somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ট্রান্সজেন্ডাদের উপর কারা হামলা করলো ?

১১ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গত সপ্তাহে সংসদে দাঁড়িয়ে একটি কথা বললেন যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এর আগে কেউ সরকারিভাবে বলেননি। মানবাধিকার কমিশন নিয়ে আলোচনার মাঝখানে তিনি বললেন, বাংলাদেশে LGBT ইস্যু আছে, এবং এই বিষয়টাকে দেশীয় সংস্কৃতি ও ধর্মের সাথে মিলিয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের মানবাধিকার কমিশন তৈরি করতে হবে। এটুকুই। না কোনো অধিকারের দাবি, না কোনো আইন পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি। শুধু একটি স্বীকারোক্তি যে বিষয়টার অস্তিত্ব আছে। কিন্তু এই ছোট্ট স্বীকারোক্তিটুকুই যথেষ্ট ছিল একটা আগুন জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য, কারণ এই দেশে সত্য বলাটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক কাজ।

৩ এপ্রিলের ঘটনাটা দিয়ে শুরু করা যাক। সেদিন শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনে প্রতি শুক্রবারের মতো কিছু ট্রান্সজেন্ডার মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। তারা বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন, হাসছিলেন, নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন। ঠিক তখন সকালের সময়ের সাংবাদিক বোরহান উদ্দিন ইয়াসিন ক্যামেরা তাক করলেন। এরপর যা হলো তা নিয়ে দুটো পক্ষের দুটো গল্প আছে। সাংবাদিক বলছেন তাকে মারধর করা হয়েছে। অন্য পক্ষের যুক্তি হলো, যারা সারাজীবন ক্যামেরার সামনে পড়লে চাকরি হারান, পরিবার ছাড়েন, এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন, তারা হয়তো সেদিন অনুমতি ছাড়া ভিডিও করাটা ভালোভাবে নেননি। মারধর যে-ই করুক, সেটা অন্যায়, এটা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু এই ঘটনাটা সুকৌশলে একটা ন্যারেটিভ তৈরি করে দিল। ন্যারেটিভটা হলো: ট্রান্সজেন্ডাররা বিপজ্জনক।

ঠিক সাত দিন পরে, ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে আটটায়, একই জায়গায় "সাধারণ মানুষ" ট্রান্সজেন্ডারদের উপর হামলা চালাল। এই "সাধারণ মানুষ" কথাটা খুব মজার। বাংলাদেশে কেউ ট্রান্সজেন্ডারদের দেখলে কি সত্যিই স্বতঃস্ফূর্তভাবে মারতে দৌড়ায়? মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে একই স্থানে দুটো ঘটনা, এবং দুটোর মাঝখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সংসদীয় বক্তব্য। যোগফলটা মিলিয়ে দেখলে মনে হয় কেউ একটা রেসিপি তৈরি করেছে। প্রথমে সাংবাদিক পেটানোর ঘটনা দিয়ে জনমনে ভয় ঢোকাও, তারপর মন্ত্রীর বক্তব্যকে "LGBT স্বাধীনতার ঘোষণা" বলে চালিয়ে দাও, তারপর "ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষের" হামলাকে জনগণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করো।

এই ঘৃণার যুক্তিটা একটু ভেঙে দেখা দরকার। ট্রান্সজেন্ডারদের বিরুদ্ধে যে মূল আপত্তি, সেটা হলো তারা "স্বাভাবিক" যৌনতার বাইরে, পুরুষ পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া এই সমাজে পাপ, অভিশাপ, সমাজের জন্য বিপদ। এই যুক্তিতেই শাহবাগে হামলা হয়, এই যুক্তিতেই মিম্বর থেকে ঘোষণা আসে। কিন্তু আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে গত বছর শুধু মাদ্রাসার ভেতরেই ৫২ জন শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তিনজন মারা গেছে, এবং ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগই ছেলেশিশু। মেহেরপুরে গত সপ্তাহে, নোয়াখালীতে তার আগের সপ্তাহে একই অভিযোগে শিক্ষকরা গ্রেপ্তার হয়েছেন। অর্থাৎ যে আচরণকে "অস্বাভাবিক" বলে রাস্তায় মানুষ পেটানো হচ্ছে, সেই আচরণ সবচেয়ে নিরাপদে ঘটছে সেই দেওয়ালের আড়ালে যেখানে নৈতিকতার সবচেয়ে উচ্চস্বরে পাহারা দেওয়া হয়। পার্থক্য শুধু একটাই, একটা দৃশ্যমান আর একটা দরজা বন্ধ করে।

