
চোখ বন্ধ করলেই আমি ধোঁয়া দেখি। ঘন, ধূসর ধোঁয়া। যেন কেউ ভেজা কাঠ জ্বালিয়েছে। তার সঙ্গে মিশে থাকে পোড়া কাপড়ের গন্ধ। কখনও মনে হয় প্লাস্টিক, কখনও মনে হয় পুরোনো বই। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, সেই ধোঁয়ার মাঝখানে সব সময় একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
তার নাম শিলা। আমি নিশ্চিত নই, সত্যিই তার নাম শিলা কি না। তবু আমার মাথা তাকে ওই নামেই ডাকে।
আজও বিছানায় শুয়ে আছি। জানালার পর্দা নড়ছে না। ফ্যানের শব্দও একই রকম। অথচ আমার নাকে আবার সেই পোড়া গন্ধ।
আমি চোখ খুললাম। ঘরে কিছু নেই। আবার চোখ বন্ধ করতেই ধোঁয়াটা ফিরে এলো। শিলা এবার আগের চেয়ে একটু কাছে।
সে কিছু বলে না। শুধু তাকিয়ে থাকে।
আমি বিছানায় উঠে বসলাম। বুকের ভেতর কেমন ধুকপুক ধুকপুক করছে। রান্নাঘরে গিয়ে দেখি মা ডাল গরম করছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, মা, কিছু পুড়ছে? মা অবাক হয়ে বলল, না তো। আমি আর কিছু বললাম না। গত তিন মাস ধরে একই ঘটনা ঘটছে।
প্রথমে ভেবেছিলাম পাশের বাসা থেকে গন্ধ আসে। তারপর মনে হলো হয়তো আমারই ভুল। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝলাম, গন্ধটা শুধু আমি পাই।
আর শিলাকেও শুধু আমিই দেখি।
ডাক্তার দেখিয়েছিলাম। তিনি বললেন, অতিরিক্ত মানসিক চাপেও এমন হতে পারে। কিছু ওষুধ দিলেন। ওষুধ খেলেও ধোঁয়া কমল না। বরং শিলা আরও স্পষ্ট হতে লাগল। এক রাতে সাহস করে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কে?
সে প্রথমবারের মতো হাসল। খুব ছোট্ট করে বলল, তুমি ভুলে গেছো?
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। আমি কি কাউকে ভুলে গেছি? পরদিন পুরোনো অ্যালবাম বের করলাম। একটার পর একটা ছবি উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ একটা ছবি হাতে থেমে গেল। খুব ছোট্ট বেলার আমি আর পাশে দাঁড়িয়ে একটা ছোট মেয়ে।
ছবির পেছনে বাবার লেখা, শিফু আর শিলা ২০০৮, আমার মাথার ভেতর যেন কেউ হাতুড়ি মারল।
শিলা!!!
আমার মামাতো বোন।
ষোলো বছর আগে আগুন লেগেছিল তাদের বাড়িতে। সবাই বলেছিল, আমি নাকি অনেক দিন তার কথা বলতাম। তারপর ধীরে ধীরে ভুলে গিয়েছিলাম। নাকি ভুলে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম?
হঠাৎ মনে পড়ল, আগুনের দিন আমি ওকে কথা দিয়েছিলাম, পরদিন আবার খেলতে যাব ওর সাথে।
আমি যাইনি, যাব কি করে, ও তো আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে গিয়েছে।।
সেদিনের পর থেকে আমার পরিবার আর কখনও তার কথা আমার সামনে তোলেনি। হয়তো আমাকে বাঁচানোর জন্য।
হয়তো নিজেরাই ভুলে থাকার জন্য। রাতে আবার চোখ বন্ধ করলাম। ধোঁয়া এলো শিলাও এলো। আমি আস্তে করে বললাম, ক্ষমা করে দিস।
সে কিছু বলল না কিছুটা সামনে এগিয়ে এসে ধোঁয়ার ভেতর ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
ইদানীং পোড়া গন্ধ আর পাই না। কিন্তু রাত যত গভীর হয়, ততই মনে হয়, মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের মতন ঘটনা গুলো আসলে কষ্ট আর বেদনার স্মৃতি হয়ে সারাজীবন বুকের ভেতর রয়ে যায়।
সমাপ্ত
ছবিঃ নেট
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


