somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রথম বাবা দেখা

২৯ শে জুন, ২০১৪ বিকাল ৪:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এক মন খারাপের দিনে চায়ের কাপে চিন্তিত চুমুক দিচ্ছিলাম। হটাত চোখে পড়ল আমার চেয়েও বেশি মন খারাপের এক মুখচ্ছবি। সিগারেটের ধোঁয়া মুখ দিয়েও বেরোচ্ছে আবার নাক দিয়েও বের হচ্ছে ছেলেটার। পরনের কি ছিল খেয়াল করার মানে নেই। হাত বাড়িয়ে দিলাম হাসিমুখে, 'কেমন আছেন?'
- ভালোই আছি। কে আপনি? আমাকে চেনেন? আমি কিন্তু আপনাকে চিনি নাই।
একসাথে বেশি প্রশ্ন করা ভালো না ।তারপরও আমি মেনে নিলাম, বুঝলাম সে অপরিচিতে বিব্রত।
-আমি এখানেই থাকি। এখানেই চা খাই। আমি বিপ্লব। আমি আপনাকে চিনি না, কিন্তু এখানে যারা আসে সবাই আমাকে চেনে। তাই ভাবলাম আপনিও আমাকে চেনে রাখেন।
- আমি হৃদয়। চট্টগ্রাম থেকে ট্রান্সফার হয়ে ঢাকায় এসেছি পড়াশোনা করতে ।
- আচ্ছা। ভালো।

এভাবে একদিন, দুদিন, তিনদিনে আমাদের মধ্যে ভালোই সম্পর্ক হয়ে গেল। আমরা একসাথে বাসা থেকে বের হয়ে একসাথে চায়ের দোকানে ঢুকে একসাথে চা খেয়ে একসাথে বের হয়ে একসাথে রেল লাইন ধরে হেঁটে বেড়াই। আমি যেহেতু লেখালেখি করি, আমি সবসময় অন্যের গল্প শুনি কিন্তু নিজের গল্প কাউকে বলি না। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে তার বলে যাওয়া একটা গল্প শুনলাম। ও নিজেই নিজের গল্পের নাম দিল," প্রথম বাবা দেখা"।


আমার মা-বাবার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় যখন মায়ের গর্ভে আমার বয়স ৫ মাস। মা আমাকে নিয়ে মামার বাড়ি চলে আসে । আমার নানু বেঁচে আছে এখনো, তাই মামা-মামীদের কাছে আমার আর মায়ের কদর আছে এখনো। মামার বাড়ীতে থাকলে কোন মানুষের জন্যই পথচলা মসৃণ হয় না। আমারও মসৃণ ছিল না। অনেক কথা শুনে বড় হয়েছি, ক্লাস টেনে উঠে আস্তে আস্তে ফিডব্যাক দেয়া শুরু করি। টুকটাক রাজনীতিতে সম্পর্ক রাখা শুরু করি , আর কেউ কিছু বলে না।

