somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অপ্রাসঙ্গিক প্রাসঙ্গিকতা

০৩ রা এপ্রিল, ২০২৩ রাত ২:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


‘’অপ্রাসঙ্গিক বলে অনেক কিছু দেখেও না দেখার ভান করে আমরা এড়িয়ে যাই । আবার প্রয়োজনীয় অনেক বিষয়ে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও আমাদের মগজে বা গরজে ধরেই না । আমরা পরশ্রীকাতর, উদাসীন এবং অহংকারী । নিজের শক্তি সামর্থ্য দিয়ে অন্যের সামর্থ্য মাপার চেষ্টা করি । কাজী নজরুল ইসলাম যথার্থই বলেছিলেন;
‘’আমরা সবাই পাপী;
আপন পাপের বাটখারা দিয়ে
অন্যের পাপ মাপি ! ‘’

আমি অবশ্য পাপ মাপার কথা বলছিনে, বলছি সামর্থ্য মাপার কথা । আমাদের মাঝে এমন লোকের অভাব নেই যারা নিজের পকেটের অবস্থা দিয়ে অন্যের অবস্থা বিবেচনা করি । কারো কাছ থেকে দুচার হাজার টাকা ধার করে ফেরত দিতে ভুলে যাই বা দিতে গড়িমসি করি । লজ্জা ফেলে পাওনাদার যদি সেই টাকা চেয়ে ফেলে, তাইলে ভাবি ব্যাটা ছোট লোক! এই কটা টাকার জন্য ধর্না দিচ্ছে ! অথচ আমরা বুঝতে চাই না যে, এই অল্প কটা টাকায় এই দুর্মূল্যের বাজারে এখনো কারো কারো সংসার চলে, চালাতে হয় । অবশ্য হাজার কোটি টাকাও যার কাছে মামুলি মনে হয় সেও মরে মাটি হয় আবার পথের ভিখেরি যে দশ টাকা দান পেলে অনেক মনে করে সেও মরে মাটি হয় । একজন দিন মজুরের কাজ করে ভালো খেতে পারে অথচ একজন চাকুরে কেন সেটা পারে না তা ঐ মুজুর লোকটির মগজে ধরে না।যদিও সব দিন মজুরের মুজুরি এক নয় আবার সব চাকুরের মাইনেও সমান নয় ।

এক গ্রামে মসজিদে পাঞ্জেগানা নামাজ পড়ানোর জন্য একজন ইমাম রাখা হোল । সাব্যস্ত হোল, সমাজের প্রতিটা ঘরে ধারাবাহিক ভাবে ইমাম সাব মাসে একদিন করে খাবেন । সামর্থ্য অনুযায়ী সকলে ইমামের বেতনের জন্য মাসিক চাঁদাও দেবেন । সেখান থেকে ইমামের বেতন হিসেবে মাসে ছয় হাজার করে দেওয়া হবে, বাড়তি টাকা ফান্ডে জমা থাকবে । কেউ পঞ্চাশ, কেউ একশ, কেউ পাঁচশ আবার কেউ বা হাজার টাকা করে দিতে লাগলো । অল্প কয়েক ঘর লোকের মধ্যেও কিছু লোক খাবার ও টাকা দুটোই দিতে অপারগ । যারা দিচ্ছিলো দুয়েক মাস পরে তাদেরও ভীমরতি ধরলো, অনেক বার বলে কয়ে টাকা আদায় করতে হয় তাদের কাজ থেকে । যারা খাবার দিচ্ছিলো তাদের মধ্যে পাঁচ ঘর থেকে যা খাবার আসতো তা নাকি মুখে দেবার যোগ্য না । জনৈক মুরুব্বি তা প্রতক্ষ করে ঐ পাঁচ ঘরের খাবার নিষিদ্ধ করেছেন । কেন বাপু? টাকা যখন সবাই সমান অঙ্কের দিতে পারে না খাবারও তো সমান মানের হবার কথা নয় । আপনি ভাবছেন, মাসে একদিন খাওয়াবে, সে খাবারের মান খারাপ হবে কেন? আরে বাপু, আপনি না হয় সপ্তাহে তিন দিন মাংস খান, খবর নিয়ে দেখেন ও বেচারা হয়তো শুধু ঈদ উপলক্ষে মাংস খায় । দয়া করে আপনার গোলার ধান দিয়ে অন্যের কোলার ধান মাপতে যাবেন না ।

