somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রিয় কবিতা, প্রিয় কবি 1

১৭ ই মার্চ, ২০০৭ রাত ২:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এটা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর মনে হতে পারে যে আমার সামপ্রতিক কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতায় প্রিয় কবির নাম আরিফুজ্জামান তুহিন। বয়সে এই কবি আমার চেয়েও অন্তত বছর তিনেকের ছোট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান চুড়ান্ত বর্ষের ছাত্র।

তুহিন কবিতা লিখেছে সবমিলিয়ে পাঁচ বা ছটি। এতগুলিও লেখার প্রয়োজন ছিলোনা। সামহোয়ার ইনের পাঠকদের কাছে এই লেখা যে কবিতাটি উপস্থাপন করবে এই একটি কবিতা লিখলেও তুহিন আমার প্রিয় কবির তালিকায় শীর্ষেই থাকতো।

তুহিন, আহসানসহ ওদের একটি গ্র পের চিন্তা করার প্রক্রিয়া সবসময়ই চড়তা ছিলো এবং এখনো তাই আছে। ক্যাম্পাসের অন্যান্যরা ওদের উগ্র বাম, চরমপন্থী বিভিন্ন নামে ডাকলেও আমি ওদের বলতাম ফ্রি-ল্যান্সার বামপন্থী। এই ওরা কোন পয়েন্টে ছাত্র ইউনিয়নের সমালোচনা করলো আবার পরদিনই মিছিলের সামনে থেকে তাকিয়ে দেখলাম একেবারে পিছনে আছে তুহিন, আহসান। যদিও ওরা আমার কথা তেমন কিছুই শুনতোনা তারপরেও অন্যান্য দলের লোকজন যখন ফিসফিস করতো এই বলে যে এই পোলাপান গুলি বাকীবিল্লাহরে নেতা মানে তখন আমার গর্বই লাগতো। বলা দরকার, সবার নেতা হওয়ার ব্যাপারে আমি ঠিক উৎসাহী ছিলাম না।

যে কবিতাটি আমরা পড়তে যাচ্ছি সে কবিতার নাম নিঃশব্দের অশ্বারোহী। এটি লেখা হয়েছিলো কমরেড মোফাখখর চৌধুরি কে নিয়ে যিনি এদেশে গোপন বামপন্থী রাজনীতির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। র্যাবের ক্রসফায়ারে তিনি নিহত হন। কবিতাটি প্রথম উপস্থাপন হয় ছাত্র ইউনিয়ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির নবীন বরণ উৎসবে, দীপক গোস্বামী সুমনের আবৃতিতে। সামহোয়ারের পাঠকদের জন্য ঘোষণা, এরকম মনোযোগ দিয়ে পাঠ করার মতো কবিতা সচরাচর আপনাদের সামনে আসেনা-

আপনি যেখানে দাড়িয়ে আছেন ঠিক,
ঐ জায়গা থেকে পূর্বদিকে সোজা কালো
পিচঢালা যে রাস্তাটি ডানের গলির ভেতর
ঢুকে গেছে, যেমনটি যায় আমাদের স্বপ্ন
অজানা কোন শোলে ইদুরের গর্তে;
আপনাকে যেতে হবে ঐ রাস্তায়।

ঐ রাস্তা ধরে ডানে একটা পার্লার রেখে বামের রাস্তায় যখন এসে পড়বেন
নিশ্চয়ই মুখে অতিরিক্ত পাউডার দেয়া স্থুলাকায়
এক রমনীর সাথে দেখা হবে-
উনি মুক্তা বানু। অন্তত চার বছর ধরে
শুধু এ এলাকার মানুষই নয়,
গলির মোড়ের যে পাগলটা রোজ পল্টনের ময়দানে
ঈশ্বরের বিচার করে গণআদালতে
সেও ওকে মুক্তা বানু বলেই জানে।

মুক্তা বানুকে পেছনে রেখে,
বিসমিল্লাহ হোটেল ডানে রেখে
রূপনগরের রূপহীন এক কঠিন মাটিতে
আপনাকে দাড়াতে হবে। ওখানটায় ষাটোর্ধ
মাথায় কাঁচা-পাকা চুল নিয়ে কিছুদিন আগেও
ছিলেন কম. চৌধুরি।

