somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অণুগল্পঃ "এ্যালার্জি"

২২ শে অক্টোবর, ২০১৫ রাত ৮:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অফিস থেকে ফিরেই শার্টটা খুলে ফ্যানের নিচে বসে হাঁপাতে লাগলাম। একদম ঘামিয়ে গেছি। বাইরে কি বিচ্ছিরি রোদ,একটা দিনও ছাতা নিতে মনে থাকে না, ধুর!!

আমি চোখ বন্ধ করে সোফায় গা এলিয়ে বসে আছি, হঠাৎ শব্দ শুনে চোখ খুলে দেখি মিতু আমার সামনের টেবিলে একগ্লাস পানি রেখে চলে যাচ্ছে। তার শাড়ির আচল কোমরে গোঁজা। কপালে ঘাম। রান্না ঘরে ছিলো বোঝা যাচ্ছে।

"রান্না শেষ হয় নি?" আমি পেছন থেকে ডাকলাম, কন্ঠে অনিচ্ছাকৃত ঝাঁঝ

মেয়েটা পেছনে ফিরেীকটু লজ্জিত ভংগিতে বললো "এই তো প্রায় শেষ ... একটু বসো, আমি এখুনি দিচ্ছি"

স্কাল থেকে অফিসের কাজের চাপ,বাইরের গরম,পেটের ক্ষুধা সব মিলিয়ে মেজাজটা এত গরম হয়েছিলো যে হঠাৎ চিড়িক করে মাথায় রাগ উঠে গেলো, মুখ বাঁকিয়ে বললাম "আমি সেই সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সারা দুনিয়ার ঝামেলা ভেংগে আসলাম আর আপনি দুইটা পদ রান্না করতে পারলেন না? কি করেছেন বসে বসে? খালি টিভি দেখা, না?"

মেয়েটা আহত গলায় বলার চেষ্টা করলো "চুলায়গ্যাসের প্রেশার ছিলো না তো..."

আমার হঠাৎ বিতৃষ্ণা লাগতে থাকে, আমি তাকে থামিয়ে দিলাম "ইউ নো হোয়াট? আমি কিছু শুনতেও চাই না। যাও, ধীরে সুস্থে রান্না করো। যাস্ট মরে যাবার আগেই পারলে ডাক দিও, ওকে?" আমি তার দিক থেকে চোখ সরিয়ে টিভির রিমোটের দিকে হাত বাড়ালাম। টাইম তো পাস করতে হবে!! মেয়েটা ধীর পায়ে রান্না ঘরের দিকে চলে গেলো। আমার মেজাজ অকারণেই চড়তে লাগলো তার এই কষ্ট পাওয়াটুকু দেখে।

বাবা মা দেখে শুনে আমাদের বিয়ে দিয়েছেন সেইটা সমস্যা না। বিয়ের আগেই প্রেম ভালো বাসা না থাকলেও বিয়ের পরে নাকি সব ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু সমস্যা হলো আমি মেয়েটাকে কিছুতেই ভালোবাসতে পারছিনা। একসাথে থাকছি, একই বিছানায় ঘুমুচ্ছি, দিন গুলো পার হয়ে যাচ্ছে। মেয়েটা আহামরি সুন্দর নয়, কিন্তু কমনীয়তা আছে। বাংলায় অনার্স করা সংসারী‬ টাইপের মেয়ে। নরম স্বভাবের। অপছন্দ করার কোন কারণ নেই। তাও আমি কেন জানি মেয়েটার সাথে কানেক্ট করতে পারছি না। সম্ভবত আমি আরো উচ্ছ্বল, ফানি সেন্স অফ হিউমার ওয়ালা কাউকে চাইছিলাম মনে মনে। যার সাথে আমি মুভি, সিরিয়াল, ফেসবুক ইত্যাদি নিয়ে কথা বলতে পারবো। যে আমার ফান গুলা ধরতে পারবে। উলটা এই মেয়েটা একদমই চাপা স্বভাবের। আমার সাথে কোন কিছুতেই তার পছন্দ মিলেনা। মনে হচ্ছে বাকিটা জীবন এরকম বিরক্ত হয়েই কাটিয়ে দিতে হবে।

টিভির দিকে তাকিয়ে থেকেই ক্লান্তিতে চোখ লেগে এসেছিলো, মিতুর ডাক শুনে ঘুম ঘুম ভাব চটকে, "খেতে আসো, খাবার দিয়েছি"

আমি বহু কষ্টে সোফা থেকে উঠে ডাইনিং এ গেলাম। খিদা নষ্ট হয়ে গেছে। বিরক্ত লাগছে। কিন্তু টেবিলের দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠলাম। পদ দুইটা না না। পদের সংখ্যা আরো বেশি। আমি চরম বিরক্ত গলায় বসতে বসতে বললাম "এত আয়োজন করতে কে বলেছে?"

