শাহবাগে লাখ লাখ মানুষের ঢল নেমেছে। এখানে সব মতের মানুষ আছে। মাঝ বয়সী, বৃদ্ধ, কলেজগামী শিক্ষার্থীদের থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রী ও বেকার যুবক-যুবতীরাও আছে। এখানে যারা এসেছেন তাদের একটিই কমন দাবি ‘কাদের মোল্লার ফাঁসি।’ কিন্তু আন্দোলনের যত দিন গড়াচ্ছে ততই দাবি আরো যৌক্তিক ও বিপ্লবী হয়ে উঠছে।
যিনিই মাইকের সামনে দাড়িয়ে দু কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন তিনিই শাহবাগের একটি নাম দিয়ে দিচ্ছেন। এর ফলে ইতিমধ্যে শাহবাগের অনেকগুলো নাম হয়ে গেছে। এতো নাম হওয়ার কারণে গণমাধ্যম বিভ্রান্ত হয়ে পুরো আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করছে। আন্দোলনকারীদের উচিত দ্রুত এ বিষয় ফয়সালা করা।
এ বিষয়ে পুরো জনতার জমায়েত প্রদিক্ষণ করে দেখলাম, কেউ কেউ বলছেন যেখানে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেয়া হচ্ছে তার নাম ‘শহীদ জননী জাহানারা ইমাম’ নাম দেয়া হোক। আর সারা দেশে এই মঞ্চের নামে আন্দোলন হোক। আমার কাছে এ বিষয়টি খুবই যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। শহীদ জননীর সম্পর্ক বিশেষ কিছু নতুন করে আর বলার নেই। জননী সাহসিকার নামেই মঞ্চের নাম হতে পারে।
আন্দোলনের কোনো মূল নেতৃত্ব নেই এখন আর। যদি কেউ চেষ্টা করে আন্দোলনের নেতৃত্ব নিতে তাহলে তার পরিণতি ভালো হবে না তা অন্তত বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের মাহবুব-উল আলম হানিফ সাহেব পানির বোতল খেয়ে বুঝতে পেরেছেন। সত্যিকার অর্থ নেতৃত্ববিহীন নৈরাজ্যিক বিপ্লবী জমায়েত যাকে বলে তার এই মূহুর্ত উদাহরণ শাহবাগের লাখ লাখ জনতা। এই জনতার এখন বেশ কিছু পরিণত ও যৌক্তিক দাবি সামনে এসেছে।
দাবিগুলো হল:
১. যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই
২. যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় দ্রুত ঘোষণা কর ও রায় কার্যকর কর
৩. জামায়াতের সঙ্গে কোন আঁতাত করা চলবে না
৪. জামায়াত সহযুদ্ধাপরাধী দল সমূহ নিষিদ্ধ কর ও তাদের মতাদর্শ প্রচার আইন করে নিষিদ্ধ কর
আনন্দের পর বিষাদগ্রস্ত আওয়ামী লীগ
সারা দেশে জামায়েতের সশস্ত্র সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগতো কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি বরং পুলিশের নিশর্ত আত্মসমর্পণ আওয়ামী লীগকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এরকম পরিস্থিতিতে কাদের মোল্লাকে ফাঁসি না দিয়ে যাবজ্জীবন সারা দেশের জনগনের মধ্যে জনপ্রিয় যে রাজনৈতিক ভাষ্য দাঁড়িয়েছে তাহল, আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াতের গোপন আঁতাত হয়েছে। এই আঁতাতের কারণে কাদের মোল্লা সাড়ে তিনশ হত্যা করেও যাবজ্জীবন সাজা পেয়েছেন।
এ পরিস্থিতি জামায়াতের হরতাল প্রতিরোধে শাহবাগের এ প্রতিরোধ সরকারের পক্ষেই গেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের কপালে চিন্তার ভাজ আরো দীর্ঘ হয়েছে যখন জামায়েতের হরতাল শেষে শাহবাগের জনতা বাড়িতে যাবার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না।