আমার এক সহকর্মীকে (শ্রমিক) যদি জিজ্ঞেস করা হতো, আজ দুপুরের ভাত কি দিয়ে? তার হাসি মাখা জবাব, খাসির মাংস । প্রতিদিনই সে খাসির মাংস দিয়ে মধ্যান্ন ভোজ সম্পন্ন করে । একদিন তার সম পদের একজন জোর করে তার খাবারের বাটি খুলে ফেলল সত্যি সত্যি কি আছে দেখবে বলে। দেখলো, একটু সবজি আর একটু আলু ভর্তা সাথে কাঁচা লঙ্কা । সহকর্মী জিজ্ঞেস করলো, কিরে তোর খাসির মাংস কই? সে হাসি মাখা জবাব দিলো, বউ আজকে খাসি রান্না করে সারতে পারেনি ! তার মত শ্রমিকের পক্ষে রোজ রোজ তো দূরে থাক বছরে একদিনও খাসির মাংস কিনে খাওয়া অসম্ভব । আমরা সামর্থ্যবানরা নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যের সামর্থ্যকে কটাক্ষ করি, বিদ্রূপ করি । কিন্তু, সে তার নিজের সামর্থ্যকে ব্যঙ্গ করে পরোক্ষ ভাবে সামর্থ্যবানদেরই কি ব্যঙ্গ করেনি?

আরও একটি কাল উপযোগী অপ্রাসঙ্গিক আলোচনা হওয়া দরকার । এখন রমজান মাস চলছে । মুসলমানদের সংযম আর আত্মশুদ্ধির মাস । রাত দুটো বাজতে না বাজতে পাড়া মহল্লার প্রতিটি মসজিদের মাইকে মাইকে ডাকা ডাকি শুরু হয়ে যায় । একবার দুবার নয় বহুবার ! কেউ সুরা কেরাত বলে, কেউ ওয়াজ নসিহত করে, কেউ গজল গায়, আবার কেউ গজল বা ওয়াজের রেকর্ড বাজিয়ে কান ঝালাপালা করে দেয় । এতে করে অন্য ধর্মের যারা আছে তারা যে কি ভাষায় গালি গালাজ করে তা তারাই ভালো জানে । মুসলমান পরহেজগার লোকজন যে একটু শান্তিতে তাহাজ্জুতের নামাজ পড়বে তারও উপায় নেই । গত রাতের কথাই ধরুন, এক মসজিদের মাইকে বাজছে, মা ওগো মা……… আরেক মসজিদের মাইকে বাজছে ভাই বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানী…… ইবাদতে মশগুল হবার উপায় আছে ?

উমর (রা.)-এর যুগে জনৈক ব্যক্তি মসজিদে-নববীতে এসে প্রতিদিন বিকট আওয়াজে ওয়াজ শুরু করে, এতে পাশেই হুজরায় অবস্থানরত হজরত আয়েশা (রা.)-এর কাজে ব্যাঘাত হতো, তাই তিনি উমর (রা.)-কে বিষয়টি অবহিত করলে উমর (রা.) ওই লোককে নিষেধ করে দেন। লোকটি কিছুদিন পর আবার ওয়াজ শুরু করলে উমর (রা.) এসে তাকে শাস্তি দেন।’ (আখবারু মাদিনা : ১/১৫)

ইদানিং রুচি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া বেশ সরব । তাই আমাদের রুচি আর রুচি বোধ নিয়ে কটা কথা বলার লোভ সামলাতে পারলাম না । কালের পরিক্রমায় আমাদের রুচিতে বেশ পরিবর্তন হয়েছে । পাড়ায় মহল্লায় নানা উপলক্ষে বিনা উপলক্ষে বিকট শব্দে সাউন্ড বক্সে ডিজে মিউজিক বাজানো পরিবর্তিত রুচি বোধের একটি উদাহরণ । একদিন এশার ওয়াক্তে সবে মাত্র জামাতে ফরজ নামাজ শেষ হয়েছে পাশের গ্রাম থেকে শুরু হোল বিকট শব্দে মিউজিক বাজানো । ভাবলাম, পাশের গ্রামে তো মুসলিম ব্যাতিত অন্য ধর্মের কোন মানুষ নাই তাহলে এহেন কর্ম কাদের হতে পারে ? সে হিসেবে তো তাহলে গ্রামের হিন্দুরাই ভালো আছে । এরা বিভিন্ন পূজা পার্বণে গান বাজনা বাজালেও অন্তত মুসলমানদের ইবাদতের সময় বন্ধ রাখে ।

