somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

"দ‍্য মিথ অফ হিন্দু টেরর ; এন ইনসাইডার এ্যাকাউন্ট অব মিনিস্ট্রি অফ হোম এ্যাফেয়ার্স ২০০৬ -২০১০) আর. ভি. এস. মণি.

২৭ শে জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সন্ত্রাসের প্রকৃত রং ( প্রথম পর্ব )
................................................
"স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকে আমার ডিরেক্টর ছিলেন একজন মার্কামারা নীরস আমলা। তাঁর ব‍্যক্তিত্বের মধ‍্যে আকর্ষণীয় কিছুই ছিল না। পদোন্নতি পেয়ে জয়েন্ট সেক্রেটারি হিসাবে তাঁর নাম প‍্যানেলভুক্ত হলেও পোস্টিং পাননি বলে মেজাজটা সবসময় তিক্ত হয়েই থাকত।
একবার আমার সাথে তাঁর ভালোমত মনোমালিন্য হল। তিনি আমাকে একটা শিক্ষা দিতে চাইলেন। তাঁর সুপারিশে আমি বদলি হয়ে গেলাম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের আভ‍্যন্তরীণ সুরক্ষা ( Internal Security ) বিভাগে। আমি আন্ডার সেক্রেটারি হিসেবে সেখানে নিযুক্ত হলাম।
যেদিন আমি নতুন অফিসে গিয়ে কার্যভার গ্রহণ করি, সেদিন আমার পূর্বসূরী আমাকে আনন্দে জড়িয়ে ধরলেন। তিনি বহুদিন ধরে চেষ্টা করছিলেন এই অফিস থেকে বদলী নেবার। অতি দ্রুত তল্পিতল্পা গুটিয়ে যেভাবে অফিস থেকে প্রস্থান করলেন, দেখে মনে হচ্ছিল যেন ঐ জায়গাটা ত‍্যাগ করে বেঁচে গেলেন। প্রটোকল অনুযায়ী আমাকে চার্জটুকু পর্যন্ত বুঝিয়ে দেবার কথা তাঁর মনে ছিল না !
আমার কাজটা ছিল পরিশ্রমসাধ‍্য। ভুলত্রুটি দেখিয়ে দেবার মত কেউ ছিল না। আমি নতুন অফিসে এসে নিজের চেষ্টায় যথাসম্ভব কাজ শিখে নেবার চেষ্টা করছিলাম।
সংসদে দুধরনের প্রশ্ন উত্থাপন করা যায়, একটি তারকাচিহ্নিত, অপরটি অচিহ্নিত। তারকাচিহ্নিত প্রশ্নের লিখিত উত্তর দেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী। নানা নথিপত্র ঘেঁটে সেই প্রশ্নের উত্তর তৈরী করে দেবার দায়িত্ব মন্ত্রকের আধিকারিকদের। সংসদীয় রাজনীতিতে এইসব প্রতিবেদন হয়ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আই এ এসরা ব‍্যঙ্গ করে এর নাম দিয়েছিলেন "জবাব ফেঁকনা" ! ( উত্তর ছুঁড়ে মারা )
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকে দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার হিসেবে আমাকে লোকসভা ও রাজ‍্যসভার question, motion ও calling attention notice এর জবাব তৈরী করে দিতে হত। সংসদের অধিবেশন চলাকালীন প্রায় রোজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক সংক্রান্ত অগণিত প্রশ্ন সংসদের অফিস থেকে আমাদের পাঠানো হত।
কয়েকদিন আগেই ব‍্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্সে জঙ্গি হামলা হয়ে গিয়েছিল। সংসদ এই ইস‍্যুতে তখন সরগরম, বিরোধী দলের প্রচুর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছিল সরকারকে। এই সূত্রে আমাদের কাজ বাড়ছিল।
ইতিমধ্যে বেনারসের সংকটমোচন মন্দির ও ক‍্যান্টনমেন্টে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে গেল। আমি রাজ‍্য সরকারের কাছ থেকে তথ‍্যসংগ্ৰহ করে একটি বয়ান প্রস্তুত করি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক হিসেবে । স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর নিন্দাসূচক বিবৃতিতে আমার দেওয়া কিছু তথ‍্য ব‍্যবহার করেছিলেন, তা মনে আছে।
২০০৬ সাল থেকেই একের পর এক জঙ্গি আক্রমণ ঢেউয়ের মত আছড়ে পড়তে থাকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
দিল্লীতে তিনটি বিস্ফোরণ ঘটার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে বিবৃতি দিলেন, সেখানে কেবল স্থান, সময় আর হতাহতের সংখ্যাটুকু বসিয়ে নেওয়া হয়েছে। বাকিটা হুবহু আগের বিবৃতির অনুকরণ। "পাইওনিয়ার" পত্রিকা বিষয়টি সর্বপ্রথম আলোকপাত করেছিল। তারা কটাক্ষ করে লিখেছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি আগে থেকেই লিখিত বয়ান ছাপিয়ে রেখেছেন এবং কোথাও জঙ্গি হামলা হলেই তা সাংবাদিক সম্মেলনে পড়ে শোনাচ্ছেন !
ওই বছরেই ঔরঙ্গাবাদে উদ্ধার হল প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র ও বিস্ফোরক। কয়েকজন ধরা পড়ল। তাদের উদ্দ‍্যেশ‍্য ছিল, মহারাষ্ট্রের কয়েকটি জায়গায় আঘাত হানা এবং নাগপুরে অবস্থিত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সদর দপ্তর আক্রমণ করে সংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে খুন করা । এসব করলে দেশজুড়ে অস্থিরতা তৈরী হবে।
ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি ক্রমাগত যে খবর পাচ্ছিল তাতে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে মহারাষ্ট্র জঙ্গিদের একটি খুব বড় লক্ষ‍্যবস্তু হতে চলেছে। ২০০৬ সালে নাগপুরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের দপ্তরে হামলা আমরা খবর পেয়েও ঠেকাতে পারিনি। তিনজন জঙ্গি সংগঠনের সদর দপ্তরে ঢুকতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে মারা যায়।
ঐ বছরের গ্ৰীষ্মে আমাদের মন্ত্রকের প্রায় সব বড় অফিসার‌ই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিতে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। সেইসময় আমি একদিন নর্থ ব্লকের ক‍্যাফেটেরিয়ায় বসে কফি খাচ্ছিলাম। আমাদের মন্ত্রকের এক কর্মী হঠাৎ আমার সামনে হাজির হলেন। তিনি আমাকে এসে জানালেন যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অতিরিক্ত সচিব আমাকে খুঁজছেন। সচিবের অফিস ঐ বিল্ডিংয়েই। তাঁর সাথে দেখা করলে তিনি বললেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি বিশেষ দরকারে এক্ষুনি ডেকে পাঠিয়েছেন আমাকে। উক্ত সচিব আমার বিশেষ পরিচিত, আগে ডেপুটেশনে লোকসভা সেক্রেটারিয়েটে একসাথে কাজ করেছিলাম দুজনে।
আমি মন্ত্রীর ঘরে গিয়ে দেখলাম মন্ত্রী শিবরাজ পাটিল ছাড়াও আরো দুজন রয়েছেন। একজন হলেন মধ‍্যপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ‍্যমন্ত্রী দিগ্বিজয় সিংহ। আরেকজনের কথাবার্তা ও ভাবভঙ্গী দেখে তাঁকে পুলিশ অফিসার বলেই মনে হল। তিনি সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া জঙ্গি হামলা ও বিস্ফোরণ সম্পর্কে বিশদভাবে জানতে চাইলেন। যেসব সংগঠন এসবের পেছনে জড়িত বলে রিপোর্টে লেখা রয়েছে, আমি তাদের নাম করলাম।
ওঁরা বারবার কিছু বিশেষ মতাদর্শের সংগঠনের জড়িত থাকার বিষয়ে কথা বলছিলেন। আমি বললাম এইসব সংগঠনের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের আভ‍্যন্তরীণ সুরক্ষা দপ্তর কোন তথ‍্যভান্ডার তৈরী করে না। এই দায়িত্বে আছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের "Human Rights and National Integration" বিভাগ। তাদের দপ্তর দিল্লির খান মার্কেটে।
আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের আধিকারিক, আমরা নিজেরা কোন তদন্ত করি না। বিভিন্ন নিরাপত্তা এজেন্সি, কেন্দ্রীয় ও রাজ‍্য পুলিশবাহিনী থেকে যেসব তথ‍্য পাই, তা দিয়েই আমাদের প্রতিবেদন তৈরী হয়। তাদের পাঠানো তথ‍্য অনুযায়ী আমরা ফাইল তৈরী করি। সেই ফাইলের ভিত্তিতে এইসব জঙ্গি হামলার পেছনে যেসব সংগঠন রয়েছে, তাদের নাম বললাম। একটি শত্রুভাবাপন্ন প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতকে ডিস্টেবিলাইজ করতে চাইছে। তারাই কিছু মানুষকে উসকে নাশকতামূলক কাজের প্রশিক্ষণ দিয়ে এই হামলাগুলি করাচ্ছে।
আমার জবাব শুনে ঘরে উপস্থিত কেউ তেমন খুশি হয়েছেন বলে মনে হল না।
ওই প্রশ্নকর্তা ব‍্যক্তিটির পরিচয় আমি পরে পেয়েছিলাম। সত‍্যিই তিনি একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিক ছিলেন। পরবর্তীকালে ২৬/১১/২০০৮ এ মুম্বইয়ের সেই বিখ‍্যাত জঙ্গি হামলায় তিনি আততায়ীর গুলিতে মারা যান। তাঁর নাম ছিল হেমন্ত কারকরে।
২০০৬ এর জুলাই মাসে মুম্বাইয়ের ট্রেনে সাতটি বিস্ফোরণ হয়। এতে ১৮৭ জন মারা যান, ৮৭২ জন আহত হন।
৮ই সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের মালেগাঁওতে চারটি বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ৩১ জন মারা যান ও ৩২১ জন আহত হন। এই ঘটনাটি ঘটার পর আমি নাসিকের সুপারিন্টেন্ডেন্ট অফ পুলিশের ( গ্ৰামীন ) থেকে বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়ে পাঠাই। স্থানীয় পুলিশের তদন্তে স্টুডেন্টস ইসলামিক মুভমেন্ট অব ইন্ডিয়া বা সিমির লোকজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।
১৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ এ সমঝোতা এক্সপ্রেসে তীব্র বিস্ফোরণ ঘটে। এতে নিহতের সংখ্যা ছিল ৬৮। পাকিস্তানের একটি করাচীভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন এর দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছিল। এই বিষয়ে আমি পানিপথের সুপারিন্টেন্ডেন্ট অফ পুলিশ ( রেলওয়েজ এন্ড ক্রাইম ) এর থেকে তথ‍্যসংগ্ৰহ করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করি।
১৮ই মে মক্কা মসজিদের বিস্ফোরণে ৯ জন মারা যান ও ৫৮ জন আহত হন। আমাদের তদন্তকারী সংস্থাগুলি লস্কর ই তৈবা ও জয়েশ এ মহম্মদের স্লিপার সেলগুলিকে সন্দেহ করতে শুরু করেছিল। এই বিষয়ে তারা প্রমাণ সংগ্রহ করতে শুরু করে। দেশজুড়ে অভিযান চালিয়ে অনেককে আটক করা হয়েছিল। সমঝোতা এক্সপ্রেস ও মক্কা মসজিদের বিস্ফোরণ, উভয় ক্ষেত্রেই ৬ ভোল্টের ব‍্যাটারি ও কাস্ট আয়রনের পাইপ ব‍্যবহৃত হয়েছিল।
২৫ শে আগষ্ট, ২০০৭ হায়দ্রাবাদের লুম্বিনি পার্ক ও গোকুল চাট ভান্ডারে বিস্ফোরণ হয়। প্রথমোক্ত স্থানে ১২ জন ও দ্বিতীয় জায়গায় ৩১ জন মারা যান। এই ঘটনার সাথে বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠন হুজির প্রত‍্যক্ষ যোগাযোগ রয়েছে বলে পুলিশের রিপোর্টে লেখা হয়।
১ .১. ২০০৮ এ রামপুরে সি আর পি এফ ক‍্যাম্প আক্রমণ করে লস্কর ই তৈবা জঙ্গিরা। আটজন মারা গিয়েছিল এতে।
দিল্লির ধারাবাহিক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল যারা, পুলিশ তদন্ত করে দেখেছিল এর পেছনে রয়েছে উত্তরপ্রদেশের আজমগড়ের একটি উগ্ৰ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী। দিল্লী পুলিশের একটি দল সন্দেহভাজন জঙ্গিদের খোঁজে শাহীনবাগের কাছে ঘনবসতিপূর্ণ জামিয়ানগরে বাটলা হাউস নামে একটি বাড়িতে অভিযান চালায়। সংঘর্ষে বেশ কিছু সন্দেহভাজন তরুণ মারা যায়, এক ইন্সপেক্টরও গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ঘটনার পরে আমি খবরের কাগজে দেখেছিলাম কংগ্ৰেসের দিগ্বিজয় সিংহ এটিকে "ফেক এনকাউন্টার" হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, পুলিশ বিশেষ উদ্দ‍্যেশ‍্যপ্রণোদিত হয়ে নিরীহ ছেলেদের মেরে ফেলেছে।
