"আমি চাকু দিয়ে কেটে নেবো ।"
"পাগলের প্রলাপ! আমি কেবল একডলার বাজি ধরতে পারি ।"
ছোট্ট একটা শ্রাগ করে চেয়ারে হেলান দিলো লোকটা "ঠিক আছে, ঠিক আছে , ঠিক আছে, ব্যাপারটা ভুলে যাই আমরা কেমন? তুমি বলছো তোমার লাইটার সবসময় টিপলেই জ্বলবে, কিন্তু এ কথার ওপর বাজি ধরার সাহস নেই তোমার, ব্যাপারটা ভুলে যাই আমরা কেমন?"
ছেলেটা সোজা সামনের পুলের পানির দিকে তাকিয়ে রইলো । তারপর হঠাৎ মনে পড়লো সিগারেটটা ধরানো হয়নি, ডালাটা তুলে বুড়ো আঙ্গুলে হুইলটা ঘোরালো সে, হাতের তালুটা এমন ভাবে আড়াল করে রেখেছে লাইটারটাকে, হলদেটে ছোট্ট শিখাটা বাতাসে কাঁপলোই না ।
এতোক্ষনে আমার মনে হলো ছেলেটার দেয়া আমার সিগারেটটাও ধরানো হয়নি । ব্যাপারটা চোখে পড়ায় সে উঠে আমার সিগারেটটা ধরিয়ে সে আবার তার নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলো । আমি ধন্যবাদ দিলাম তাকে । আবার চুপচাপ বসে রইলাম আমরা চারজন ।
লোকটা যে এই বিদঘুটে বাজির কথা বলে ছেলেটার মনের শান্তি নষ্ট করে দিয়েছে সেটা মূখে কিছু না বললেও বুঝতে পারছি আমি । বেশ কিছুক্ষন ঘাড় চুলকালো সে তারপর দু'হাতের তালু হাঁটুর ওপর রেখে শরীরটা মোচড়াতে লাগলো ।
"আচ্ছা" একটুক্ষন বাদে মুখ খুললো সে " আপনি বলতে চাইছেন পরপর দশবার লাইটারটা ঠিক ঠিক জ্বালাতে পারলেই ক্যাডিলাকটা আমার, আর একবার না জ্বললে বাঁ হাতের কনি আঙ্গুলটা যাবে?"
"ঠিক কথা, ঠিক এরকমই বাজি ধরতে চাচ্ছিলাম, কিন্তু তুমি ভয় পাচ্ছো" ।
"আচ্ছা বাজিতে হারলে আমাকে হাতটা বাড়িয়ে ধরতে হবে?"
"উঁহু" মাথা নাড়লো শয়তান কিংবা পাগল লোকটা । "অতো শস্তা নয়, হয়তো বাজিতে হেরে গেলে তুমি হাতটা বাড়ালেই না? তোমার হাতটা বেঁধে রাখবো টেবিলের ওপর, আমি ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে থাকবো একবার মিস হলেই ঘচাৎ!"
"ক্যাডিলাকটা কোন বছরের?
"এক্সকিউজ মি? বুঝলাম না"
ক্যাডিলাকটা কত পুরনো?"
ওহো! মডেল? ওটা একদম নতুন, মাত্র গত বছরের, আমি বুঝতে পারছি তুমি বাজি ধরবে না, আমেরিকানরা আবার বাজিটাজি ধরতে জানেনা" ।
ছেলেটা এক মুহুর্ত চুপ থেকে তাকালো তার সংগিনী ইংরেজ মেয়েটার দিকে, তারপর আমার দিকে, তীক্ষ্ন স্বরে বললো "আমি বাজি ধরবো আপনার সাথে" ।
"দারুন!" হাততালি দিলো লোকটা খুশিতে, " আপনি স্যার দয়া করে এ ব্যাপারে, মানে আমাদের এই ছোট্ট বাজির ব্যাপারে রেফারি হবেন" ।
"উমম...আমার বিচারে এটা দুই পাগলের বাজি, এর মধ্যে থাকার কোন ইচ্ছা নেই আমার"
"আমিও তাই মনে করি" এই প্রথম মুখ খুললো মেয়েটা "একটা চুড়ান্ত নির্বোধ এবং পাগলের মত কাজ হচ্ছে "।
"আপনি কি সিরিয়াস ওর আঙ্গুল কেটে ফেলার ব্যাপারে?'
