল খেলেছিলেন আশরাফুল, প্লাঙ্কেটের সেই বলটি অল্পের জন্য ব্যাটের কানা ছোঁয়নি। তবে আউট লাঞ্চের পর দ্বিতীয় ওভারেই। উইকেটে টার্ন ছিল, ছিল বাউন্সও, রকিবুলের কাছে পাত্তা পায়নি কিছুই। ৮২ বলের ফিফটিতে ৮টি চার ও একটি ছয়। শেষ ব্যাটসম্যান রবিউল যখন উইকেটে আসেন, তাঁর রান ৮৬। ট্রেডওয়েলের এক ওভারে একটি ছয় ও দুটি চার মেরে সেঞ্চুরিতে পৌঁছেছেন ১৫০ বলে। আগের দিন মেরে খেলতে পারেন বলে যে দাবি করেছিলেন, কাল তা করেই দেখালেন। দিনশেষে বললেন চাপটাকে তিনি নিয়েছিলেন চ্যালেঞ্জ হিসেবে, ‘টেস্ট দলে ঢুকতেই হবে এটা নিয়ে ভাবিনি, তবে রান না পাওয়ায় একটা চাপ তো ছিলই। চাপটাকে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম, ঠিক করেছিলাম রানে ফিরতেই হবে।’
ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতা শেষ বিকেলে পুষিয়ে দেওয়ার আভাস দিয়েছেন বোলাররা। কিন্তু সামনে টেস্ট, একটা দুশ্চিন্তা না হয়ে পারেই না। রবিন পিটারসেনের মতো স্পিনারও বাংলাদেশের বিপক্ষে ১০ উইকেট পেয়েছেন। ট্রেডওয়েলের ৬ উইকেট আবার এমন কিছুর ইঙ্গিত না তো!
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


