আমাদের দেশপ্রেম কেন জানি ফাও মনে হয়। ক্রিকেট নিয়ে আমরা যা করলাম এই কয়দিন! শত্রু-মিত্র প্রায় গলাগলি। পরীক্ষার সময় হরতাল অবরোধ যেখানে শিথিল হয় না, মানুষ মরে গেলে, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বসে গেলেও যেখানে ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক কর্মসূচি চলমান থাকে সেখানে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে পারায় বিজয় উতসব করার জন্য তাতেও বিরতি টানা হয়েছে। জেল-জুলুমে জর্জরিত দলের নেতারাও পথে নেমে বিজয় উতসব করছেন। হ্যা, ক্রিকেটে ইংল্যান্ডকে হারানো একটা বড় এচিভম্যান্ট বাংলাদেশের জন্য। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু তার মানে এই বিজয়কে ব্রিটিশদের ২/৩ শত বছরের শাসন-শোষণের জবাবের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধ ভাবাটা কতটা মুর্খামী বা আবেগ সর্বস্ব কথা-বার্তা তার সীমা-পরিসীমা আমার বোধে আসে না। অন্যদিকে জামশেদ নামে এক পাকিস্তানি ক্রিকেটারের ফেক একাউন্ট থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেটার রুবেলকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য এবং বাঙালির বিজয় উতসবকে ৭১ এর বিজয় উতসব এবং ভারতের সহায়তা ছাড়া বিজয়ের সাথে তুলনা করায় আমাদের পিন্ডি চটকে গেছে। প্রতিবাদে ফেসবুক/ব্লগের নিউজ ফিডে তো এক ধরনের বন্যাই নেমে গিয়েছিল। তাকে নিয়ে নিউজের পর নিউজ হয়েছে। দেশের প্রথম সারির অনলাইনগুলোর মধ্যে বাংলানিউজ অন্যতম একটি। তারা নাসির জামশেদের ব্যক্তিগত জীবনী ঘেটে সে কবে কবে শাস্তি পেয়েছিল তা নিয়েও সংবাদ করে ফেলেছে। ভাল কথা। অন্যদিকে ভারতীয় (স্যাটায়ার নয়) জি নিউজ রুবেলকে কটাক্ষ করে এমনি একটা নিউজ ছাপায়। কই আমরাতো এ ব্যাপারে তেমন উচ্চবাচ্চ করলাম না! তবে কি ওরা আমাদের শত্রু বলে তাদের হাতে ধর্ষিত হতে চাই না আর অন্যদিকে বন্ধু দেশের কাছে বলাতকার হওয়ার জন্য সর্বদাই কাপড় উঠিয়ে প্রস্তুত হয়ে বসে থাকি? এ আমাদের কেমন দেশপ্রেম?
আমাদের দূর দেশের শত্রুদের সীমান্তবাহিনীতো আমাদের দেশের সাধারণ গরু ব্যবসায়ীদেরকে গুলি করতে পায় না, উলংগ করে পিটায় না, সীমানা অতিক্রম করে এসে ধরে নিয়ে যায় না। আমাদের দেশকে অনুগত করে ধরে রাখতে না পারার ব্যর্থতায় আমাদের সফলতা দেখে না হয় কিছু ক্ষোভের প্রশমন ঘটায় রমিজ রাজারা। কিন্তু তারাতো শারীরিকভাবে কিছু করতে পারে না। কিন্তু যারা প্রতিবেশী হয়ে, বন্ধুর বেশে আমাদেরকে গুলি করে, হত্যা করে তাদের বিরুদ্ধে আমাদের উপযুক্ত প্রতিবাদ কই? তাদের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধেও কেন আমরা টু শব্দটি করতে পারি না? আমরা আসলেই কি দেশপ্রেমিক হতে পেরেছি?
আমরা এত আবেগপ্রবণ কেন? ক্রিকেটে একটি দেশেকে হারানো কি কখনো যুদ্ধ করে দেশ জয়ের মত বিষয়? ধরা যাক, সামনের ম্যাচে আমরা ভারতকেও হারাতে সক্ষম হলাম, তাতে কী আমরা বিএসএফের হাতে নির্যাতিত হওয়া থেকে মুক্তি পাব? না, মোটেও তা নয়। মূলত ক্রীড়া মানেই খেলার বিষয়, স্রেফ বিনোদন। কিন্তু সেটাকে এত উচু পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, ম্যাচ জিতে ব্রিটিশদের শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ ভাবা মূলত আমাদের মানসিক দৈন্যতারই সাক্ষর। জায়গামত কিছু করতে না পারার অব্যক্ত বেদনা আমরা ঢাকতে চাই ক্রিকেটে জয়ী হয়ে। অথচ মানসিক দিক দিয়ে সর্বদা আমরা ব্রিটিশদেরই গোলামী করছি। তাদের দেশে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছি। ক্রিকেটের বিজয় উল্লাস হবে, সেই সাথে এটাকেই প্রাকটিক্যাল বিজয় ধরে নিয়ে মগ্ন না হয়ে দেশকে শান্তি, শৃংখলা ও ঐক্যবদ্ধ করে তুলে আসল বিজয়ের দিকে ধাবিত হওয়াই হবে আমাদের দেশপ্রেমের প্রকৃত নিদর্শন। অথবা এই সস্তা আবেগ ধীরে ধীরে আমাদেরকে আফিমের মত বুদ করে দেবে। বিশ্বের বুকে আমরা একটা হাস্যকর আবেগসর্বস্ব জাতিতে পরিণত হবো। এই আফিম থেকে আমাদের মুক্তি মিলুক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




