ছোট্র মেয়ে রাশেদা । বয়স আর কতই হবে ধরেন চার, পাঁচ । দুরন্ত প্রকৃতির এই মেয়েটি অনূপম সুন্দর- যেন , সুরভিত কুসুমকলি । নিষ্পাপ চেহারা আর ফুলের মত সুষমা মন্ডিত ছিল । পিতা মাতার অনাদরে অবহেলায় ভেরে উঠা এই মেয়েটি ক্রমে ক্রমে শিশূসুলভ দুষ্টুমি কিংবা চপলতা হারিয়ে ফেলেছিল । রাশেদারা পাঁচ ভাই বোন । ভাই বোনদের মধ্যে সে চতুর্থ । তার ছোট আরেকটি বোন আছে । রাশেদার একমাত্র ভাইটি সংসারের তৃতীয় সন্তান । ছেলে হিসাবে বাবা-মা , আত্মিয় স্বজন সহ সকলেরই আদরের ধন । আদর -আহলাদ , স্নেহ-মমতা সবই তার দখলে । এই অভাবের সংসারেও তার বাবা-মা ছেলের সব আবদার পূর্ণ করতে কৃপনতা করেননা । একদিন ঃ ভাদ্রমাসের পড়ন্ত বিকাল , ভাঠির সমতল গ্রামগূলি সোনার জলে ভাসতেছে । ছোট বড় নৌকা গুলূ ধবল পাখা বিস্তার করে যার যার গন্তব্য পথে ছুটে চলছে । রাশেদা বাড়ীর আঙিনায় খেলা করছিল । সহসা তার চোঁখ পড়ল বাড়ীর অদূরে । বাড়ীর তীর ঘেঁষে একখানা নৌকা আসছে । রাশেদার ছোট কৌতুহলি মনে আগ্রহ জন্মাল । দৌরে গেল নৌকার কাছে । তার বাবা হাট থেকে সওদা নিয়ে ফিরেছেন । সাংসারিক জিনিষ পত্র সবজি,তরিতরকারী আরো কত কিছু ! রাশেদার বাবার হাতে বড় একটি মাছ ! রূই মাছ । মাছটি দেখে রাশেদার চোঁখ তো ছানাবড়া । দৌরে বাবার কাছ থেকে মাছটি নিয়ে বাড়ীর ভিতরে এল । মা..মা..বলে খুশিতে চিৎকার করতে লাগল । মাছটি কাটার জন্য মা রান্না ঘরে দা নিয়ে বসলেন । রাশেদাও মায়ের কাছে আগ্রহ ভরে মাছ কাটা দেখছে । তার মনে যেন আনন্দে আর ধরেনা । রাশেদা লোভ সামলাতে পারলনা । মায়ের কাছে আবদার করল ঃ ''মা , মাছের মাথাটি কিন্ত আমাকে দিতে হবে'' । মা ধমক দিলেন ''যাও পড়তে যাও, রান্না বান্না শেষ হলে খেতে ডাকব'' । রাশেদা খুশি মনে ভাই বোনদের সাথে পড়তে গেলো । খাবার সময় মা ডাকলেন । রাশেদা আর তার বোনেরা রান্নাঘরে ছাঠাই বিছিয়ে বসল । তার বাবা এবং ভাইয়ের জন্য শোবার ঘরে বিছানার উপড় খাবার সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে । রাশেদা অধির আগ্রহে তালায় ভাত নিয়ে বসে আছে । মা হাড়ি থেকে নামিয়ে তরকারি পাতে ডাললেন , সাথে রূই মাছের এক ঠুকরা পেঠি । রাশেদা বলল ঃ ''মা , মাছের মাথা কোথায় ? মাথা ছাড়া আমি ভাত খাবনা । মাথাটি আমার চাই-ই '' । মা ধমকালেন বললেন ঃ ''মেয়েদেরকে এসব খেতে নেই । মাছের মাথাটি তোমার বাবা ও ভাইকে দেওয়া হয়েছে । এখন ছুপ করে ভাত খেয়ে উঠ '' । রাশেদর কচি মন বিষাদে ভরে গেল , টিক যেন লান্বিচতা,অপমানিতা ও দুখিনীর মত । ঋদয়ের জমাট বাঁধা কান্নার বেগ সামলাতে না পেরে সহসা ঢুকড়ে কেঁদে উঠল । নয়নের দুই ধারায় নোনা জলের বন্যা বইতে শুরূ করল । তার মা আবারো ধমকালেন এবং বললেন ঃ'' ভাত খেয়ে নাও'' । কিন্ত রাশেদা খায়না , তার কান্নায় প্রবল বেগ ধারন করল । বাবা লাটি হাতে তেঁড়ে আসলেন । তিব্র হূংকার ছাড়লেন , চিৎকার করে বলতে লাগলেন যে , '' চুপ কর হারামজাদি , নইলে তোকে আজ মেরে ফেলব । ছেলে হয়ে দুনিয়ায় আইলেনা কেন ? তাহলে কোন দুঃখ ছিলনা ''। রাশেদার কচি মন বাবার চিৎকার আর গর্জনে ভয়ে আরষ্ট হয়ে গেলো । মায়ের আচলে ধরে যেন একটু আশ্রয়ের পথ খুজছিল । ভয়ে তার শরীরে জর এসে গেলো , প্রচন্ড জর !! মা তার শিয়রে বসে মাথায় পানি ডালছেন । ভোর বেলা যখন স্বর্গের ঊষা মর্ত্যে নেমে এসে ঘরে ঘরে শান্তি বিলাচ্ছে । মোয়াজ্জিনের কনঠে সুমধূর আজানের ধবনি ভেসে আসছে তখন রাশেদাদের বাড়ীতে কান্নার আওয়াজ !! একি ! সকলেই ছুটে গেলো তাদের বাড়ীতে । একটি সাদা বিছানার উপর রাশেদার নিস্পাপ, নিস্তব্দ , নিথর শরীর খানা পড়ে আছে । মৃত্যুর আগে প্রচন্ড জরের মধ্যে নাকি আবোল-তাবোল বকছিল ঃ ''মা, আমাকে মেরে ফেলবে, মা... আমি মাথা খাবনা মা..মা মাথা খাবনা '' ।
বিশ্ব নারী দিবসে রাশেদার কবরে পুস্পমাল্য অর্পন করে তার বিদ্রুপের পাত্র হতে চাইনা ।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই মার্চ, ২০০৬ রাত ৩:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



