somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইতিহাসের পাঠশালায়: পর্ব-৩৩ | পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য: ১৪৩৮-১৬৫৭ সাল

১১ ই জানুয়ারি, ২০১৯ রাত ১১:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


হাবসবার্গ রাজপরিবার (১৪৩৮-১৭৪০ সাল)

দ্বিতীয় এলবার্ট (১৪৩৮-১৪৩৯ সাল): প্রথম রুডলফ ও প্রথম এলবার্টের পর হাবসবার্গ রাজবংশের তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে জার্মানির রাজা হন দ্বিতীয় এলবার্ট। ১৪৩৮ সালে তিনি জার্মানির রাজা নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু জার্মানির রাজমুকুট পরার সৌভাগ্য তাঁর হয়নি। অভিষেকের পূর্বেই তিনি মারা গিয়েছিলেন। ১৪৩৯ সালে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। দ্বিতীয় এলবার্ট তাঁর জীবদ্দশায় হাঙ্গেরি-ক্রোয়েশিয়ার রাজা, বোহেমিয়ার রাজা, লুক্সেমবার্গের ডিউক ও অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক হয়েছিলেন।

তৃতীয় ফ্রেডারিক (১৪৪০-১৪৯৩ সাল): ১৪৪০ সালে জার্মানির রাজা হন ফ্রেডারিক দ্য পিসফুল। তিনি সম্রাট তৃতীয় ফ্রেডারিক হিসেবে পরিচিত। ১৪৫২ সালে তিনি ‘পবিত্র রোমান সম্রাট’ হিসেবে অভিষিক্ত হন। ১৪৯৩ সালে তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ‘পবিত্র রোমান সম্রাটের’ পদে বহাল ছিলেন। তৃতীয় ফ্রেডারিক ছিলেন হাবসবার্গ রাজবংশের প্রথম সম্রাট। জার্মানির রাজা হওয়ার বেশ পূর্বেই ফ্রেডারিক অস্ট্রিয়ার ডিউক হয়েছিলেন। ১৪৮৩ সালে তিনি পুত্র ম্যাক্সিমিলিয়ানকে তাঁর সহশাসক বানিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যু হয় ১৪৯৩ সালে।

প্রথম ম্যাক্সিমিলিয়ান (১৪৯৩-১৫১৯ সাল) : সম্রাট তৃতীয় ফ্রেডারিকের পর তাঁর পুত্র ম্যাক্সিমিলিয়ান তাঁর সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার লাভ করেন। ম্যাক্সিমিলিয়ান তাঁর জীবদ্দশায়ই শাসনকার্যে যুক্ত হন। তিনি পর্তুগালের এলিয়েনর ছিলেন। ১৪৮৬ সালে তাঁর পিতা তাকে জার্মানির রাজা (রেক্স রোমানোরাম) বানিয়েছিলেন। ১৫০৮ সালে তিনি ‘পবিত্র রোমান সম্রাট’ হন। ‘পবিত্র রোমান সম্রাট’ হওয়ার পর ম্যাক্সিমিলিয়ান সম্রাট প্রথম ম্যাক্সিমিলিয়ান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।


চিত্র: আধুনিক যুগের সূচনালগ্নে ব্যবহৃত যুদ্ধাস্ত্র

১৫১৯ সালে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত প্রথম ম্যাক্সিমিলিয়ান ‘পবিত্র রোমান সম্রাটের’ পদে বহাল ছিলেন। অবশ্য রোমের পোপ কখনো প্রথম ম্যাক্সিমিলিয়ানের মাথায় সম্রাটের মুকুট তোলে দেননি। জার্মানি থেকে আল্পস পাড়ি দিয়ে রোমে যাওয়া সবসময়ই বেশ বিপদজনক ছিল। সম্ভবত এ কারণেই ম্যাক্সিমিলিয়ান মুকুট গ্রহণের জন্য রোমে যাননি। ম্যাক্সিমিলিয়ান তাঁর পিতার সাথে শেষ দশ বৎসর ধরে যৌথশাসক ছিলেন।