সে আমার প্লেটে ভাত তুলে দিতে দিতে বললো "আম্মা কাল রাতে ফোনে কথায় কথায় বললেন তোমার নাকি গরুর কালো ভুনা খুব পছন্দ। আর বেগুন দিয়ে চিংড়ি। তাই উনার থেকে রেসিপি নিয়ে ট্রাই করলাম একটু"

আমার গলা একটু নরম হয়ে আসে, আমি লাউয়ের বাটির দিকে দেখিয়ে বললাম "এটা কার জন্য? আম্মু বলেনি আমার লাউ পছন্দ না?"

সে একটু থেমে নিচু গলায় বললো "আসলে আমার গরুর মাংস, বেগুন, চিংড়ি সব কিছুতেই প্রচন্ড এলার্জি আছে। ওষুধ খেয়েও কাজ হয় না। তাই আমার জন্য লাউ"

মেয়েটার কিছুটা লজ্জিত কিছুটা অপ্রস্তুত চেহারাটার দিকে আমার ভেতরে কি জানি নেড়ে চেড়ে গেলো। বেচাড়ি এই কিচেনের গরমের মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজে খেতে পারবে না এরকম জিনিস গুলো রান্না করেছে আমার জন্য। আর আমি রান্না করতে দেরি হওয়ায় কি না কি বলেছি এতক্ষণ ধরে!! আমি মাংসের, চিংড়ির বাটি সরিয়ে লাউয়ের বাটিটা নিজের দিকে টেনে নিলাম। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। লাউয়ের তরকারি ভাত মাখিয়ে এক লোকমা তার মুখের কাছে নিয়ে চোখে চোখ রেখে বললাম "যে রেঁধেছে সেই আগে খাবে, হা করো"

মেয়েটা খুবই লজ্জিত ভংগিতে অল্প অল্প করে খাচ্ছে আমার হাত থেকে। চাপা স্বভাবের মেয়েটার বিস্ময়ে ভরা চোখ দুটো ভর্তি পানি। মুছতেও পারছে না। হঠাৎ আমি টের পেলাম এই যে চোখে পানি, এই মুখে তুলে খাইয়ে দেয়াটা, এই যে লাজুক কান্না মাখা হাসি- এগুলোই তো ভালোবাসা। অযথাই ভালোবাসার সংজ্ঞা খুঁজে মরি আমরা।।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে অক্টোবর, ২০১৫ রাত ৮:০০
১৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মহাজন জিন্দা হ্যায়!!!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৭



মনে পড়ে, ঠিক এক বছর আগে গত বছর এই সময়ের দিকে ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে যাচ্ছিল 'মহাজন স্যারকে আরও ৫ বছর বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে দেখতে চাই' টাইপের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম অটুট, মৌলভিরা নন: সমালোচনা মানেই অশ্রদ্ধা নয়

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৬



নবী ইউসুফ (আ.)-এর সময় মিসরীয়রা 'আমুন' দেবতার পূজা করত। মিসরের শাসক আপোফিসকে তার পিতা তৎকালীন পুরোহিতদের কুচক্রী স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এই পুরোহিতরা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজ্যসভা থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৈশব- কৈশোর বেলার গল্প

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৭



আমাদের শৈশব ছিলো অতিশয় প্রাণপ্রাচুর্যময় যদিও শৃঙ্খলাপূর্ণ।
একালের মতো বিলম্বিত শয্যা ত্যাগ রীতিমতো গর্হিত অপরাধ! শয্যা ত্যাগ করেই বিশেষত অবকাশের দিন গুলোতে নিয়মিত গন্তব্য ছিলো কারো কারো খেলার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ পাখির জগত

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:০০



টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।

টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।

বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোহভঙ্গ!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:৪৮



পদ্মা সেতু নিয়ে কত অপবাদই না দেয়া হয়েছিলো! বলা হয়েছিলো- বাংলাদেশ কখনো নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় প্রকল্প করতে পারবে না। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ায়। অথচ শেষ পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×