কি হবে যদি শাহবাগের জনগণ বাড়িতে না যায়? তিনদিন হয়ে যাচ্ছে। এই জনতা যদি দিনের পর দিন শাহবাগে থেকে যায় তাহলে জরুরি অবস্থা জারি করা ছাড়া আর কোনো গতি থাকবে না হাসিনা সরকারের। ঠিক এ কারণে যত দ্রুত সম্ভব শাহবাগ থেকে লোকজনকে একটা বুঝ দিয়ে বাড়ি পাঠাতে হবে। এ জন্য সরকারের বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তবে এসবগুলিই হচ্ছে শাহবাগের জনগণের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসা চিন্তা। সবগুলোই যে বাস্তবে ফলবে তা নয়, তবে কোনো আন্দোলনের মধ্যে যখন জনগণ থাকে আর সেই জনগনের চিন্তা যে কোনো ঘরে বসে থাকা অগ্রসর তাত্ত্বিকের চেয়ে উন্নত হয়ে থাকে। এটাই বিজ্ঞানের নিয়ম।
আওয়ামী লীগ-জামায়াত ঐক্য
আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াতের ঐক্য কোন পুরানো কিছু না। ঐক্য ৮৬ নির্বাচন থেকে শুরু করে ৯৬ নির্বাচনে দেখা গেছে। অর্থাৎ শাসকশ্রেণীর একাংশ জামায়াতের সাথে ক্ষমতার রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে জামায়াতের মিত্র শক্তি হিসেবে দলটির উচ্চ পর্যায়ের নেতারা দেখে থাকেন। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের আওয়ামী লীগ আর কেন্দ্রীয় কমিটি কিন্তু এক নয়। এ বিষয়টি আওয়ামী লীগ জেনেও তাদের কর্মীদের পাত্তা দেয় না।
তবে সম্প্রতি যে বক্তব্যটি ঘুরে ফিরে আসছে তাহলো আওয়ামী লীগ জামায়াতের ঐক্যের কারণেই কাদের মোল্লার ফাঁসি না হয়ে যাবজ্জীবন হয়েছে।
ঐক্য বা আতাঁতটি কি? যে খবরটি ঢাকার সাংবাদিক মহলে ভাসছে তাহলো দীপু মনি স্বামীর বাশি শুনতে ভারতে গেছেন। এই সফরে তিনি সেখানে প্রণব মুখার্জির সাথে বসবেন। এরপর প্রণবদা আবার ঢাকায় আসছেন। সব মিলিয়ে এই যড়যন্ত্রের বিদেশ নেতা হলেন প্রণব দা।
হাসিনা নিজেকে প্রধান করে সংসদ ভেঙে দিয়ে দলীয় সরকারের একটি নির্বাচন দিবেন। সেই নির্বাচনে বিএনপি যাবে না। এ সময় প্রথমে বিএনপিকে ভাঙা হবে। বিশেষত সংস্কারপন্থীরা একাজটি করবেন। এরপর জামায়াত চার দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে গিয়ে আলাদাভাবে নির্বাচন করবেন। ফলাফল জাতীয় পার্ট প্রধান বিরোধী দল। আর হাসিনার দল আবার সরকারি দলে।
জামায়াত যদি নির্বাচনে যায় আর শুধু বিএনপি যদি না যায় তাহলে নির্বাচনকে সারা পৃথিবীতে জায়েজ করতে পারবে আওয়ামী লীগ।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে মানুষ কি ঘোড়ার ঘাস খায়। এসব বিষয় যদি মানুষ ধরেই ফেলে তাহলে কি হবে? তাহলে এ যড়যন্ত্র সফল হবে না। আর আওয়ামী লীগের সঙ্গে শুধু ভারত আছে। তারা কি এত বড় ঘটনা সামাল দিতে পারবে। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে বিএনপিকে উসকে দিচ্ছে আমেরিকা। আর আমেরিকার কথা না শুনে ভারত কি আওয়ামী লীগের পক্ষে থাকবে? পাগলেও বিশ্বাস করে যে এটা ভারত করবে না।
তাহলে বিষয়টি এটা হতে পারে যে, আওয়ামী লীগের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভারত শেষ পর্যন্ত পাশে থাকবে না। যেমনটি আমেরিকাও বিএনপির পাশে থাকবে না। ফলাফল হল আরেকটি ওয়ান ইলেভেন। এই জল ঘোলা করার জন্যই নানা প্রস্তুতি চলছে।
