তার বলার ভঙ্গিতে এমন একটা কিছু ছিল যে আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। আমি কোন উত্তর দিলাম না। অনেক ছোট বেলায় পড়া একটা গল্পের কথা মনে পড়লো। কার লেখা ঠিক মনে নেই, সৈয়দ মুজতবা আলীর হতে পারে। ট্রেনের বগিতে ফার্ষ্ট কাসে উঠে পড়েছে টোকাই ধরণের একটি ছেলে। উঠেই বিভিন্ন উদ্ভট প্রশ্ন করে বিরক্ত করে ফেলেছে সবাইকে। এক পর্যায়ে হঠাৎ করে সে লেখকের কাছে জানতে চাইলো,স্যার আপনি কখনো সন্দেশ খাইছেন? লেখক প্রথমে প্রশ্নের ভঙ্গি এবং ধরণ শুনে মজা পেলেন। তারপর এই প্রশ্ন এবং সেই ছেলেটা লেখকের মনে যে অনুভুতি তৈরি করলো তাই হয়ে গেল গল্পটির আসল উপাদান। যতদুর মনে পড়ে গল্পের শেষটা ছিল মন খারাপ হওয়ার মত। এইসব গল্পটল্প যদিও চুড়ান্ত বিচারে কোন ব্যাপার না কিন্তু বাস্তবের ছোটখাট গল্পগুলি প্রত্যেকটাই এক একটা ব্যাপার হয়ে যায়। জগতটাও এমন আজিব, সবসময় কিছু না কিছু কাহিনী ঘটেই চলে। আমার অতি সাধারণ বিচার বুদ্ধি দিয়েও যা বুঝি তাতেই আমি অবাক হই আর অবাক হই। মানুষ ভাত খায়, আবার মানুষই দর্শন চর্চা করে। মানুষ আগে কি অবস্থায় ছিল আর এখন কি অবস্থায় আছে? কতো বড় বড় বিষয় নিয়ে সে এখন ভাবে অথচ কুকুর-বিড়ালের মত গাল দিয়ে খেয়ে পশ্চাৎ দিয়ে বের করার বাস্তবতাকেই সে পরিবর্তন করতে পারে নাই। আর মেয়ে মানুষ দেখলে তো কথাই নাই! জামকাপড় খুলে আদিম যুগে ফেরত যাওয়ার জন্যে মাথা খারাপ হয়ে যায়। কোন এক কবি নদীর এপার ওপার নিয়ে কোন একটা কথা বলেছিলেন। এইটাও মানুষের জীবনের একটা বিরাট মনস্তত্ব। এই যে আমি, ভালো খাওয়া দেখলে আমার হিতাহিত জ্ঞান থাকে না, সুন্দরী মেয়ে দেখলে জিহবা দিয়ে রীতিমত লোল পড়ে, এই আমারই মাঝে মাঝে মনে হয় এরকম না হয়ে অন্যরকম হলে কতই না ভালো হতো। সব চিন্তা বাদ দিয়া সাগরের পাড়ে দাড়িয়ে মাথায় হাত রেখে শুধু চিন্তা করতাম, কেন? কেন এইসব? মানুষ কেন আসলো? তার গন্তব্যই বা কোথায়? কিন্তু তা কি সম্ভব? পরের বেলাই আমাকে ভাত খেতে হবে। নাহলে এসিডিটির ব্যাথা শুরু হয়ে যাবে। খেতেই যখন হবে তো খারাপ খাব কেন? ভালোটাই খাব। আর ভালো খাওয়া তো এমনি এমনি জুটবে না। নিজের মাথায় জোরসে একটা চাটি মেরে এইসব লঘু চিন্তার খপ্পর থেকে ফেরৎ আসলাম। আমি ভাবতেছি এরকম বড় বড় কথা! এতদিনে ’ আদার ব্যাপারী ও জাহাজের খবর’ নিয়ে চালু থাকা বাগধারার একটা সঠিক প্রয়োগ ঘটলো বলে মনে হচ্ছে।
সেইদিনের পর ফাকে ফাকেই লায়েক ভাইয়ের খোঁজ রাখতাম। তিন মাসের মধ্যেই চমকওয়ালা আরেকটি বিপরীতধর্মী বাস্তবতা উপহার দিলেন। সেটি ছিল আরো বেদনাদায়ক। কিছুদিন আগে তার বাসায় গিয়ে কিছুটা কৌতুহলভরে, কিছুটা মজা করে জানতে চাইলাম, মধু টধু খাচ্ছেন তো রেগুলার? সালশার বোতল খালি হয়ে গেছে নাকি এখনো আছে? থাকলে দ্যান, আমিও একটু খাই। প্রসঙ্গত বলা দরকার, তিনি এখনো সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা বেতনে প্রজেক্টের কাজই করে যাচ্ছেন। পারমানেন্ট কিছু হয় নাই। লায়েক ভাই আমার কথাকে খুব সিরিয়াসলি নিলেন। বললেন, সালশা খাব কেন? আমিতো এখন নিয়মিত গোমুখাসন করতেছি। গোমুখাসন কি এবং কেন? জানতে চাইলাম আমি। লায়েক ভাই করিৎকর্মা লোক, দেরী না করে তিনি নামাযের ভঙ্গিতে মেঝেতে বসে পড়লেন। তারপর ডান পাটা বাম পায়ের উপর তুলে দিয়ে চেপে ধরে পেছন দিকে নিলেন যতদুর সম্ভব। দু পায়ের হাটু যেখানে এক হয়েছে সেখানে আঙ্গুল নির্দেশ করে বললেন, দ্যাখো, এই জায়গাটা অনেকটা গরুর মুখের মত দেখতে হয়েছে না? এটাই গোমুখাসন। আমি বিস্মিত হলাম কিন্তু তখনো জানতাম না যে আমার বিস্ময়ের অনেক কিছুই এখনো বাকী রয়েছে। লায়েক ভাই বললেন, এটা হচ্ছে যোগ ব্যায়ামের একটি আসন। ধরো, যৌন কামনায় তোমার শরীর উত্তেজিত হয়ে গেল, কিন্তু তা উপশমের কোন রাস্তা তোমার জানা নেই তখন এই আসন ম্যাজিকের মত কাজ দেবে। সেবার নিয়মিত মধু, সালশা খেয়ে আমিতো বিপদেই পড়ে গেলাম। প্রত্যেক রাতেই শরীর গরম হয়ে ওঠে। এটা শরীরের জন্য খুব খারাপ। যে দাওয়খানা থেকে সালশা নিয়েছিলাম তাদের কাছে গেলে তারা এই পরামর্শ দিল। ভালো কাজ পেয়েছি।’
এই কথার পরে কোনরকম বক্তব্য বা অভিব্যক্তি প্রকাশের সুযোগ আমার ছিল না।
তিন.
অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে একটি কর্পোরেট ব্যাংকের বার্ষিক ক্যালেন্ডার ও এনুয়াল রিপোর্টের কাজ পেয়ে গেলাম আমি। আমার প্রতিষ্ঠানের যে কলেবর তাতে এত বড় কাজ না পাওয়ারই কথা। কিন্তু আমার দেয়া ডিজাইন পছন্দ হওয়ার কারনে কাজটি তারা আমাকেই দিয়ে দিল। বিগ ডিল, ইটস আ ভেরি বিগ ডিল! উত্তেজনায় আমার মাথা দপদপ করতে লাগলো। এতো টাকা ইনভেস্ট করা একটু কঠিন কিন্তু কাজটা ঠিকঠাক মত করতে পারলে আগামী বছর কিছু না করেও দিব্যি হেসেখেলে কাঁটিয়ে দেয়া যাবে। আমি ভাবতে বসলাম, কিভাবে কোথা থেকে এত টাকার যোগাড় করা সম্ভব। কাগজের দামের একাংশ ও ছাপার টাকা বাকী রাখলে নগদ কত টাকা দরকার হবে? এইসব বিবিধ বিষয় দিনরাত আমার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগলো। এ সংক্রান্ত তদবির ও প্রস্তুতিতে আমার যাবতীয় সময় পার হতে লাগলো। প্রায় দেড় সপ্তাহ ধরে জেসিকার সাথে আমার দেখা হয় নাই, এমনকি সে ফোন করলেও ভালো করে কথা বলতে পারি নাই। কাজের প্রস্তুতি মোটামুটি গুছিয়ে উঠলে এ বিষয়টির ভয়াবহতা চিন্তা করে আমি আতঙ্কিত হয়ে গেলাম। জেসিকা আমাকে কাঁচা খেয়ে ফেলবে! মনে মনে নানারকম কায়দা কৌশল করতে লাগলাম। শাহবাগের আজিজ মার্কেটে এই মার্কেটের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ আতলামি মার্কা কিছু কাপড়ের দোকান হয়েছে। ইদানিং আতলামীর উপকরণে জেসিকার একটা ঝোক ল করা যাচ্ছে। এ লাইনেই এ যাত্রা সামলাতে হবে। আমাকে চমকে দেবার জন্যই সে এটা শুরু করেছিল। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছি, সে ইন্টারমিডিয়েটও উৎরাতে পারে নাই এ নিয়ে তার কিছু হিনমন্যতাও ছিল। এ কারনে, সুরুচির পরিচয় দিতে সে বিভিন্নরকম প্রচেষ্টা নিত। আমি মনে মনে বলতাম, দরকার নাই জান আমার, সুরুচির কোন দরকার নাই। তোমার ধারালো ফিগার আর আমার শ্বসুরের ধনসম্পত্তি যে পরিমাণ আছে তার চেয়ে বেশি সুরুচির আমার দরকার নাই; মুখে যদিও কিছুই বলতাম না, বরং তার এই চেষ্টা আমাকে আনন্দ দিত। একবার সে গামছার কাপড় দিয়ে বানানো একটা ফতুয়া পরে আসলো, আমার জন্যেও আনলো একটা। তার ঘি, মাখন খাওয়া চেহারার সাথে সেটা এতই বেমানান লাগছিলো, কি আর বলবো। কে তাকে এই বুদ্ধি দিছে আল্লাহ মালুম! আর আমি নিজে পরবো গামছার ফতুয়া? কভি নেহী। আমার দাদা ছিল খেজুর গাছ কাটা গাছি, বাবা অল্প জমিওয়ালা কৃষক। গামছার ব্যবহার তারা জীবনে যথেষ্ট করেছেন, আমার আর গামছা দরকার নাই। যা হোক, আমি আজিজ মার্কেটে গিয়ে তার জন্য দুইটা ফতুয়া কিনলাম। একটা আলখাল্লা পরা রবীন্দ্রনাথের ছবিওয়ালা আরেকটাতে বাঁশি বাজাচ্ছেন চিত্রশিল্পী সুলতান। রবীন্দ্রনাথ আলখাল্লা পরে থাকুন বা সুলতান যত পারেন মনের সুখে বাঁশি বাজান তাতে আমার কি? এরকম একটা বিপদের মুহুর্তে তারা যে আমার কাজে লাগতে পারেন এটা ভেবেই তাদেরকে আমার বড়ো মাপের একটা কিছু মনে হলো। তবে আমার কোন কায়দা কৌশলই ঠিক ভাবে কাজে আসলো না। জেসিকা, আমার পরানের জেসু আমার সাথে দেখাই