কম. চৌধুরি যিনি কমসে কম ষাট
বা তার অধিক শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ
হেমন্ত এবং অবশ্যই বসন্তে
বেঁচে ছিলেন রাস্ট্রের এত ভালোবাসা,গণতন্ত্র
পায়ে দলে কিংবা বলতে পারেন উপেক্ষা করে
বেঁচে ছিলেন এবং একই সাথে আমাদের
শান্তিপ্রিয় গণতন্ত্রীদের ঘুম হারাম করে দিয়েছিলেন।

সেই কম চৌধুরির বাসাতে ঢুকলে প্রথমে দেথা যাবে
তাকবিহীন ঘরভরা বই।
মার্কস-লেনিন সাহেবের সব সংকলন।
মাও সেতুঙের যুদ্ধ বাঁধানো লাল বই
ইতিহাস আর দর্শন কেমন ফুরফুরে ভাবে
চেয়ে আছে ঘরের একমাত্র জলরঙের চিত্রের দিকে।

ছড়ানো ছিটানো মার্কস-লেনিন-মাও সেতুঙের মধ্যে
সঞ্চয়িতার ক'টা পাতা এখনো খোলা।
আপনি যদি আরো ভালো করে ল্য করেন
তাহলে দেখতে পাবেন ঘরের মধ্যে খেজুর পাতার
একটি পাটি ব্যতীত বসবার কিংবা
ঘুমাবার কোন ব্যবস্থা নেই।

সাদা-পাকা চুল নিয়ে ষাট বা ততোধিক
অবগাহনের কাল পেরিয়ে কম. চৌধুরি কি তবে
সবুজ ফসলের মাঠে একটি ফিঙ্গের কালো পাখা হয়ে
ধান পোকাদের গোপন ব্যাথা বুকে বুনে
সটান কাটিয়ে দিতে চেয়েছিলেন?

ঠিক এই ঘরটায় তিনি
পাতার পর পাতা কলমবন্দী করেছেন,
তার সেইসব অগণিত লেখনীর মাঝে কোন
কবিতা বা কোন রমনীর কাছে কোনো প্রেমপত্র ছিল কিনা
এ বিষয় স্পষ্ট করে বলা শক্ত;
কারন রাষ্ট্র নামক সুন্দর পরিশীলিত এবং
অবশ্যই গণতন্ত্রী এই প্রতিষ্ঠান তার নিরিহ মানবিক দূত দিয়ে
সেসব আলামত সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক
সুবিচারের জন্য বহু যত্ন করে
সংরক্ষণ করেছেন।

কম. চৌধুরি কখনো ঝুম বর্ষায় ভিজতে
চেয়েছিলেন বা ভিজেছেন কিনা আমাদের
জানা নেই; তবে তার ঘরের জলরঙের
চিত্রকর্মে যে কিশোরীর অবয়ব, তার চোখে
বৃষ্টির পানি ছিল, আর পেছনের আকাশটা নীল।

আপনাকে এ পর্যন্ত এসে থেমে যেতে হবে
কেননা আপনি আর কিছুই দেখতে
পাবেন না। এবার আপনার সামনে
গণতান্ত্রীক মানবিক রাষ্ট্র প্রেসনোট ধরিয়ে দেবে:
গতকাল রাতে চরমপন্থী নেতা মোফখখারুল চৌধুরি তার গোপন অস্ত্র ভান্ডার পুলিশ কে দেখিয়ে দিতে নিয়ে গেলে, ওত পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা পুলিশের ওপর গুলি বর্ষন করে। পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। এ সময় চৌধুরি পলায়রকালে ক্রসফায়ারে পড়ে নিহত হয়।
তবে গভীর রাতে উইঢিবির পরে
যেখানটায় দাড়িয়ে গণতান্ত্রীক মানবিক রাষ্ট্রের
দূতেরা তাকে বলেছিলো: দৌড় দাও,
আর কম. চৌধুরি তার দরাজ কন্ঠে
শেষ রাতের নীরবতার বুকে হাতুড়ি মেরে বলেছিলেন:
বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক-
তাঁর সেই চিৎকারে খোয়াবে সঙ্গমে প্রার্থনারত
মানুষ ও অমানুষের কলিজায় আগুন ধরে গিয়েছিল
আর শান্তির মানবিক দূতেরা রবীন্দ্র সঙ্গীতের
মত কোমল অস্ত্রের টিগার টিপতে কমপক্ষে
দশ সেকেন্ড ভুলে গিয়েছিল।