২০০৮ সালের পর থেকেই মহারাষ্ট্র এটিএস বা সন্ত্রাস দমন শাখা মালেগাঁও বিস্ফোরণের তদন্তের দায়িত্ব হাতে পায়। সংবিধানের সপ্তম তফশিল অনুযায়ী কোন রাজ‍্যের আইনশৃঙ্খলা হল রাজ‍্য সরকারের এক্তিয়ারভুক্ত বিষয়। এখানে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের কোন ভূমিকা নেই। এই এটিএসের দায়িত্বে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘরে আমার দেখা সেই অফিসার, হেমন্ত কারকরে।
কারকরের টিম তদন্তে আসার পরেই আমার মনে হয়েছিল যে তদন্তের অভিমুখ সম্পূর্ণভাবে বদলে যাচ্ছে । মিডিয়ায় এই প্রথম একটি বাক‍্য শোনা যেতে লাগল --- " হিন্দু সন্ত্রাস"।
সাধ্বী প্রজ্ঞা, শিবনারায়ণ কালসাঙ্গরা, স্বামী অসীমানন্দ ও একজন সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্ণেল শ্রীকান্ত পুরোহিতকে গ্ৰেপ্তার করা হল। আমার স্পষ্ট মনে আছে মালেগাঁও বিস্ফোরণে ফিল্ড লেভেলে যে সব অফিসার তদন্ত করেছিলেন, তাঁদের চার্জশিটে "আহলে হাদিস" নামে একটি সংগঠনকে দায়ী করা হয়েছিল।
কিন্তু ঘটনা ঘটার দুবছর পরে নতুন তথ‍্যসূত্র পেয়ে কারকরের টিম ওই পূর্বোক্ত সংগঠনের ভূমিকাকে কোন গুরুত্ব দিতে চাইলেন না। কিন্তু তিনি তদন্তকে যেভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তাতে নানান প্রশ্নের জন্ম হচ্ছিল। এই কেসটি সর্বভারতীয় মিডিয়ায় তুমুল প্রচার পেয়ে গেল, বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক চাপান উতোরও কম হল না।
২০০৮ সালের ২৬শে নভেম্বর দিনটি কেউ কখনও ভুলতে পারবে না। অনেকের মত আমার জীবনকেও তা ওলটপালট করে দিয়েছিল।
সেদিন সন্ধ‍্যায় আমি বাড়িতে টিভি দেখছিলাম। সেখানে দেখলাম মুম্বইতে বড় ধরনের জঙ্গি হামলা হচ্ছে। সব খবরের চ‍্যানেলগুলিতেই বলা হতে লাগল ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনাস, দুটি বড় হোটেল, একটি ক‍্যাফে এবং একটি আবাসনে ভয়ংকর সব কান্ড ঘটে চলেছে। প্রায় বারোটি জায়গা আক্রান্ত।
১৫ মিনিটের মধ‍্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের কন্ট্রোল রুম থেকে আমার তলব চলে এল। সেইসময়ে আমাদের প্রায় সব উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা সরকারি কাজে পাকিস্তানে। দুদেশের সচিব পর্যায়ের বৈঠকের বিষয় ; সন্ত্রাসদমন।
কন্ট্রোল রুমে পৌঁছে দেখলাম সেখানে তুমুল ব‍্যস্ততা। ইতিমধ‍্যেই প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, বিদেশ দপ্তর, ক‍্যাবিনেট সেক্রেটারিয়েট, বিভিন্ন দেশের দূতাবাস থেকে প্রচুর কল আসতে শুরু করে দিয়েছে।
কিছুক্ষণ পরে দুজন জয়েন্ট সেক্রেটারি কন্ট্রোল রুমে চলে এলেন। আমরা যন্ত্রের মত একটানা কাজ করে যেতে লাগলাম।
কিভাবে এন এস জি কমান্ডোদের দিল্লি থেকে মুম্বাইয়ে নিয়ে আসা যায়, তাই নিয়ে প্রচুর সরকারি বার্তালাপ চলল। এসব কাজে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই গোটা পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অত‍্যন্ত নিরাসক্ত বলে মনে হয়েছিল আমার। ওইসময়ে মুম্বইয়ে সেনাবাহিনীর মেরিন কমান্ডোর একটি দল প্রশিক্ষণের জন‍্য ঘটনাচক্রে ছিল। তাঁরা স্বরাষ্ট্র নয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অধীনে। তাঁদের দিয়ে তাজ হোটেলে অভিযান চালিয়েও তেমন লাভ হল না। পরের ঘটনাগুলো সকলের জানা।
হোম সেক্রেটারি পাকিস্তান থেকে ফিরে আসার পরেই ক‍্যাবিনেট সেক্রেটারীর আহুত একটি আপৎকালীন বৈঠকে যোগ দিতে চলে গেলেন। আমি তাঁর ব‍্যক্তিগত সচিবের কাছে আমার রিপোর্ট পাঠিয়ে দিলাম।
একটি বিষয় যা অনেকেই জানেন না, তা হল -- তাজ হোটেলে ঢুকে জঙ্গিরা যখন একে একে মানুষ খুন করছিল, সেই সময়ে সেখানে উপস্থিত ছিলেন মহারাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রবিভাগের অতিরিক্ত সেক্রেটারি চিৎকলা জুৎশী। তিনি ওই পাঁচতারা হোটেলে একটি ব‍্যক্তিগত নৈশভোজে যোগ দিতে গিয়েছিলেন।
আমার অবাক লাগে যে কয়েকদিন আগে থেকেই মহারাষ্ট্র সরকারকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের পক্ষ থেকে ক্রমাগত সতর্কবার্তা পাঠানো হচ্ছিল আসন্ন জঙ্গিহামলা সম্পর্কে। সমুদ্র সংলগ্ন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গা, হোটেল, মন্ত্রালয়, মাতোশ্রী এবং ভি আই পি আবাসনগুলি বা অন‍্যান‍্য "হাই ভ‍্যালু টার্গেট"গুলির সুরক্ষাব‍্যবস্থা জোরদার করার পরামর্শ সেখানে দেওয়া হয়েছে। এই রিপোর্ট নিশ্চিতভাবে চীফ সেক্রেটারি মারফত অতিরিক্ত সচিবের টেবিলেও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনে চলে গিয়েছে। জঙ্গি হামলার আশঙ্কা সত্ত্বেও তিনি কেন ওই ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাটিতে চলে গিয়েছিলেন,তা আজও ভেবে পাই না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের কন্ট্রোল রুমে যারা কাজ করেন, তারা অধিকাংশই কেন্দ্রীয় পুলিশ বাহিনীর সদস‍্য। পিটার নামে এক সি আর পি এফের আ্যাসিস্টেন্ট কমান্ডান্ট সেসময় কন্ট্রোল রুমে মোতায়েন ছিল। সে পরে আমাকে হাসতে হাসতে বলেছিল, "স‍্যার, উনি কি সেদিন সেই জঙ্গি হামলার উদ্বোধন করতে ওই হোটেলে গিয়েছিলেন ?"
তাজ হোটেলে যে সব জঙ্গি হত‍্যালীলা চালাচ্ছিল, তাদের সাথে তাদের পাকিস্তানী হ‍্যান্ডলারদের নিয়মিত কথা হয়ে চলেছিল স‍্যাটেলাইট ফোন মারফৎ। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা সেই কলগুলি ইন্টারসেপ্ট করে রেকর্ড করে রাখছিল। এই সংক্রান্ত ট্রান্সক্রিপ্টগুলি পরবর্তীকালে আদালতে প্রমাণ হিসাবে নথিভুক্ত হয়।
সেই রকমই একটি কথোপকথনে শোনা যায় ---
"হ‍্যান্ডলার : আসসালামুয়ালাইকুম। তোমাদের হোটেলে তিনজন মন্ত্রী (ওয়াজির ) আর একজন ক‍্যাবিনেট সেক্রেটারি রয়েছে। কিন্তু কোন ঘরে তারা রয়েছে সেটা বলতে পারছি না।
জঙ্গি ; আরে, এতো দারুন ব‍্যাপার।
হ‍্যান্ডলার ; ঐ তিনচারজনকে খুঁজে বের করে পণবন্দী কর। তাহলে ভারত সরকারের থেকে যা চাইবে পেয়ে যাবে।"
তাজ হোটেলে সেই সময়ে উপস্থিত এই "হাই ভ‍্যালু আ্যাসেট" সম্পর্কে পাকিস্তানে খবর চলে গেল কি করে ?
ঐ জঙ্গিরা সমুদ্রপথ দিয়ে ভারতের জলসীমায় প্রবেশ করে। "কুবের" নামে একটি মাছধরা ট্রলার ছিনতাই করে তার টান্ডেল ( সারেং) কে মেরে তারা কোলাবায় আসে। তারপর রবাবের ডিঙিতে চড়ে মচ্ছিমার কলোনিতে নামে। হাঁটতে হাঁটতে তারা বাধওয়ার পার্কে চলে আসে। তারপর তারা মুম্বইয়ের শহরাঞ্চলে ঢুকে পড়ে নির্বিচারে হত‍্যালীলা চালায়। ঘটনার এতদিন পরেও এইগুলো শুনতে রূপকথার মত লাগে।
আমি যতদূর জানি, মুম্বই উপকূলের মৎস‍্যজীবিদের এলাকায় অচেনা কেউ ঢুকলেই তারা সচকিত হয়ে যায়। সেখানে এরা দৃষ্টি আকর্ষণ না করে হাঁটতে হাঁটতে নিরুদ্বেগে শহরের অভ‍্যন্তরে হানা দিল,এটা বিশ্বাস করা কঠিন। কোন শক্তিশালী লোকাল নেটওয়ার্ক ছাড়া এই কাজ সম্ভব নয়। কিন্তু এই নিয়ে সঠিকভাবে তদন্ত হল কোথায় ?
২৬.১১.২০০৮ এর বীভৎস জঙ্গি হামলার পর আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অফিসারদের জীবনটাই যেন বদলে গিয়েছিল। উত্তাল সংসদে প্রশ্নের পর প্রশ্ন, আর রুটিনমাফিক তার জবাবী নোট তৈরি করে দিতে দিতে আমরা ক্লান্ত হয়ে গেলাম। আমাদের তৈরী করা নোটের ওপর ভিত্তি করেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধীদল ও মিডিয়াকে মোকাবিলা করতেন। তবে তিনি যেভাবে কথা বলতেন, তাতে দেশবাসীর কাছে তাঁর বিশ্বাসযোগ‍্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে গিয়েছিল।
সারা দেশজুড়ে কেন্দ্রীয় পুলিশবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক যেন অভিযুক্তের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।
আমি বুঝতে পারতাম ক‍্যাবিনেট সেক্রেটারি, হোম সেক্রেটারি ও বিভিন্ন উচ্চস্তরের আমলাদের নিয়ে যে রুদ্ধদ্বার বৈঠকগুলি হচ্ছে, তাতে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সেই সময়ে অনেক নথি আর ফাইল টেনে টেনে আবার বার করা হতে লাগল। এইসূত্রে বিশেষভাবে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল একটি বিষয়। আমাদের দেশের বাইরে বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা "র" ও আভ‍্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা "আই বি" নিরন্তর কাজ করে চলেছে। রিপোর্ট পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায় যে এই গোয়েন্দা সংস্থাগুলি ঘটনার আগেই সমুদ্রপথে জঙ্গি অনুপ্রবেশ ও আক্রমনের পূর্বাভাস দিয়েছে।
তাদের গোপন রিপোর্টে সেই জঙ্গিদের আসার একটা রুটম‍্যাপ পর্যন্ত দেওয়া আছে ! পরবর্তীকালে এও দেখা যাচ্ছে যে জঙ্গিরা মোটামুটি সেই রুটটিই ব‍্যবহার করেছিল। গোয়েন্দা সতর্কবার্তা পেয়ে আমাদের উপকূলরক্ষী বাহিনী ( Coast Guard ) স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ওই রুটে নজরদারি বাড়িয়ে দিয়েছিল। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এই কাজকে সমর্থন তো দূরে থাক, উচ্চতম প্রশাসনিক মহল থেকে নির্দেশ এসেছিল, এ ব‍্যাপারে "সংযম" ( restraint ) রক্ষা করার। এই অনভিপ্রেত ঘটনাটি না ঘটলে মুম্বইয়ের নাশকতায় ১৬৬ জনের মৃত্যু হত না।
আমাদের পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনীর মধ‍্যে আন্তরিকতা ও পেশাদারীত্বের অভাব নেই। কিন্তু বিভিন্ন কারনে শাসনক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপের ফলে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না।
উত্তরপ্রদেশে ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট চত্বরে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় এলাহাবাদ হাইকোর্টে একটি সুয়ো মোটো কেসের জবাবে ( ৫ই জানুয়ারি,২০০৮) যে এফিডেভিট আমি মন্ত্রকের তরফ থেকে দাখিল করেছিলাম, তাতে এই পর্যবেক্ষণের কথা আমি লিখে দিয়েছিলাম।
আমি বিস্ময়ের সাথে এও লক্ষ্য করলাম, যে দেশের সংখ্যালঘু উন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রী এ আর আন্তুলে প্রকাশ‍্যে বিবৃতি দিয়ে বললেন যে এই মুম্বই হামলা গৈরিক সন্ত্রাসবাদীদের কাজ। হেমন্ত কারকরে মালেগাঁও বিস্ফোরণের তদন্ত করতে গিয়ে একটি বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের রাঘববোয়ালদের প্রত‍্যক্ষভাবে জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছিলেন বলেই তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হল। কমলনাথ ও দিগ্বিজয় সিংহ তাঁকে সমর্থন করলেন। পাকিস্তানে সংবাদ চ‍্যানেলগুলিতে এই হামলা "হিন্দু জিওনিস্ট"দের ষড়যন্ত্র বলে প্রচারিত হতে লাগল। এদেশের বেশ কিছু উর্দু সংবাদপত্র ও সোসাল একটিভিস্টরাও একথা প্রচার করতে শুরু করলেন। এই নিয়ে কয়েকটি বইও বেরোল।
দীর্ঘদিন অফিসের কাজে ব‍্যস্ত থাকার পর আমি একটি পারিবারিক বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাই। সেইসময়ে অফিস থেকে জরুরি ফোন পেয়ে আমার কর্মক্ষেত্রে গিয়ে দেখি, সেখানে প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ আধিকারিক এসে ইতিমধ্যেই হাজির হয়েছেন। সকলের মুখ বেশ থমথমে। কিছুক্ষণ পরে ঘোষণা হল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদত‍্যাগ করছেন।