তখন কলেজে পড়ি।আমার বয়স আঠার উনিশের মাঝামাঝি। কলেজে উঠলেই গায়ে গরম চলে আসে কিন্তু। একবার আমাদের গ্রামের এক মাতব্বরের ছেলেকে মেরেছিলাম। সামান্য ঝগড়া থেকে ও আমার মাকে গালি দিয়েছিল, আমি সহ্য করতে পারি নাই। সকালে ওকে একা মেরেছিলাম আর বিকালে বন্ধুবান্ধবসহ মেরেছিলাম। আমি দুবারই ওর মাথায় আর মুখে হাতুড়ি দিয়ে মেরেছি। হাত থেকে হাতুড়ি পড়ে যাবার পর হাত দিয়ে ঘুষি দিছি, খুব মারছি। ওকে দ্রুত হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া হয়। মনের জেদ মিটে নাই দেখে আবার মারার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তখনই খবর পেলাম ওরা আমাকে মারতে আসছে। চারদিকে ফোন দিয়ে বন্ধুদের খবর দিলাম। সবাই সাথে সাথে চলে আসায় আর আমাকে কিছু করতে পারেনি। এদিকে আমার মা প্রায় পাগল হয়ে যাবার মত অবস্থা। তারপর বিশাল সালিশ বসবে বলে কথা হচ্ছে। আমার নাকি বিশ হাজার টাকার মত জরিমানা করবে। আমি তখন পাগল হয়ে গেছি প্রায়। আমি এত টাকা কোথা থেকে দিব? মা কত কষ্ট করে আমাকে পড়ালেখা করান তার উপর খেতে কষ্ট হয়। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম সালিশের বিচার না মেনে ইউনিয়ন পরিষদে আপিল করব। আমি আসলে জানতাম না কি ঘটতে যাচ্ছে।
এদিকে আমার সাথে না পেরে আমাকে গালাগালি করা হচ্ছে। কিন্তু একটা গালি শুনে আর ঠিক থাকতে পারলাম না , "জারজ"। যদিও আমি আমার বাবাকে দেখি নাই কিংবা বাবার সাথে কখনো আমার কথা হয় নাই, তবুও আমি জানতাম যে আমার বাবা আছে। তারমানে আমি জারজ না। কিন্তু সবাই জানেনা কিংবা জানলেও আমাকে গালি দেয়ার জন্যই বলা হইছে। আমার ছোট ফুফু আবার আমার মামার বাড়ির পাশেই বিয়ে হইছে। উনি সব কিছু কার কাছে শুনে বাবাকে ফোন করে বললেন, এটা আমি জানতাম না।
পরদিন সকালে বিশাল সালিশ বসল। ঐ দোকানেই যেখানে আমি ছেলেটাকে মেরেছি। গ্রামের চেয়ারম্যান যদিও আমার ফেভারে ছিল কিন্তু মাতব্বরের হুমকির মুখে উনি আসলেন না। হঠাত করে দশ বারটা মোটরবাইক আর তিন চারটা সি এন জি চালিত বেবীট্যাক্সি আসল। সবমিলিয়ে ত্রিশ জনের মত হবে। আমার পাশের বাড়ির একজন আমাকে চিনিয়ে দিলেন আমার বাবা কে। আমি গেলাম বাবার কাছে। চেহারা আমার মতই, ক্লিন শেভড, পিছন দিকে ফিরানো চুল, হাতে সিগারেট। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন ,'কেমন আছ?"
- ভালো। ভেবেছিলাম বুকে ঝরিয়ে ধরবে। ধরে নাই। যাইহোক মরুভূমিতে দু এক ফোঁটা পানি পড়লেই কি আর না পড়লেই কি???????
বিচার আমার পক্ষে আসল। আমাকে গালাগালের অপরাধে মাতব্বরের ছেলেকে বকাঝকা করা হল। আর আমাকে বলা হল ছেলেটাকে মুছে দিতে, দিলাম।
এই প্রথম আমি আমার বাবাকে দেখলাম। পুরাই আমার মত। একটু রুক্ষ। মুখে হাসি মনে হয় কখনোই ছিলো না।
তারপর অনেকবার দেখা হল, কথা হল, কিন্তু সেই প্রথম দেখার অনুভুতি পাই নাই। আমার প্রথম সিগারেট খাওয়া ছিল ২০১০ এর বাবা দিবসে, হাতে সিগারেট রেখেই মাকে ফোন দিলাম, "মা, বাবার কথা খুব মনে পড়ছে"
মার উত্তর ছিল অনেক মায়াময়," আমি তোর বাবা না?" হয়ত কথাটা বলার পর মা কেদেছে।কিন্তু আমি আর হতাশ হইনাই।
বিপ্লব, একটানা কথা গুলা বলে ফেললাম। তোমাকে কোন প্রশ্ন করার সুযোগ দিই নাই।
আমি রেললাইনের পাশের ধূসর ঘাস গুলর দিকে তাকিয়ে দু এক ফোঁটা চোখের জল ফেলেছি। আমি আমার অতীতের দিকে তাকালে ছেলেটা আমার গল্পই আমাকে শুনালো। আসলে গল্প না, আক্ষেপ।

অবশেষে আমি আশরাফ, আর বিপ্লব আমার বন্ধু। :( :( :( :( :( :(
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সাদা নীল জার্সি

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ২৩ শে জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪২


গায়ে ভাই রে সাদা নীল জার্সি
গন্ধ বাতাসে উম্মুখ হয়ে আছি;
কখন হবে- কণ্ঠ নালীর মিছিল-
তারপর- তারপর- সজোরে কিক
গোল- গোল শব্দটা আনন্দ মুখর!
আমার জার্সির রঙগুলো আত্মহারা
রাতজাগা পাগলাপাড়া ফুটবল খেলা
নয়ন জলে টলমলে- স্মৃতির... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাইরে এসো

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ২৩ শে জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৬

এসো, বৃত্তবদ্ধ খাঁচা ছেড়ে বাইরে এসো,
কল্পনাতীত উদাত্ত আকাশে চোখ পেতে
দুজনে বসি ঘাস গালিচাতে আজ পাশাপাশি ,
দেখ, পুস্প-ফলে বৃক্ষদের একাগ্র তপস্যা
দেখ, পূর্নিমাকে অর্থ দেয় বিপরীত অমাবশ্যা ।

দেখ, সাপ ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনা ও তাঁর মন্ত্রীবর্গের দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত নয় কি?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৩ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৪

"হে কাবা! তুমি কতই না উত্তম, তোমার সুঘ্রাণ কতই না চমৎকার! তোমার মর্যাদা কতই না মহান! তবে সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে একজন মুমিনের জান,... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্পর্শে_ _ _ _ _

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ২৩ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০০

-কি পাও আমার মাঝে ?
-দুটি চোখ।
যেখানে আমার সর্বসুখ নিহিত,
ছমছমে সন্ধ্যা, ভয় জাগানিয়া অন্ধকার রাত,
এসব বৃথা হয়ে যায়,
তোমার একটি ছোঁয়ায়।
তোমার চোখের একটি পলক, আমার হাজার বছর,
আর কি... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেসুরো গলায় গান গাওয়ার অপরাধে

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ২৩ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:০৯


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বাংলা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী মো. তাশরিক-ই-হাবিবকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে

যে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পপুলিস্ট দিক ও ন্যায়বিচারের দিক উভয়ই খেয়াল রাখতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×