১৪৭৭ সালে তিনি বারগান্ডি ডাচির উত্তরাধিকারী ডিউককন্যাকে বিবাহ করেছিলেন। যুদ্ধ এবং বিবাহের মধ্য দিয়ে ম্যাক্সিমিলিয়ান হাবসবার্গ রাজবংশের প্রভাব বৃদ্ধি করেছিলেন। তবে প্রভাবশালী শাসক হওয়া সত্ত্বেও ম্যাক্সিমিলিয়ান অস্ট্রিয়ান অঞ্চলসমূহ হারিয়েছিলেন যা এখনকার সুইটজারল্যান্ডের অন্তর্গত। ১৪৯৮ সালে ম্যাক্সিমিলিয়ান তাঁর পুত্র ফিলিপ দ্য হ্যান্ডসাম এর সাথে ক্যাস্টিলের হবু রাণী জোয়ানা অভ ক্যাস্টিল এর বিয়ে দেন।


চিত্র: আধুনিক যুগের ইউরোপীয় যোদ্ধা

এর ফলে স্পেনে হাবসবার্গ রাজবংশের শক্ত ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত এবং পরবর্তীতে ম্যাক্সিমিলিয়ানের নাতি চার্লস লিয়ন-ক্যাস্টিল এবং এরাগনের সিংহাসন অধিকার করতে পেরেছিলেন এবং স্পেনের প্রথম ‘দে জুরি’ রাজা হয়েছিলেন।

পঞ্চম চার্লস (১৫১৯-১৫৫৬ সাল): সম্রাট ম্যাক্সিমিলিয়ানের জীবদ্দশায়ই তাঁর পুত্র ফিলিপ মারা গিয়েছিলেন। ফিলিপের মৃত্যু হয় ১৫০৬ সালে। তাই ১৫১৯ সালে সম্রাট ম্যাক্সিমিলিয়ানের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারী হন তাঁর নাতি চার্লস। চার্লস ‘পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের’ ক্ষমতায় আসার পর সম্রাট পঞ্চম চার্লস হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি ‘পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের’ পাশাপাশি স্পেনিশ সাম্রাজ্যের ক্ষমতাও লাভ করেছিলেন। সম্রাট পঞ্চম চার্লস ছিলেন ‘পবিত্র রোমান সম্রাটদের’ মধ্যে প্রথম যিনি স্পেনেরও শাসক হয়েছিলেন।


চিত্র: সম্রাট পঞ্চম চার্লস

১৫১৬ সালে তিনি স্পেনিশ সিংহাসন লাভ করেছিলেন। স্পেনিশ শাসকদের তালিকা অনুযায়ী তিনি ছিলেন ‘প্রথম চার্লস’। ১৫৫৬ সালে স্বেচ্ছায় সরে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি একই সাথে এই দুই সাম্রাজ্য শাসন করেছিলেন। ১৫৫৬ সালে সম্রাট পঞ্চম চার্লস ‘পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের’ ক্ষমতা অর্পণ করেছিলেন তাঁর ছোট ভাই প্রথম ফার্ডিনান্ডের হাতে এবং স্পেনের ক্ষমতা অর্পণ করেছিলেন তাঁর পুত্র দ্বিতীয় ফিলিপের হাতে।

সম্রাট পঞ্চম চার্লসের সাম্রাজ্যে অনেকগুলো ছোটবড় ইউরোপীয় স্টেইট ছিল। এতগুলো স্টেইট শাসন করার ক্ষেত্রে তাঁর বৈচিত্রময় বংশপরিচয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তিনি ইউরোপের তিনটি শক্তিশালী রাজপরিবারে উত্তরসূরী ছিলেন। এ তিনটি রাজবংশ হল: হাবসবার্গ রাজবংশ, বারগান্ডিয়ান নেদারল্যান্ডের ভ্যালোইস-বারগান্ডি রাজপরিবার এবং ক্যাস্টিল ও এরাগনের ট্রাস্টামারা রাজপরিবার।


চিত্র: সম্রাট পঞ্চম চার্লসের দুই সাম্রাজ্য

দক্ষিণ, পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপের বিস্তীর্ণ এলাকা ছাড়াও আমেরিকা ও এশিয়ার স্পেনিশ উপনিবেশগুলোও সম্রাট পঞ্চম চার্লসের অধীনস্ত এলাকা ছিল। তিনি ছিলেন প্রথম রাজা যার একক ক্ষমতার অধীনে ক্যাস্টিল, লিয়ন ও এরাগন একই সাথে শাসিত হয়েছিল। তাই অখণ্ড স্পেনের প্রথম রাজাও ছিলেন তিনি। এ তিনটি রাজ্য ও কিছু উপনিবেশ নিয়ে মূলত অখণ্ড স্পেনিশ সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল।