( দ্বিতীয় পর্ব )
...................................................
২০০৮ সালের ১লা ডিসেম্বর পি চিদম্বরম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন। বেশ তুখোড়, বলিয়ে কইয়ে,সফল আইনজ্ঞ চিদম্বরম তৎকালীন সরকারের বেশ ভরসার লোক ছিলেন।
২৬.১১.২০০৮ এর ভয়ংকর জঙ্গি হামলার পর দেশজুড়ে সরকারের প্রতি যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়ে চলেছিল তিনি তা প্রশমিত করার উদ‍্যোগ নিলেন।
দেশ ওই সময়ে একটি অত্যন্ত কঠিন অবস্থার মধ‍্যে দিয়ে যাচ্ছিল। কিছু মানুষ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাইছিল।
পাকিস্তান তাদের অর্থ ,অস্ত্রশস্ত্র ও বিস্ফোরক চোরাপথে পাঠিয়ে দিয়ে তাদের যুদ্ধের উন্মাদনাকে জিইয়ে রেখেছিল ! দেশজুড়ে ছড়ানো ছিল জঙ্গিদের মডিউল, কাশ্মীরে রোজ গুলিগোলা চলত, মাফিয়াচক্রগুলি সক্রিয় ছিল এবং হাওলায় কালো টাকার লেনদেন অবাধে চলত। দেশের এটিএম গুলি থেকেও জাল টাকা পাবার খবর আসছিল। জাল টাকা মানেই অর্থনৈতিক যুদ্ধ ! এই টাকাগুলো পাকিস্তানে ছাপানো হত ও বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলাগুলি দিয়ে ভারতে ঢোকানো হত।
মানবাধিকার সংগঠনগুলি এইসব নিয়ে কোন কথা বলত না। তাদের কার্যকলাপ দেখে মনে হত তারা যেন জঙ্গিদের প্রতিই সহানুভূতিশীল।
বিভিন্ন দাতব‍্য প্রতিষ্ঠান যেমন আল রশিদ, ইকরা, রাবিতা, সাহাবিল আখান, উম্মা রিলিফ,মদীনা ট্রাস্ট ইত‍্যাদির ওপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক নিয়মিত নজর রাখত। এগুলি বিভিন্ন সন্দেহজনক গোষ্ঠীর ফ্রন্ট হিসেবে কাজ করত।
আমাদের রিপোর্ট অনুযায়ী, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আই এস আই ভারতে নাশকতামূলক কাজের জন‍্য ওই সময়ে প্রায় ৮৪ কোটি টাকা জঙ্গিগোষ্ঠীগুলিকে দিয়েছিল। ভারতে অস্থিরতা তৈরীর জন্য তাদের মোট বিনিয়োগ ছিল ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা। কাঠমান্ডুর পাকিস্তানী দূতাবাস ছিল আই এস আইয়ের বড় ঘাঁটি।
আমাদের মন্ত্রকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারতবিরোধী কাজের যে তহবিল গঠিত হয়েছিল তার ২৫ % ছিল পাকিস্তানের অনুদান, ১৫ % মাদক চোরাচালানের টাকা, ১০% জাল নোটের কারবারের লভ‍্যাংশ, ১০% অস্ত্র চোরাচালানের অর্থ, ১০% তোলাবাজির অবদান, ১০% জাকাতের খয়রাত ও বাকি ১০% বিভিন্ন সংগঠনের তহবিল থেকে দান হিসেবে আসত, বাকি অন‍্যান‍্য সূত্রে। ন‍্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব‍্যূরো বা NCRB আমাদের থেকে তথ‍্য নিত।
আমাদের কাছে খবর ছিল, করাচীর বেশ কিছু যৌনকর্মীকে পাক আই এস আই প্রশিক্ষণ দিয়ে ভারতে ঢুকিয়ে দিয়েছে। এদেশে তারা ভূয়ো পরিচয়পত্র পেয়ে গেছে। তারা সেনাবাহিনী ও অন‍্য গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের অফিসারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে অনেক গোপনীয় তথ‍্য তাদের থেকে জেনে নিচ্ছে ও তা দেশবিরোধী শক্তির কাছে পাচার করে দিচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী জেলাগুলিকে ভারতের শত্রুরা চোরাচালান, হিউম‍্যান ট্রাফিকিং ও জাল নোট ভারতে ঢুকিয়ে দেবার বড় করিডোর হিসাবে বরাবর ব‍্যবহার করে আসছে।
পশ্চিমবঙ্গের বাংলাদেশ সংলগ্ন ও ভারতের নেপাল সংলগ্ন জেলাগুলিতে জনবিন‍্যাস দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। সেখানে গজিয়ে উঠছিল প্রচুর ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেখানে যে ভারতবিরোধী প্রচার চলে, সে সম্পর্কে গোয়েন্দা সংস্থাগুলি ক্রমাগত আমাদের তথ‍্যপ্রমাণ যোগাড় করে পাঠাত। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার সরকার তাতে কর্ণপাত করত না। উত্তরপ্রদেশ সরকারের অবস্থাও ছিল তথৈবচ। সিওয়ানের রাজনৈতিক নেতা সাহাবুদ্দিন প্রকাশ‍্যে দেশবিরোধী শক্তিকে মদত দিত।
কর্ণাটকে ভাটকাল বলে একটি বন্দর শহর আছে। সেখানে ইয়াসিন, রিয়াজ ও ইকবাল নামে তিন ভাই ছিল তিনটি রত্ন। ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন নামে একটি জঙ্গি সংগঠনের নেতা হিসেবে তারা প্রচুর বোমা বিস্ফোরণের সঙ্গে যুক্ত ছিল। দক্ষিন ভারতের এই শহরটি বিশেষভাবে আমাদের নজরে ছিল।
আমরা বুঝতে পারছিলাম, দেশের যা পরিস্থিতি, তাতে পেনাল কোড বা ভারতীয় দন্ডবিধি, পুলিশের ধীরগতির তদন্ত ও নানা সমস‍্যায় জর্জরিত সাবেকি বিচারব‍্যবস্থা সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলা করার পক্ষে যথেষ্ট নয়। সন্ত্রাসবাদীরা নতুন নতুন প্রযুক্তির ব‍্যবহার করছিল। তাদের সাথে এঁটে ওঠার জন্য প্রচলিত কিছু আইনের সংস্কার ও নতুন আইন প্রণয়ন করার খুব দরকার ছিল।
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়ার জন‍্য কংগ্ৰেস আমলে ছিল টাডা আইন। বাজপেয়ীর আমলে সেটিই হল পোটা। সেই আইনটিকেই আরো আঁটোসাঁটো করে ইউ এ পি এ Unlawful Activities (Prevention) Amendment Act ও জাতীয় তদন্ত সংস্থা আইন বা National Investigation Agency Act আনা হল।
আমাদের দেশে গোয়েন্দা সংস্থার অভাব নেই। প্রতিটি রাজ‍্য সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ ও সেনাবাহিনী ছাড়াও আধাসামরিক বাহিনী, রেলরক্ষী বাহিনী ও উপকূলরক্ষী বাহিনীর নিজস্ব গোয়েন্দা বিভাগ রয়েছে, কিন্তু তাদের কাজের মধ‍্যে সমন্বয় বড় একটা হয় না। এক সংস্থার তথ‍্য অন‍্য সংস্থা জানতে পারে না। একটি নাশকতামূলক কাজ ঘটে যাবার পর আমাদের দপ্তরে যে রিভিউ মিটিংগুলি হত তাতে এই গোয়েন্দাসংস্থাগুলির মধ‍্যে বোঝাপড়ার অভাবটাই প্রকট হয়ে উঠত।
আমরা বারবার বলতাম যে এমন একটি সংগঠন খুব দরকার যারা বিভিন্ন সংস্থা থেকে ইনপুটস নিয়ে দেশবিরোধী শক্তির মোকাবিলা করবে ও তদন্ত করে আদালতে চার্জশিট দিতে পারবে। একটি জাতীয় সুরক্ষা সংস্থা তৈরি করতেই হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবার এন আই এর বিষয়ে ছাড়পত্র দিয়ে আমাদের দীর্ঘদিনের দাবিকেই যেন স্বীকৃতি দিলেন।
সিদ্ধান্ত হল, জাতীয় সুরক্ষার সঙ্গে যেসব বিষয় জড়িত, এন আই এ তাই নিয়ে তদন্ত করে আদালতে মামলা চালাবে। এতে সি বি আইএর ওপর অনেকটাই চাপ কমবে।
এই সংক্রান্ত আইনগুলির বিভিন্ন ধারা ও উপধারাকে ঠিকমত সাজিয়ে তুলতে আমরা অমানুষিক পরিশ্রম করেছিলাম। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের দায়িত্ব ছিল ন‍্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি নামক সম্পূর্ণ নতুন একটি সংস্থার জন্ম দিয়ে তাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও শক্তপোক্ত একটি সাংগঠনিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো। এটিকে এমনভাবে তাকে সাজাতে হবে যাতে এন আই এ অন‍্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলির থেকে সর্বোচ্চ সাহায্য পায়, কিন্তু তার কার্যক্ষেত্র ও পরিধি যথাসম্ভব আলাদা থাকে। এটা যথেষ্ট কঠিন কাজ।
আমার মনে আছে, এই কাজগুলি করতে গিয়ে একবার একটানা তিনদিন আমি পর্যাপ্ত ঘুমের সুযোগটুকুও পাইনি। বাড়িতে আমার ছেলের সাথে আমার দেখা হত খুব কম।