রমজান এলে আমাদের রুচি বহুগুণে বেড়ে যায় । যদিও ধনি নির্ধন ভেদে রুচির ভিন্নতা রয়েছে । নির্ধনের রুচি বৃদ্ধি হলেও উপার্জনের স্বল্পতা দরুন অল্পতেই তুষ্ট থাকতে হয় । গত রমজানের কোন এক বিকেলে দুঃসম্পর্কের এক আত্মীয়ের সাথে হঠাৎ দেখায় জোর করেই তার বাসায় নিয়ে যায় । ইফাতারিতে বাহারি রকমের নানা পদ, বাজারে পাওয়া যায় এমন কোন ফলেরই বুঝি কমতি নাই । যেন তেন উপার্জনের টাকায় এলার্জি আছে জেনেই গৃহকর্তা ইফতার সাজাতে সাজাতেই বললো, নামাজ কালাম পড়ছি, রোজা রাখছি ! সব বাদ দিয়ে দিয়েছি, আর কত! বাড়ি ভাড়ার টাকা দিয়েই দিব্যি চলে যায় । ভাবলাম বাড়ি ভাড়ার টাকা হালালই বটে ! সংকোচ ভেতরে রেখেই ইফতার সারলাম ।

অনেকে বাহারি ইফতার আইটেম সামনে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি পোস্ট করে, তাদের রুচির জানান দিতে । রোজা রেখেছিল কিনা বলা মুশকিল । তবে এমন বাহারি আইটেম দিয়ে ইফতার সেরে বহু মানুষকে আমি নামাজে দাঁড়াতে দেখিনি । যাই হোক আমাদের রুচি বোধ আর মূল্যবোধ যেন মানবিক হয়, অন্যের সমস্যার কারন না হয়, এতটুকু আবদার এই অধমের কাম্য ।‘’

রুদ্র আতিক, সিরাজগঞ্জ
১৭ চৈত্র ১৪২৯ বঙ্গাব্দ ।

পুনশ্চঃ ছবি http://www.banglawave.com See less
Comments


সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৩ রাত ২:৩১
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

লাইকা লেন্সে তোলা ক’টি ছবি

লিখেছেন অর্ক, ১৭ ই জুন, ২০২৪ সকাল ১১:৩০




ঢাকার বিমানবন্দর রেল স্টেশনে ট্রেন ঢোকার সময়, ক্রসিংয়ে তোলা। ফ্ল্যাস ছাড়া তোলায় ছবিটি ঠিক স্থির আসেনি। ব্লার আছে। অবশ্য এরও একরকম আবেদন আছে।




এটাও রেল ক্রসিংয়ে তোলা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনি কার গল্প জানেন ও কার গল্প শুনতে চান?

লিখেছেন সোনাগাজী, ১৭ ই জুন, ২০২৪ বিকাল ৫:৩১



গতকাল সন্ধ্যায়, আমরা কিছু বাংগালী ঈদের বিকালে একসাথে বসে গল্পগুজব করছিলাম, সাথে খাওয়াদাওয়া চলছিলো; শুরুতে আলোচনা চলছিলো বাইডেন ও ট্রাম্পের পোল পজিশন নিয়ে ও ডিবেইট নিয়ে; আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাবাকে আমার পড়ে মনে!!!

লিখেছেন সেলিম আনোয়ার, ১৭ ই জুন, ২০২৪ সন্ধ্যা ৭:৫২

বাবাকে আমার পড়ে মনে
ঈদের রাতে ঈদের দিনে
কেনা কাটায় চলার পথে
ঈদগাহে প্রার্থনায় ..
বাবা হীন পৃথিবী আমার
নিষ্ঠুর যে লাগে প্রাণে।
কেন চলে গেলো বাবা
কোথায় যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×