somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিপ্লবের শরিকরা

০৫ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ২:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যারা বিপ্লব আনে, তারা বিপ্লব টেকায় না। যারা বিপ্লব টেকায়, তারা শরিকদের টেকায় না। ১৯৭৯ সালে ইরানে খোমিনি ক্ষমতায় এসেছিল বামদের কাঁধে চড়ে। কমিউনিস্ট, সেকুলার, নারীবাদী—সবাই শাহের বিরুদ্ধে এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল। তেহরানের রাস্তায় সেদিন বামেরা উৎসব করেছিল। ঢাকা-কলকাতার বামেরাও উৎসব করেছিল। তারপর খোমিনি একে একে সবাইকে সরিয়ে দিলেন। কেউ গুলি খেল, কেউ পালাল, কেউ চুপ হয়ে গেল। এদিকে ঢাকা-কলকাতার বামেরাও সেদিন চুপ হয়ে গ্রামসি পড়তে বসেছিল।

অর্ওয়েলের মতে, পরীক্ষাটা সহজ। কোনো বুদ্ধিজীবি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে বিচার করতে হলে বুঝতে হবে তাদের কথকতা-নীরবতার মানচিত্র, দেখতে হবে তারা কোথায় চুপ থাকে। বাংলাদেশের এবং কলকাতার বামদের নীরবতার মানচিত্রটি বেশ সুনির্দিষ্ট।

পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীরে হত্যা—নীরব। বাংলাদেশে পাকিস্তানি সামরিক উপস্থিতির সম্ভাবনা—নীরব। বঙ্গোপসাগরে ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন— নীরব। সংসদে শরিয়া আলোচনা—নীরব।

কিন্তু ভারতের পুশইন নীতি—সরব। ভারতীয় সংখ্যালঘু—সরব। মোদি সরকারের যেকোনো পদক্ষেপ—অত্যন্ত সরব।

এই মানচিত্রটি একদিনে তৈরি হয়নি। এটা একটি ক্রমশ প্রকাশ্য পরম্পরা। সেই একই অবস্থান থেকে নোয়াম চমস্কি তুরস্কের হায়া সোফিয়া নিয়ে কথা কখনো বলেননি, এরদোয়ানকে নিয়ে বলেননি—কিন্তু ভারত নিয়ে ঠিকই বলেছেন। আবার পাকিস্তান নিয়ে কোনোদিন বলেননি। এমন বুদ্ধিজীবির নীরবতাও একটি বিবৃতি।

প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার এখন বিচার চাইছে। যারা তাদের কার্যালয়ে আগুন দিয়েছে, তাদের বিচার। এটা দাবি হিসেবে আত্মঘাতী পথে যাত্রা করা মিডিয়ার জন্যও ন্যায্য দাবি। কিন্তু এই দাবির পেছনে যে আত্মঘাতী ইতিহাস আছে তা কাগজ দুটি স্বীকার করবে না। গত দেড় দশকে জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানগুলোকে এই কাগজগুলো বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যে আদর্শিক পরিবেশ তৈরিতে এই মিডিয়া সহায়তা করেছে, সেই পরিবেশেরই শিকার তারা আজ। অর্ওয়েলের ভাষায় এটা 'ফিরতিআঘাত' (blowback)—নিজের ছোড়া বুমেরাং নিজের মাথায় ফেরত আসা। সাগর-রুনির কথা মনে আছে? এক সময় যে তদন্তের দাবিতে কাগজগুলো সরব ছিল, এখন সেই তদন্ত আর তাদের শিরোনাম হয় না। বিচারের দাবি তখনই জোরালো হয় যখন নিজেরা ক্ষতিগ্রস্ত। এটা সাংবাদিকতা নয়। এটা আত্মরক্ষা।