আমি দেখেছি,আমাদের দেশের গ্ৰাম‍্য পোস্ট অফিস থেকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর -- সব সরকারী দপ্তরের সাধারণ নিয়ম হল, কোন কর্মী যদি কাজ করতে চান, তবে তার কাজের অভাব হবে না। আমার ওপর সহকর্মীরা ভরসা করতেন আমার স্মৃতিশক্তি ও বিরামহীনভাবে কাজ করে যাওয়ার ক্ষমতার জন‍্য। আমি তখনও বুঝতে পারিনি আমার এই দিনরাত অফিসে পড়ে থাকা কিছু ক্ষমতাশালী লোক ভাল চোখে দেখছে না।
জঙ্গিবিরোধী আইনগুলির খসড়া তৈরী করে তার কপি আমরা ক‍্যাবিনেটের কাছে অনুমোদনের জন্য জমা দিয়েছিলাম। এরপর আমাদের খসড়াগুলিকে আরো নিঁখুত করার জন্য চলেছিল আইনমন্ত্রকের অফিসারদের সাথে দীর্ঘ বৈঠক। এই দুটি বিল সংসদে আনা হল ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে। ২০শে ডিসেম্বর তা পাশ হল। আমরা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
এবার বিলদুটি রাষ্ট্রপতির সম্মতি পেলেই আনুষ্ঠানিকভাবে আইন হিসাবে স্বীকৃতি পাবে। আমি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের আভ‍্যন্তরীণ সুরক্ষা দপ্তরের যুগ্ম সচিব এই সংক্রান্ত কাগজপত্র নিয়ে রাষ্ট্রপতি ভবনে গেলাম। সেখানকার সেকশন অফিসার আমারই মত একজন তামিল, তিনি আমাদের যথেষ্ট সাহায্য করলেন। আমাদের মন্ত্রকের তরফ থেকে আমরা বিলের কাগজপত্র বিধিসম্মতভাবে জমা দিলাম। রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর করে দিলেই কিছুদিন পরে আবার সব কাগজপত্র নিয়ে মায়াপুরীতে সরকারি প্রিন্টিং ডিভিশনে ছুটতে হবে আমাদের, গেজেট নোটিফিকেশন প্রকাশিত হলেই আইনদুটি সারাদেশে বলবৎ হয়ে যাবে।
রাষ্ট্রপতি ভবনের কাজ শেষ হয়ে গেল। এবার বাড়ি ফেরার পালা। যুগ্ম সচিবকে বিদায় জানিয়ে আমি গাড়ী নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
দ্বারকা মোড়ের টি পয়েন্টের কাছে এসে লক্ষ‍্য করলাম যে আরোহীসমেত চারটি বাইক আমাকে অনুসরণ করছে। আমার প্রবল অস্বস্তি শুরু হল।
সেক্টর ১৬ বির কাছে একটি পুলিশ চৌকি রয়েছে। আমি তাদের কাছে সাহায্য চাইতে গেলে কর্তব‍্যরত পুলিশকর্মী রূঢ়ভাবে আমার লাইসেন্স দেখতে চাইলেন। মানিব‍্যাগ বার করে লাইসেন্স বের করতে গেলে ঐ পুলিশকর্মী ছোঁ মেরে আমার হাজার টাকা কেড়ে নিলেন। প্রতিবাদ করতে গিয়ে জুটল থাইয়ের ওপর ডান্ডার বাড়ি, নিজের পরিচয় দিয়েও কোন লাভ হল না। পুলিশের কাছে সাহায্য পাবার আশা আর নেই। আমি দেখছিলাম ঐ বাইক আরোহীরা অদূরেই দাঁড়িয়ে। আমি অত‍্যন্ত দ্রুত গাড়িতে উঠে গাড়িটা স্টার্ট করে ছিলাম। এরপর বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাতে লাগলাম এমনভাবে যাতে বাইক আরোহীরা আমার গতিবেগের সাথে পাল্লা না দিতে পারে। বিভিন্ন ঘুরপথ ব‍্যবহার করে বাড়িতে এসে পৌঁছলাম যখন, তখন আমি বিধ্বস্ত। রাতে খাবার সময় বৃদ্ধা মা আমার চেহারা দেখে বললেন, "বাছা, দেখে মনে হচ্ছে ভূতে তোমাকে কষে এক চড় মেরেছে।"
আমি পুলিশি হেনস্থার ঐ ঘটনাটি আমার অফিসে জানিয়েছিলাম ও অভিযোগ দায়ের করেছিলাম। এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৩ই ফেব্রুয়ারি সেক্টর ১৯ এ পুলিশের ডিসির দপ্তরে ঐ ঘটনার সময়ে ডিউটি রোস্টারে যেসব বিট কনস্টেবল ও সাব ইন্সপেক্টরের নাম ছিল তাদের সকলকে আমার সামনে হাজির করানো হয় এবং উক্ত ডিসি অফিসের বারান্দায় একটি টি আই প‍্যারেড হয়। আমি কিন্তু কাউকে শনাক্ত করতে পারিনি। এরপর প্রায়ই পুলিশের কিছু ইন্সপেক্টরকে আমার কাছে এনকোয়ারির জন‍্য পাঠানো হত, এবং আমাকে প্রতিবার পুরো ঘটনাটি নতুন করে আবার বিবৃত করতে হত। বিষয়টা একটা বিরক্তিকর পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। এক অফিসার প্রায়ই এসে আমাকে কেসটি ক্লোজ করার বিষয়ে সহযোগীতা করতে অনুরোধ করতেন। এটি করাতে পারলে তার বিরুদ্ধে ভিজিলেন্সের তদন্ত বন্ধ হবে ও পদোন্নতির পথে আর বাধা থাকবে না। আমি নিরুপায় হয়ে তাঁর কেস ক্লোজ করার কাগজপত্রে স্বাক্ষর করে দিই।
মুম্বই হামলার একমাত্র জীবিত জঙ্গি আজমল কাসভ যে আসলে পাকিস্তানের ফরিদকোটের ছেলে, এই পরিচয় প্রকাশ‍্য হয়ে পড়ছিল। কোন কোন অতি উৎসাহী পাকিস্তানী সাংবাদিক তার গ্ৰামের বাড়ীতে পর্যন্ত চলে গিয়েছিল ! কাসভকে জেরা করে অনেক নতুন তথ‍্য জানা যাচ্ছিল।
আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের OPS Room একটি বৈঠকের শেষে এক উচ্চপদস্থ অফিসার আমাকে গোপনে জানালেন যে পাকিস্তানের গোয়েন্দা এজেন্সি আই এস আই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের এক বা একাধিক আধিকারিককে অপহরণ করে পণবন্দী করার বিষয়ে ভেবে দেখছে। এই পণবন্দীদের মুক্তির বিনিময়ে কাসভকে পাকিস্তানের হাতে তুলে দিতে হবে কোন অজ্ঞাত স্থানে। ১৯৯৯ সালে আই সি ৮১৪ বিমান হাইজ‍্যাকিং করে আই এস আই এইভাবেই "জৈশ এ মহম্মদ" সংগঠনের প্রধান মৌলানা মাসুদ আজহার সহ অন‍্যান‍্য জঙ্গিদের ছাড়িয়ে নিয়ে চলে গিয়েছিল।
আমি পরে ভেবে দেখেছিলাম যে ওই সময় পর্যন্ত পাকিস্তান স্বীকার করেনি যে কাসভের সাথে তাদের কোন যোগ আছে। তাকে কোনভাবে সরিয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সম্ভাবনা শেষ করে দিলেই আর পাকিস্তানের যোগাযোগের কোন প্রমাণ থাকবে না।
আমি বিস্মিত হয়ে ভাবতে লাগলাম, ঐদিন যারা আমাকে অনুসরণ করছিল, তারা কারা ? অভিযোগ জানানো সত্ত্বেও সরকার এই বিষয়ে তদন্ত করছে না কেন ?
২০০৯ সালে কৃতী আই এফ এস অফিসার এইচ. এস. পুরী রাষ্ট্রসংঘে ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। সেই সময়ে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি আন্তর্জাতিক জঙ্গিবিরোধী
তালিকা ( United Nations National Security Council Resolution 1267 list ) তৈরি হচ্ছিল। পুরী সেখানে দাউদ ইব্রাহিমের নাম অন্তর্ভুক্ত করার জোর প্রচেষ্টা চালান। এতে দাউদের বেআইনি ব‍্যবসার ওপর মারাত্মক আঘাত হানা সম্ভব হত। রাষ্ট্রসঙ্ঘের কালো তালিকায় নাম উঠলে দাউদ বেশিরভাগ দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আর ব‍্যবহার করতে পারবে না, কয়েকটি মহাদেশ জুড়ে তার বেআইনি আর্থিক লেনদেন বন্ধ হয়ে যাবে এবং তার নেতৃত্বাধীন মাফিয়াচক্রের অস্ত্র ও মাদকের ব‍্যবসা করার ক্ষেত্রে দুর্লঙ্ঘ আইনি বাধা তৈরী হবে।
অভিজ্ঞ কূটনৈতিক অফিসার পুরীসাহেব ভারত সরকারের তরফে " রিসার্চ এন্ড এনালিসিস উইং" বা "র" ও আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রককে এই বিষয়ে অবহিত করেন। "র" এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের অফিসাররা নড়েচড়ে বসেন। আমার মনে আছে, আমরা সেসময় খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম। এটা ছিল দাউদকে নিস্ক্রিয় করে দেওয়ার এক সুবর্ণসুযোগ।
আমরা "র" এবং ইন্টেলিজেন্স ব‍্যূরোর থেকে দাউদ সম্পর্কে যাবতীয় তথ‍্য চেয়ে পাঠালাম। কিন্তু এই দুটি সংগঠন হল গোয়েন্দা সংস্থা। তাদের কাজ খবর যোগাড় করা, প্রমাণ নয়।
দাউদের অবৈধ কার্যকলাপ সম্পর্কে যদি কোন সরকারী সংস্থা অকাট‍্য প্রমাণ যোগাড় করতে পারে, যা আন্তর্জাতিক ফোরামে গৃহীত হবে, সেটি হল সিবিআই। সেইসময়ে সিবিআই অফিসাররা এমন ভাব দেখাতেন, যেন তারা দাউদের বিরুদ্ধে যাবতীয় তথ‍্যপ্রমাণের পাহাড়ের ওপর বসে আছেন !