শাহবাগ আন্দোলনের কী হবে
শাহবাগে সত্যিকার অর্থই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি রয়েছে। এখানে কোনো দলেরই কর্তৃত্ব নেই। যদি আজ (শুক্রবার) এর সমাবেশ থেকে আওয়ামী লীগ ও কিছু আওয়ামী লীগ বন্ধু বামপন্থীরা বলেন, বন্ধুরা আন্দোলন অনেক করেছি। হাসিনা আমাদের সাথে ভিডিও কনফারেন্স (শেখ হাসিনা সেটা আন্দোলনকারীদের সাথে করতে পারেন) করে দাবি মেনে নিয়েছেন। এখন বাড়ি চলে যাই। তাহলে এই ক’দিনে যতখানি কড়াই তেঁতেছিলো তাতে পানি ঢেলে দেওয়া হবে।
আন্দোলনকারীরা এ জন্য প্রস্তুত নিচ্ছেন। আমি যদি ভুল না করি তাহলে যা লক্ষ্য করেছি তাহলো আন্দোলনকারীরা দলে দলে ভাগ হয়ে আলোচনা করছেন আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তবে নিশ্চিত করেই একটা অংশ রয়েছেন যারা সর্বোচ্চ ত্যাগ করতে রাজি। যারা আন্দোলন বিজয়ী না হওয়া পর্য়ন্ত ঘরে ফিরতে রাজি নয়, তারা কারোর মুখের কথা বিশ্বাস করেন না। তারা দেখতে চান ফল।
আগে ফাঁসি দাও তারপর ফিরে যাবো ঘরে
তবে এ দাবির সাথে জামায়াত নিষিদ্ধের দাবি আওয়ামী লীগের হাত পা কাঁপিয়ে দিয়েছে। মূলত এ দাবি ওঠার পর আওয়ামী লীগের গায়ে জ্বর আসার কথা। এ দাবিটি মূলত বৃহস্পতিবার থেকে জোরদার হয়েছে। বিভিন্ন লিফলেট আর স্লোগানে স্লোগানে এই দাবি উঠেছে। জনতা এ দাবির ব্যাপারে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। আমি বিভিন্ন শ্লোগানের মধ্যে এ দাবিটি ফুটে উঠতে দেখেছি। যেখানে হাজার হাজার জনগণ দাবির সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে বলেছেন, জামায়াতকে নিষিদ্ধ কর।
আন্দোলনকারীদের এখানেই চ্যালেঞ্জ। মূলতঃ তারা এক মহাসন্ধিক্ষণে অবস্থান করছেন। একটু আপোষ করলে দারুণ সুযোগ হাতছাড়া হবে। আর যদি একটু কষ্ট করেন, ধৈর্য্য ধরেন তাহলে বিজয় অনিবার্য।
যদি জামায়াতকে নিষিদ্ধ না করে আমরা ঘরে ফিরি তাহলে ইতিহাসের দায় আমাদের কাঁধে থাকবে। আমরা লড়াইয়ের এমন একটি পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়িয়েছি যেখানে বিজয় খুব কাছে। আবার বিজয় অর্জন করাটাও সময়ের ব্যাপারে খুব কৌশলের।
বামপন্থীদের একাংশ বরাবরের মতই শাসক দল আওয়ামী লীগকে বাঁচানোর চেষ্টা করবেন। আমরা যদি অগ্রভাগে থেকে স্লোগান তুলি আর নয় আঁতাত, করলে আঁতাত জবাব দিবে বাংলাদেশ।
যদি কোনো আঁতাতকারী বক্তব্য কেউ দেয়, সাথে সাথে তা প্রত্যাখান করে স্লোগান দেওয়া উচিত। তবে জামায়াত নিষিদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত শাহবাগে থাকা হবে এই মুহূর্তের সব থেকে বড় কর্মসূচি। আর যদি আঁতাতকারীরা বিজয় অর্জন করে তাহলে ইতিহাস আবার পেছনে যাবে।
লেখক : মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান তুহিন: শাহবাগের অবরোধ কর্মসূচির অন্যতম সংগঠক এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক সাংবাদিক।
লিংক : Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ রাত ২:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


