যারা বিপ্লব আনে, তারা বিপ্লব টেকায় না। যারা বিপ্লব টেকায়, তারা শরিকদের টেকায় না। ১৯৭৯ সালে ইরানে খোমিনি ক্ষমতায় এসেছিল বামদের কাঁধে চড়ে। কমিউনিস্ট, সেকুলার, নারীবাদী—সবাই শাহের বিরুদ্ধে এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল। তেহরানের রাস্তায় সেদিন বামেরা উৎসব করেছিল। ঢাকা-কলকাতার বামেরাও উৎসব করেছিল। তারপর খোমিনি একে একে সবাইকে সরিয়ে দিলেন। কেউ গুলি খেল, কেউ পালাল, কেউ চুপ হয়ে গেল। এদিকে ঢাকা-কলকাতার বামেরাও সেদিন চুপ হয়ে গ্রামসি পড়তে বসেছিল।
অর্ওয়েলের মতে, পরীক্ষাটা সহজ। কোনো বুদ্ধিজীবি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে বিচার করতে হলে বুঝতে হবে তাদের কথকতা-নীরবতার মানচিত্র, দেখতে হবে তারা কোথায় চুপ থাকে। বাংলাদেশের এবং কলকাতার বামদের নীরবতার মানচিত্রটি বেশ সুনির্দিষ্ট।
পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীরে হত্যা—নীরব। বাংলাদেশে পাকিস্তানি সামরিক উপস্থিতির সম্ভাবনা—নীরব। বঙ্গোপসাগরে ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন— নীরব। সংসদে শরিয়া আলোচনা—নীরব।
কিন্তু ভারতের পুশইন নীতি—সরব। ভারতীয় সংখ্যালঘু—সরব। মোদি সরকারের যেকোনো পদক্ষেপ—অত্যন্ত সরব।
এই মানচিত্রটি একদিনে তৈরি হয়নি। এটা একটি ক্রমশ প্রকাশ্য পরম্পরা। সেই একই অবস্থান থেকে নোয়াম চমস্কি তুরস্কের হায়া সোফিয়া নিয়ে কথা কখনো বলেননি, এরদোয়ানকে নিয়ে বলেননি—কিন্তু ভারত নিয়ে ঠিকই বলেছেন। আবার পাকিস্তান নিয়ে কোনোদিন বলেননি। এমন বুদ্ধিজীবির নীরবতাও একটি বিবৃতি।
প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার এখন বিচার চাইছে। যারা তাদের কার্যালয়ে আগুন দিয়েছে, তাদের বিচার। এটা দাবি হিসেবে আত্মঘাতী পথে যাত্রা করা মিডিয়ার জন্যও ন্যায্য দাবি। কিন্তু এই দাবির পেছনে যে আত্মঘাতী ইতিহাস আছে তা কাগজ দুটি স্বীকার করবে না। গত দেড় দশকে জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানগুলোকে এই কাগজগুলো বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যে আদর্শিক পরিবেশ তৈরিতে এই মিডিয়া সহায়তা করেছে, সেই পরিবেশেরই শিকার তারা আজ। অর্ওয়েলের ভাষায় এটা 'ফিরতিআঘাত' (blowback)—নিজের ছোড়া বুমেরাং নিজের মাথায় ফেরত আসা। সাগর-রুনির কথা মনে আছে? এক সময় যে তদন্তের দাবিতে কাগজগুলো সরব ছিল, এখন সেই তদন্ত আর তাদের শিরোনাম হয় না। বিচারের দাবি তখনই জোরালো হয় যখন নিজেরা ক্ষতিগ্রস্ত। এটা সাংবাদিকতা নয়। এটা আত্মরক্ষা।
১৯৯১ সালের নির্বাচনের সময় ঐতিহাসিক বিদ্রূপসমেত বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে দেশ বিক্রির অভিযোগ করে একটি শ্লোগান প্রচলিত ছিল। সেই শ্লোগান কয়েক প্রজন্মের কানে ঢুকেছে। তিন দশক পরে দেখা গেল, যারা এই শ্লোগান দিয়েছিল, তারাই এখন বিদেশি স্বার্থের কাছে সবচেয়ে অনুগত। এবং তারাই এখন যুক্তি দিচ্ছে—এই আনুগত্য আসলে বাংলাদেশের জন্য লাভজনক। হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, এদেশে ভিখারিরাও দুর্নীতিগ্রস্ত। কিন্তু দুর্নীতি আর সার্বভৌমত্ব বিসর্জন এক জিনিস নয়। একটি দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে। একটি বিকিয়ে যাওয়া রাষ্ট্র পারে না। তবে এই পার্থক্যটাই যারা আবার তিন দশক ধরে বোঝাতে চেয়েছিলেন, তারাই আজ বঙ্গোপসাগর-সেন্টমার্টিন নিয়ে নির্ঘুম না হয়ে উল্টো পাকা আম খেয়ে নাকে তেল দিয়ে ভালোই ঘুম দিচ্ছেন!
শেষে ইরানের কথা আবার বলতেই হয়, যেমন বলছিলাম শুরুতেই, বিপ্লবের প্রতিটি শরিককে খোমিনি একে একে সরিয়ে দিয়েছিল। যারা টের পায়নি, তারা গুলি খেয়েছে। যারা টের পেয়েছে, তারা পালিয়েছে। ইতিহাস সবসময় ঠিক একইভাবে পুনরাবৃত্তি না হলেও পুরনাবৃত্তির কাঠামোটা বদলায় না। যে শরিকরা এখন বাংলাদেশ থেকে আমেরিকায়-ইউরোপ-অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার বা স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা-তদবির করছেন, তারা সম্ভবত ইতিহাসের সেই কাঠামোর কঠোরতা বুঝতে পেরেছেন। শুধু একটু দেরিতে, এই যা।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ২:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