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের পক্ষ থেকে সিবিআইকে দাউদ ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে যাবতীয় তথ‍্যপ্রমাণ জমা দিতে বলা হল। আমরা এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেবার জন‍্য মাঝেমাঝেই বৈঠক করতে লাগলাম। সেই বৈঠকে র, আই বি, বিদেশমন্ত্রক ও অন‍্যান‍্য সংস্থার প্রতিনিধিরা যোগ দিলেও সিবিআই থেকে কেউ আসতেন না। বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চিদম্বরমকে রিপোর্ট করেও কোন ফল হয়নি। আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের তরফ থেকে সিবিআইকে বারবার "রিমাইন্ডার" পাঠালেও তাদের তরফ থেকে কোন সাড়া না পাওয়ায় এই উদ‍্যোগটি ব‍্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল।
২০০৮ সালে মুম্বই হামলার জন্য পাকিস্তানের সঙ্গে স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের আলোচনা ভেস্তে যাবার পর ২০১১ সালের মার্চে আবার তা শুরু হয় দিল্লিতে। ঠিক হয়, দুই দেশের সরকার পরস্পরকে পলাতক অপরাধীদের সম্পর্কে ফাইল ( dossier ) বিনিময় করবে। আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের আভ‍্যন্তরীণ সুরক্ষা বিভাগ এর আগে নিঁখুতভাবে ২০০৬, ২০০৭ ও ২০০৮ সালে এই ধরনের বিস্তারিত নথি তৈরী করেছিল। কিন্তু এবার ঐ ডসিয়ের তৈরীর দায়িত্ব দেওয়া হল চিদম্বরমের প্রিয় এন আই এ কে। সদ‍্যগঠিত এন আই এর অফিসাররা একটা হামবড়া মনোভাব নিয়ে চলতেন। তারা কারো থেকে সহযোগিতা চাইলেন না। কিন্তু দেখা গেল ঐ ডসিয়েরে দুটি এমন নাম রয়েছে, যাদের পাকিস্তানে পলাতক হিসাবে দেখানো হলেও তাদের সাম্প্রতিক অবস্থান মুম্বইয়ের জেলে ! এই ঘটনার পরে ভারতের তরফে প্রস্তুত নথিগুলির বিশ্বাসযোগ‍্যতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেল।
চিদম্বরম অবশ্য মুম্বই পুলিশ ও আই বির মধ‍্যে প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করে বিবৃতি দিলেন। দুজন সাব ইন্সপেকটরকে সাসপেন্ড করা হল। ব‍্যস, এইটুকুই !
আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের আপত্তি সত্ত্বেও আল জাজিরা নিউজ চ‍্যানেলকে ভারতে সম্প্রচারের অনুমোদন দিয়ে দেওয়া হল। তারা কাশ্মীর ও অন‍্যান‍্য সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে একপেশে, অসত‍্য রিপোর্টিং করত।
আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বড় বড় পরিকল্পনা রূপায়ণের অভাবে মুখ থুবড়ে পড়ছিল। উপকূলবর্তী রাজ‍্যগুলিকে নজরদারির জন্য অত‍্যাধুনিক বোট দেওয়া হলেও সেটি চালনা করার উপযুক্ত কর্মী দেওয়া হয়নি। রাজ‍্য সরকারের লোকদের সঠিক প্রশিক্ষণ দিয়ে বোটগুলিকে সঠিকভাবে ব‍্যবহার ও রক্ষনাবেক্ষন করার কোন ব‍্যবস্থা করা হয়নি। একই অবস্থা ছিল "মেগাসিটি পুলিশ" ও "মরু পুলিশ" প্রকল্পের। প্রচুর ঢক্কানিনাদ সহকারে শুরু হওয়া CCTNS (Crime and Criminal Tracking Network System) , Natgrid ও NCTC র অবস্থাও হয়েছিল শোচনীয়।
২০০৯ সালে মন্ত্রকের পাবলিক প্রসিকিউটর নিয়োগ নিয়ে তীব্র মতভেদ দেখা গেল। আমরা চেয়েছিলাম দীপক সালভির মত সফল, অভিজ্ঞ ক্রিমিনাল লইয়ারকে, যিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে ১৯৯৩ সালের মুম্বই বিস্ফোরণের বেশিরভাগ আসামীদের কনভিকশন করিয়েছেন, এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় দুজনের মৃত‍্যুদন্ড হয়েছে।
কিন্তু বিস্ময়ের সাথে দেখলাম মন্ত্রী ও বশংবদদের সুপারিশে সিবিআইয়ের আইনজীবী রোহিনী সালিয়ানকে নিযুক্ত করা হল। এই রোহিনী সালিয়ান ২০০৬ সালের মালেগাঁও বিস্ফোরণে মহারাষ্ট্র সন্ত্রাসদমন শাখা ও সিবিআই যে নজন সংখ‍্যালঘু যুবককে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দিয়েছিল, তাদের মুক্তির জন্য আদালতে সওয়াল লাগলেন !
এন আই এর ডিরেক্টর জেনারেল নিয়োগ করার সময়ে দপ্তরের দুজন জয়েন্ট সেক্রেটারীর কোন পরামর্শ মন্ত্রী চিদম্বরম নেননি। এই নিয়ে আমাদের মন্ত্রকে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা বাড়তে লাগল।
আমাদের এত উদ‍্যোগ সত্ত্বেও এন আই এ শেষপর্যন্ত একটি মাথাভারি সরকারী অফিসে পরিণত হল !
আমার কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ দ্রুত পাল্টে যাচ্ছিল। পুরনো অফিসারদের একটু একটু করে নিস্ক্রিয় করে দেওয়া হচ্ছিল। এই সময় একটি ঘটনা ঘটল।
পুলিশ যে জাল নোটগুলো বাজেয়াপ্ত করত, সেগুলির একটি বড় অংশের রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্ব এক পর্যায়ে আমাদের দপ্তরের ওপর আসত। দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার হিসেবে আমাকে ঐ বাজেয়াপ্ত নোটগুলি মুম্বইতে রিজার্ভ ব‍্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার সদর দপ্তরে জমা দিতে হত। তাঁরা সেগুলি পরীক্ষা করে একটি রিপোর্ট দিতেন, যেটি তদন্তের কাজে অত‍্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে বিবেচিত হত। এত বিপুল পরিমাণ নোট রাখার জন‍্য আমার বেশ কিছু আলমারি দরকার ছিল। আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের এ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিভিশনকে বেশ কিছু আলমারীর রিকুইজিশন দিলাম। কিন্তু ঐ ডিভিশনের ডিরেক্টর নানা কারন দেখিয়ে বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখতে লাগলেন। আমি বুঝলাম, পরিকল্পিতভাবে অসহযোগীতা শুরু হয়ে গেছে।
আমার চেম্বারের বাইরে আমার স্টাফরা বসতেন। কিন্তু সেখানে হঠাৎ পুলিশ ট্রেনিং সেকশনকে ঢুকিয়ে অনেকটা পরিসর দখল করে নেওয়া হল। সেকশনের দায়িত্বে ছিলেন একজন মহিলা অফিসার। একদিন সকালে আমার কাছে হাতের লেখার স্পেসিমেন চাওয়া হল। সেই নমুনা জয়েন্ট সেক্রেটারির কাছে পরীক্ষার জন‍্য পাঠিয়ে দেওয়া হল। কিছুদিন পরে আমি জানতে পারলাম যে পুলিশ প্রশিক্ষন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ওই মহিলা অফিসার আমার বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ এনেছেন। তাঁর টেবিলের ড্রয়ারে নাকি কন্ডোমের প‍্যাকেটের সঙ্গে অশ্লীল চিঠি পাওয়া গেছে ! আমার বিরুদ্ধে "বিশাখা গাইডলাইন" অনুযায়ী আভ‍্যন্তরীণ বিভাগীয় তদন্ত হল। কিন্তু তাতে আমার দোষ কিছুই পাওয়া গেল না। পরবর্তীকালে আ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের এক কর্মী, যে আমার সাথে আগে "উদ‍্যোগ ভবন"এ কাজ করেছে, চুপিচুপি জানায় যে ঐ যৌন হেনস্থার ব‍্যাপারটি উচ্চপর্যায়ের কয়েকটি লোকের মস্তিষ্কপ্রসূত ষড়যন্ত্র ছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম, আমি কর্মক্ষেত্রে ধীরে ধীরে একটি অবাঞ্ছিত ব‍্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছি। তারা আমাকে ওই দপ্তরে আর দেখতে চাইছিল না।
২০১০ সালের জুন মাসে আমাকে আভ‍্যন্তরীণ সুরক্ষা বিভাগ (Internal Security Division) থেকে Central Board of Film Certification এ বদলী করে দেওয়া হল।
আমাদের সেক্রেটারি দীপ্তিবিলাসকে আগেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, আমার প্রস্থানের পর আমাদের ডিরেক্টর সাহেবও লম্বা ছুটিতে চলে গেলেন। ঐসময় নাকি তার ছেলের পরীক্ষা চলছিল।
ফিল্ম সেন্সর বোর্ডে কিছুদিন কাজ করার পর আমি নগরোন্নয়ন দপ্তর ও পরে ভূমিরাজস্ব দপ্তরে ডেপুটি ল‍্যান্ড এন্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসার হিসাবে যোগ দিই।
আমি ভাবলাম এইবার আমি সমস্ত হেনস্থা থেকে মুক্তি পেয়েছি। এটি ছিল আমার চরম ভুল ধারনা।