১৫১৯ সালে ‘পবিত্র রোমান সম্রাট’ হওয়ার পাশিপাশি চার্লস অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক হয়েছিলেন। পূর্ব ইউরোপের অস্ট্রিয়া থেকে শুরু করে পশ্চিম ইউরোপের স্পেন পর্যন্ত এবং দূর প্রাচ্য ও আমেরিকায় স্থাপিত উপনিবেশসহ তাঁর সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল প্রায় চার মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার। সম্রাট পঞ্চম চার্লসের সময়ে ‘পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য’ বহির্ভূত ফ্রান্সের সাথে তাঁর বেশ কিছু যুদ্ধ হয়েছিল।

ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ড ছিল তখনকার ‘পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের’ বাইরে ইউরোপের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দুটি দেশ। ফ্রাঙ্ক সম্রাট শার্লামেনের সময়ে ‘পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য’ গড়ে উঠেছিল মূলত ফ্রান্সকে কেন্দ্র করেই। পরবর্তীতে অটোনিয়ান রাজবংশের উত্থানের মধ্য দিয়ে জার্মানিকে কেন্দ্র করে পুনরায় ‘পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য’ প্রতিষ্ঠিত হলেও ফ্রান্স আর কখনোই এর আওতাভুক্ত হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে ফ্রান্স এ সাম্রাজ্যের পাশেই এক বিশাল ও শক্তিশালী দেশ হিসেবে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল।

সম্রাট পঞ্চম চার্লসের সময়ে ইতালি থেকে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে বেশ কিছু যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল। এসব যুদ্ধ ছিল বেশ ব্যয়বহুল। ব্যয়বহুল হলেও এসব যুদ্ধ সম্রাট চার্লসকে সামরিক সফলতা এনে দিয়েছিল। এ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ইউরোপে প্রথম আধুনিক পেশাজীবী সেনাবাহিনী গড়ে উঠেছিল। এ সেনাবাহিনীর নাম ছিল টারসিওস।

চার্লসের সেনাবাহিনী ফ্রান্সের দখল থেকে মিলান ও ফ্রেঞ্চ-কামাটে উদ্ধার করেছিল। ১৫২৫ সালে সংঘটিত পাভিয়ার যুদ্ধে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে হাবসবার্গদের চূড়ান্ত বিজয়ের মধ্য দিয়ে এ দুটি অঞ্চল উদ্ধার হয়েছিল। এ যুদ্ধে পরাজয়ের পর ফ্রান্সের রাজা প্রথম ফ্রান্সিস পূর্ব ইউরোপ ও এশিয়া অঞ্চলের উসমানীয় সাম্রাজ্যের সাথে আঁতাত করতে বাধ্য হন।

১৪৫৩ সালে উসমানীয়দের হাতে বাইজেন্টাইনদের পতনের পর দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটেছিল। তাই ‘পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের’ কাছে উসমানীয় সাম্রাজ্য ছিল একটি বড় হুমকি। সম্রাট পঞ্চম চার্লসের শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ছিলেন উসমানীয় সুলতান (সম্রাট) সোলেমান দ্য ম্যাগনিফিশেন্ট।

১৫২৫ সালের পাভিয়ার যুদ্ধের পর ফ্রান্সের রাজা প্রথম ফ্রান্সিস উসমানীয় সুলতান সোলেমান দ্য ম্যাগনিফিশেন্ট এর সাথে মৈত্রীতার সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। এরপর সুলতান সোলেমান ১৫২৬ সালের মোহাস যুদ্ধে খ্রিষ্টান সৈন্যদের পরাজিত করে হাঙ্গেরিয়ান রাজ্যের কেন্দ্রিয় অঞ্চল দখল করে নেন। তবে ১৫২৯ সালে সুলতান সোলেমান ভিয়েনা দখলে ব্যর্থ হওয়ার পর উসমানীয়দের অগ্রযাত্রা থেমে যায়।