করতে চাচ্ছিল না। ফোনে বললো, আমার সাথে তোমার দেখা করার কি দরকার? এমনিতে তো আমাকে তোমার কোন দরকার নেই, দুই সপ্তাহ বিরতির কারনে যদি গা ঘসাঘসি করার খায়েশ জাগে তাহলে একটা কলগার্ল ভাড়া কর, পয়সা লাগলে আমি দিবানি। দিবানি শব্দটার ব্যবহারে আমি ঘোরতর আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। এমনিতে তার কথাবার্তার ঠাটবাট খারাপ না, কিন্তু চরম েেপ গেলে এটা অুন্ন থাকে না, আঞ্চলিক শব্দ বেরিয়ে আসে। লণ বেশি ভাল না। আমি গলা মিহি করলাম, হাল্কা ধমক দিলাম, নানারকম অনুনয় বিনয় করলাম কিন্তু কোন কিছুতেই সে আর গলে না। তো পাথর টলানোর আর বুদ্ধি কি? আমি মোটর সাইকেল নিয়ে একেবারে ওদের আদাবরের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম। গেটের বাইরে দাড়িয়ে মোবাইলে কল দিয়ে বললাম, তুমি যদি এখনি না আস তাহলে সোজা বাসায় ঢুকে তোমার বাবা মাকে বলবো, আপনাদের মেয়েকে আমি বিয়ে করতে চাই। একটু পরেই বেরিয়ে আসতে দেখলাম তাকে। চেহারায় রীতিমত আতঙ্ক। আমি তো জানি, বাপ মাকে কি পরিমাণ ডরায় সে। কৌশল হিসেবে এটা একটু চরমই হয়ে গেল। কি করা, আর তো কোন উপায় ছিল না। চুপিচুপি এসে বাইকের পেছনে বসলো সে। আমি সোজা একটানে মিরপুর ১০ নাম্বার দিয়ে ঘুরে বিজয় সরনী দিয়ে এয়ারপোর্ট রোডে উঠলাম। উত্তরা গিয়ে ধরলাম আশুলিয়ার রাস্তা। পুরো সময়েই আমার শরীর থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখলো জেসিকা। অন্যান্য সময় বাইকে উঠলেই পেছন থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরতো সে। কি যে ভালো লাগতো, বাইক চালানোর মজাটাই মাঠে মারা গেল আজ। মাগরিবের আযান পড়লে ফাকা একটা জায়গায় বাইকটা থামালাম। তার মুখটা এখনো গম্ভীর, থমথমে। আমি হাত ধরে মা চাইলাম, ওর জন্যে আনা উপহার দিলাম। সে খুলে ওগুলি দেখল, চেহারার কোন পরিবর্তন হলো না। এরপর বিস্মিত হয়ে দেখলাম, আলখাল্লা পরা বাউল রবীন্দ্রনাথ আর বংশীবাদক সুলতানকে গিট দিয়ে বাঁধছে সে। কি যে আছে মাথায় কে জানে? অনেকটা আচমকাই সে ঐ কাপড়দ্বয়ের ব্যবহার করে আমার গলা পেচিয়ে ধরলো, বেশ জোরেই। নিঃশ্বাস নিতে একটু কষ্ট হচ্ছিল, ব্যাপার না, মারা না গেলেই হলো। আমি চুপচাপই থাকলাম। হাত দিয়ে ধরা কাপড় শক্ত করে আমার গলায় চেপে বসাতে গিয়ে ধীরে ধীরে সে চলে আসছিলো আমার বুকের কাছে। গলায় একটা শক্ত টান পড়াতে আমি ঝুকে প্রায় ওর গায়ের উপরেই পড়লাম। ওর নিঃশ্বাসের গতি তখন স্বাভাবিক ছিল। সেটা যতো বাড়লো, আমার গলার ফাস ততোই আলগা হলো। একসময় তা আর থাকলো না কারন ওর হাত দুটো তখন দুপাশে ঝুলছে। ঝুলন্ত হাত দুটো একটু পরেই আমার গলায় উঠে কোমল পরশ বোলাতে লাগলো, যেখানে একটু আগেই চেপে বসেছিল শক্ত ফাস। ফেরার পথে আমার বাইকটা উড়ছিল, জেসিকার উড়তে থাকা ওড়নাটাকে মনে হচ্ছিল এই বাহনের ডানা। এরপর ডানা দুটিকে গুটিয়ে শক্ত করে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল সে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




