প্যারিস পিস কনফারেন্সের তরফ থেকে প্রস্তাব দেয়া হয় যে রুশ সরকারের প্রতিনিধিরা বসফোরাস প্রণালীর কোন দ্বীপে গিয়ে আলোচনা করার জন্য । যেহেত সোভিয়েত সরকারকে সরাসরি আমন্ত্রণ জানানোও হয় নি তাই চিচেরিনকে প্যারিসের একটা বামপন্থী পত্রিকা থেকে প্রস্তাবের খুঁটিনাটি বের করতে হলো । শেষ পর্যন্ত ফেব্রুয়ারীর 4 তারিখে মিত্র পক্ষের কাছে একটা লম্বা চিঠি দিলেন । যদিও এরকম প্রস্তাবের পক্ষে অনেকের সায় ছিল না, তবু মেনশেভিকরাও সমর্থন করল এ প্রস্তাব । ফেব্রুয়ারীর 10 তারিখে নির্বাহী কমিটি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করতে বসল ।
চিচেরিন বললেন সোভিয়েত সরকার যদিও আগের চেয়ে সংহত অবস্থানে আছে তাহলেও তারা যু্দ্ধ বন্ধ করতে আগ্রহী । এমন কী যেজন্য বড় রকম ছাড় দিতে রাজী আছে তারা । ছাড়গুলো হচ্ছে আগের ঋণ শিকার করে নেয়া, যদিও তা এই মুহুর্তে শোধ দেয়া খুবই কঠিন ব্যাপার হবে । খনিজ, বনজ ও অন্যান্য কাঁচামালের যোগান নিশ্চিত করা । এমন কী মুল ভুখন্ডের কিছু অংশ ছেড়ে দিতেও তারা রাজী । এ শেষ ইস্যুটা অত্যন্ত তিক্ত বিতকের্র সৃষ্টি করল । অবশ্য সম্পুর্ণ বোঝাপড়াটা সমারিক অবস্থানের উপরই নিভর্র করবে । সোভিয়েত সরকারের বর্তমান পরিস্থিত সম্বন্ধে চিচেরিন আশাবাদী চিত্র আঁকলেন ।
ফেব্রুয়ারীর 5 তারিখে বিবৃতিটা কাগজে আসার সাথে সাথেই আলোচনার মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ালো সেটা । বিপ্লবের জঙ্গী রুপ নিয়ে সাধারন মানুষের মধ্যে কোন সংশয় ছিল না । বেশিরভাগ মানুষই শান্তি চাইছিল । একই সাথে যুদ্ধ আর বিপ্লব চালানো খুব কঠিন ব্যাপার । বিপ্লবের আঠারো মাস পরে রুশ নেতৃত্ব এখন গোটা দুনিয়াতে বিপ্লব সৃষ্টির আগে মস্কোর রুটি সরবারাহ নিশ্চিত করতে চান । কেন্দ্রীয় সোইয়েত কী বলে আমি জানতে আগ্রহী ছিলাম ।
হোটেল মেত্রোপোলের বড় হল ঘরটাতে কমিটির বৈঠক বসল বরাবরের মতই লেট করে । একদম ঘড়ির কাঁটা ধরে এসে দেখি হলটা প্রায় ফাঁকা । পাশের কামরায় কমিউনিস্ট পাটির্র একটা মিটিং চলছে । হল ঘরটা ঠিক আগের মতই আছে, এক মাথায় লাল ব্যানার টানানো, তাতে দুনিয়ার সব প্রোলেতারিয়েতকে এক হতে বলা হচ্ছে । ঘরটা যখন মানুষজনে ভরে উঠল, তখন পুরনো পরিচিতদের অনেকের সাথে দেখা সাক্ষাৎ হল আমার ।
অত্যন্ত পুরনো কোট আর ছোট একটা ফারের কালো হ্যাট পরে চশমার ফাঁক দিয়ে চোখ মিটমিট করতে করতে বুড়ো প্রফেসর প্রোক্রোভস্কি ঢুকলেন শরীরের পিছনের দু'হাত রেখে । ব্রেস্ত আলোচনার সময় শেষ দেখেছিলাম আমি তাঁকে । আমি ভেবেছিলাম তিনি আমাকে চিনতে পারবেন না, কিন্তু সোজা এগিয়ে এসে আমাকে মনে করিয়ে দিলেন যখন মনে হয়েছিল পেত্রোগ্রাদ জার্মানরা দখল করে ফেলবে । তিনি জানালেন যে যুদ্ধের শুরুটা নিয়ে তাঁরা অনেক লেখালেখি করছেন, সেখানে ইংল্যান্ড অনেকটা ভালভাবে দেখানো হয়েছে, কিন্তু ফ্রান্স আর রাশিয়ার উদ্দেশ্য ও কর্মকান্ডের উপর খুব খারাপ ছায়াপাত ঘটেছে ।
