somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নান্দাইলের ইউনুস ও স্বপ্নভঙের বাংলাদেশ

০৩ রা মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে প্রচারিত হুমায়ূন আহমেদের একটি জনপ্রিয় নাটকে একজন ভাড়াটে খুনীর চরিত্র ছিল। ভাড়াটে খুনীর নাম ইউনুস - নান্দাইলের ইউনুস। গ্রামের চেয়ারম্যান তার প্রতিদ্বন্দ্বী একজন ভালো মানুষ স্কুল শিক্ষককে হত্যার জন্য ইউনুসকে ভাড়া করে। খুনের আগে ইউনুস চেয়ারম্যানের বাড়িতে অতিথি হিসেবে আসে। বাড়িতে থাকে চেয়ারম্যানের স্ত্রী এবং এক দুঃসম্পর্কের তরুণী আত্মীয়া - কুসুম। ইউনুসকে খাবার পরিবেশনের ভার পড়ে কুসুমের ওপরে।

চেয়ারম্যানের স্ত্রীর কাছে কুসুম বানিয়ে বানিয়ে গল্প করে যে, নতুন অতিথি বিয়ের জন্য মেয়ে খুঁজছে এবং তাকে খুবই পছন্দ করেছে। কুসুম ইউনুসকে চিনতে না পারলেও, চেয়ারম্যানের স্ত্রী বুঝতে পারেন যে, তার স্বামী মাস্টারকে খুন করার জন্য তাকে ভাড়া করে এনেছে। কুসুম যখন আবারও বানিয়ে বানিয়ে ইউনুসের কথা বলে, তখন চেয়ারম্যানের স্ত্রী তাকে একটা চড় দিয়ে বলেন, "আর গাধা, তোর মাথায় শুধু বিয়া আর বিয়া; চেয়ারম্যান একে ভাড়া করেছে মাস্টারকে খুন করাতে। ইউনুস কোনো মানুষ নয়, সে পিচাশ!" কুসুমও তখন কেঁদে কেঁদে বলে যে, সে সারাক্ষণ বিয়ের কথা বলে, কারণ চেয়ারম্যান রাত-বিরাতে তার ঘরের দরজায় কড়া নাড়ে এবং তাকে ধর্ষণের সুযোগ খোঁজে।

ড. ইউনূসের বিগত ১৮ মাসে কাদের স্বার্থরক্ষার জন্য কাজ করেছেন, সেটা এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে। আমেরিকার সাথে ইউনূস যে বাণিজ্য চুক্তি করেছেন, সেখানে আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমেরিকা থেকে কিনতে হবে। বাংলাদেশে বর্তমানে যে বিমানগুলো আছে, সেগুলোই ধারণক্ষমতার নিচে ব্যবহৃত হচ্ছে; সেখানে আবার ১৪টি বিমান বোয়িং কোম্পানি থেকে কিনতে হবে। এরপর আছে কৃষিপণ্য কেনার বিষয়টি। বাংলাদেশকে ৩.৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কৃষিপণ্য আমেরিকা থেকে কিনতে হবে। এই চুক্তিটি শুধু দেশবিরোধী নয়, দেশের সার্বভৌমত্ববিরোধীও। এই চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে দেশকে অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট হতে পারে।

চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর নিয়ে দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে ইউনূসের গভীর অনুরাগ আমরা দেখেছি। ডিপি ওয়ার্ল্ডের লোকগুলো ইউনূসের বন্ধু। এদেরকে চিনলে ইউনূসকে অনেকটা চেনা যায়। ডিপি ওয়ার্ল্ডের দীর্ঘদিনের চেয়ারম্যান ও সিইও ছিলেন সুলতান আহমেদ বিন সুলাইয়েম, যিনি এবছর ১৩ ফেব্রুয়ারি এপস্টেইন নথি প্রকাশিত হলে, চাপের মুখে পদত্যাগ করেন।

