দরাজ গলায় হেসে উঠলেন জেনারেল জারফ । রেইন্সফোর্ডকে প্রশ্নের চোখে দেখছেন তিনি । 'আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যে আপনার মত একজন সভ্য ও আধুনিক তরুন মানুষের জীবনের মুল্য নিয়ে এখনো এত রোমান্টিক বিশ্বাস আঁকড়ে আছে । নিশ্চয়ই গত যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, আপনাকে এ ব্যাপারে---?'
'আমাকে ঠান্ডা মাথায় মানুষ খুন করতে শেখায়নি.' আড়ষ্ঠভাবে বলল রেইন্সফোর্ড ।
অট্ট হাসির দমকে কেঁপে উঠলেন জেনারেল । 'কী সাংঘাতিক মজার মানুষ আপনি!' বললেন তিনি । 'এমন কি আমেরিকাতেও আজকাল কোন শিক্ষিত তরুনকে, এরকম মধ্য ভিক্টোরিয়ান ধ্যান-ধারনা আঁকড়ে থাকতে দেখা যায় না । এটা অনেকটা একটা লিমুজিন গাড়িতে নস্যির কৌটো পাওয়ার মত ব্যাপার । সন্দেহ নেই আপনার পুর্বপুরুষরা সব পিউরিটান ছিলেন, অনেক আমেরিকানেরই তাই ছিল । আমি আপনার সাথে বাজি ধরতে পারি আপনার এসব তুচ্ছ বিশ্বাস ভেসে যাবে যখন আপনি আমার সাথে শিকারে যাবে । একদম নতুন থ্রিল পাবেন আপনি মি. রেইন্সফোর্ড ।'
'ধন্যবাদ । আমি একজন শিকারী, ঘাতক নই ।'
'ওহ আবার! সেই অপ্রীতিকর শব্দটা!' একটুও না চটে বললেন জেনারেল । 'আমি কিন্তু আপনার ধারনা যে ভুল সেটা এখনই দেখিয়ে দিতে পারি ।'
'তাই?'
'জীবন শক্তিমানদের জন্য । শক্তিমানরাই বাঁচে এবং যদি দরকার হয় শক্তিহীণদের জীবন নিয়ে হলেও । জগতে দুর্বলরা আছে শক্তিমানদের আনন্দের জোগান দিতে । আমার শক্তি আছে, আমি কেন এই ক্ষমতা ব্যাবহার করব না ? আমি যদি শিকার করতে চাই, শিকার করব না কেন ? দুনিয়ার আবর্জনাদের আমি শিকার করি । বিভিন্ন ট্র্যাম্প জাহাজের খালাসীদের---চীনা, নিগ্রো, দো আঁশলা, শ্বেতাঙ্গ । একটা ভাল জাতের ঘোড়া বা কুকুরের দাম ওরকম বিশটা মানুষের চেয়ে বেশী ।'
'কিন্তু ওরা মানুষ!' ক্ষেপে গিয়ে বলল রেইন্সফোর্ড ।
'একদম ঠিক কথা,' সায় দিলেন জেনারেল । 'আর সেজন্যই আমি আমার বিনোদনের জন্য ওদের ব্যাবহার করি । কারন ওরা চিন্তা করতে পারে, অন্তত একটা পর্যায় পর্যন্ত । সেজন্যই ওরা বিপজ্জনক ।'
'কিন্তু আপনি ওদের কোথায় পান ?'