সম্রাট পঞ্চম চার্লস তাঁর উদ্ভাবিত সামরিক কৌশলগুলোর জন্য বেশ খ্যাত ছিলেন। এছাড়াও প্রটেস্টান্ট রিফর্মেশনের বিরোধীতার জন্যও তিনি ইতিহাসে আলোচিত। তাঁর সময়ে কয়েকজন জার্মান প্রিন্স ক্যাথলিক চার্চ বর্জন করে ‘পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য’ থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন এবং সম্রাট পঞ্চম চার্লসের বিরুদ্ধে ‘স্মেলক্যালডিক লীগ’ নামে একটি সামরিক জোট গঠন করেছিলেন।


চিত্র: উসমানীয় সুলতান সোলেমান দ্য ম্যাগনিফিশেন্ট

চার্লস তাঁর সাম্রাজ্যে প্রটেস্টান্ট মতবাদের বিস্তার রোধ করতে এবং সাম্রাজ্যের অন্যান্য অংশকে ধর্মীয় উপদলীয় যুদ্ধ থেকে মুক্ত রাখতে পাল্টা ধর্মীয় আন্দোলনের কৌশল গ্রহণ করেন। তিনি ট্রেন্টে যাজকদের ধর্মীয় সম্মেলন আহ্বান করেন। ট্রেন্ট সম্মেলনে রিফর্মেশন বিরোধী আন্দোলনের সূচনা করা হয়।

চার্লসের পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁর সাম্রাজ্যে শান্তিপূর্ণভাবে ও বৃদ্ধিবৃত্তিক পদ্ধতিতে প্রটেস্টানিজমকে প্রতিরোধ করার জন্য সেইন্ট ইগনাটিয়াস নামে একজন সন্ন্যাসী ‘সোসাইটি অভ যিসাস’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। স্পেনেও চার্লসের অহিংস পদ্ধতি কাজে লেগেছিল। স্পেনের কয়েকজন ধর্মীয় লেখকের লেখনীর মাধ্যমে ধর্মীয় উপদলীয় সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয়েছিল।

সম্রাট পঞ্চম চার্লসের সময়ের আরও কিছু ঘটনার জন্যও তাঁর সময়কাল ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করেছে। তাঁর সময়েই স্পেনীয়রা মেক্সিকোর অ্যাজটেক সভ্যতার সন্ধান পেয়েছিল এবং পেরুর ইনকা সভ্যতা দখল করে নিয়েছিল। আমেরিকান রেড ইন্ডিয়ানদের সর্ববৃহৎ সভ্যতা ছিল মেক্সিকোর অ্যাজটেক সভ্যতা।
১৪০০ সালের দিকে এ সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। এর রাজধানীর নাম ছিল টেনোকটিটলান। ১৫১৮ সালে স্বর্ণসন্ধানী স্পেনিশ অভিযাত্রীরা প্রথম অ্যাজটেক সভ্যতার খোঁজ পায়। এরপর অভিযাত্রীদের নেতা ফার্নান্দো কোরটেস কাছাকাছি ভেরাক্রুজ অঞ্চলে স্পেনীয় বসতি স্থাপন করেন। সেখান থেকে তিনি অ্যাজটেক রাজধানী দখলের চেষ্টা করতে থাকেন।


চিত্র: অ্যাজটেক সভ্যতা

অবশেষে ১৫২১ সালে তিনি অ্যাজটেক রাজা মন্টেজুমাকে পরাজিত করে অ্যাজটেক রাজধানী দখল করতে সক্ষম হন। অন্যদিকে ১৫৩২ সালে পেরুর ইনকাদের অন্তর্দ্বন্ধের সুযোগে স্পেনিশ বিজেতা ফ্রান্সিসকো পিজাররো সে সাম্রাজ্য দখল করে নিয়েছিলেন। অ্যাজটেক ও ইনকা সভ্যতা দখলের পর দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায় স্পেনিশ উপনিবেশের ব্যাপক বিস্তার ঘটে।

চার্লস আমেরিকায় স্পেনিশ উপনিবেশায়নের তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত হয়েছিলেন। তিনি ফার্ডিনান্ড ম্যাগেলানকে পাঁচটি জাহাজ প্রদান করেছিলেন। এ পাঁচটি জাহাজ নিয়ে ফার্ডিনান্ড ম্যাগেলান ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জলপথে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেছিলেন। এ অভিযানের ফলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে স্পেনিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপিত হয় এবং ফিলিপাইনে স্পেনিশ উপনিবেশ স্থাপনের কাজ শুরু হয়।