১৯৯১ সালের নির্বাচনের সময় ঐতিহাসিক বিদ্রূপসমেত বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে দেশ বিক্রির অভিযোগ করে একটি শ্লোগান প্রচলিত ছিল। সেই শ্লোগান কয়েক প্রজন্মের কানে ঢুকেছে। তিন দশক পরে দেখা গেল, যারা এই শ্লোগান দিয়েছিল, তারাই এখন বিদেশি স্বার্থের কাছে সবচেয়ে অনুগত। এবং তারাই এখন যুক্তি দিচ্ছে—এই আনুগত্য আসলে বাংলাদেশের জন্য লাভজনক। হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, এদেশে ভিখারিরাও দুর্নীতিগ্রস্ত। কিন্তু দুর্নীতি আর সার্বভৌমত্ব বিসর্জন এক জিনিস নয়। একটি দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে। একটি বিকিয়ে যাওয়া রাষ্ট্র পারে না। তবে এই পার্থক্যটাই যারা আবার তিন দশক ধরে বোঝাতে চেয়েছিলেন, তারাই আজ বঙ্গোপসাগর-সেন্টমার্টিন নিয়ে নির্ঘুম না হয়ে উল্টো পাকা আম খেয়ে নাকে তেল দিয়ে ভালোই ঘুম দিচ্ছেন!

শেষে ইরানের কথা আবার বলতেই হয়, যেমন বলছিলাম শুরুতেই, বিপ্লবের প্রতিটি শরিককে খোমিনি একে একে সরিয়ে দিয়েছিল। যারা টের পায়নি, তারা গুলি খেয়েছে। যারা টের পেয়েছে, তারা পালিয়েছে। ইতিহাস সবসময় ঠিক একইভাবে পুনরাবৃত্তি না হলেও পুরনাবৃত্তির কাঠামোটা বদলায় না। যে শরিকরা এখন বাংলাদেশ থেকে আমেরিকায়-ইউরোপ-অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার বা স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা-তদবির করছেন, তারা সম্ভবত ইতিহাসের সেই কাঠামোর কঠোরতা বুঝতে পেরেছেন। শুধু একটু দেরিতে, এই যা।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ২:৪২
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জাতিসত্তার পরিচয়ের বাজার

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:২১

ইতিহাসে কোনো আদর্শ সত্যিকার অর্থে মরে না। সে শুধু নাম বদলায়, পরাজিত আদর্শেরও পুনর্জন্ম হয়।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ একটি আসনও পায়নি। কিন্তু সেই রাতে মুসলিম লীগ মরেনি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটা ছিলো সোনার কণ‍্যা, মেঘ বরন কেশ!!!!

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ ভোর ৬:১৩



শাওন প্রশ্ন করেছিলে ৭৮ বছর বয়স্ক একজন মহিলার। অন্তর্বাস উচিয়ে যখন অন্তর্জালে দাঁত মুখ খিচিয়ে উল্লসিত বহু পোস্টে ভেসে যায় ।কিংবা দেয়ালে সরাসরি দি লিখে প্রচার করছিলো তখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘ছুটি’র স্মৃতি

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৫০

(প্রায় দু’মাস আগে লেখা। তখন গ্রীষ্মকাল হলেও ঢাকায় কয়েকদিন পরপর বৃষ্টি হতো। এখনকার মত “ঘাম ঝরে দরদর” ধরণের গরম ছিল না। রাতগুলো তুলনামূলকভাবে বেশ ঠাণ্ডা থাকতো।)

আজ খুব ভোরে (শেষরাতে)... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে কারণে এবারের বিশ্বকাপও আর্জেন্টিনার ঘরেই উঠবে B-)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৪



কারণ আর্জেন্টিনা দুর্দান্ত, মেসি-মার্তিনেজরা অপ্রতিরোধ্য। আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত এই বিশ্বকাপের সবগুলো ম্যাচেই একছত্র আধিপত্য দেখিয়ে জয়লাভ করে প্রবল বেগে ফাইনালের দিকে ধ্বাবিত হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে গতবারের... ...বাকিটুকু পড়ুন

হোমিওপ্যাথি হচ্ছে একটি ধাপ্পাবাজ কিবিরাজি চিকিৎসা পদ্ধতি এর বৈজ্ঞানীক কোন ভিত্তি নেই

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১:০৪



হোমিওপ্যাথি যে একটি ভাঁতাবাজি চিকিৎসা পদ্ধতি তা আমি আগেও জানতাম কিন্তু আমি কখনো এর বিরুদ্ধে কথা বলিনি বা কোথাও কিছু লিখিনি- তবে আজ কি মনে করে চ্যাটজিপিটির কাছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×