দেমিয়ান ব্লেদনি এলেন, আগের চেয়ে মোটা হয়ে গেছেন তিনি (গ্রাম থেকে তাঁর ভক্তরা নাকি খাবার পাঠায় তাঁকে) । গোল মুখ, হাসিখুশি চোখ আর সন্দিগ্ধ একজোড়া ঠোঁট, পুরোদস্তুএ চাষী এবং বিপ্লবের একজন কবি । দায়সারা ভাবে শেভ করেছেন তিনি, হলদে গোঁফজোড়া ছোট করে ছাঁটা, চামড়ার ট্রাউজার পরে আছেন তিনি । একসময় প্রাভদা আর অন্যান্য পত্রিকায় তাঁর প্রহসন-মুলক কবিতা পড়েছি আমি । তিনি জানালেন তাঁর বইটার আড়াই লাখ কপি ঠিক দু'সপ্তাহের মধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে, এবং তাঁর পোট্রর্েট আঁকছে একজন সত্যিকারে শিল্পী ।
মাদাম রাদেক একবছর আগে লিকের স্যান্ডউইচ বানিয়েছিলেন দারুন । এখন কমিটির প্রধান হিসেবে যুদ্ধবন্দীদের বিষয়ে কথা তুললেন তিনি । কথা শেষ করে আমার পাশে বসলেন তিনি । কর্তৃপক্ষ তাঁকে ক্রেমলিনের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বের করে দিয়ে সেখানে মিউজিয়াম করতে চায় জানালেন তিনি । এটা হচ্ছে তাঁকে ক্রেমলিন থেকে বের করে দেয়ার স্রেফ একটা অজুহাত । মাদাম ত্রতস্কি আসলে মাদাম রাদেক আরেকটু ভাল বাসায় আছেন সেটা সহ্য করতে পারছেন না ।
ঘরটা একটু একটু করে ভরে উঠছিল মানুষজনে । লিতভিনভকে আমি জিগ্যেস করলাম উনি বক্তৃতা দেবেন কিনা । এমন সময় লম্বা চুল ছোটখাট একজন লোক ছুটে এসে আমাকে সোভিয়েত ইউনিয়নে আবিষ্কৃত দেশলাই দেখালো । রাশিয়াতে দেশলাই বানাবার কাঠের বা প্যারাফিনের সাংঘাতিক অভাব, দেশলাই সাধারনত ফিনল্যান্ড থেকে আমদানী করতে হয় । এই বিশেষ দেশলাইটা কাঠের বদলে ফেলে দেয়া কাগজ আর বারুদের জায়গায় প্যারাফিনের বদলে ভেড়ার পশম ধোয়ার সময় যে তেলালো জিনিসটা বের হয় তা দিয়ে তৈরী । লোকটার নাম বের্গ, প্রেসিডিয়ামের অর্থনীতি বিষয়ক প্রধান । আমাকে তিনি এক প্যাকেট দেশলাই উপহার দিলেন । দেশলাইয়ের কাঠিগুলো সব একসাথে লাগানো, জ্বালাতে হলে ভেঙ্গে নিতে হয়, অনেকটা প্যারিসের দেশলাইয়ের মত । আমাকে বের্গকে বললাম আমি এটা প্যাটেন্ট করে নিজেই উৎপাদন করব । আশপাশের লোকেরা হেসে উঠল আমার কথা শুনে ।
ইযভেস্তিয়া পত্রিকা থেকে স্তেকলভ, মাদাম কোলোনতাই এবং আরোপ অনেক লোক এসেছিল যাদের নাম আমার স্মরণে আসছে না । প্রাভদার সম্পাদক বুখারিনও ছিলেন সেখানে, আপনার সাথে যে কোনো দার্শনিক আলাপ করতে তিনি এক পায়ে খাড়া । সে দার্শনিক হতে পারে বার্কলি, লক, বার্গসোঁ বা উইলিয়াম জেমস । তারপর দরজা দিয়ে এলিয়াভা খোঁড়াতে খোঁড়াতে ঢুকলেন । তিনি আমাকে মনে করিয়ে দিলেন গত গ্রীস্মে যখন তিনি আমাদের সাথে দেখা করেন তখণ তিনি আমাদের প্রত্যেককে গোল্ডেন অ্যাংকর হোটেলে পনেরোটা করে ডিম খেতে দেখেছিলেন । গত গ্রীস্মে আমি আমেরিকান রাষ্ট্রদূত মি. লিন্ডলের অনুবাদক হিসেবে কাজ করছিলাম । রাদেক বলেছিলেন যে এলিয়াভাকে আবার তিনি জীবিত দেখবেন তিনি এরকম আশা রাখেন না ।
প্রেসিডিয়ামে সামান্য কোলাহল দেখা গেল । আভানাসিয়েভ সেক্রেটারির আসন নিলেন, স্ভের্দলভ বললেন 'এবার কমরেড চিচেরিন বলবেন ।'