চার্লস যদিও সবসময় যুদ্ধ-বিগ্রহ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, তিনি শান্তি পছন্দ করতেন। মারকেন্টোনিও কন্টারিনি নামে একজন পণ্ডিত ১৫৩৬ সালে তাঁর একটি লেখায় পঞ্চম চার্লস সম্পর্কে লিখেছেন “ভূখণ্ডের জন্য লালায়িত নয়, কিন্তু শান্তির জন্য প্রচণ্ড লালায়িত”। চার্লস ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান ১৫৫৬ সালে। ১৫৫৬ সালে চার্লস হাবসবার্গ সিংহাসন প্রদান করেন তাঁর ছোট ভাই ফার্ডিনান্ডকে।

অন্যদিকে স্পেনিশ সাম্রাজ্য প্রদান করেন তাঁর পুত্র দ্বিতীয় ফিলিপকে। আঠারো শতক পর্যন্ত এ দুই সাম্রাজ্য পরস্পরের মিত্র ছিল। চার্লস অবসরে যাওয়ার সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৫৬ বছর। কিন্তু ৩৪ বছরের ঘটনাবহুল শাসকজীবনের ভারে তিনি ছিলেন ক্লান্ত। তাই নির্জনতা ও শান্তির আশায় তিনি একটি মনাস্টেরিতে আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি ৫৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

প্রথম ফার্ডিনান্ড (১৫৫৬-১৫৬৪ সাল): ১৫৫৬ সালে হাবসবার্গ রাজবংশের বিখ্যাত সম্রাট পঞ্চম চার্লস তাঁর ছোট ভাই ফার্ডিনান্ডের হাতে ‘পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের’ ক্ষমতা অর্পণ করেন। এরপর ১৫৫৮ সালে ‘পবিত্র রোমান সম্রাট’ হিসেবে ফার্ডিনান্ডের অভিষেক হয়। জার্মানি তথা ‘পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের’ সম্রাটদের তালিকা অনুযায়ী তিনি প্রথম ফার্ডিনান্ড হিসেবে পরিচিত।

১৫২৬ সালে ফার্ডিনান্ড বোহেমিয়া ও হাঙ্গেরির রাজা হয়েছিলেন। ১৫২৭ সালে হয়েছিলেন ক্রোয়েশিয়ার রাজা। সম্রাটের ক্ষমতায় আরোহণের পূর্বে তিনি তাঁর বড় ভাই সম্রাট পঞ্চম চার্লসের অধীনে অস্ট্রিয়ান অঞ্চলের হাবসবার্গ ভূখণ্ডসমূহ শাসন করেছিলেন। সম্রাট প্রথম ফার্ডিনান্ডের শাসনামলের উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল পার্শ্ববর্তী উসমানীয় সাম্রাজ্যের সাথে তাঁর ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এবং প্রটেস্টান্টদের সাথে তাঁর টানাপোড়েন।

১৫২০ এর দশকে উসমানীয়রা ইউরোপের কেন্দ্রিয় অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের যে প্রচেষ্টা শুরু করেছিল তা সম্রাট প্রথম ফার্ডিনান্ডের সময়েও অব্যাহত ছিল। অন্যদিকে প্রটেস্টান্ট রিফর্মেশনের ধাক্কাও তাকে সামলাতে হয়েছিল। তাঁর প্রিয় উক্তি ছিল, “পৃথিবীর ধ্বংসের মধ্যে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হউক”। সম্রাট প্রথম ফার্ডিনান্ডের মৃত্যু হয় ১৫৬৪ সালে।

দ্বিতীয় ম্যাক্সিমিলিয়ান (১৫৬৪-১৫৭৬ সাল): ১৫৬৪ সালে সম্রাট প্রথম ফার্ডিনান্ডের মৃত্যুর পর ‘পবিত্র রোমান সম্রাট’ হন দ্বিতীয় ম্যাক্সিমিলিয়ান। তিনি ছিলেন হাবসবার্গ রাজপরিবারের অস্ট্রিয়ান শাখার সদস্য। ১৫৬২ সালের ১৪ মে প্রাগ শহরে তাকে বোহেমিয়ার রাজা হিসেবে অভিষিক্ত করা হয়েছিল। একই বছর ২৪ নভেম্বর তাকে ‘রেক্স রোমানোরাম’ অর্থাৎ জার্মানির রাজাও নির্বাচিত করা হয়েছিল।