"ভীষনভাবে সিরিয়াস, সাংঘাতিক ভাবে সিরিয়াস"
"আমি খুব খুশি হবো" আমার চোখের দিকে তাকালো ছেলেটা "যদি আপনি থাকেন"
"ঠিক আছে" বললাম আমি "আমি থাকবো, যদিও ব্যাপারটা আমার মোটেই পছন্দ হচ্ছেনা"
"তুমিও চলো" বলে মেয়েটাকে টেনে নিয়ে চললো ছেলেটা । "আমি হোটেলের অ্যানেক্সে থাকি" বলে পথ দেখিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেলো লোকটা. মাঝপথে থেমে আমাদের হাত তুলে গাড়িটা দেখালো "ওই যে গাড়িটা", হালকা সবুজ একটা ক্যাডিলাক দাঁড়িয়ে আছে হোটেলের ড্রাইভওয়ের ওপর । অ্যানেক্সের ভেতর ঢুকে সিঁড়ি ভেঙ্গে নিজের স্যুটে পৌঁছে চাবি দিয়ে দরজার তালা খুললো লোকটা । একটা বড়সড় ডাবল বেডরুমে ঢুকলাম আমরা ।
"প্রথমেই" বললো লোকটা " একটু মার্টিনি গলায় ঢালা যাক"
পানীয়ের সব সাজ সরঞ্জাম একটা ছোট টেবিলে রাখা, মার্টিনি তৈরি করে এনে গ্লাস তুলে দিলো সে ছেলেটার হাতে । বেল বাজিয়ে মেইডকে ডাকলো লোকটা, মেইড এলে হাতে একটা একপাউন্ডের নোট গুঁজে দিয়ে বললো "আমরা একটা ছোট্ট খেলা খেলতে যাচ্ছি এখানে, সেজন্য কটা জিনিস লাগবে আমাদের, তুমি গিয়ে নিয়ে এসো...কয়েকটা পেরেক, একটা হাতুড়ি আর একটা মাংস কাটার চপিং নাইফ, হোটেলের কিচেনেই পাবে তুমি আশা করি" ।
"চপিং নাইফ স্যার?" চোখ কপালে তুলে জানতে চাইলো পরিচারিকা ।
'হ্যাঁ, হ্যাঁ জলদি নিয়ে এসো, আমরা অপেক্ষা করছি,' বলেই আমাদের দিকে ফিরে মার্টিনি ঢালায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো লোকটা । আমরা চারজন পরস্পর কে দেখতে লাগলাম । কি হবে যদি ছেলেটা বাজিতে হারে? হাসপাতালে দৌঁড়াতে হবে আমাদের ।
"তোমার কি মনে হয়না এটা একটা বোকার মতো বাজি?"
