মনে করুন আপনি রাস্তায় হাঁটছেন আর আপনার জুতার তলির সাথে সংযুক্ত ক্ষুদ্র জেনারেটরের মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুতের সাহায্যে আপনার ফোনটি চার্জ হচ্ছে। বাস্তবে এ ধরণের যন্ত্রের ব্যবহার এখন আর খুব বেশি দূরে নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বার্ক্ললে ল্যাব এর বিজ্ঞানীরা নির্দোষ কিছু ভাইরাসের সাহায্যে যান্ত্রিক শক্তিকে বৈদ্যুতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন।
বিজ্ঞানীরা পরীক্ষামূলকভাবে একটি জেনারেটর তৈরি করেছেন যা একটি ছোট লিকুইড ক্রিস্টাল ডিসপ্লে চালাতে সক্ষম। যন্ত্রটি কাজ করে কিছু বিশেষ ভাইরাস দ্বারা প্রলেপ দেওয়া ডাকটিকিট আকৃতির একটি ইলেক্ট্রোড এর উপর আঙ্গুলের চাপে। ভাইরাসগুলো আঙ্গুলের চাপের শক্তিকে ইলেক্ট্রিক চার্জে রূপান্তরিত করে।
জৈব বস্তুর পাইজোইলেক্ট্রিক বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে জেনারেটর তৈরির ঘটনা এটাই প্রথম। পাইজোইলেক্ট্রিসিটি হচ্ছে বস্তুর উপর যান্ত্রিক চাপ প্রয়োগে বৈদ্যুতিক চার্জ আহরনের একটি পদ্ধতি।
এ আবিষ্কারের ফলে ছোট যন্ত্রপাতির কম্পনকে কাজে লাগিয়ে বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদন করা সম্ভব হবে। সহজে মাইক্রোইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস তৈরিতেও এ প্রযুক্তি কাজে লাগতে পারে কারণ ভাইরাসগুলো নিজেদেরকে এক পাতলা ঝিল্লিতে সুবিন্যস্ত করে যা জেনারটরটিকে কাজ করতে সাহায্য করে। ন্যানোটেকনোলজির ভুবনে এই স্বয়ংক্রিয় সুবিন্যাস অত্যন্ত কাংখিত একটি বিষয়। বিজ্ঞানীরা তাদের পরীক্ষার ফল গত ১৩ মে ২০১২ ‘নেচার ন্যানোটেকনোলজি জার্নালে প্রকাশ করেছেন।
“"এ বিষয়ে আরো গবেষনার প্রয়োজন, তবে আমাদের এ কাজটি ন্যানোটেকনোলজিতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও ভাইরাল ইলেক্ট্রনিক্সের ভিত্তিতে তৈরি যন্ত্রপাতির জন্য জেনারেটর তৈরির ক্ষেত্রে এক আশাপ্রদ আবিষ্কার”", একথা বলেছেন বিজ্ঞানী সিউং-উক লী যিনি বার্কলে এর জৈবপ্রকৌশল বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপক । এ গবেষণায় তাকে সাহায্য করেছেন বার্কলের আরো দুই শিক্ষক রমামূর্তি রমেশ এবং বিউং ইয়াং লী।
পাইজোইলেক্ট্রিক প্রভাব ১৮৮০ সালে আবিষ্কৃত হওয়ার পর থেকে এখনো পর্যন্ত ক্রিস্টাল, সিরামিক, হাড়, প্রোটিন এবং ডিএনএ তে এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। ইলেক্ট্রিক সিগারেট লাইটার, স্ক্যানিং প্রোব মাইক্রোস্কোপ ইত্যাদি যন্ত্রপাতি তৈরিতে এই প্রভাব ব্যবহৃত হয়। তবে পাইজোইলেক্ট্রিক যন্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত উপাদান সমূহ বিষাক্ত এবং এগুলো নিয়ে কাজ করাও বেশ অসুবিধাজনক যা এ প্রযুক্তির বহুল ব্যবহারের একটি অন্তরায়।