যার চোখে খেলা করে ফসলের শীষ
নারীর হৃদয় ভোগ্য নয় আর
ফ্যাট বাড়ির শেকল পরানো আকাশ থেকে মুক্ত হবে
উত্তর কৈশোর,
যুবক-যুবতী স্বপ্ন দেখবে একটি
বর্ষনমুখর দুপুরের
সে চোখ একজন চরমপন্থীর
একজন মোফাখখর চৌধুরির
কিংবা বলতে পারেন
একজন খুনি মাতালের চোখ।

ঋতি্বক নামের মানুষটিকে তিনি
শেষ ফোনে বলেছিলেন: তোমরা ভালো থেকো।
কম. চৌধুরি কি জানতেন না, গণতন্ত্রের সোনার দেশে
আমরা সবাই রাঙ্গা রাজপূত্র।
আমাদের ভাতের কষ্ট নেই
ভোটদানের কষ্ট নেই
এমনকি ভালোবাসার কষ্টও নেই;
তিনি কি জানতেন না, আমরা সবাই
ভয়াবহ ভালো আছি।

আপনাকে এই ফ্যাট বাড়ি থেকে নেমে
সব ভুলে যেতে হবে
কেননা খোয়াবে অথবা সঙ্গমে যদি
কখনো কম. চৌধুরি আপনাকে ভর করে
তবে কোন এক শীত কিংবা বসন্তের রাতে
মানবিক-গণতন্ত্রী শান্তির দূতেরা
তাদের কোমল অস্ত্র আপনার বুকে
ঠেসে ধরবে আর পরের দিন
ছাপানো কাগজে বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা থাকবে:
ক্রসফায়ারে চরমপন্থী নেতা নিহত।
কে না জানে এই শান্তিপ্রিয় মানবিক
গণতন্ত্রী রাষ্ট্রের বিরোধিতা মানেই
সন্ত্রাসবাদ আর ক্রসফায়ার!


সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই মার্চ, ২০০৭ রাত ২:৪১
১৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

তাওরাত ও যুক্তি দিয়ে কথা বলুন - ইহুদীরা আত্মসমর্পন করবেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৩ রা অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:০০

গানঃ 'My Name Is Palestine' - Garth Hewitt
লিংকঃ Click This Link



জ্ঞানী মানুষ যুক্তি পছন্দ করেন। জ্ঞানী মানুষ অজ্ঞানতার বেড়াজাল থেকে নিজেকে বের করে যুক্তির মাপকাঠিতে নিজের জীবনকে সাজায় বলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাময়িক পোস্ট: বিদায়ের আগে

লিখেছেন অর্ক, ০৩ রা অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১৭



আমি নিজের লেখা ও অনুবাদ করা কিছু বই বের করতে চাই। এক্ষেত্রে কেউ কোনওভাবে সহযোগিতা করতে পারলে জানাবেন। গতকাল একজন নিয়মিত ব্লগারের মন্তব্যে ব্লগ বন্ধ হবার জোর সম্ভাবনার কথা জেনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগে ১০ টি বছর পার করলাম

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:০২



ব্লগে ১০ বছর পার করে দিলাম। কত সময় কেটে গেছে এখানে, কত পরিচিত মুখ রয়ে গেছে এখানে। তবুও ভালোবাসার বন্ধন যেন শেষ না হয়।

যে কবিতাটা দিয়ে ব্লগিং শুরু করেছিলাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিন্নাহকে জানতে হলে পাকিস্তান আন্দোলনের ইতিহাস জানতে হবে। পর্ব-১

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:১৩



পাকিস্তান সৃষ্টির বছরখানেক আগে ১৯৪৬ সালে বোম্বে শহরের দুই নামকরা পার্সি ডাক্তার বুঝতে পেরেছিলেন যে ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ এবং আইনজীবী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আয়ু আর বেশিদিন নেই। ডা.... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ ডিসেম্বর ১০-১৬: বিশ্ব তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ছিল

লিখেছেন কলাবাগান১, ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:১১


লিখা টির ইতিহাস ভিত্তিক ইনফো এআই থেকে সংগৃহীত

আমরা সবাই জানি যে ১৯৭১ সনের ১৬ই ডিসেম্বর বিকেলে পাকিস্হান হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পন করে মিত্রবাহিনীর কাছে। কিন্তু আমরা অনেকেই হয়তো জানি না,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×