( তৃতীয় ও শেষ পর্ব )
...................................................
"হিন্দু সন্ত্রাস" শব্দবন্ধটি ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রীরা অকাতরে ব‍্যবহার করতেন। মিডিয়ায় এটি একটি বহুল প্রচলিত শব্দে পরিণত হয়। প্রগতিশীল ও মানবাধিকার কর্মীরা এই বিষয় নিয়ে তুমুল উৎসাহে লেখালেখি, সেমিনার ও পুস্তিকা প্রকাশ করতে থাকে।
২০.০৬.২০০৬ তারিখে পুণার নিকটবর্তী নান্দেড় শহরে একটি বিস্ফোরণে দুজন মারা যায়।
সেই প্রথম সরকারী নথিতে " হিন্দু সন্ত্রাস" কথাটি স্থান পেয়েছিল। মহারাষ্ট্র পুলিশের সন্ত্রাসদমন শাখা থেকে এই কেসটি সিবিআইয়ের হাতে চলে আসে। কিন্তু সিবিআই তদন্ত করে সরকারের মর্জিমত রিপোর্ট দিতে অস্বীকার করে। এতে সিবিআইয়ের এক দক্ষ অফিসার, যিনি হয়ত পরবর্তীকালে সংস্থার ডিরেক্টর পর্যন্ত হতে পারতেন, সরকারের কোপে পড়েন। তাঁর আভ‍্যন্তরীণ মূল‍্যায়ণের রিপোর্টে নেতিবাচক কথা লিখে প্রাপ‍্য পদোন্নতির পথ রুদ্ধ করা হয়।
এরপর একে একে আজমের, মালেগাঁও, হায়দ্রাবাদ, সমঝোতা এক্সপ্রেস, গোয়া ইত‍্যাদি জায়গায় যেসব বিস্ফোরণ হয়, তার সাথে এই "গৈরিক" বা "হিন্দু সন্ত্রাস"এর বিষয়টা জড়িয়ে দেওয়া হতে থাকে। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্টে যাদের আততায়ী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, তাদের নাম মুছে ফেলে নতুন নাম ঢোকানো হয়।
যাদের গ্ৰেপ্তার করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের এক অফিসার ছিলেন‌। অবিশ্বাস্য দ্রুততায়, প্রায় তিরিশ দিনে তাঁর বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয়েছিল। সাধারণ বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে চার্জ গঠন করতে যেখানে মাস পাঁচেক লাগে, সেখানে এই স্পর্শকাতর বিষয়ে তাড়াহুড়ো করে কাগজপত্র জমা করা আমার স্বাভাবিক মনে হয়নি।
২০১০ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চিদম্বরম ভারতের সব রাজ‍্যের পুলিশ প্রধানদের একটি বৈঠকে "গৈরিক সন্ত্রাস" এর মারাত্মক বিপদ সম্পর্কে উপস্থিত সকলকে সতর্ক করেন। এই শব্দবন্ধে আপত্তি জানিয়ে জন্মুর এক সাধু আদালতে মামলা করেন। এরপর কংগ্রেসের তরফে জনার্দন দ্বিবেদী বিবৃতি দিয়ে বলেন, " কালো ছাড়া সন্ত্রাসবাদের কোন রং হয় না।" ( টাইমস নিউজ নেটওয়ার্ক, ২৮ আগষ্ট, ২০১০)
অফিসার্স ট্রেনিংয়ের সময় একটি কথা আমাদের খুব ভাল করে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেটি হল এই যে, সংসদে উত্থাপিত লিখিত প্রশ্নের উত্তরে কখনও এমন কিছু লেখা যাবে না, যার পেছনে কোন নথির সমর্থন নেই। কারণ এই নিয়ে পরবর্তীকালে কোন বিতর্ক হলে, পুরো দায়িত্বটি অফিসারের ঘাড়ে চলে আসবে। এবং সংসদের নিজস্ব বিচারের ক্ষমতা রয়েছে যেখানে আদালত পর্যন্ত মাথা গলাতে পারে না। অফিসার ফেঁসে গেলে তাকে কেউ দেখার নেই। অসত‍্য ভাষণের বা সংসদকে বিভ্রান্ত করার জন‍্য শাস্তির ব‍্যবস্থা বেশ কড়া।
মজার কথা, ওই সময়ে সন্ত্রাসবাদী হামলা নিয়ে সংসদে যতগুলি প্রশ্ন করা হয়,তার সবকটিতে সরকারের তরফ থেকে উত্তর দেওয়া হয়েছে যে প্রত‍্যেকটি সন্ত্রাসবাদী হামলার পেছনেই হিন্দু সন্ত্রাস নয়, পাক আই এস আইয়ের মদতপুষ্ট জঙ্গিদের হাত রয়েছে। ( "Pakistan / Pok based ISI sponsored groups have been found responsible for ...... so and so ....... terror attack.") । সংসদীয় নথিতে আজো তা জ্বলজ্বল করছে !
এর মানে হল, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যাই বলুন না কেন, সেইসময়ে দপ্তরের সংশিষ্ট অফিসাররা কেউ নেতাদের প্রিয়পাত্র হবার জন্য অসত‍্য ভাষ‍্য লিখে বিপদের মুখে পড়তে চাননি !
আমি লক্ষ‍্য করেছিলাম যে বাজপেয়ীর আমলের জঙ্গিদমন আইন পোটা রিপিল অর্ডিন্যান্স (২১. ৯. ২০০৪ ) পাশ করার পর থেকেই তৎকালীন ইউ পি এ সরকার সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে অভিযুক্ত ও অন্তরীণ ব‍্যক্তিদের জামিন ( bail ) করিয়ে দেবার জন‍্য অতিমাত্রায় ব‍্যগ্ৰ।
২০০৪ সালের ১৫ জুন গুজরাট পুলিশের ডিটেকশন অফ ক্রাইম ব্রাঞ্চ ও কেন্দ্রীয় সরকারের সাবসিডিয়ারি ইন্টেলিজেন্স ব‍্যূরোর সাথে একটি সংঘর্ষের ঘটনায় আহমেদাবাদের শহরতলীতে চারজন মারা যায়। মৃতরা হল ইশরাত জাহান নামে বছর উনিশের এক কলেজ ছাত্রী, জাভেদ শেখ, জিশান জোহর ও আমজাদ আলি রাণা -- এরা লস্কর ই তৈবার স্লিপার সেলের সদস্য ছিল। প্রাণেশ পিল্লাই নামে কেরালার এক যুবক ধর্মান্তরিত হয়ে জাভেদ শেখ নাম নিয়েছিল। সে জঙ্গিদের হয়ে স্থানীয় নেটওয়ার্ক তৈরীর দায়িত্বে ছিল। শেষের দুজন ছিল পাকিস্তানী।
ইশরাত জাহানের মা শামিমা কৌসর এই ঘটনায় পুলিশী হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ জানিয়ে আদালতে মামলা করেছিলেন। প্রাণেশ পিল্লাইয়ের বাবাও সুপ্রিম কোর্টে অনুরূপ মামলা করেছিলেন।
২০০৯ সালের জুলাই মাসে গুজরাট হাইকোর্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রককে কেসটির "factual position" জানিয়ে একটি হলফনামা দাখিল করতে নির্দেশ দেয়। আমি বিস্তর নথিপত্র ঘেঁটে একটি হলফনামা প্রস্তুত করি ও সেটি আমাদের মন্ত্রকের আভ‍্যন্তরীণ সুরক্ষা বিভাগের ডিরেক্টর ও জয়েন্ট সেক্রেটারি
অনুমোদন করেন। পরবর্তীতে এটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের সেক্রেটারি মারফত মন্ত্রী চিদম্বরমের কাছে যায় ও অনুমোদিত হয়। এরপর এটি আইনমন্ত্রকের সেক্রেটারির অনুমোদন লাভ করে।
আমি এই হলফনামা গুজরাট হাইকোর্টে জমা করি ০৬. ০৮. ২০০৯ তারিখে।
কিন্তু এরপর বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক ঘনীভূত হতে থাকে। কয়েকটি সংগঠনের আবেদনের ভিত্তিতে কোর্টের নির্দেশে মৃতদেহগুলি কবর থেকে তোলা হয় এবং আবার সুরতহাল বা "ইনকোয়েস্ট" প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি করা হয়। এস পি তামাং নামে এক জুডিশিয়াল অফিসারের রিপোর্টে পুলিশ আধিকারিকদের অভিযুক্ত করা হয়। এরপর
গুজরাট হাইকোর্টের নির্দেশে একটি স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম বা সিট এই মৃত্যুর তদন্তের দায়িত্ব পেল।
বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক চাপান উতোর যখন তুঙ্গে ওঠে, তখন গুজরাটের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আমার দায়ের করা হলফনামাটির উল্লেখ করে বলেন কেন্দ্রীয় সরকার রাজনৈতিক স্বার্থের নিহতদের পক্ষ সমর্থন করলেও তাদের হলফনামায় সম্পূর্ণ বিপরীত কথা লেখা রয়েছে। উক্ত হলফনামায় তো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও অন‍্যান‍্য অফিসারদের স্বাক্ষর রয়েছে !
এতে মন্ত্রী চিদম্বরম ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তিনি ওই হলফনামাটি চেয়ে পাঠান। সেটি সরকারী হেফাজত থেকে নিঁখোজ হয়ে যায়।
এরপর আইনজ্ঞ চিদম্বরম আরেকজন প্রভাবশালী উকিলের সহায়তায় আরেকটি হলফনামা তৈরী করেন। আইনগতভাবে তাকে " সাপ্লিমেন্টারি এফিডেভিট" বলায় অসুবিধা থাকায় ঐ নথির নাম দেওয়া হয় " further affidavit ". এই এফিডেভিটে নিহতদের জঙ্গি যোগের সমস্ত উল্লেখ মুছে ফেলা হয়।
এই এফিডেভিটটি আদালতে ফাইল করার জন্য আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়। আমি সিভিল সার্ভিস রুলস এর ৩০ সি ধারা অনুযায়ী, এই নির্দেশ মানতে বাধ‍্য। তাই আমি তা পালন করি। ওইসময় আমাকে কড়া পুলিশি নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছিল। এই কেসটি নিয়ে তদন্ত করছিল আদালত নিযুক্ত বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট।
আদালতে তদন্তকারী পুলিশ অফিসার সতীশ ভার্মা এফিডেভিট জমা দিলেন, লেখা হল, ‘পারপোর্টেড এনকাউন্টার’, --- ‘জেনুইন’ নয়। গুজরাটের বহু পুলিশ অফিসার এই তত্ত্ব মানতে চাইলেন না। এবার সিবিআইয়ের ডাক পড়ল তদন্তের জন্য। সিবিআই রিপোর্ট দিল, প্রত্যেকটা হত্যা হয়েছে পুলিশ হেফাজতে, ক্লোজ রেঞ্জ থেকে গুলি করা হয়েছে, লাশ নিয়ে যাওয়া হয়েছে ‘লোকেশনে’, মৃতদেহের হাতে অস্ত্র গুঁজে দেওয়া হয়েছে তার পরে। ২০ জন পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে খুন, কিডন্যাপিং, ক্রিমিনাল কনস্পিরেসি-সহ নানা অভিযোগ আনা হল।
সিবিআইয়ের তদন্তে এও বলা হল, ঘটনার কথা আগাম জানতেন, এবং তাতে অনুমোদন ছিল তৎকালীন গুজরাট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর !
আমার সুদীর্ঘ চাকরিজীবনে রাজিন্দর কুমারের মত সৎ ও দক্ষ অফিসার কমই দেখেছি। তিনি একসময়ে আই বির পাকিস্তান ডেস্কে কর্মরত ছিলেন। পরে এস আই বিতে বদলী হন। তাঁর সোর্স নেটওয়ার্ক ছিল নিঁখুত। ২০১০ সালের পর থেকে তিনি জঙ্গিদের বহু স্লিপার সেল ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। এই স্লিপার সেল অতি ভয়ংকর বস্তু। এখানে তরুণ যুবক ও যুবতী, যাদের কোন পুলিশ রেকর্ড নেই, তাদের বাছা হয়। তারপর তাদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও বিস্ফোরক দিয়ে নাশকতা চালাবার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ইশরাত জাহান এনকাউন্টার কেসে তিনি যে রিপোর্ট দিয়েছিলেন, তাতে আমি কোন অসঙ্গতি দেখিনি। আমি সম্পূর্ণ সজ্ঞানে, স্বইচ্ছায় সেই তথ‍্যগুলির সাহায্যে নিজের নথিপত্র প্রস্তুত করেছি।
আসলে রাজিন্দর কুমারের মত অফিসারদের কার্যকলাপের ফলে আই এস আইএর বহু পরিকল্পনা ব‍্যর্থ হয়ে যাচ্ছিল। তারা প্রত‍্যাঘাতের সুযোগ খুঁজছিল।
পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর ভরত প‍্যাটেলকে সিবিআই চাপ দিয়ে কুমারের বিরুদ্ধে স্টেটমেন্ট দিতে বাধ‍্য করে। ৩০শে জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক থেকে একটি বেশ মোটা ফাইল সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয় যাতে রাজিন্দর কুমারের বিরুদ্ধে কেস সাজাতে সুবিধা হয়।
ডি জি বানজারা নামে গুজরাট পুলিশের যে অফিসার এই অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাঁকেও হেনস্থা করা হচ্ছিল।
সোহরাবুদ্দিন এনকাউন্টার কেসে তাঁকে অভিযুক্ত করে আট বছর কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। এই সোহরাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে ৬০টি ফৌজদারি কেস ছিল। এই কেসে তৎকালীন গুজরাটের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ গ্ৰেপ্তার হয়ে গিয়েছিলেন।
এছাড়াও প্রচুর পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা চলতে থাকায় পুলিশবাহিনীর মনোবল তলানিতে এসে ঠেকেছিল।