"এটা খুব চমৎকার একটা বাজি, জিতলে একটা ক্যাডিলাক মুফতে পাচ্ছি আর হারলে এমন একটা জিনিস যাচ্ছে যেটা আমার কোনোই কাজে লাগবেনা " । ইতিমধ্যেই একটা বড় মার্টিনি গলা দিয়ে নামিয়ে ফেলেছে ।
হাসলো লোকটা, শেকারটা ঝাকিয়ে আরেকদফা ড্রিংক মিক্স করছে সে । "খেলা শুরু হবার আগেই আমি রেফারির হাতে গাড়ির চাবি হস্তান্তর করছি, ইনস্যুরেন্স আর অন্যান্য কাগজ পত্র সব গাড়ির গ্লোভ কম্পার্টমেন্টে আছে "।
ফিরে এলো পরিচারিকা, একহাতে তার একটা ছোট্ট চপার, যে ধরনের ছুরি দিয়ে কসাইরা হাড় কাটে, অন্য হাতে একটা হাতুড়ি আর ছোট এক থলে পেরেক । ।
পরিচারিকা বেরিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে, "চমৎকার, সব জিনিস পেয়েছি আমরা, এবারে শুরু করতে পারি" বলে জিনিসগুলো টেবিলে সাজিয়ে রাখলো সে । টেবিলটা সাধারন একটা লেখার টেবিল, সচরাচর হোটেলে যেমন দেখতে পাওয়া যায়, চারফুট বাই তিনফুট মাপের । " এবার পেরেক গাঁথতে হবে" বলে হাতুড়িটা তুলে নিলো সে । "একটু সুতো লাগবে আমাদের" সুতো খুঁজে পেলো সে কামরার এক জায়গা থেকে ।
টেবিলের ওপর ছ'ইঞ্চি তফাতে দুটো পেরেক পাশাপাশি গাঁথলো লোকটা । পুরোটা নয়, মাথা সহ বেশ অনেকটা বেরিয়ে থাকলো পেরেকের । যেকোন লোক দৃশ্যটা দেখে বুঝবে বদমাশ লোকটা আগেও এসব কু কাজ করেছে । হাতুড়ি, পেরেক, টেবিল, সুতো সব তার জানা আছে । "চেয়ার টেনে বসুন সবাই প্লিজ, তুমি তুমি এখানে বসো" বলে টেবিলের ধারের চেয়ারটা দেখিয়ে দিলো । ছেলেটা বসলো টেবিলের পাশে ।
"বাঁ হাত টা বাড়িয়ে দাও, এই দুটো পেরেকের মাঝখানে", ছেলেটা হাতবাড়ানো সাথেসাথেই সুতো দিয়ে অনেকবার পেঁচিয়ে কষে বেঁধে ফেললো সে হাতটা পেরেকদুটোর সাথে ছেলেটার হঠাৎ হাতটা সরিয়ে নেবার কোন উপায়ই থাকলোনা ।
" হাতটা মুঠো করে পাকিয়ে শুধু কনি আঙ্গুলটা বাড়িয়ে দাও, চমৎকার! চমৎকার! এবারে শুরু করতে পারি আমরা, ডানহাতে লাইটারটা নাও" বলে চপারটা তুলে নিলো সে বিছানা থেকে "মিস্টার রেফারি শুরু করতে বলুন" । ইংরেজ মেয়েটা বসে আছে চুপচাপ ছেলেটার চেয়ারের পিছনে, বাঁ হাত বাঁধা ছেলেটা ডান হাতে লাইটার হাতে বসে আছে । অদ্ভুত লোকটা ছুরি হাতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে ।
"তুমি তৈরি?" ছেলেটাকে কিগ্যেস করলাম আমি ।
"হ্যাঁ"
"আপনি?" লোকটাকে জিগ্যেস করলাম । অবান্তর প্রশ্ন, একপায়ে তৈরি সে চপার নিয়ে ।
"ঠিক আছে শুরু করুন" বললাম আমি ।
"দয়া করে জোরে জোরে গুনবেন, কবার লাইটার টিপলাম" ছেলেটা অনুরোধ করলো ।
"ঠিক আছে "
বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে লাইটারের ডালাটা তুললো ছেলেটা, বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে ঘোরালো হুইলটা, ফস করে জ্বলে উঠলো লাইটার ।