১৫৬৩ সালের ১৬ জুলাই প্রেসবার্গে তাকে হাঙ্গেরি ও ক্রোয়েশিয়ার রাজা হিসেবে অভিষিক্ত করা হয়েছিল। ১৫৬৪ সালের ২৫ জুলাই তিনি তাঁর পিতা প্রথম ফার্ডিনান্ডের উত্তরসূরি হিসেবে ‘পবিত্র রোমান সম্রাট’ হন। সম্রাট হওয়ার পর উসমানীয় সাম্রাজ্যের সাথে আগে থেকেই চলমান যুদ্ধে তাকেও অংশ নিতে হয়েছিল। এছাড়াও স্পেনের ক্ষমতাসীন হাবসবার্গ আত্মীয়দের সাথেও তিনি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তাঁর মৃত্যু হয় ১৫৭৬ সালের ১২ অক্টোবর।

দ্বিতীয় রুডলফ (১৫৭৬-১৬১২ সাল): ১৫৭৬ সালে সম্রাট দ্বিতীয় ম্যাক্সিমিলিয়ানের মৃত্যুর পর ‘পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের’ ক্ষমতায় আসেন দ্বিতীয় রুডলফ। ১৬১২ সালে তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ সাম্রাজ্যের ক্ষমতায় বহাল ছিলেন। রুডলফ ১৫৭২ সালে হাঙ্গেরি ও ক্রোয়েশিয়ার রাজা হয়েছিলেন; ১৫৭৫ সালে হয়েছিলেন বোহেমিয়ার রাজা এবং ১৫৭৬ সালে হয়েছিলেন অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক। দ্বিতীয় রুডলফকে হাবসবার্গ রাজবংশের একজন অসফল সম্রাট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর ভুলের জন্য তাকে ‘তিরিশ বছরের যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়তে হয়েছিল। তবে শিল্পের জগতে তাঁর যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। তিনি ম্যানারিস্ট চিত্রকলার একজন গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। এছাড়াও ওকাল্ট ধারার শিল্প ও শিক্ষা-দীক্ষার প্রসারে তিনি নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন যা পরবর্তী বৈজ্ঞানিক জাগরণের ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

ম্যাথিয়াস (১৬১২-১৬১৯ সাল): ১৬১২ সালে সম্রাট দ্বিতীয় রুডলফের মৃত্যুর পর ‘পবিত্র রোমান সম্রাট’ হন ম্যাথিয়াস। ১৬০৮ সালে তিনি হাঙ্গেরি ও ক্রোয়েশিয়ার রাজা হয়েছিলেন এবং ১৬১১ সালে বোহেমিয়ার রাজা হয়েছিলেন। তিনি পূর্ববর্তী সম্রাটদের মতোই হাবসবার্গ রাজপরিবারের সদস্য ছিলেন। ১৬১৯ সালে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।

দ্বিতীয় ফার্ডিনান্ড (১৬১৯-১৬৩৭ সাল): ১৬১৯ সালে সম্রাট ম্যাথিয়াসের মৃত্যুর পর ‘পবিত্র রোমান সম্রাট’ হন দ্বিতীয় ফার্ডিনান্ড। তিনি ১৬১৭ সালে বোহেমিয়ার রাজা হয়েছিলেন এবং ১৬১৮ সালে হাঙ্গেরির রাজা হয়েছিলেন। তাঁর শাসনকালের সাথে ‘তিরিশ বছরের যুদ্ধের’ সময়ের বেশ মিল ছিল। ১৬৩৭ সালে এ হাবসবার্গ শাসক মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