২১.৬. ২০১৩ সালে আহমেদাবাদের সিবিআইএর স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিমের তরফে আমাকে জানানো হয় যে পরদিন অর্থাৎ ২২.৬.২০১৩ তারিখে আমেদাবাদে তাদের সামনে হাজির হয়ে আমাকে স্টেটমেন্ট রেকর্ড করতে হবে। এই টিমটি ইশরাত জাহান কেসের তদন্তের দায়িত্বে ছিল। আমি তাদের বলি এই আবেদনটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনে আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে রাখতে। সিবিআই টিম তা পালন করে আমাকে ভোরের ফ্লাইটে আমেদাবাদের টিকিট করিয়ে দেয়।
সিবিআই দপ্তরে আমি যে চেম্বারে অপেক্ষা করছিলাম তার লাগোয়া একটি ঘরেই গুজরাটের আমেদাবাদ সিটি পুলিশের এক মহিলা আধিকারিক, পি সি গুর্জরকে চরম হেনস্থা করা হচ্ছিল। ইশরাত জাহান কেসের এফ আই আরে তার সই ছিল, এবং সেখানে সেটিকে "এনকাউন্টার" হিসেবে প্রতিপন্ন করা হয়েছিল। ভারতীয় আইন অনুযায়ী, এসব কেসে প্রাথমিক রিপোর্টের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। আমি স্পষ্ট দেখলাম আরেকটি ঘরে সিবিআই এর জিজ্ঞাসাবাদকারী দলের এক সদস‍্য একটি লোককে সজোরে চড় মারল। লোকটি মনোজ সিধপুরা, একটি গ‍্যারাজের মালিক, এই মামলার অন‍্যতম সাক্ষী।
ইশরত, জাভেদ শেখ এবং দুই পাকিস্তানী নাগরিক নাসিক থেকে সুরাত অবধি এসেছিল। তাদের গন্তব্য ছিল আমেদাবাদ। সুরাতে তাদের গাড়ি বিকল হয়ে যাওয়ায় তারা মনোজের শক্তি গ‍্যারাজে তা মেরামত করায়। রাত নটায় সুরাত থেকে রওনা হয়ে ২৭০ কিমি যাত্রা করে ভোরে আমেদাবাদের উপকন্ঠে আসার পর পুলিশের দলটি তাদের আটকায়। সেখানেই গুলিবিনিময় হয় ও গোটা দলটি মারা পড়ে। তদন্তকারী অফিসার সতীশ শর্মা সেদিন আমার সঙ্গে অত‍্যন্ত নির্মম ব‍্যবহার করেন। আমাকে চার পাঁচ ঘন্টা জল খেতে দেওয়া হয় না, নোংরা গালাগালি দেওয়া হয় ও জলন্ত সিগারেট থাইয়ে চেপে দেওয়া হয়। আমি যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকি। ওই দগ্ধ ট্রাউজার আমি আজও নিদর্শন হিসেবে রেখে দিয়েছি।
সতীশ কুমার জেরার সময়ে আমাকে কিছু অদ্ভুত কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে এই গুজরাতের সাদা দাড়ি আর কালো দাড়িকে তিনি গারদের ভিতরে পুরেই ছাড়বেন ! উনি তৎকালীন মুখ‍্যমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন। সেইসময়ে জাতীয় রাজনীতিতে ওঁদের গুরুত্ব বাড়ছিল।
তিনি আরো বললেন যে ১৩. ১২. ২০০১ এ পার্লামেন্টে জঙ্গি হামলা ও ২৬.১১.২০০৮ এর মুম্বই হামলা সংগঠিত হয়েছে তৎকালীন ক্ষমতায় থাকা সরকারের মদতে। জঙ্গি বিরোধী আইন আনার অজুহাত হিসেবে এই হামলাগুলিকে সরকার ব‍্যবহার করেছে। সংসদে হামলার পর পোটা আইন আসে, এবং মুম্বই হামলার পর ইউ এ পি এ আইনকে সংশোধন করা হয়। এখন কারো পকেটে দশ টাকা থাকলেও তা জঙ্গি কার্যকলাপে ব‍্যবহার করার জন‍্য বলে বাজেয়াপ্ত করে নেওয়া যায় এবং অভিযুক্তকে সারাজীবনের জন‍্য জেলে ঢুকিয়ে দেওয়া যায় !
অশেষ হেনস্থার পর সিবিআই আমাকে এয়ারপোর্টে পাঠাবার ব‍্যবস্থা করে। লাঞ্ছিত, বিধ্বস্ত আমি তখনও ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। ২৪.৬.২০১৩ তারিখে আমি আমার ঊর্ধ্বতন অফিসার অর্থাৎ সেক্রেটারি, ( নগরোন্নয়ন ) কে চিঠি লিখে সব জানাই।
এই ঘটনার পর আমি কার্যতঃ একঘরে হয়ে গেলাম। কেউ আমার সাথে মিশত না, আমাকে মোবাইলে কেউ ফোন করত না আড়িপাতার ভয়ে, অজ্ঞাতপরিচয় কিছু লোক প্রায়ই আমাকে অনুসরণ করত এবং আমার দপ্তরের একজন জয়েন্ট সেক্রেটারি, এম আহমেদ প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাকে উত‍্যক্ত করতে শুরু করলেন। তাঁর সমবেদনা ইশরাত ও তার দলবলের প্রতি ছিল।
অফিসের বিভিন্ন কাজে আমাকে এমনভাবে জড়িয়ে দেওয়া হত, যেখানে খুব সহজেই আমাকে দুর্নীতির মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া যায়। ওই সময়ে আমার দপ্তরের কিছু লোকের যোগসাজশে ৭ নং রেসকোর্স রোডের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ জমি এক অনাবাসী ভারতীয়র কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয় নিয়মবহির্ভূতভাবে। এই দুষ্কর্মের সাথে আমাকে জড়িয়ে দেবার চেষ্টা করা হয়। আমি অতিকষ্টে সামাল দিই সেই পরিস্থিতি। আমার ওপরওয়ালা আমেদ এবং মন্ত্রী কমল নাথের ব‍্যক্তিগত সচিব খালিদ বিন জামা আমাকে নানাভাবে দিনের পর দিন চূড়ান্ত কষ্ট দিয়েছে।
এরপর আবার শুরু হল নতুন উৎপাত।
সিবিআইয়ের একজন ডেপুটি সুপারিন্টেন্ডেন্ট জয়ন্ত কাশ্মিরী প্রায়ই আমার অফিসে এসে নানা অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করে সময়ের অপচয় করতে লাগল। অবস্থা এমন হল, যে প্রতি বুধবার দুপুরে আমার অফিসে হানা দেওয়াটা একটা নিয়ম হয়ে দাঁড়াল। ঐ দিন আমাদের দপ্তরের পাবলিক গ্ৰিভান্স রিড্রেসাল থাকত। উনি আমার উল্টোদিকের চেয়ারে বসে থাকতেন, এবং আমাকে ঠিকভাবে কাজ করতে দিতেন না।
আমার ছেলে এম বি এ পাশ করে চেন্নাইতে একটি চাকরী পেয়েছিল। একদিন সে খুব বিমর্ষ হয়ে বাড়িতে ফোন করল। তার কোম্পানির ম‍্যানেজমেন্ট তাকে ইস্তফা দিতে বলেছে। পরে জানা গিয়েছিল সিবিআই থেকে কোম্পানির লোকজনকে ওর বিষয়ে ভয় দেখানো হয়েছিল।
ডিসেম্বর মাসে ঐ জয়ন্ত কাশ্মিরী নামে সিবিআইয়ের ডেপুটি সুপারিন্টেন্ডেন্ট সকালে আমাদের বাড়িতে এসে যাচ্ছেতাই সব কান্ড করতে লাগল। তার সাথে যারা এসেছিল, তাদের চেহারা গুন্ডার মত। আমাদের বসার ঘরের সব জিনিপত্র তারা আছড়ে ভেঙ্গে ফেলছিল। আমার ৮৭ বছরের বৃদ্ধা মার ওপর এর অভিঘাত হল মারাত্মক। আতঙ্কগ্ৰস্ত, কম্পমান মাকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর আর তিনি ফিরে আসেননি।
২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচন। বর্তমান সরকারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তারা আমার চাপ আরো বাড়াতে লাগল। আমি গুজরাট হাইকোর্টে যে এফিডেভিটটি দাখিল করেছি, তা জয়েন্ট ডিরেক্টর ( এস আই বি ) রাজিন্দর কুমার আমাকে দিয়ে জোর করে সই ক‍রিয়ে নিয়েছে, তা লিখিতভাবে স্বীকার করানোর জন‍্য নানাভাবে চাপ দেওয়া হতে লাগল।
আমি একটি বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম। উপযুক্ত কাগজপত্র ছাড়া এক পাও এগোব না।
আমি আমার নির্যাতনকারীদের কাছে বার্তা পাঠিয়েছিলাম যে তাদের কথামত আমি কাজ করব, যদি স্বরাষ্ট্রদপ্তর বা সিবিআই আমাকে এমন কোন নথি দেখায় যেখানে তারা স্বীকার করেছে যে সেদিন কোন এনকাউন্টার হয়নি। বলাই বাহুল্য, এই ধরনের নথি সৃষ্টি
করা তাদের সাধ‍্যের বাইরে ছিল।
২০০৪ সালে পাকিস্তানের জামাত উদ দাওয়া ইশরাত জাহানকে তাঁদের মুখপত্র "গাজওয়া টাইমস"এ "ফিদায়ীন" (আত্মঘাতী) বলে প্রকাশ‍্যে স্বীকার করে নিয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে হৈ চৈ হওয়ায় তারা সতর্ক হয়ে এই বিবৃতিটি প্রত‍্যাহার করে নিয়েছিল।
ক্রমাগত হেনস্থার ফলে উত‍্যক্ত হতে হতে আমি আর পারছিলাম না। একদিন গোপনে চেন্নাই হয়ে কুম্ভকোনম গিয়ে কিছুদিন নিরুপদ্রবে থাকতে সমর্থ হই।
১৫ই মে, ২০১৪ সালে দেশজুড়ে নির্বাচনের ফল ঘোষণা হয়। সরকার পরিবর্তন হয়ে যায়। কিন্তু মজার কথা, আমার জীবনে "আচ্ছে দিন" আর আসেনি। আসলে প্রশাসনের অভ‍্যন্তরে সবসময়ই কিছু ধ্বংসাত্মক মানসিকতার লোক থাকে। তাদের কেউ সরাতে পারে না।
ডিসেম্বর ২০১৩, এক অভিযুক্ত পুলিশ অফিসার এন কে আমিন সুপ্রিম কোর্টে একটি ক্রিমিনাল রীট পিটিশন দায়ের করেন। (নং ১২৮/২০১৩)
এই সূত্রে সুপ্রিম কোর্ট আমাকে একটি নোটিশ পাঠায়। আমি কোর্টে হাজির হয়ে যথোপযুক্ত জবাব দিই।
এর কয়েকদিন পরে আমার উকিলের অফিসে একটি "ফতোয়া" র চিঠি আসে, যেখানে আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এই "ফতোয়া" আমার বাবাকে এত আতঙ্কগ্ৰস্ত করে তোলে যে, তিনি চরম অবসাদের শিকার হন। বাবার অসুস্থতা এত বাড়ে যে শেষপর্যন্ত তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। অবশেষে, আমার বাবার পরিনতিও ঠিক আমার মায়ের মতোই হল।
আমি প্রায়ই দেখতাম অফিসের পার্কিং লটে আমার গাড়ির চারটি চাকার নাটবল্টু কারা যেন খুলে রেখে যায় ! মানুষকে যে কতভাবে ছুটিয়ে মারা যায় !
একদিন বাড়ি ফেরার পথে রাস্তায় একটি ডাম্পার উল্টোদিক থেকে এসে আমার গাড়িতে সজোরে ধাক্কা দিয়ে সামনের অংশের যথেষ্ট ক্ষতিসাধন করল। আমি আয়ুর জোরে বেঁচে গেলাম সেদিন।
তবে অবস্থার সামান্য হলেও পরিবর্তন হচ্ছিল।
এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত অফিসাররা মুখ খুলতে শুরু করেছিলেন। প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রসচিব জি কে পিল্লাই ও রাজিন্দর কুমার ইতিমধ‍্যেই প্রকাশ‍্যে বিবৃতি দেওয়া শুরু করেছিলেন। আমার সাথেও "টাইমস নাও" খবরের চ‍্যানেল যোগাযোগ করতে শুরু করে, এরপর একে একে অন‍্যরা। আমার একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার সম্প্রচারিত হয় টাইমস নাও চ‍্যানেলে, ১লা মার্চ,২০১৬।
এতে আমার শত্রুরা আমার ওপর ভীষণ রেগে যায়। আমি এপ্রিল মাসে মুম্বাইতে সরকারী কাজের সূত্রে গিয়ে প্রভাদেবীর টেক্সটাইল কমিটি গেস্ট হাউসে উঠেছিলাম। সেখানে ২২.৪.২০১৭ তারিখে আমার ওপর আবার একটি প্রাণঘাতী হামলা হয়। আমি ভাগ‍্যের জোরে বেঁচে যাই ও যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি দিল্লী ফিরে আসি।
এবার আমি ঠিক করি, অনেক হয়েছে, স্বেচ্ছাবসর নিয়ে বাকি জীবনটা শান্তিতে কাটাব। সুখের চেয়ে স্বস্তি ভালো। আমি আমার দীর্ঘ পেশাগতকে জীবনকে বিদায় জানাই।
এতদিন সরকারী চাকরী করে আমার অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান হল এই - যুদ্ধ মানে সীমান্তে গুলিগোলা নয়, যে সব ক্ষমতাশালী লোকরা আমাদের নয়াদিল্লির নর্থ ব্লকের বিরুদ্ধে সাউথ ব্লককে লড়িয়ে দিচ্ছে, সিবিআইকে দিয়ে আইবি ও রাজ‍্য পুলিশের অফিসারদের অনর্থকভাবে হেনস্থা, মামলা ও গ্ৰেপ্তার করাচ্ছে, তাদের সংগ্ৰাম আসলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই ।
আমি চিরকাল সাধারণ ভাবে জীবনযাপন করেছি। শ্রীমদ্ভাগবতগীতা পাঠ করেছি যখনই সময় পেয়েছি। সেই আদর্শে চলার চেষ্টা করেছি। "জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী" এই নীতিতে মনপ্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করেছি।
আমি এই বইতে যা লিখেছি, তার প্রত‍্যেকটি কথার সমর্থন পাওয়া যাবে আদালতের হলফনামা ও নথিতে , সেক্রেটারিয়েটের রিপোর্টে, থানার কেস ডায়েরি ও চার্জশিটে, আর টি আইএর কাগজপত্র, সরকারি ফাইল ও সংবাদপত্রে।
প্রতিজ্ঞা করেছিলাম চাপের কাছে নতিস্বীকার না করার। যখন আমি ভীষণ ভেঙ্গে পড়তাম, আমার মা বলতেন, "তুমি আমার সাহসী ছেলে।" আপ্রাণ চেষ্টা করেছি মায়ের এই কথা যাতে মিথ‍্যা না হয়।