চিচেরিনের ভাষনটাকে বলা যায় বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিষয়ে একটা সাধারন রিপোর্ট দিলেন তিনি । শান্তি আনার জন্য সোভিয়েত সরকার কী কী করছে বললেন তিনি সবিস্তারে, প্রেসিডেন্ট উইলসনের কাছে পাঠানো টেলিগ্রামের কথা বললেন তিনি । যে কয়টা দেশ রাশিয়ার বিরুদ্ধে সৈন্য পাঠিয়েছে তাদের প্রত্যেকটা দেশ সম্বন্ধে বিশ্লেষন করলেন তিনি ।
চিচেরিনকে দেখে মনে হচ্ছিলো ভীষণ ক্লান্ত তিনি । অধস্তনদের হাতে কিছু দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার কৌশলটা তিনি এখনো আয়ত্ব করতে পারেননি । তাকে 'গুডমর্নিং' বলতেও সংকুচিত বোধ করবেন আপনি এত ক্লান্ত মন হয় তাঁকে সারাক্ষণ । শোনা যায়, মানুষের অবাঞ্ছিত দেখা সাক্ষাৎ এড়াতে রাতের বেলা কাজ করেন তিনি । তিনি যে রিপোর্টটা পেশ করেছিলেন তা অত্যন্ত কৌতুহলদ্দীপ হলেও যেভাবে তিনি বলছিলেন তাতে কারো উৎসাহ বোধ করার কথা নয় ।
এর পরে বললেন বুখারিন । বাদামী পোশাক পড়া এ লোকটার সাথে আমার বার্লিনে অর্থনৈতিক সন্মেলনে দেখা হয়েছিল । যাহোক চিচেরিনের চেয়ে স্পষ্ট গলায় কথা বললেন তিনি । বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি ব্রেস্ত চুক্তির আগের মুহুতের্র মত বলে মন্তব্য করলেন । তারপর বললেন লীগ অ্য নেশন্স আসলে মস্ত বড় পুঁজির সিন্ডিকেট । ইউরোপের পুঁজির অবস্থা খুব নাজুক, আমেরিকানরা এমন একটা সংস্থা বানাতে চাইছে যেটা পুরো ইউরোপকে নিয়ন্ত্রণ করবে । তিনি বললেন, মিত্রপক্ষ তাদের দাবী দাওয়া পেশ করুক । রাশিয়া যত মুল্যই দিতে হোক শান্তি 'কিনে' নেবে ।
বুখারিনের পর লিতভিনভ বক্তব্য রাখলেন । ধুসর ফারের হ্যাট মাথায় গোলগাল হাসিখুশি মানুষ । উঠে দাড়ানোর সময় চশমাটা পিছলে নীচে পড়ে যাচ্ছিল । শুরুতেই ফ্রান্সকে দোষারোপ করলেন তিনি । ফ্রান্সের একগুঁয়েমির জন্যই যুদ্ধটা এখনো চলছে, আমেরিকান যুদ্ধ থামাতে আগ্রহী ।
সবশেষে মস্কো সোভিয়েতের প্রধান কামেনভ উঠে দাঁড়ালেন । ব্রেস্ত চুক্তির সাথে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনার বিরোধিতা করে বললেন তিনি রুশ ঐক্য কেবল সোভিয়েত সরকারের অধীনেই সম্ভব । উক্রাইন গত পনেরো মাসে প্রায় সমস্ত শক্তিরই পদানত ছিল । জার্মান, প্রাক্তন বুর্জোয়া এবং আবার সোভিয়েত শাসন । সমসয় আসছে যখন পাশ্চাত্যের শক্তিগুলোকে সোভিয়েত সরকারকে স্বীকৃতি না দিয়ে উপায় থাকবে না ।
সভা শেষে বিনা প্রতিবাদে শান্তি প্রস্তাব পাশ হল । সাথে 'সমস্ত লাল ফৌজের সৈনিকদের' ধন্যবাদ প্রস্তাব দিয়ে সভা ভেঙ্গে গেল । গতবছর জার্মানদের সাথে করা 'ব্রেস্ত চুক্তির' থেকেও বড় ছাড় দিতে হবে এবার রাশিয়াকে যাতে আমারিকা, ফ্রান্স, ব্রিটেন আর জাপান তাদের হস্তক্ষেপকারী বাহিনী সরিয়ে নিয়ে যায় ।
পড়ন্ত তুষারের মধ্যে দিয়ে হোটেলের উদ্দেশ্যে হেঁটে চললাম আমি । আমার সামনে দুই শ্রমিক তর্ক করছে । 'আসলে দুর্ভিক্ষই বাধ্য করেছে সরকারকে এমন প্রস্তাব দিতে,' একজন বল আরেকজনকে । 'খাবারের অভাব কী কখনো মিটবে এই দেশে?' অন্যজন জানতে চাইল ।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ সকাল ১০:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