তৃতীয় ফার্ডিনান্ড (১৬৩৭-১৬৫৭ সাল): ১৬৩৭ সালে সম্রাট দ্বিতীয় ফার্ডিনান্ডের মৃত্যুর পর ‘পবিত্র রোমান সম্রাট’ হন তৃতীয় ফার্ডিনান্ড। তিনি ১৬৫৭ সাল পর্যন্ত ‘পবিত্র রোমান সম্রাট’ ছিলেন। এর পাশাপাশি তিনি হাঙ্গেরি ও ক্রোয়েশিয়ার রাজা, বোহেমিয়ার রাজা এবং অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক ছিলেন।

লেখক: আসিফ আযহার
শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, শাবিপ্রবি
ই-মেইল: asifajhar@gmail.com
ওয়েবসাইট: http://www.asifajhar.wordpress.com
ফেসবুক: Asif Ajhar, যোগাযোগ: 01785 066 880

বি.দ্র: রকমারিসহ বিভিন্ন অনলাইন মার্কেটে লেখকের সবগুলো বই পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে লেখকের নামে সার্চ দিলেই যথেষ্ট।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জানুয়ারি, ২০১৯ রাত ১১:১৫
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এলোমেলো জীবনের দিনলিপি থেকে-২৪

লিখেছেন মাহমুদুর রহমান, ২৫ শে মার্চ, ২০১৯ দুপুর ২:৩৬

(ক)

আরজ আলী মাতুব্বরের প্রথম আটটি প্রশ্ন এবং আমার উত্তরঃ-
যেমন -
১। আমি কে? (নিজ) =
উত্তরঃ আমি মানুষ।মান(আত্মসম্মান) ও হুঁশ(বিবেক) =আশরাফুল মাখলুকাত।

২। জীবন কি শরীরী বা অপার্থিব?... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাকার পথে পথে- ৭ (ছবি ব্লগ)

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৫ শে মার্চ, ২০১৯ বিকাল ৩:০৪



ঢাকা শহরে থাকি।
মাঝে মাঝে প্রয়োজনে, অপ্রয়োজনে নানান জায়গা ঘুরে বেড়াই। অনেক কিছু চোখে পড়ে। পকেটে মোবাইল থাকে তাই ইচ্ছা হলেই সাথে সাথে ছবি তুলে নিই। ছবি... ...বাকিটুকু পড়ুন

|| দিশেহারা ||

লিখেছেন নাঈম জাহাঙ্গীর নয়ন, ২৫ শে মার্চ, ২০১৯ সন্ধ্যা ৬:২১



আমি উম্মাদ আজ-
পথের ভুলে দিশেহারা,
বিষণ্ণ সময়, কন্টক পথ-
সঙ্গী বিরহ যন্ত্রণা।

পথের টানে পথিক আমি-
সকাল সন্ধ্যা রাত্রির,
নই মন্থর- ছুটি দুরন্ত-
সদা থাকে এই মন অস্থির।

ডাকি ঈশ্বর, হইলো পর-
যাদের ভেবেছি আপন,
একা নির্জন- পথ দুর্গম-... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বাধীনতার ৫০এর কাছে এসেও এ জাতি স্বাধীনতা শূন্যতায়...

লিখেছেন স্বপ্নের আগামী, ২৫ শে মার্চ, ২০১৯ রাত ১১:০৪

স্বাধীন আমি তাহার মতোই
তিনি যেমন চাহেন,
তাহার হাতে নাটাই আমার
একটু নড়াচড়ায় সূতা টানেন!

হেঁচকা টানে ভয় দেখিয়ে
শিকলের ঝনঝন,
ভগবান যেনো শাসক গুস্টি;
নির্দেশনায় ইঙ্গিত পুজোয় কল্যাণ!!

পুজোর বেদী পরিয়ে দিয়ে
দেয় স্বাধীনতার খড়কুড়া,
মনের ভেতরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বাধীনতা কারা চেয়েছিলেন, কারা এনেছিলেন, কারা স্বাধীনতা বুঝে নিয়েছেন

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২৬ শে মার্চ, ২০১৯ ভোর ৬:৫৮



*** কোন ১ ইডিয়ট পোষ্টটাকে রিফ্রেশ করার শুরু করেছে; দেশ ভরে গেছে বানরে ****

পুর্ব পাকিস্তানের কোন শ্রেণীর জনতা স্বাধীনতা চেয়েছিলেন? দরিদ্ররা স্বাধীনতা চেয়েছিলেন। ফজলুল কাদের চৌধুরী, মোনায়েম খান, একে খান,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×