বিন সুলাইয়েম কুখ্যাত শিশুধর্ষক এবং ক্ষমতাধরদের ব্ল্যাকমেইল করার জন্য ইসরায়েলের তৈরি জেফ্রি এপস্টেইনের অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমেরিকার বিচার বিভাগের মতে, বিন সুলাইয়েম ও এপস্টেইনের মধ্যে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সম্পর্ক ছিল। ২০০৮ সালে শিশুধর্ষণের অপরাধে এপস্টেইন দণ্ডিত হওয়ার পরও এই সম্পর্ক বজায় ছিল।

শেষ খবর অনুযায়ী, বিএনপি সরকার এই চুক্তির বিষয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। এটি নিয়ে বিস্তারিত মূল্যায়ন চলছে এবং দেশের স্বার্থ, জনগণ ও অর্থনীতির সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করে সিন্ধান্ত নেয়া হবে এমনটি বলা হচ্ছে।

ইউনূসের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এনসিপিকে প্রচারণার জন্য এক কোটি টাকা চাঁদা দিয়েছিল। একটা দেশের কোন কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে কোন রাজনৈতিক দলকে চাঁদা দিতে পারে, এটা পৃথিবীর ইতিহাসেই বিরল ঘটনা।

মার্চের মাঝামাঝি থেকে দেশে প্রবল হাম সংক্রমণ শুরু হয় এবং ২৫০-এর বেশি শিশুর মৃত্যু হয়। বহু বছর ধরে ইউনিসেফের যে টিকাদান কর্মসূচি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত ছিল, ১৮ মাসের জন্য ক্ষমতায় এসে ইউনূস গং সেটা পাল্টে দিয়েছিল, বোধহয় এখান থেকে কোনো একটা লুটপাটের উপায় খোঁজার জন্য। ইউনিসেফ-পরিচালিত এই কর্মসূচি থেকে সরে আসার ফলে টিকার সরবরাহ কমে যায়; ফলাফল হিসেবে আমরা পেলাম ২৫০ এর বেশি শিশুর মৃত্যু।

বিগত নির্বাচনে বিএনপি যদিও জয়ী হয়েছে এবং ৩০০ আসনের মধ্যে ২১২টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে, কিন্তু জামাত জোট ৭৭টি আসন পেয়ে এখন সংসদে বিরোধী দলে রয়েছে, যেটা বাংলাদেশের ইতিহাসে অভাবনীয়। বাংলাদেশের সমাজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন অনেক বেশি উগ্রপন্থি ও রক্ষণশীল, যেটার পিছনে ইউনূসের অবদান অনস্বীকার্য।

ইউনূসের সময়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে যে প্রবল সহিংসতার বৃদ্ধি হয়েছে, দিনের পর দিন ইউনূসের প্রেস সচিব সেটাকে ভারতীয় অপপ্রচার বলে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এর সর্বশেষ ভয়ঙ্কর দৃষ্টান্ত ছিল গার্মেন্টস কর্মী দিপু চন্দ্রকে মেরে ফেলে গাছে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে মারার ঘটনা এবং তার ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি কুষ্টিয়ার পীরকে পিটিয়ে মেরে ফেলা। ইসলামপন্থী জঙ্গিরা মাজার ধ্বংস করেছে, বিভিন্ন নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে পিটিয়েছে, ভয়ভীতি দেখিয়েছে, এমনকি নারী ক্রীড়া দলের ওপরও হামলা করেছে।

ইউনূসের ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই সক্রিয় জঙ্গিদের বড় একটি অংশ জেল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তাদের একজন ছিলেন কুখ্যাত হারুন ইজহার। এই ব্যক্তি প্রকাশ্যেই ইসলামপন্থি জঙ্গি রাজনীতিতে যুক্ত। তার মাধ্যমে আল-কায়েদা ও টিটিপির নেটওয়ার্ক বাংলাদেশে সক্রিয় হয়েছে। তাদের ভেতরে আল-কায়েদা শাখাও সক্রিয়। গত বছর মে মাসে যখন শিবির ও এনসিপি মিলে আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞার দাবি জানায়, তখন এই আল-কায়েদা মতাদর্শী জসিমউদ্দিন রহমানির ইমামতিতে তারা নামাজে অংশ নেয়।

