
নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে প্রচারিত হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় একটি নাটকে একজন ভাড়াটে খুনীর চরিত্র ছিল। খুনীর নাম ইউনুস - নান্দাইলের ইউনুস। গ্রামের চেয়ারম্যান তার প্রতিদ্বন্দ্বী একজন ভালো মানুষ স্কুল শিক্ষককে হত্যার জন্য ইউনুসকে ভাড়া করেন। খুনের আগে ইউনুস চেয়ারম্যানের বাড়িতে অতিথি হিসেবে আসেন। বাড়িতে থাকে চেয়ারম্যানের স্ত্রী এবং দুঃসম্পর্কের এক তরুণী আত্মীয়া - কুসুম। ইউনুসকে খাবার পরিবেশনের ভার পড়ে কুসুমের ওপরে।
চেয়ারম্যানের স্ত্রীর কাছে কুসুম বানিয়ে বানিয়ে গল্প করে যে, নতুন অতিথি বিয়ের জন্য মেয়ে খুঁজছে এবং তাকে খুবই পছন্দ করেছে। কুসুম ইউনুসকে চিনতে না পারলেও, চেয়ারম্যানের স্ত্রী বুঝতে পারেন যে, তার স্বামী মাস্টারকে খুন করার জন্য তাকে ভাড়া করে এনেছে। কুসুম যখন আবারও বানিয়ে বানিয়ে ইউনুসের কথা বলে, তখন চেয়ারম্যানের স্ত্রী তাকে একটা চড় দিয়ে বলেন, আর গাধা, তোর মাথায় শুধু বিয়া আর বিয়া; চেয়ারম্যান একে ভাড়া করেছে মাস্টারকে খুন করাতে; ইউনুস কোনো মানুষ নয়, সে পিচাশ! কুসুমও তখন কেঁদে কেঁদে বলে, সে সারাক্ষণ বিয়ের কথা বলে, কারণ চেয়ারম্যান রাত-বিরাতে তার ঘরের দরজায় কড়া নাড়ে এবং তাকে ধর্ষণের সুযোগ খোঁজে।
ড. ইউনূস বিগত ১৮ মাসে কাদের স্বার্থরক্ষার জন্য কাজ করেছেন, সেটা এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে। আমেরিকার সাথে তার সরকার যে বাণিজ্য চুক্তি করেছে, সেখানে আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমেরিকা থেকে কিনতে হবে। বাংলাদেশে বর্তমানে যে বিমানগুলো আছে, সেগুলোই ধারণক্ষমতার নিচে ব্যবহৃত হচ্ছে; সেখানে আবার ১৪টি বিমান বোয়িং থেকে কিনতে হবে। এরপর আছে কৃষিপণ্য কেনার বিষয়টি। বাংলাদেশকে ৩.৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কৃষিপণ্য আমেরিকা থেকে কিনতে হবে। চুক্তিটি শুধু দেশবিরোধী নয়, দেশের সার্বভৌমত্ববিরোধীও। এই চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে দেশকে অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট হতে পারে।
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর নিয়ে দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে ইউনূসের গভীর আগ্রহ আমরা দেখেছি। ডিপি ওয়ার্ল্ডের লোকগুলো ইউনূসের বন্ধু। এদেরকে চিনলে ইউনূসকে অনেকটা চেনা যায়। ডিপি ওয়ার্ল্ডের দীর্ঘদিনের চেয়ারম্যান ও সিইও ছিলেন সুলতান আহমেদ বিন সুলাইয়েম, যিনি এবছর ১৩ ফেব্রুয়ারি এপস্টেইন নথি প্রকাশিত হলে, চাপের মুখে পদত্যাগ করেন।
বিন সুলাইয়েম কুখ্যাত শিশুধর্ষক এবং ক্ষমতাধরদের ব্ল্যাকমেইল করার জন্য ইসরায়েলের গুপ্ত কৌশল জেফ্রি এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। আমেরিকার বিচার বিভাগের মতে, বিন সুলাইয়েম ও এপস্টেইনের মধ্যে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সম্পর্ক ছিল। ২০০৮ সালে শিশুধর্ষণের অপরাধে এপস্টেইন দণ্ডিত হওয়ার পরও তাদের সম্পর্ক বজায় ছিল।
শেষ খবর অনুযায়ী, বিএনপি সরকার এখনও এই চুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। এটি নিয়ে বিস্তারিত মূল্যায়ন চলছে এবং দেশের স্বার্থ, জনগণ ও অর্থনীতির সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করে সিন্ধান্ত নেয়া হবে, এমনটি বলা হচ্ছে।
ইউনূসের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এনসিপিকে প্রচারণার জন্য এক কোটি টাকা চাঁদা দিয়েছিল। একটা দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে কোন রাজনৈতিক দলকে চাঁদা দিতে পারে এটা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল একটি ঘটনা।
মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশে প্রবল হাম সংক্রমণ শুরু হয় এবং ২৫০-এর বেশি শিশুর মৃত্যু হয়। বহু বছর ধরে ইউনিসেফের যে টিকাদান কর্মসূচি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত ছিল, ১৮ মাসের জন্য ক্ষমতায় এসে ইউনূস সরকার সেটা পাল্টে দিয়েছিল, বোধহয় এখান থেকে কোনো একটা লুটপাটের উপায় খোঁজার জন্যই। ইউনিসেফ-পরিচালিত এই কর্মসূচি থেকে সরে আসার ফলে টিকার সরবরাহ কমে যায়; ফলাফল হিসেবে আমরা পেলাম ২৫০ জন শিশুর মৃত্যু।
ইউনূসের সময়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে যে প্রবল সহিংসতার বৃদ্ধি হয়েছিল, দিনের পর দিন ইউনূসের প্রেস সচিব সেটাকে ভারতীয় অপপ্রচার বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এর সর্বশেষ ভয়ঙ্কর দৃষ্টান্ত ছিল গার্মেন্টস কর্মী দিপু চন্দ্র দাসকে মেরে ফেলে গাছে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে মারার ঘটনা। তারই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি কুষ্টিয়ার পীরকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হল। ইসলামপন্থী জঙ্গিরা মাজার ধ্বংস করেছে, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে পিটিয়েছে, ভয়ভীতি দেখিয়েছে, এমনকি নারী ক্রীড়া দলের ওপর হামলা করেছে।
ইউনূসের ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই সক্রিয় জঙ্গিদের বড় একটি অংশকে জেল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তাদের একজন ছিলেন কুখ্যাত হারুন ইজহার। এই ব্যক্তি প্রকাশ্যেই জঙ্গি রাজনীতিতে যুক্ত। তার মাধ্যমে আল-কায়েদা ও টিটিপির নেটওয়ার্ক বাংলাদেশে সক্রিয় হয়েছে। গত বছর মে মাসে যখন শিবির ও এনসিপি মিলে আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞার দাবি জানায়, তখন আল-কায়েদা মতাদর্শী জসিমউদ্দিন রহমানি সেখানে নামাজে ইমামতি করেন।
এখন খবর হলো, সামরিক বাহিনীর একটি অংশে টিটিপির নেটওয়ার্ক কার্যকর রয়েছে; যাদের কয়েকজনকে পাকিস্তানি জঙ্গিগোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগের কারণে সম্প্রতি গ্রেফতার করা হয়েছে।
বিগত নির্বাচনে বিএনপি যদিও জয়ী হয়েছে এবং ৩০০ আসনের মধ্যে ২১২টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে, কিন্তু জামাত জোট ৭৭টি আসন পেয়ে এখন সংসদে বিরোধী দলে রয়েছে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। বাংলাদেশের সমাজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন অনেক বেশি উগ্রপন্থি ও রক্ষণশীল, যেটার পিছনে ইউনূসের অবদান রয়েছে।
আওয়ামী লীগ যখন লুটপাট, নৈরাজ্য, গুম, ব্যাংক দখল, অর্থ পাচার, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, হাতুড়ি-হেলমেট বাহিনীর তাণ্ডব এবং রাতের অন্ধকারে ব্যালট বাক্স ভরে নির্বাচন করে গণতান্ত্রিক সব ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন কায়েম করেছিল, তখন হাসিনার বিরুদ্ধে জনগণের আন্দোলন ছিল প্রগতিশীল। তখন মানুষ গণতন্ত্র, সুবিচার ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার দাবিতে লড়াই করেছিল।
সেই শূন্যতার মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে যখন ড. ইউনূস দায়িত্ব নিলেন, তখন পুরো জাতি আওয়ামী লীগের ধর্ষণ প্রচেষ্টার হাত থেকে রক্ষা পেতে আশা করেছিল যে, তিনি মানুষের স্বার্থে ও দেশের কল্যাণে কাজ করবেন। পরবর্তীতে দেখা গেল, তিনি কাজ করলেন ডিপি ওয়ার্ল্ডের জন্য, আমেরিকার জন্য, জঙ্গিগোষ্ঠী ও জামাতের জন্য। মর্মবেদনায় আচ্ছন্ন হয়ে আমরা দেখলাম, নান্দাইলের ইউনুসের মতোই তিনি মানুষ নন, তিনি এপস্টেইনের এলিট!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