"এক!" গুনলাম আমি । আগুনের ছোট্ট শিখাটা নিভিয়ে দিলোনা সে, বরং ডালাটা নামিয়ে দিলো তারপর সেকেন্ড পাঁচেক অপেক্ষা করে খুললো ওটা, জোরের সাথে ঘোরালো লাইটারের হুইল, দপ করে জ্বলে উঠলো লাইটার ।
"দুই!" জানালাম আমি । "তিন!...চার!..পাঁচ!...ছয়!...সাত!, স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে এ লাইটারটা বেশ ভালোভাবেই কাজ করে । বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে সব করা যায় । "আট!" বললাম আমি আর হঠাৎ দরজাটা খুলে গেলো । আমরা সবাই ঘুরে দাঁড়ালাম, ছোট খাটো এক কালোচুলের মহিলা দরজায় দাঁড়িয়ে, কয়েক সেকেন্ড চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকলেন তিনি ভেতরের দৃশ্য দেখে ।
"কার্লোস! কার্লোস!" বলে চিৎকার করে ঢুকে ছুটে এলেন তিনি । লোকটার কব্জি চেপে ধরে চপারটা কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেললেন ওটা বিছানার ওপর, তারপর তার কোটের ল্যাপেল ধরে ঝাঁকাতে শুরু করলেন । ঝাঁকুনির সাথে সাথে চললো ননস্টপ ধাতানি, স্প্যানিশ অথবা পর্তুগিজ ভাষায়, ঠিক বুঝলাম না আমি । তারপরে শেষ একটা ঝাঁকুনি থামিয়ে একটা বিছানার কাছে নিয়ে বসিয়ে দিলেন তিনি লোকটাকে । বিছানায় বসে চোখ পিট পিট করতে লাগলো লোকটা, হাত দিয়ে মাথাটা বোঝার চেষ্টা করলো সে সত্যিই মাথাটা ঘাড়ের সাথে লেগে আছে নাকি আলগা হয়ে গেছে ঝাঁকুনির চোটে!
"কিছু মনে করবেননা, আমারই দোষ, দশ মিনিটের জন্য পার্লারে গিয়ে ছিলাম চুল ধোয়াতে, সত্যি ও কে দশ মিনিটও একা রেখে যাওয়া সম্ভব নয়, পুরনো বাতিক মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে" । মহিলা ফিরলেন আমাদের দিকে "নিশ্চয়ই, গাড়িটা বাজি ধরে ছিলো ও আপনাদের সাথে?"
"হ্যাঁ, একটা ক্যাডিলাক" মুখ খুললো ছেলেটা, হাতটাকে সে মুক্ত করে এনেছে টেবিল থেকে ।
"খুব খারাপ, খুব খারাপ, গাড়িটা আসলে ওর নয়, আমার, আসলে বাজি ধরার মতো কিছুই নেই ওর, আমি খুব দুঃখিত" ।
"ঠিক আছে" বলে ক্যাডিলাকের চাবিটা টেবিলের ওপর রাখলাম ।
"আসলে বাজি ধরার মতো কিছু নেই ওর" মহিলা বলে চললেন "দুনিয়াতে একটা কানা কড়িও নেই ওর, সত্যি বলতে কি আমি সব জিতে নিয়েছি ওর কাছ থেকে, অনেক সময় লেগেছে, অনেক কষ্ট সইতে হয়েছে কিন্তু শেষতক ওর সব কিছুই চলে এসেছে আমার হাতের মুঠোয়, স-ব" বলে আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসলেন তিনি, ক্লান্ত, দুঃখিত হাসি, তারপর এগিয়ে এসে টেবিল থেকে গাড়ির চাবিটা তুলে নিলেন ।
"হাতের মুঠোয়" বলার জন্যই কিনা কে জানে মহিলার হাতের দিকে নজর গেলো আমার । মাত্র দুটো আঙ্গুল আছে সে হাতে, কেবল তর্জনি আর বুড়ো আঙ্গুল, বাকি সবগুলো আঙ্গুল কাটা পড়েছে!
শেষ:
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