এই দেশে হিজড়া সম্প্রদায় হাজার বছর ধরে আছে। মুঘল আমলে তারা রাজদরবারে সম্মানিত ছিলেন। ব্রিটিশরা এসে তাদের "অপরাধী জাতি" ঘোষণা করল। স্বাধীনতার পরেও সেই ঔপনিবেশিক আইন রয়ে গেল। ২০১৩ সালে সরকার তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি দিল, কিন্তু বাস্তবে কিছুই পাল্টাল না। পাসপোর্টে "হিজড়া" লেখার সুযোগ হলো, কিন্তু চাকরি নেই, বাড়ি নেই, মসজিদে ঢুকতে দেয় না, কবরস্থানে দাফন করতে দেয় না। এই মানুষগুলো সপ্তাহে একটা দিন, শুক্রবার সন্ধ্যায়, জাদুঘরের সামনে বসে একটু নিজেদের মতো থাকেন। এই অল্পটুকুও কারও সহ্য হচ্ছে না।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্যাটার্ন নতুন না। একটা সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে আগে "বিপজ্জনক" বলে পরিচিত করাও, তারপর "জনরোষ" সৃষ্টি করো, তারপর হামলা করো এবং হামলাকারীদের "ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ" বলে রক্ষা করো। এভাবেই অনেক মাজার ভাঙা হয়েছে, অনেক হিন্দু মন্দির পুড়েছে, অনেক সংখ্যালঘুর বাড়ি ছাই হয়েছে। প্রতিবার একই রেসিপি, শুধু উপকরণ বদলায়। এবার উপকরণ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে সেই মানুষগুলোকে যারা এমনিতেই সবচেয়ে অরক্ষিত, যাদের পাশে দাঁড়ানোর লোক সবচেয়ে কম।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে একটা কথা বলেছেন। এটা বাংলাদেশের LGBT সমাজের জন্য কোনো বিজয় না, এটা একটা সাধারণ বাস্তবতার স্বীকারোক্তি। কিন্তু এই সামান্য স্বীকারোক্তিটুকুও যে একটা গোষ্ঠীর এত গায়ে লাগল, এত দ্রুত এত সহিংস প্রতিক্রিয়া হলো, সেটাই বলে দেয় পরিস্থিতিটা আসলে কতটা ভয়াবহ। যে দেশে মাদ্রাসার শিক্ষক ১১ বছরের শিশুকে ধর্ষণ করেন এবং সেই খবর তিন দিনের মধ্যে হারিয়ে যায়, সেই দেশে জাদুঘরের সামনে আড্ডা দেওয়া ট্রান্সজেন্ডারদের পেটানোর খবর ভাইরাল হয় এবং "জনগণের ক্ষোভের প্রকাশ" বলে বৈধতা পায়। এটাই এই দেশের সবচেয়ে বড় প্রহসন।

জেনে রাখা ভালো : বাংলাদেশে বেশিরভাগ মানুষ এখনো মনে করে, ছেলে মানে ছেলে, মেয়ে মানে মেয়ে এবং এটা বদলায় না । তাই তারা সবকিছু এক করে ফেলে; ছেলে + ছেলে পছন্দ = গে ; এখানে transgender বিষয়টা মিস হয়ে যায় । উদাহরণ : আকাশ জন্মের সময় ছেলে ছিল, কিন্তু পরে নিজেকে নারী হিসেবে অনুভব করে (transgender নারী হলো। সে যদি পুরুষদের প্রতি আকৃষ্ট হয়,তাহলে সে straight (নারী → পুরুষে আকর্ষণ) ; গে না ।

শাহবাগে ট্রান্সজেন্ডারদের ওপর হামলা-ভোরের কাগজ

শাহবাগে ট্রান্সজেন্ডারদের হামলায় সাংবাদিক আহত- রহমত নিউজ ।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ২:৪৮
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের "ইসলামী" বই - নমুনা ! আলেমদের দায়িত্ব

লিখেছেন ঢাকার লোক, ১০ ই মে, ২০২৬ সকাল ৮:৪৭

আমাদের দেশের বিখ্যাত চরমোনাইয়ের প্রাক্তন পীর সাহেব, মাওলানা ইসহাক, যিনি বর্তমান পীর রেজাউল করিম সাহেবের দাদা, এর লেখা একটা বই , "ভেদে মারেফাত বা ইয়াদে খোদা"। এ বইটার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম কর্ম

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১০ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:১৩



আপনার দিনের পর দিন ধর্মীয় লেখা পোস্ট করার কারণে -
হয়তো, আপনার কম্পিউটারটি স্বর্গে যেতে পারে।
কিন্তু, আপনার নিজে স্বর্গে যেতে হলে -
আপনার নিজের ধর্ম কর্ম করতে হবে।


ঠাকুরমাহমুদ
ঢাকা, বাংলাদেশ



...বাকিটুকু পড়ুন

আমার মা আমার পৃথিবী

লিখেছেন জিনাত নাজিয়া, ১০ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৬

" আমার মা,আমার পৃথিবী "

মাঝেমধ্যে হঠাৎ করেই মাগো তুমি আমার স্বপ্নে এসে আমার হ্রদয় ছুঁয়ে যাও। সেদিন সারাটাক্ষন আমি আমার মায়ের মাঝে ডুবে থাকি। কোনো কাজে মন বসাতে পারিনা।
কিশের এতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

মিমস যুদ্ধ: রাজনীতিতে হাসি-ঠাট্টার কৌশল”

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ১০ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৯

সাম্প্রতিক সময়ের সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ডগুলো বেশ মজার। ট্রল আর মিমসের দুনিয়ায় প্রতিদিন নতুন নতুন বিষয় যুক্ত হচ্ছে যা আমাদের বিনোদনের খোরাক জোগায়। ওপরের তালিকার সাথে আরও কিছু চলমান মিমস... ...বাকিটুকু পড়ুন

তোমার কোন এক মুহূর্তের শব্দ শুনি

লিখেছেন সামরিন হক, ১০ ই মে, ২০২৬ রাত ৯:৩১


ছবি- নিজস্ব সংগ্রহ


কেঊ এসে মেরে রেখে যাক তা চাই নি কখনো ।
তবুও সে আসে,মেরে ফেলে চলে যায়।
তখন খুব জোড় করে বেঁচে থাকি,
বলতে পারো জোড় করে বাঁচিয়ে রাখি নিজেকে।

জীবন কোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×