লী এবং তার সহযোগীরা ল্যাব এ ব্যবহৃত ভাইরাসগুলোর আরও ব্যাপক ব্যবহারের উপায় খুঁজছিলেন। এম১৩ ব্যাক্টেরিওফাজ শুধুমাত্র ব্যাক্টেরিয়াকেই আক্রমণ করে এবং এটি মানুষের জন্য ক্ষতিকরও নয়। যেহেতু ভাইরাসটি কয়েক ঘন্টার মধ্যেই মিলিয়ন মিলিয়ন বংশবৃদ্ধি করতে পারে কাজেই এর সরবরাহেও কোন ঘাটতি হবার সম্ভবনা নেই। এটি সহজে জেনেটিক্যালি পরিবর্তন করা সম্ভব এবং এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নিজেদেরকে দণ্ডাকৃতির ঝিল্লিতে সুবিন্যস্ত করে।
উপরিল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলোই ন্যানো কাঠামো তৈরির জন্য বিজ্ঞানীরা খুঁজে থাকেন। তবে বার্কলের বিজ্ঞানীদের সর্বপ্রথমে বের করতে হয়েছিল যে এম১৩ ব্যাক্টেরিয়া পাইজোইলেক্ট্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। এ ব্যাপারে লী রমেশের দ্বারস্ত হলেন যিনি ন্যানো স্কেলে ঝিল্লির উপর বৈদ্যুতিক প্রভাব এর উপর একজন বিশেষজ্ঞ। তারা এম১৩ ভাইরাসের একটি ঝিল্লির উপর তড়িৎক্ষেত্র প্রয়োগ করলেন এবং বিশেষ অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে এর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করলেন। ভাইরাসের প্যাঁচানো প্রোটিনের প্রলেপের মোচড় দেখে তারা নিশ্চিত হলেন পাইজোইলেক্ট্রিক প্রভাবের ব্যাপারে।
পরবর্তীধাপে বিজ্ঞানীরা ভাইরাসের পাইজোইলেক্ট্রিক প্রভাব বৃদ্ধির ব্যাপারে সচেষ্ট হলেন। তারা জেনেটিক ইঞ্জিনারিয়িং এর মাধ্যমে ভাইরাসের প্যাঁচানো প্রোটিন প্রলেপের একপ্রান্তে চারটি ঋণাত্মক আধানযুক্ত এমিনো এসিড সংযুক্ত করলেন। এটি প্রোটিনের ধনাত্মক এবং ঋণাত্মক চার্জের ব্যাবধান বৃদ্ধি করে যা পরিণামে ভাইরাসের মধ্যে ভোল্টেজ বৃদ্ধি করে। বিজ্ঞানীরা পদ্ধতিটি আরও উন্নত করার জন্য ভাইরাসের ঝিল্লির একস্তরের উপর অন্যটি গাদা করে সাজালেন। দেখা গেল ২০ স্তর পুরু গাদাই সবচে বেশি পাইজোইলেক্ট্রিক প্রভাব প্রদর্শন করে।
এবার পদ্ধটির প্রয়োগের জন্য বিজ্ঞানীরা ভাইরাসের সাহায্যে একটি পাইজোইলেক্ট্রিক জেনারেটর তৈরি করলেন। তারা জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত ভাইরাসের জন্য এমন অবস্থা তৈরি করলেন যাতে ভাইরাসগুলো এক বর্গসেন্টিমিটার আকৃতির একটি ঝিল্লিতে একাধিক স্তরে সুবিন্যস্ত হতে পারে। এই ঝিল্লিটি লিকুইড ক্রিস্টাল ডিসপ্লে এর সাথে তারের মাধ্যমে সংযুক্ত দুটো স্বর্ণ প্রলেপকৃত ইলেক্ট্রোডের মাঝে বসানো হয়।
যখন জেনারেটরে চাপ প্রয়োগ করা হয় তখন এটি ছয় ন্যানোএম্পিয়ার এবং ৪০০ মিলিভোল্ট পর্যন্ত বিভবের বিদ্যুৎ উৎপাদান করতে পারে যা ডিসপ্লেতে যেকোন একটি সংখ্যা প্রকাশের জন্য যথেষ্ট।
লী জানিয়েছেন এই বাহ্যিক প্রয়োগের উপর ভিত্তি করে তারা এটিকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করছেন। জৈবপ্রযুক্তিতে ব্যবহৃত সরঞ্জামের জন্য প্রচুর পরিমানে জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত ভাইরাসের উৎপাদন হয়ে থাকে, তাই ভাইরাসের সাহায্যে তৈরি পাইজোইলেক্ট্রিক বস্তু মাইক্রোইলেক্ট্রনিক্সের জগতে এটা এক নতুন অধ্যায় সূচনা করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
সূত্রঃ সায়েন্স ডেইলি
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মে, ২০১২ সকাল ৮:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