এখন নতুন খবর হলো যে সামরিক বাহিনীর একটি অংশে এই টিটিপির নেটওয়ার্ক কার্যকর রয়েছে। যাদের কয়েকজনকে পাকিস্তানি জঙ্গিগোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগের কারণে সম্প্রতি গ্রেফতার করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ যখন লুটপাট, নৈরাজ্য, গুম-হত্যা, ব্যাংক দখল, অর্থ পাচার, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, হাতুড়ি-হেলমেট বাহিনীর তাণ্ডব, রাতের অন্ধকারে ব্যালট বাক্স ভর্তির নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক সব ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেশে স্বৈরতান্ত্রিক নৈরাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল, তখন হাসিনার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো জনগণের আন্দোলন ছিল প্রগতিশীল। মানুষ গণতন্ত্র, সুবিচার এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজের দাবিতে লড়াই করেছিল।

সেই শূন্যতার মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হিসেবে যখন ড. ইউনূস ক্ষমতা নিলেন, তখন কুসুমের মতো পুরো জাতি আওয়ামী লীগের ধর্ষণ প্রচেষ্টার হাত থেকে রক্ষা পেতে ভেবেছিল যে, নিশ্চয়ই তিনি মানুষের স্বার্থে, দেশের জন্য কাজ করবেন। পরে দেখা গেল, তিনি কাজ করলেন ডিপি ওয়ার্ল্ডের জন্য, আমেরিকার জন্য, জঙ্গিগোষ্ঠি ও জামাতের জন্য। নান্দাইলের ইউনুসের মতই তিনি মানুষ নন, তিনি পিচাশ, তিনি এপস্টেইনের এলিট!
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৬
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একাত্তরের আগের আর পরের জামাত এখনও এক

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ০২ রা মে, ২০২৬ সকাল ১১:৫৮


গোলাম পরওয়ার বলেছে একাত্তরের জামাত আর বর্তমান জামাত এক নয়। অথচ এক। স্বাধীনতার আগের জামাত আর পরের জামাত একই রকম।
একাত্তরের আগে জামাত পাকিস্তানের গো% চাটতো এখনও তাই চাটে। তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

সোনার ধানে নোনা জল

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০২ রা মে, ২০২৬ দুপুর ১:১২



হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ শব্দে রেদোয়ানের ঘুম ভাঙল। না, কোনো স্বপ্ন নয়; মেঘের ডাক আর টিনের চালে বৃষ্টির উন্মত্ত তান্ডব। বিছানা ছেড়ে দরজায় এসে দাঁড়াতেই এক ঝলক... ...বাকিটুকু পড়ুন

মরহুম ওসমান হাদীর কারণে কবি নজরুলের জনপ্রিয়তা বেড়েছে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা মে, ২০২৬ দুপুর ২:৫৯


ইনকিলাব মঞ্চের জাবের সাহেব মাইকের সামনে দাড়িয়ে যখন বললেন , শহীদ ওসমান হাদীর শাহাদাতের উসিলায় নাকি এদেশের মানুষ আজ কবি নজরুলের মাজার চিনতে পারছে, তখন মনে হলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের শিক্ষা - ১

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা মে, ২০২৬ রাত ৯:২৬



সমাজ আমাদের বিভিন্ন ভাবে পরীক্ষা করে। কখনো ধন-সম্পদ দিয়ে, আবার কখনোবা কপর্দকশূন্যতা দিয়েও! সমাজের এই পরীক্ষায় কেউ জিতেন, আবার কেউবা পুরোপুরি পর্যুদস্ত হয়ে বিদায় নেন এই ধরাধাম থেকে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিষন্ন মেঘের ভেলায় ভেসে....

লিখেছেন ইন্দ্রনীলা, ০২ রা মে, ২০২৬ রাত ১০:২৯



তোমাকে শুধু একটাবার বড় দেখতে ইচ্ছা করে...
এই ইচ্ছায় আমি হয়ে যাই একটা ঘাসফড়িং
কিংবা আসন্ন শীতের লাল ঝরাপাতা,
উড়ে যাই ভেসে যাই দূর থেকে দূরে...
অজানায়...

শরতের কাঁশফুলের পেঁজা তুলো হয়ে
ফুঁড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×