আর. ভি. এস. মণি
"দ‍্য মিথ অফ হিন্দু টেরর ; এন ইনসাইডার এ্যাকাউন্ট অব মিনিস্ট্রি অফ হোম এ্যাফেয়ার্স ২০০৬ -২০১০)
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৫২
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

“Epstein “ বুঝতে পারেন ! কিন্তু রাজাকার,আলবদর,আলশামস আর আজকের Extension লালবদর বুঝতে পারেন না ‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৬:০৮

মূলত এটি একটি ছবি ব্লগ। এক একটি ছবি একটি করে ইতিহাস। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কস্টের অধ্যায়।

এপস্টেইন ফাইল দেখে আপনারা যারা বিচলিত, জেনে রাখুন ভয়াবহ আরেক বর্বরতা ঘটেছিলো ৭১এ এদেশেই, আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

শুধু উপবাস নয়, আত্মশুদ্ধি অর্জনই রোজার মূল উদ্দেশ্য

লিখেছেন নতুন নকিব, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:০১

শুধু উপবাস নয়, আত্মশুদ্ধি অর্জনই রোজার মূল উদ্দেশ্য

ছবি, সংগৃহিত।

সারসংক্ষেপ

রমজানের রোজা ইসলামের অন্যতম মৌলিক ইবাদত। সাধারণ মুসলিম সমাজে রোজা ভঙ্গের ধারণা প্রধানত পানাহার ও যৌন সংসর্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ কুরআন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

Will you remember me in ten years!

লিখেছেন করুণাধারা, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৫৫



উপরের ছবিটি ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে একজন ব্লগার তার এক পোস্টে দিয়েছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন দশ বছর পর কেউ তাকে মনে রাখবে কিনা!! গতমাসে এই পোস্ট যখন আমার নজরে এলো, হিসাব... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষ

লিখেছেন বিপ্লব০০৭, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৫৭



মানুষ আসলে কী?

Sophies Verden কেতাবে নরওয়েজিয়ান ইয়স্তেন গার্ডার (Jostein Gaarder) এক বিশাল বয়ান পেশ করেছেন ছোট্ট মেয়ে সোফির জীবনের গল্প বলতে বলতে। নীতি-নৈতিকতা, জীবন-জগৎ, সৃষ্টি নিয়ে সোফির ধারণা ছিলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

শোনো হে রাষ্ট্র শোনো

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:০২


নিশ্চল শহরে আজ ক্ষুধারা হাঁটে পায়ে পায়ে
ফুটপাথে শুয়ে রয় ক্ষুদার্ত মুখ।
চালের বস্তার সেলাই হয়নি ছেড়া,
রুটির দোকানে আগুন ওঠেনি জ্বলে।
ক্ষুদার্ত আধার জাপটে ধরে আষ্টেপৃষ্টে।

আমার চোখ লাল, ভেবো না নেশায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×