বাঁ চোখের পাতাটা নামালেন জেনারেল । 'এই দ্বীপটার নাম শিপ ট্র্যাপ আইল্যান্ড,' বললেন তিনি । 'মাঝে মাঝে ফুঁসে ওঠা সাগর আমাকে ওদের উপহার দেয় । যখন ভাগ্য এত সদয় হয় না তখন আমি নিজের ভাগ্যকে একটু সাহায্য করি । জানালার কাছে আসুন ।'
রেইন্সফোর্ড উঠে জানালা দিয়ে সাগরের দিকে তাকাল ।
'সামনে দেখুন!' বলে সামনের রাতের অন্ধকারের দিকে আঙ্গুল তুললেন । রেইন্সফোর্ডের চোখে অন্ধকার ছাড়া কিছু চোখে পড়ছে না । জেনারেল একটা বোতাম চাপতেই আলোর ঝলকানি দেখতে পেল রেইন্সফোর্ড ।
হাসলেন জেনারেল । 'সাগরে একটা চ্যানেলকে নির্দেশ করছে এই বাতিঘর । 'কিন্তু আসলে সেখানে কোন চ্যানেলই নেই, আছে ক্ষুরের মতন ধারাল ডুবো পাহাড়ের সারি । সাগরদানোর মতই যেকোন জাহাজকে ভেঙ্গে ফেলতে পারে যেভাবে আমি এই বাদামটাকে ভেঙ্গে ফেলছি,' বলে শক্ত কাঠের মেঝেতে একট আখরোট ফেলে জুতোর তলা দিয়ে সেটা পিষে ফেললেন জারফ । 'হ্যাঁ, আমাদের বিদ্যুত আছে,' যেন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন এভাবে বললেন জেনারেল । 'আমরা সভ্য থাকার চেষ্টা করি ।'
'সভ্যতা? আর আপনি মানুষ খুন করেন ?'
ক্ষনিকের জন্য রাগের ছায়া দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল জেনারেলের চোখে । একইরকম আমুদে, আন্তরিক গলায় বললেন তিনি, 'কী সাংঘাতিক ন্যায়পরায়ন যুবক আপনি ! আমি আপনাকে আশ্বাস দিচ্ছি আপনি যা ভাবছেন আমি সেভাবে বর্বরের মত করি না কাজটা । আমি তাদের প্রত্যেকটা প্রয়োজনের প্রতি খেয়াল করি । তারা যথেষ্ট পরিমানে খাবার ও এক্সারসাইজের সুযোগ পায় । তারা যথেষ্ট হৃষ্টপুষ্ট হয়ে ওঠে । আপনি আগামীকালই দেখতে পাবেন ওদের ।'
'আপনি কী বলছেন ?'
'আমার প্রশিক্ষন কেন্দ্র দেখতে যাবো আমরা । এটা মাটির নীচের সেলারে অবস্থিত । প্রায় ডজনখানেক ছাত্র আছে এখানে এই মুহুর্তে । এরা সব ডুবে যাওয়া স্প্যানিশ জাহাজ, স্যান লুকার থেকে এসেছে । তবে এই চালানটা খুবই বাজে, আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি । জঙ্গলের থেকে জাহাজের ডেকেই এরা বেশী চালু ।' জেনারেল হাত তুলতেই ইভান যে ওদের ওয়েটারের কাজ করছিল, যে ওদের ঘন টার্কিশ কফি এনে দিল । অনেক কষ্টে নিজের মুখ বন্ধ রাখল রেইন্সফোর্ড ।
'দেখুন, আসলে এটা একটা খেলা,' মসৃন গলায় বলে চললেন জেনারেল । 'আমি ওদের একজনকে প্রস্তাব দেই শিকারে যাবার । যথেষ্ট পরিমানে খাবার আর একটা হান্টিং নাইফ দেই তাকে । তিন ঘন্টা সময় দেই আগে যাবার, তারপর আমি সবচেয়ে ছোট ক্যালিবার আর রেঞ্জের পিস্তল নিয়ে ওকে অনুসরণ করি । আমার শিকার যদি তিনদিন আমার চোখে ধুলো দিয়ে, এই দ্বীপে গা ঢাকা দিয়ে থাকতে পারে, তবে সে জিতে গেল । আর--' হাসলেন জেনারেল, 'আই যদি তাকে খুঁজে পাই তবে সে হেরে গেল ।'
'সে যদি খেলতে অস্বীকার করে তবে ?'
'ওহ,' বললেন জারফ । 'আমি তাকে এই অপশনটা দেই যে খেলতেই হবে সেটা বাধ্যতামুলক নয়, সে মর্জি হলে খেলবে । সে যদি খেলতে না চায় তবে আমি তাকে ইভানের হাতে তুলে দেই । ইভান একসময় মহান জারের খাস চাবুক-বরদার ছিল, স্পোর্টস সম্বন্ধে ওর নিজস্ব কিছু চিন্তা ভাবনা আছে । অবশ্যম্ভাবী ভাবে মি. রেইন্সফোর্ড, ওরা আমার সাথে খেলতে রাজী হয় ।'
'আর যদি ওরা জেতে?'
জেনারেলের মুখের হাসিটা চওড়া হল । 'আজ পর্যন্ত আমি কখনো হারিনি মি. রেইন্সফোর্ড ।' বলে তাড়াহুড়ো করে যোগ করলেন, 'আপনি আমাকে হামবড়া ভাবছেন না আশা করি । বেশীরভাগই আসলে একেবারে প্রাথমিক ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করে । মাঝেসাজে আমি বেশ শক্ত লোক খুঁজে পাই । সেক্ষেত্রে আমাকে কুকুর ব্যাবহার করতে হয় ।'
'কুকুর?'
'এইদিকে আসুন প্লিজ । আমি দেখাচ্ছি আপনাকে ।'
জেনারেল জারফ, রেইন্সফোর্ডকে আরেকটা জানালার ধারে নিয়ে গেলেন । জানালা থেকে আলো নীচের উঠানে পড়ে বিচিত্র নকশা আঁকছে । রেইন্সফোর্ড দেখতে পেল, নীচের উঠানে প্রায় ডজন খানেক প্রকান্ড কালো কালো ছায়া ঘোরাফেরা করছে । ওর দিকে চাইতেই ওদের সবজেটে চোখগুলো জ্বলে উঠল ।
'বেশ ভাল একটা পাল,' মন্তব্য করলেন জেনারেল । 'আমি রোজ সন্ধ্যা সাতটার সময় ওদের ছেড়ে দেই । কেউ যদি সেসময় বাইরে থেকে আমার বাড়িতে ঢোকার বা, ভিতর থেকে বাইরে যাবার চেষ্টা করে তবে অত্যন্ত খারাপ একটা পরিনতি ঘটবে তার ।' বলে ফোলি বার্জারের একটা গানের কলি গুনগুন করে সাধতে লাগলেন জেনারেল ।
'এবারে,' বললেন তিনি । 'আমার সর্বশেষ মাথার সংগ্রহটা আমি আপনাকে দেখাতে চাই । আপনি কী আমার সাথে লাইব্রেরীতে আসবেন ?'
'আশা করি আমাকে ক্ষমা করবেন,' বলল রেইন্সফোর্ড । 'আমি আসলেই আজ রাতে ভাল বোধ করছি না ।'
'ওহ তাই?' আন্তরিকতার সাথে জিগ্যেস করলেন জারফ । ' এরকম ঘটা খুবই স্বাভাবিক, বিশেষ করে লম্বা সাঁতারটা দিয়ে নিশ্চয়ই ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন আপনি । আপনার একটা লম্বা ঘুম দরকার । তাহলেই আমি বাজি ধরতে পারি যে আপনি আগামী কাল একদম ঝরঝরে বোধ করবেন । এরপর আমরা শিকারে যাবো ঠিক আছে ? আমার হাতে একটা চমৎকার শিকার আছে--' কিন্তু রেইন্সফোর্ড তার আগেই ঘর ছেড়ে যাবার জন্য পা বাড়াল ।
'আমি দুঃখিত আজ রাতে আপনি আমার সাথে যেতে পারছেন না,' বললেন জেনারেল । 'আজকের শিকারটার বেশ তেজ আছে । একটা বড়সড় শক্তিশালী নিগ্রো--তা গুডনাইট মি. রেইন্সফোর্ড । রাতের ঘুম ভাল হোক আপনার ।'
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জানুয়ারি, ২০০৭ রাত ৯:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


